বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি সরু খাল। বর্ষার দিন এলে খালে পানি ঢোকে কুমার নদী থেকে। পানি চলে যায় চত্রার বিলে। খালে তাই স্রোত পড়ে যায়। খালের পাশে একটা বাবলা গাছ আছে। ছোট বাবলা গাছ। গাছটি হেলতে হেলতে খালের মাঝ বরাবর চলে এসেছে । সেই গাছে একটা মাছরাঙা বাস করে। দিনের বেশির ভাগ সময় তাকে বাবলা গাছের ডালেই দেখা যায়। নীল, আর কালো রঙের সাথে সামান্য হলুদ রঙের মিশেল রঙে মাছরাঙাটির গায়ের রঙ। লাল লম্বা ঠোঁট। দেখতে খুব সুন্দর লাগে। মন জুড়িয়ে যায় মাছ ধরার জন্য তাক করে বসে থাকার দৃশ্য দেখে ।
মাছরাঙাটি সারাদিন বাবলা গাছের ডালে বসে থাকলেও তার একটি বাসা আছে। বাসাটা খাল থেকে অনেক উঁচুতে, কিছু আগাছার আড়ালে মাটির গর্তের ভিতর। সেখানে হয়ত আরেকটি মাছরাঙা আছে। দু’টি মাছরাঙা একই রকমের হওয়াতে বোঝা যায় না কয়টি মাছরাঙা আছে। বাবলা গাছের ডালে একটি পাখি দেখা যায় সব সময়।
আমার দাদু বলেছেন ওখানে দু’টি পাখিই আছে।
বাসায় ডিম দিয়েছে। একটা ডিম পাহারা দেয়। আরেকটা মাছ ধরে। পালা বদল করে মাছ ধরে তাই একটি পাখিই চোখে পড়ে। দু’টি পাখি এক সাথে দেখা যায় না। দাদু বলেছেন তাই বিশ্বাস না করে উপায় নেই। বিশ্বাস করে নিলাম।
মাছরাঙার মাছ ধরার কৌশল খুব সুন্দর। গাছের ডালে নিঃশব্দে বসে থাকে তীক্ষè দৃষ্টি দিয়ে। কোনো রকম নড়াচড়া করে না। মাছ যতক্ষণ না দেখা যায় ততক্ষণ একই ভাবে বসে থাকে। পাখিটির ধৈর্যশক্তি খুব বেশি।
একটা মাছ শিকার করার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে। ধৈর্যচ্যুতি হতে দেখা যায় না। যখন মাছ তার চোখে পড়ে তখন বিদ্যুৎবেগে পানি থেকে ছোঁ মেরে মাছ ধরে নিয়ে আসে। মাছরাঙা ছোঁ মেরেছে, মাছ ধরতে পারে নাই এমন দেখাই যায় না। মাছরাঙার আক্রমণ প্রায় শতভাগ সাফল্যের ছোঁয়া পায়।
আমাদের খালের মাছরাঙাটি চকচকে নীল বর্ণের। বিকেল হলে আমরা কয়েকজনে মিলে মাছ ধরা দেখি।
হেলে পড়া সূর্যের আলো মাছরাঙার গায়ে পড়লে চিকচিক করে উঠে তৈলাক্ত নীল বর্ণ খুব ভালো লাগে।
খালে প্রচুর মাছের আনাগোনা দেখা যায়। মাছ মারার জন্য মাঝি বাড়ির সুনীল মাঝি মাছ মারার জাল পেতে রেখেছিল। মাছরাঙাটি জালে বাঁধা মাছটি ধরতে গেলে জালে ঠোঁট আটকে গেল। জাল থেকে আর বের হতে পারছে না কোনোভাবেই । ফলে পানিতে দাপাদাপি করছে মাছরাঙাটি। এসময় সেখানে পৌঁছায় মাঝি যিনি জাল ফেলেছেন। এসেই দেখলেন মাছরাঙাটি বাঁচার জন্য কেমন ছটফট করছে। খুব দয়া হলো মাঝির। তিনি তাড়াতাড়ি পানিতে নেমে পড়লেন। দ্রুত চলে গেলেন মাছরাঙার কাছে। খুব সাবধানে জাল থেকে মাছরাঙার ঠোঁটটি ছাড়িয়ে নিলেন আর অমনি মাছরাঙাটি উড়ে চলে গেল। গিয়ে বসল সেই বাবলা গাছের ডালে। লোকটি দেখলেন- মাছরাঙাটি যেন কৃতজ্ঞ চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি সরু খাল। বর্ষার দিন এলে খালে পানি ঢোকে কুমার নদী থেকে। পানি চলে যায় চত্রার বিলে। খালে তাই স্রোত...
