নতুন চাকরিতে জয়েনিং হবে। সময় সকাল ১০টা। সকাল ৬টা থেকে প্রস্তুতি। একপ্রকার হুড়োহুড়ি বলা চলে। সাত সকালে দাপাদাপির শব্দে আসাদ সাহেব উঠে আসেন। রাতে হালকা বাতাস, কয়েকটা মেঘের ডাক। চৈত্র ও বৈশাখ মাসে এটি স্বাভাবিক। বিদ্যুৎ গেল ১১টায় কখন এসেছে আসাদ সাহেব বলতে পারবেন না। গুমোট গরম হলেও জানালা খোলার উপায় নেই। মশারা কিলবিল করে মিছিল নিয়ে ঢুকে পড়বে। হাসফাস করে রাত পেরিয়ে শানুর চিৎকারে সকাল হয়। সকালের একটু শীতল পরশে কিছুক্ষণ আরামে ঘুমাবেন উল্টো বাড়িতে গরুর হাট বসেছে। গরম মেজাজে খুড়িয়ে খুড়িয়ে শানুর সামনে হাজির।
- কী ব্যাপার এত চিৎকার কেন?
-আরে দাদা আমার নতুন চাকরি। জয়েনিং।
-বেশ তো, হুড়োহুড়ি, চিৎকারের কী আছে?
বুড়োর সাথে খুশির দিনে ঝগড়া করতে মন চায় না। অপ্রাসঙ্গিক কথা বলবেন। বর্তমান সময় পেরিয়ে ব্রিটিশ আমলে চলে যাবেন। একটু পরপর বলবেন, আমি ব্রিটিশ আমলের মেট্রিক পাস। তুই কার কাছে কী বলিস? শানু দ্রুত বেরিয়ে পড়ে। শহরে যানযট আছে। তাকে যেতে হবে বেশ কিছুটা পথ। সাভার থেকে যাত্রাবাড়ী। চকচকে একটা গাড়ি। হেলপার ডাক ছেড়ে বিরামবিহীনভাবে বলে চলে, এই যাত্রাবাড়ী, যাত্রাবাড়ী....
শানু দেরি করে না। গাড়ি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে শুরু করে। হেলপার একটু পরপর ধুম করে থাবা মেরে বলে, ওস্তাদ স্লো। এক এক থাবা মানে পাঁচ দশ মিনিট দুই থাবার অপেক্ষা। দুই থাবা পড়লেই গাড়ি চলা শুরু। গাড়ির সামনে বড় করে লেখা আছে ননস্টপ এক্সপ্রেস। কিছু গাড়ি বিরতিহীন। উঠে পড়লে দেখা যায় হীন বাদে শুধু বিরতি আছে। এটার অবস্থাও তাই, নন বাদ- স্টপ সার্ভিস বলা যায়। যাত্রী বোঝাই গাড়িতে একের পর এক থাবা আর ওস্তাদ স্লো শব্দে ক্ষেপে ওঠেন এক বয়স্ক লোক, এই হেলপার ফাজলামোর কিন্তু সীমা আছে? হালকা পাতলা গড়নের হেলপার বয়সে যুবক। চিকন শরীরের হেলপার মোটা গলায় বলে, যাত্রী নেব না! খালি গাড়ি চালায়া যাবো? হেলপারের কথা শেষ হয় না যাত্রাবাড়ী ব্রিজের একটু আগে গাড়িটা ঘ্যাড়ব্যাড় বিকট শব্দ তুলে বন্ধ হয়ে যায়। যাত্রীরা ইচ্ছেমতো গালি দিতে থাকে। বিশেষ ক্ষেত্রে হেলপার, ড্রাইভাররা গালিপ্রুভ। হেলপার দেরি করে না। লাফ দিয়ে নেমে গাড়ির নিচে ঢুকে পড়ে। ড্রাইভার গালি, খ্যাঁচানি ঠেলে রাস্তায় নামে। গায়ের জড়তা কাটান। ভাবখানা এমন একটু পর যেন ওনার ওয়ার্ল্ডকাপের ম্যাচ আছে। ওয়ার্মআপ শেষে আয়েশী গলায় বলেন, কী অবস্থা কালু?
- ওস্তাদ দেখতাছি। সময় লাগব।
- আমি খেতে গেলাম।
গাড়ির নিচ থেকে আওয়াজ আসে, যান ওস্তাদ যান।
সাড়ে ৮টা। হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে। দ্রুত হেঁটে ব্রিজ পার হয়ে অন্য গাড়িতে ওঠে। যান্ত্রিক জীবনে যন্ত্র ছাড়া উপায় নেই। এপারেও একই অবস্থা। গাড়ি চলতে শুরু করেছে সবেমাত্র। ড্রাইভার হাঁক ছেড়ে হেলপারকে ডাকে। সেও তার বাদুড়ঝোলা অবস্থান ত্যাগ করে ছুটে এসে বলে, ওস্তাদ সমস্যা?
- আমার ওই বেগ এসেছে....
- আচ্ছা যান।
ড্রাইভার নেমে যায়। হেলপার গাড়ি চালাতে শুরু করে। আজব দেশ! হেলপার ড্রাইভার রকেটের গতিতে গাড়ি ছোটায়। ওস্তাদ স্লো বলার লোক নাই আপাতত। একটু ঝিমুনি ভাব আসতেই শোরগোল শুনে লাফিয়ে ওঠে শানু। গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে কে জানে! কাগজপত্র দেখাতে না পারায় মাঝপথে গাড়ি আটকে দিয়েছে পুলিশ। সকাল ১০টা। শানু আর সহ্য করতে পারে না হেলপারের সামনে গিয়ে একটা কড়া ধমক, এই ব্যাটা তুই গাড়ি চালাতে বসেছিস কেন? কাগজপত্র নেই।
- তা উনার তো বেগ এসেছে। গাড়িতে ঝেড়ে দিলে তো আপনারাই চেঁচামেচি করতেন।
পাশ থেকে একজন বলে, এই হেলপার চুপ। একদম কথা বলবি না। এমন থাবড়ান থাবড়াব গাড়ির নাম ভুলে যাবি। আরেকজন বলে বাড়ির নাম ভুলে যাবি। হেলপার ফিক করে হেসে ওঠে, স্যার কী যে কন, হেলপার ছাড়া দুনিয়ায় আছে কেউ? আগে যে ছিল সে কী ড্রাইভার?
- তো!
- সেও হেলপার। এই পারে আমি চালাই ওই পারে সে।
- ড্রাইভার নাই?
- আছে তো। ওস্তাদ তো আর দেও দানব না যে একাই চারটা গাড়ি চালাবেন।
শানু থাপ্পড় মারবে কি আপন মনে হেসে বিদায় নেয়। তার সময় পেরিয়ে গেছে। নতুন চাকরি। প্রথম দিন। একটু আগাতেই দেখে গাড়ির বহর। নিথর গাড়ি, চলছে না। কেউ বলতেও পারছে না কি হয়েছে। কিছু রিকশা, সিএনজি ঘুরঘুর করছে। কয়েকজনকে মতিঝিল যাওয়ার কথা বলে প্রত্যাখ্যাত হয়ে কিছুটা নিরাশ। একটা সিএনজিতে এক মেয়েকে বসা দেখে এগিয়ে যায়।প্রশ্ন করে, কীরে তুই যাবি!
- হ্যাঁ।
- কেউ যাবে না, তুই যাবি কেন?
-স্যার আর বইলেন না, মানুষ থেকে শুরু করে আমার বউ পর্যন্ত হেলপার বলে গালি দেয়।
- হেলপার মানে?
- হু, হেলপার! বড় গাড়ির হেলপার আজ সিএনজি নিয়ে বের হইছি। কিছু মনে কইরেন না স্যার, গালি খাওয়া জীবন আর রাখব না। ওপারে যাবো কেমন ভয় ভয় লাগতাছে এজন্য আপারে উঠাইছি। এখন আপনি উঠলেই হয়। তিনজনে একেবারে সোজা বুড়িগঙ্গা....। মেয়েটা প্রথমে কিউ তার পর ওরে মারে বাবারে শব্দ করে সিএনজি থেকে লাফ দিয়ে নামে। শুধু নেমেই ক্ষান্ত হয় না একেবারে ভোঁ দৌড়।
নতুন চাকরিতে জয়েনিং হবে। সময় সকাল ১০টা। সকাল ৬টা থেকে প্রস্তুতি। একপ্রকার হুড়োহুড়ি বলা চলে। সাত সকালে দাপাদাপির শব্দে আসাদ সাহেব উঠে আসেন। রাতে হালকা...
