রাতুল প্রাইমারি স্কুলে পড়ে। ক্লাস ফাইভে। কিছু দিন হলো রাতুল ক্লাস করছে না। স্কুল বন্ধ। প্রিন্সিপাল স্যার অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটি ঘোষণা করেছেন। দেশেজুড়ে হইহুল্লোড় হচ্ছে। সর্বমহলের ছাত্ররা রাস্তায় নেমে পড়েছে। জায়গায় জায়গায় পুলিশ বাহিনীর মহড়া। থেকে থেকে গুলির ঠাসঠুস শব্দ শোনা যায়। সুতরাং ছোটদের বাড়িতে থাকা ভালো। নিরাপদ। এই ভেবে কাজী সাহেব গত সপ্তায় স্কুল গেটে তালা ঝুলিয়েছেন।
রাতুল লম্বা ছুটি পেয়ে দারুণ খুশি। স্কুলে যাওয়ার চাপ নেই। প্রতিদিন সে বের হয় ক্রিকেট খেলার জন্য। ক্রিকেট খেলায় সে দারুণ পাকা। এলাকায় তার প্রচুর নাম ডাক। কেউ তাকে ছাড়া খেলা শুরু করে না। রাতুল প্লেয়ার ভাগবাটোয়ারা করলে খেলা আরম্ভ হয়। মরিয়ম বেগম চিন্তায় থাকেন ছেলেকে নিয়ে। এই অস্থির সময়ে ছেলেটি কোথায় খেলে। না জানি কি বিপদ হয়!
আজ রাতুলের মা ঘরের দরজা খুলে ভারী অবাক হলো। বাসার সামনে একগাদা ছেলেপুলে। সবাই রাতুলের বয়সি। প্রায় সবার পরনে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। চকচকে শার্ট গায়ে। ভদ্র চেহারা। তিনি হাসিমুখে জিগ্যেস করলেন, বাবারা! তোমরা কারা? ‘লাল শার্টপরা একটি ছেলে বলল, আন্টি! আমরা রাতুলের বন্ধু।’
‘তা কেন এসেছো বাবা!’
‘রাতুল আসতে বলেছে।’
মরিয়ম বেগম চিন্তায় পড়ে গেলেন। রাতুল তাকে কিচ্ছু বলেনি। বিষয়টা কেমন যেন খটকা লাগল।
তিনি মুখ হাসি টেনে বললেন, রাতুল কেন আসতে বলেছে তোমাদের?
‘চটপটে ছেলেটি ঠোঁট বলল- রাতুল বলেছে আজকে আমাদেরকে নিয়ে খেলবে।’
‘কী খেলবে?’
‘পানি খেলা।’
‘ওমা! এটি আবার কী খেলা?’
‘আপনি বুঝবেন না আন্টি। আমরা যখন খেলব তখন দেখবেন।’ মরিয়ম বেগম কথা বাড়ালেন না। ঘরের কাজে মন দিলেন।
একসময় মরিয়ম বেগম দেখতে পেলেন বাচ্চারা সবাই খেলছে। সবার হাতে এক একটা পানির বোতল। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রাতুল বলছে ভাইয়া! পানি লাগবে! পানি! আমি মুগ্ধ। পানি লাগবে পানি।
এলাকার ছোট ছোট বাচ্চারা একে একে পানির বোতল নিচ্ছে। মরিয়ম বেগমের চোখ ভিজে উঠল। তিনি ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করলেন। মরিয়ম বেগম চোখকে বিশ্বাস করাতে পারছেন না তার ভাঙা ঘরে শহীদ হয়ে যাওয়া মুগ্ধ ফিরে এসেছে। তিনি তার ছেলের মাঝে মুগ্ধর সাহসী ছায়া দেখতে পাচ্ছেন। কানের কাছে মিহি গলায় ডাকছে ভাইয়া! পানি লাগবে! পানি।
মরিয়ম বেগম প্রতিজ্ঞা করলেন রাতুলকে তার মতো বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে হবে। সেও যেনো মুগ্ধর মতো সাহসী হয়। কারণ আমাদের দেশে মুগ্ধর মতো সত্যিকার কিছু তরুণ দরকার। এরকম একঝাঁক সাহসী বীর থাকলে বাংলাদেশকে কেউ রুখে দিতে পারবে না। তিনি নিজ ছেলের মাঝে স্পষ্ট মুগ্ধকে দেখতে পাচ্ছেন।