আয়ান খুব শান্ত এবং ভদ্র একটি ছেলে। বাবা-মা, দাদা-দাদী সবাই আয়ানকে খুব ভালোবাসে। প্রাইমারি শেষ করে কিছু দিন হলো আয়ান হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছে। বাসা থেকে স্কুল আর প্রাইভেটে যাওয়া ছাড়া সাধারণত ঘরের বাইরে তেমন একটা বের হয় না সে। সেদিন আয়ান প্রাইভেট থেকে ফিরে চুপিচুপি ঘর থেকে বের হচ্ছিল। ঠিক তখনই দাদা দেখে ফেলল আয়ানকে।
-আয়ান, কোথায় যাচ্ছ এ সময়ে? তোমার হাতে এটা কী? দাদা ভারী গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
-না মানে দাদা ভাই, এই খাবারগুলো মনে হচ্ছে নষ্ট হয়ে গেছে। তাই এগুলো ডাস্টবিনে ফেলে দিতে যাচ্ছি। আয়ান আমতা আমতা করে জবাব দিলো।
দাদা বলল, দেখাও তো আমাকে।

আয়ান তার হাতে থাকা প্যাকেটটি দাদার কাছে দিলো। তাতে ছিল বিরিয়ানি ও সালাদ।
দাদা ভালো করে দেখে বললেন, কই এগুলো তো নষ্ট হয়নি। এটি এখন ফ্রিজে রেখে দাও। পরের বেলায় গরম করে খাওয়া যাবে। এভাবে খাবার নষ্ট করা উচিত নয়।
আয়ান মাথা হেলিয়ে হ্যাঁ-সূচক জবাব দিয়ে বলল, ঠিক আছে, দাদা ভাই। এখনই ফ্রিজে রেখে আসছি।
দাদা আয়ানকে পাশে বসিয়ে বললেন, দেখো দাদা ভাই, আমরা যে খাবারগুলো খাই এর পেছনে অনেকের কষ্ট ও শ্রম রয়েছে। তাদের কষ্টের বিনিময়ে আমরা খেতে পাই। তাই আমাদের উচিত খাবারের যত্ন নেয়া, অযথা খাবার নষ্ট করা থেকে বিরত থাকা।
আয়ান দাদা ভাইয়ের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল।
দাদা আরো বললেন, আমরা কত ভালো ভালো খাবার খাই। এরপরও সামান্য কিছু হলে খাবার ফেলে দিই, খাবার নষ্ট করি। কিন্তু তুমি কি জানো- কত মানুষ ভালো খাবার তো দূরের কথা ঠিকমতো একটু ডাল-ভাতও খেতে পায় না? কত মানুষ না খেয়ে দিন পার করছে।
দাদা ভাইয়ের কথা শুনে আয়ান ভীষণ অবাক হলো। কারণ, আয়ানের বাবা অনেক ধনী। বাড়ি-গাড়ি সবকিছুই আছে তাদের। আয়ান কিছু চাওয়ার আগেই বাবা-মা তাকে সবকিছু এনে দেয়। তাই কষ্ট কী জিনিস তা সে বোঝে না বললেই চলে।
বিস্ময়ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, দাদা ভাই, সত্যিই কি তাই?
দাদা বললেন, হ্যাঁ, সত্যিই তাই। তোমার অবাক লাগছে শুনতে তাই না!

আয়ান বলল, হুম দাদা ভাই ।
দাদা বললেন, আমি আগামীকাল এক জায়গায় যাবো। তোমাকেও সেখানে নিয়ে যাবো। তাহলে তুমি বুঝতে পারবে।
পরের দিন দাদা আয়ানকে নিয়ে গাড়িতে করে শহরের বাইরে বের হলেন। গাড়ি শহর পেরিয়ে গ্রামের পথ ধরে চলতে লাগল। অনেক দূর যাওয়ার পর গাড়িটি গ্রামের মাটির রাস্তার শেষ মাথায় গিয়ে থামল। যতদূর চোখ যাচ্ছিল তাতে কোনো মানুষ দেখা যাচ্ছিল না। আয়ান তার দাদার সাথে হাঁটতে লাগল। কিছু দূর যেতেই একটা তাঁবু দেখতে পেল আয়ান। দাদা ভাই তাকে নিয়ে সেদিকেই এগিয়ে গেলেন।
আয়ান দেখল, অনেক নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও শিশুরা তাঁবুর নিচে বসে আছে। তাদের থাকার মতো কোনো ঘরবাড়ি নেই। ভালো কাপড়-চোপড় নেই। সবার চেহারায় দুঃখ-দুর্দশার ছাপ। আয়ান কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না।
আয়ানদের দেখে লোকজন দৌড়ে এলো। তাদের একজন বলল, তিন-চার দিন আগে আমাদের এলাকায় ঝড়-বন্যা হইছে। এতে আমাদের ঘরবাড়ি সব শেষ হয়ে গেছে। আমরা এখন এখানে এসে খোলা আকাশের নিচে কোনোরকম বাস করছি।

আরেকজন বলল, খাবার-দাবার যা ছিল সব শেষ হয়ে গেছে। গতকাল বিকেল থেকে না খেয়ে আছি। ছেলে-মেয়েদের মুখেও কোনো খাবার দিতে পারিনি। এ কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
আরেকজন বলল, আমাদেরকে কোনো সাহায্য করুন। নয়তো আমরা বাঁচতে পারব না। আমাদের কোনো খাবার-দাবার নেই, টাকা-পয়সা নেই।
এসব দেখে আয়ানের কচি মনটা হু হু করে উঠল। চোখে কান্না চলে এলো। মানুষ এত কষ্টে আছে সে ভাবতেও পারেনি।
আয়ানের দাদা তাদেরকে সান্তনা দিলেন। ধৈর্যধারণ করতে বললেন। যথাসম্ভব আর্থিক সহযোগিতাও করলেন। এরপর তাদের থেকে বিদায় নিলেন।
ফেরার পথে দাদা ভাই আয়ানকে বললেন, দেখেছ, তাদের জীবনযাপন কত কষ্টের। অথচ তুমি, আমি, আমরা কত ভালো আছি। প্রতিদিন ভালো ভালো খাই, ভালো ভালো জামাকাপড় পরি, প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে কত টাকা খরচ করি। আমরা যদি আমাদের প্রতিদিনের খরচ থেকে তাদের জন্য কিছু টাকা-পয়সা জমা করি, কিছু কাপড়-চোপড় ও খাবার-দাবার দিই তাহলে তাদের অনেক উপকার হবে। এতে আমাদের মানবসেবা করা হবে। শোনো দাদা ভাই, একা একা ভালো থাকার নাম ভালো থাকা নয়; বরং নিজের আপনজন, প্রতিবেশী ও আশপাশের সবাইকে নিয়ে ভালো থাকাই মূলত হলো ভালো থাকা।

দাদা ভাইয়ের কাছ থেকে আয়ান প্রায়ই অনেক কিছু শেখে। সেদিনও নতুন করে অনেক কিছু শিখল। বাড়ি ফিরে সে রাতে আয়ানের আর ঘুম হয়নি। তাদের কথা ভেবে ভেবেই রাত পার করেছে। একবার নিজের দিকে তাকায় আরেকবার দাদা ভাইয়ের কথাগুলো মনে করে, সেই অসহায় মানুষগুলোর কথা মনে করে। আয়ানের ছোট্ট মনে তাদের জন্য কিছু একটা করার ব্যাকুলতা শুরু হলো। কী করা যায় কী করা যায় এসব ভাবতে ভাবতেই সকাল হয়ে গেল।
সেদিন ছিল শুক্রবার। আয়ানের স্কুল বন্ধ। সকালে আয়ান তার দাদা ভাইয়ের কাছে এসে বলল, দাদা ভাই, গতকাল যেখানে গিয়েছিলাম আজকেও সেখানে চলো। আমি আব্বুর কাছে থেকে কিছু টাকা নিয়েছি। আর আমার কিছু কাপড়-চোপড় ছিল সেগুলো জমা করেছি। আমি এই সামান্যটুকু দিয়েই তাদের পাশে দাঁড়াতে চাই। আমিও মানবসেবা করতে চাই।
দাদার চোখ আনন্দে ছলছল করে উঠল। আয়ানকে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, তুমি তো আমাকে খুশি করে দিলে। এইটুকু বয়সে তুমি যা করেছ, তা আমি এই বুড়ো বয়সেও করতে পারিনি। এভাবেই আমাদের সবার নিজ নিজ জায়গা থেকে এগিয়ে আসা উচিত। তাহলেই আগামীতে সুন্দর একটা দেশ তৈরি হবে।
দাদা আয়ানকে নিয়ে রওনা হয়ে গেলেন।