রাতের শেষপ্রহর চলছে এখন। ভোর হতে খুব বেশি সময় আর বাকি নেই। হাসপাতালের একটি রুমে সুমাইয়ার নিথর দেহটা রাখা হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে বাবা-মাকে তাদের কন্যার মৃতদেহটা দেখানো হয়েছে। অস্থির, চঞ্চল ফুটফুটে সুন্দর মেয়েটা কী শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। অদ্ভুত এক নীরবতা গ্রাস করে আছে তার চার পাশে। অতি আদরের মেয়েটি যে ধরনের ঘটনার শিকার হয়ে অস্বাভাবিকভাবে মারা গেছে তা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না আমিনুল হক এবং তার স্ত্রী তাসলিমা। অকস্মাৎ ,অকালে এভাবে কন্যাটিকে হারাতে হবে তারা কল্পনাও করেননি। কন্যা হারানোর শোকে তারা কেমন বিমূঢ় হয়ে গেছেন। কান্নার কথা যেন ভুলে গেছেন। তাসলিমা নীরবে মৃত কন্যার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। তিনি ভাবছেন কয়েকদিন আগে দেখা স্বপ্নটির কথা। যেখানে সুমাইয়াকে সাদা ধবধবে পোশাকে বাড়ি থেকে অজানা গন্তব্যের দিকে চুপচাপ বেরিয়ে যেতে দেখেছিলেন। সেই দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল তার। কন্যার জন্য অজানা আশঙ্কায় দুলে উঠেছিল মায়ের মন। কী এক দ্বিধায়, ভয়ে, আশঙ্কায় সেই দুঃস্বপ্নের কথা কন্যা সুমাইয়া কিংবা বাসার কাউকে খুলে বলতে পারেননি। বললে তারা সবাই কিভাবে নেয় বিষয়টি- তেমন ভেবে নিজের মধ্যে চেপে রেখেছিলেন স্বপ্নের কথা।
স্কুলে পড়ার সময় সুমাইয়া বাইরে ঘুরতে, বেড়াতে যেতে বায়না ধরতো শুধু। ছুটির দিনগুলোতে একমাত্র কন্যাটির বায়না পূরণ করতে বাবা-মা বিভিন্ন জায়গায় তাকে নিয়ে বেড়াতে যেতেন। তখন হয়তো তাদের অর্থবিত্ত, প্রভাব, প্রতিপত্তি আজকের মতো ছিল না। খুবই সাধারণ মানের ছোটখাটো ব্যবসা ছিল আমিনুল হকের। ব্যবসাটাকে টিকিয়ে রেখে আরো সামনে এগিয়ে নিতে অনেক পরিশ্রম করতে হতো। মাঝে মাঝে হতাশা গ্রাস করলেও ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আবার দ্বিগুণ উদ্যমে কাজ শুরু করতেন তিনি। সততা, নিষ্ঠা এবং পরিশ্রমকে পুঁজি করে পথ চলার আপ্রাণ চেষ্টা ছিল। তখন চার পাশে ব্যবসাবাণিজ্যের পরিবেশটা ছিল অন্যরকম। আজকের মতো অসুস্থ এবং অরুচিকর ছিল না। অথচ এখন ব্যবসাবাণিজ্যে প্রতারণা, অসততা, অনয়িম, অসুস্থ প্রতিযোগিতা চরমে পৌঁছেছে। সৎভাবে ব্যবসা করে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাটাই যেন অসম্ভব হয়ে উঠেছে । ব্যাংকে এলসি খুলে বিদেশ থেকে পণ্যসামগ্রী আমদানি না করে হাজার হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন দেশে পাচার করছে চেনাজানা অনেক ব্যবসায়ী। রাতারাতি তাদের অর্থবিত্ত ফুলে ফেঁপে উঠছে। আশপাশের অনেককে এ ধরনের জালিয়াতি আর অনিয়ম করতে দেখে শুরুতে তাদের প্রতি ঘৃণাবোধ জাগলেও ধীরে ধীরে আমিনুল হকও তাদের দলে শামিল হয়ে গেছেন। ব্যবসাবাণিজ্যে জালিয়াতি, প্রতারণা, সিন্ডিকেট না করলে ছিটকে পড়তে হবে, নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। কারণ, এখন সময়টাই খারাপ হয়ে গেছে। এখানে সততা, নৈতিকতা, মূল্যবোধের কোনো দাম নেই। পুরো সিস্টেমটাই দূষিত ও বিষাক্ত হয়ে গেছে। রাজনীতি, প্রশাসন, ব্যাংকব্যবস্থা- সবখানেই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়ার প্রতিযোগিতা চলছে।
আমিনুল হক আগের সব নীতিবোধ সততা, মূল্যবোধ জলাঞ্জলি দিয়ে ব্যবসায় নেমে গত বেশ কয়েকবছরে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন। কানাডায় ম্যালা টাকা পাচার করে সেখানে বাড়ি কিনেছেন। তার ইচ্ছে মেয়ে সুমাইয়া এবং দুই ছেলে আকিব-সাকিবকে সেখানে পাঠিয়ে দেবেন। ও লেভেল, এ লেভেল কমপ্লিট করার পর সুমাইয়াকে সেখানে চলে যেতে বলেছিলেন আমিনুল। কিন্তু তখন বাদ সেধেছিলেন সুমাইয়ার মা তাসলিমা। একমাত্র কন্যাসন্তানকে চোখের আড়াল করতে চাননি তিনি। কতো আদর-যতেœ মেয়েটিকে বড় করেছেন। সে যদি হাজার হাজার মাইল দূরে, সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে কোন অচেনা জায়গায় চলে যায়, তাহলে এখানে কী নিয়ে থাকবেন, কিভাবে বাঁচবেন?
সুমাইয়া যতই স্মার্ট জীবনযাপন করুক না কেন দেশ ছেড়ে বিদেশে গিয়ে থাকতে কিংবা পড়াশোনা করতে রাজি ছিল না। সারা দিন ভার্সিটি, ক্ল¬াব-পার্টি, বন্ধুবান্ধবদের আড্ডা, ফুর্তি, মজা-মাস্তি শেষে নিজের ঘরে ফিরতে পছন্দ করত সে। মা তার অপেক্ষায় বসে থাকত। ঘরে ফিরেই মাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ বসে থাকত। তাসলিমাও কন্যার প্রতীক্ষায় বসে থাকতে থাকতে ক্ল¬ান্ত, অধৈর্য হয়ে যেতেন। রাতে অনেকসময় ঘুমিয়েও পড়তেন। কিন্তু কন্যা বাসায় ফেরেনি- সে কথা মনে হতেই ঘুম ছেড়ে উঠে বসতেন। বাইরে তার এতো কী ব্যস্ততা, ঘোরাঘুরি? মেয়েদের এতো ব্যস্ততা, ঘোরাঘুরি ভালো নয়। বিশেষ করে সুমাইয়ার মতো অল্পবয়সী সুন্দরী মেয়েদের জন্য তো বিপদ ডেকে আনতে পারে এসব। যেকোনো সময়ে একটা অঘটন ঘটে যেতে পারে। কন্যাটি দেখতে দেখতে বেশ বড় হয়ে গেছে। আগের মতো ছোট্টটি নেই। ওর জীবনযাপনে একটা শৃঙ্খলা থাকা দরকার। শৃঙ্খলাহীন জীবনে যেকোনো সময়ে দুর্ঘটনা, বিপদ ঘটতে পারে। কথাগুলো অনেকবার প্রিয় সন্তানটিকে বলতে চেয়েছেন তাসলিমা। এখন তার সংযত হয়ে চলা দরকার, আকার ইঙ্গিতে বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু অনেক আদর-স্নেহে লালিত সুমাইয়া মা-বাবার কাছ থেকে তেমন শাসন, উপদেশ, পরামর্শ শোনার মানসিকতা নিয়ে বেড়ে ওঠেনি। এ ধরনের কিছু শুনলেই রাগ-অভিমানে গাল ফুলিয়ে বসে থাকে। নয়তো ঘরের দরজা বন্ধ করে চুপচাপ বসে থাকে। বাবা-মা, ভাইদের কারো সাথে মন খুলে কথা বলে না। মেয়েটির গোমড়া মুখ দেখতে ভালো লাগে না, কেমন যেন অসহ্যকর মনে হয়। যে কারণে তাসলিমা মেয়েকে সহজে তেমন কিছু বলতো না। হঠাৎ মুখ ফসকে তেমন কিছু বেরিয়ে গেলেও সুমাইয়ার মন খারাপ হতো, রাগ করতো। কিন্তু এভাবে তো চলতে পারে না, তাসলিমা ভাবতেন।
আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু কেউ কেউ বলেন, ছেলে-মেয়েদের বেশি প্রশ্রয় দিতে নেই। এটা তাদের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনে। সন্তানের ভালোর জন্য তাদের আদর-স্নেহ, ভালোবাসার পাশাপাশি শাসন-নিয়ন্ত্রণও প্রয়োজন রয়েছে। আজকাল অনেক পরিবারে এটা নেই। যে কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অবক্ষয়, উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন, অপরাধপ্রবণতা ব্যাপকভাবে বাড়ছে। মাদকাসক্তি মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্বামী আমিনুল হক এতক্ষণ নীরব নিথর থাকলেও এখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন আর বলছেন, ওহ, আল্লাহ! এটা কী হলো? এত বড় শাস্তি দেয়ার আগে আমাদের উঠিয়ে নিয়ে গেলেই তো হতো। আমি তো আর পারছি না সহ্য করতে।
প্রাণহীন মৃত মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তাসলিমা নিজেকে প্রশ্ন করেন, কার পাপে মহান সৃষ্টিকর্তা তাদের এত বড় শাস্তি দিয়েছেন। স্বামী আমিনুলের ব্যবসাবাণিজ্য নিয়ে মাথা না ঘামালেও তাসলিমা বুঝতে পারে ঠিকই আজকাল এর মধ্যে নানা অনিয়ম, প্রতারণা, জালিয়াতি ঢুকে পড়েছে, যা ভয়ানক অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। সারা জীবন ব্যবসাবাণিজ্য করে যতটা অর্জন করা সম্ভব হয়নি তা খুব কম সময়ে, অতি দ্রুত লাভ করেছেন আমিনুল হক। এর পেছনে অনেক অপরাধ, অনিয়ম, দুর্নীতি লুকিয়ে আছে। তাসলিমা তার ঘর-সংসার করলেও মন থেকে এসব কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেননি কোনোভাবেই। এই মুহূর্তে তাসলিমার কেন জানি মনে হয় পিতার অনৈতিক ব্যবসাবাণিজ্য, অনিয়ম, দুর্নীতি, অপরাধের পাপের শাস্তি হিসেবে সৃষ্টিকর্তা কন্যা সুমাইয়াকে এভাবে ছিনিয়ে নিয়েছেন তাদের কাছ থেকে। কন্যা হারানোর দুঃসহ বেদনা বয়ে বেড়ানো কত যে ভয়ঙ্কর সেটি অনুভব করতে গিয়ে উপলব্ধি হয়, এর চেয়ে মরে গেলেও অনেক ভালো হতো। এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কিছু হতে পারে না।
২
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সুমাইয়া আফরিন ধর্ষণ-হত্যার অভিযোগের ঘটনায় ধর্ষণ ও অতিরিক্ত মাদক গ্রহণের আলামত পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে নিশ্চিত করেছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক। এ ঘটনায় গ্রেফতার নিহত তরুণীর দুই বন্ধুকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত রিপোর্টটি পড়তে পড়তে বুকের মধ্যে এক ধরনের হতাশা আর ক্ষোভ চেপে বসে সায়মা রহমানের। সুমাইয়া তার ছাত্রী ছিল। ক্লাসে হয়তো দশ-বারো দিন সুমাইয়াকে পেয়েছিল। মেয়েটির মধ্যে একধরনের উগ্রতা, ঔদ্ধত্যভাব ছিল। আজকাল অনেক তরুণ বয়সী ছেলে-মেয়ের মধ্যে এ ব্যাপারটা বেশ লক্ষ করা যায়। তেমন অস্বাভাবিক লাগেনি বিষয়টি। তবুও কেন জানি সায়মার মনে হতো, সুমাইয়া এমন হয়তো ছিল না। সঙ্গদোষে আর বাড়িতে অভিভাবকদের প্রশ্রয় পেয়েই সে এমন হয়ে গেছে। মেয়েটাকে ফেরানো দরকার। তাকে একান্তভাবে কাছে ডেকে নিয়ে ঠিকঠাক মতো বুঝিয়ে বললে মানে কাউন্সেলিং করলে সে নিশ্চয়ই উপলব্ধি করতে পারবে। নিজের ভুলটা ধরতে পারবে।
বাসায় সুমাইয়ার বয়সী সায়মার একটি ছোট বোন রয়েছে। নাঈমা শারীরিক প্রতিবন্ধী। স্কুল-কলেজে যাওয়া হয়নি। ঘরেই তার দিনরাত কাটে। লেখাপড়া করতে না পারলেও সে চমৎকার ছবি আঁকে। গানও গায় ভালো। তার গাওয়া গান শুনলে মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে মনে। সুমাইয়াকে ক্লাসে দেখলেই সায়মার কেবলই তার ছোট বোনটির কথা মনে পড়ে যায়।
ক্লাসের এত ছেলে-মেয়ের মধ্যে তাকে আলাদাভাবে ডেকে কথা বললে অন্যরা ব্যাপারটি কিভাবে নেয়, ভেবে সে পিছিয়ে গেছে। আবার সুমাইয়ার উগ্রতা, ঔদ্ধত্যভাব দেখে কিছুটা দ্বিধার মধ্যে ছিল সায়মা। তার গায়ে পড়ে উপদেশ দিতে যাওয়ার ব্যাপারটা মেয়েটি কিভাবে নেয় কে জানে। সে তো বাজেভাবে রিঅ্যাক্ট করে তাকে অপমানও করতে পারে। এখনকার ছেলে-মেয়েদের ঠিকমতো বোঝার জো নেই। কখন যে কী করে বসে, কী বলে ফেলে তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। নানা চিন্তাভাবনার দোলচালে সায়মার মনে জেগে ওঠা ইচ্ছাটা পূরণ করতে পারেনি। সেটি মনের মধ্যেই রয়ে গেছে। শহরজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী ঘটনাটির পর সায়মার নিজেকে কেন জানি অপরাধী মনে হয় । একজন শিক্ষক হিসেবে বিপথগামী ছাত্রীকে সঠিক পথে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তারও তো একটা দায়িত্ব ছিল। মেয়েটির করুণ পরিণতি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না সে। সুমাইয়াকে যদি একান্তে কাছে ডেকে বোঝানো সম্ভব হতো। ভার্সিটিতে তার শিক্ষক হলেও সায়মা তো তার বড় বোনের মতো। ছোট বোনকে কত কী বিষয়ে বুদ্ধি-পরামর্শ দিতে পারে। প্রয়োজনে শাসনও করতে পারে। মেয়েটা সর্বনাশের পথ ধরে ভয়ঙ্কর এক পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, অথচ এটা সে বুঝতে পারছে না। বাড়িতেও পরিবারের কেউ এ বিষয়ে সতর্ক কিংবা শাসন করছে না। চোখের সামনে তরতাজা সম্ভাবনাময় একটি প্রাণ গহিন অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। পচে গলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কেউ কি কোথাও নেই, সুমাইয়াকে ঠিকপথে ফিরিয়ে আনার জন্য শক্ত ভূমিকা নেয়ার মতো কেউ কি নেই? তাকে দেখে কেবলই ভেবেছে সায়মা।
যদি তার জন্য কিছু করা যেত...।
সে এরকম একটা কিছুর আশঙ্কা করছিল। শেষ পর্যন্ত মেয়েটার ভয়ঙ্কর করুণ পরিণতি হলো। এখন চার দিকে সুমাইয়াকে নিয়ে শুধু আজেবাজে নানা কথার ফুলঝুরি। একটা বখে যাওয়া নষ্ট মেয়ের তো এমনই পরিণতি হবে। অতিরিক্ত মাদক সেবনে মারাত্মক অসুস্থ হওয়ার পর সহপাঠী ছেলে বন্ধুর লালসার শিকার হতে হয়েছে। এরকম একটা মেয়ের জন্য সহানুভূতি জানাতে কে এগিয়ে আসবে? সায়মা ভাবছে, সুমাইয়ার বাবা-মায়ের কথা, বোন হারানো দুই ভাইয়ের কথা। এত বড় একটি শোক সহ্য করার পাশাপাশি সুমাইয়াকে নিয়ে চার পাশে নানাজনের মুখরোচক আলোচনায় অশালীন মন্তব্য তাদের সবাইকে আরো অনেক কষ্টের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। চার পাশের পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, চেনাজানা বন্ধু-বান্ধবদের অনেকেই বাসায় এসে লোকদেখানো সহানুভূতি জানালেও আড়ালে নানা কটু মন্তব্য করতে ছাড়ছে না। এর চেয়ে বড় যন্ত্রণাদায়ক আর কিছু কি হতে পারে তাদের জন্য।
সায়মার ভীষণ ইচ্ছে করে সুমাইয়াদের বাসায় ছুটে যায়। তার পরিবারের কষ্ট, দুঃখ, বেদনার অনুভূতি ভাগাভাগি করে নেয়। যে যা-ই ভাবুক, যা কিছু মনে করুক, সুমাইয়াদের বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে।
অকালে একটি তাজা ফুলের মতো প্রাণবন্ত মেয়ে এভাবে ঝরে গেল। কেউ তাকে আটকাতে পারল না। আগামীতে এরকম আর কেউ যেন চোখের সামনে পচে গলে নষ্ট হয়ে না যায়, অকালে ঝরে না যায়, সে ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। সায়মা এ ব্যাপারে তার ভার্সিটিতে সচেতনতা গড়ে তোলার ব্যাপারে উদ্যোগ নেবে একজন তরুণ বয়সী শিক্ষক হিসেবে। সুমাইয়ার মতো আরো অসংখ্য ছেলে-মেয়ে রয়েছে ভার্সিটিতে। যারা নানাভাবে বিপথগামী হয়েছে। অবুঝের মতো পথ চলছে। নিজের বিপদ ডেকে আনছে তারা। সেই ভুল পথ থেকে সরিয়ে আনতে হবে যেকোনো উপায়ে। মাদকের সর্বনাশা আগ্রাসন, উচ্ছৃঙ্খল বিকৃত জীবনযাপন, আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাধারা থেকে নিজেদের মুক্ত করে সুস্থ, সুন্দর, সুশৃঙ্খল উন্নত জীবনের অনুসারী করে তুলতে হবে। তাদের সাথে বন্ধুর মতো আচরণ করতে হবে। তাদের কাছে ডেকে মনের দুঃখ-কষ্ট, বেদনা, হতাশার কথাগুলো জানতে হবে। শিক্ষকদের শুধু ক্লাসে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর লেকচার দিয়ে, রুটিনমাফিক পরীক্ষা নিয়েই দায়িত্ব শেষ ভাবলে হবে না। ছাত্র-ছাত্রীদের হৃদয়ের কথা জানতে হলে তাদের প্রতি আলাদা দৃষ্টি দিতে হবে, কান পেতে গভীরভাবে শুনতে হবে তাদের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়গুলো। সায়মা সিদ্ধান্ত নেয়, কাল ভার্সিটি গিয়ে ভাইস চ্যান্সেলর, প্রক্টর, সিনিয়র প্রফেসর এবং প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের লোকজনদের সাথে এ বিষয়ে কথা বলবে। তাদের ভার্সিটির ছাত্রী সুমাইয়া আফরিনের বেদনাদায়ক অকালমৃত্যুর ঘটনাটি যাতে অন্য সবাইকে সচেতন ও সতর্ক করে তার চেষ্টা করতে হবে। বিষয়টি ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে তুলে ধরতে কী করা যায়, তেমন কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। এ কাজে সে কতটা সফল হবে আগে থেকে নিশ্চিত কিছু বলা যায় না। তবে উদ্যোগ নিতে তো সমস্যা নেই। চোখের সামনে অকালে সম্ভাবনাময় জীবনগুলো পচে-গলে নষ্ট হয়ে যেতে দিতে পারে না যেকোনো সুস্থ বিবেকবান মানুষ।