আবদুল মান্নান সৈয়দ বা (৩ আগস্ট ১৯৪৩-৫ সেপ্টেম্বর ২০১০) বাংলাদেশের একজন আধুনিক কবি, সাহিত্যিক, গবেষক ও সাহিত্য-স¤পাদক। কবিতা ছাড়াও তিনি গল্প, উপন্যাস, সমালোচনা, নাটক ইত্যাদি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদান রেখেছেন। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। রবীন্দ্রোত্তরকালে বাংলা সমালোচনা-সাহিত্যে তার রয়েছে দারুণ অবদান। কবি জীবনানন্দ দাশ এবং কবি কাজী নজরুল ইসলামের ওপরও তার রয়েছে গবেষণা। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দেড় শতাধিক। বাংলাদেশের সাহিত্যমহলে তিনি ‘মান্নান সৈয়দ’ নামেই পরিচিত।
বাংলা কবিতায় তিনি যুক্ত করেছিলেন পরাবাস্তববাদী দিগন্ত। বাংলা ভাষায় তিনিই একজন কবি যিনি ষাটের দশকে সমকালীন কাব্যরুচিকে বদলে দেয়ার অভিপ্রায়ে পরাবাস্তবতার শরণাপন্ন হয়েছিলেন। এভাবেই তিনি স্বীয় কবিকণ্ঠস্বরকে অনন্যসাধারণ করে উপস্থাপন করেছিলেন। তার উদ্ভাবনী শক্তি ও ব্যঞ্জনা সৃষ্টি ভাষাকে করে তুলেছে ব্যতিক্রমী। স্বাধীনতা পরর্তীকালে বাংলা ভাষায় তার মতো সাহিত্যসমালোচক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বিশ্বসাহিত্য স¤পর্কে ছিল তার অগাধ ধারণা। মান্নান সৈয়দ ছিলেন বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ‘পোয়েট ইন রেসিডেন্স’। তাকে স্কলার-ইন-রেসিডেন্স পদমর্যাদায় নিয়োগ করে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সংগ্রামী জীবনকে গ্রোথিত করে পূর্ণাঙ্গ নজরুল-জীবনী রচনার দায়িত্ব দেয়া হয়। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন ইত্তেফাক পত্রিকার সাহিত্যবিভাগে ‘সোনার হরিণ’ শিরোনামে একটি কবিতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতার জগতে তার অভিষেক হয়েছিল। ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ শিরোনামীয় কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতায় আবদুল মান্নান সৈয়দের অনির্বচনীয় আসনের শিলান্যাস হয়েছিল। জীবদ্দশায় তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ২১। ষাটের দশকের আধুনিকতাবাদী কবিদের মধ্যে আবদুল মান্নান সৈয়দ অন্যতম। তার কাব্যশৈলীর বড় বৈশিষ্ট্য আধুনিকতা ও নন্দনতত্ত্বের বহুমাত্রিক প্রয়োগ। সুররিয়ালিস্ট বা পরাবাস্তবতার কবি হিসেবে তিনি খ্যাতিমান ছিলেন। বলা হয়েছে, ‘তিনি প্রচণ্ড তোলপাড় করা শক্তি নিয়ে বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কবিতায় তিনি এনেছেন পরাবাস্তববাদী অনন্য বৈভব।’
প্রথম কাব্যগ্রন্থ ’জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ। সমকালীন সাহিত্যসমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তার অন্যতম কবিতাগ্রন্থ হচ্ছেÑ জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ (১৯৬৭), জ্যোৎস্না রৌদ্রের চিকিৎসা (১৯৬৯), সংবেদন ও জলতরঙ্গ (১৯৭৪), কবিতা কো¤পানি প্রাইভেট লিমিটেড (১৯৮২), পরাবাস্তব কবিতা (১৯৮৪), পার্ক স্ট্রিটে এক রাত্রি (১৯৮৩), মাছ সিরিজ (১৯৮৪), নির্বাচিত কবিতা, আমার সনেট ইত্যাদি।
কবি আল মাহমুদ এক সমালোচনায় বলেছিলেন, মান্নান সৈয়দের কবিতার কোনো বিষয় নেই, কবিতার বিষয় কবিতা এবং তিনি নিজেই। এখানেই বোঝা যায়, মান্নান সৈয়দের কবিতার শিল্পরূপ। তিনি পরাবাস্তব কবিতা লিখেছেন। পয়ারে লেখা ১৪ মাত্রার লেখা পরাবাস্তব কবিতাগুলো মাত্রাবৃত্তে ছন্দে লেখা। জীবনানন্দ দাশের ওপর তিনি বেশি গবেষণা করেছেন। তার প্রমাণ জীবনানন্দের ওপর বেশি গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ হচ্ছেÑ জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ (১৯৬৭)। জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ প্রকাশের পরে বইটি মুখে মুখে আলোচনা ছড়িয়েছিল বেশ। সবচেয়ে প্রভাবস¤পাতী সমালোচনাটি লিখেছিলেন কথাশিল্পী শওকত ওসমান, আর সবচেয়ে দীর্ঘ সমীা প্রণয়ন করেছিলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। এ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো পরাবাস্তবতা আর চিত্রকল্প-শিল্পের ছড়াছড়ি। পরাবাস্তবতা (সুররিয়ালিজম বা সুররিয়ালিস্ট) এমন এক ধরনের বাস্তবতা, যে বাস্তবতার সাথে ব্যবহারিক সত্যোজাত বাস্তবতার মিল থাকতে পারে; আবার নাও থাকতে পারে। থাকলেও তা সহজ কিংবা সরাসরি যে নয়, তা বলাই বাহুল্য। বস্তুত ‘সুররিয়ালিস্ট বা পরাবাস্তব’ চেতনার মূল ভিত্তি হলো অযুক্তি ও অবচেতন। গতানুগতিক নৈতিকতাবোধ, প্রচলিত সামাজিক ও শৈল্পিক কনভেনশন, একান্ত বস্তুনির্ভর যুক্তির শৃঙ্খল, এসব ভেঙে ফেলে পরাবাস্তববাদ গুরুত্ব দেয় জীবনের বিস্ময়ের ওপর, যা লুকিয়ে থাকে স্বপ্নে, অবচেতনে বিশৃঙ্খলায়, অতিপ্রাকৃতিতে, অস্বাভাবিকতায়, ভয়ে, অযুক্তিতে, কুসংস্কারজ্ঞানে, সব গতানুগতিক নৈতিক ও নান্দনিক আইন-কানুনকে উড়িয়ে দেয়ার মধ্যে। (সাহিত্য কোষ/কবীর চৌধুরী)।
মান্নান সৈয়দ বলতেনÑ সুররিয়ালিজমই হলো প্রকৃত বাস্তবতা। পরাবাস্তবতা কবিতার কিছু উদাহরণ-
১. দেখেছি ঘাসের মেঝে ছিন্ন/ লাল মুণ্ড নিয়ে খেলে বিনা অপব্যয়ে / সূর্য টেনে নিয়ে যাচ্ছে কালো রেলগাড়ি;/ আল্লাহ আছেন তার অবাক সৃষ্টিতে / বৃষ্টি হচ্ছে, যেন ছেলেরা চলেছে স্কুলে। Ñ(রাত্রিপাত কবিতায়)
২. জ্যোৎস্না হয় জল্লাদের ডিমের মতো চুলহীন জলহীন মুণ্ড/ জোড়া-জোড়া চোখ/ সাতটি আঙুলের ও একমুষ্টি হাত/ রক্তকরবীর অন্ধকার/ এবং একগুচ্ছ ভুল শিয়ালের সদ্যোমৃত যুবতীকে ঘিরে জ্বলজ্বলে চিৎকার। (জ্যোৎস্না)
৩. পরিবর্তনের ছাদ বিড়ালের মতো/ অন্যমনস্ক হবার সুযোগে পা টিপে-টিপে এগোল/ আমার খোঁড়আকাক্সা/ বরফের মানুষ নাজেহাল ছোটো-ছোটো নুড়ির আওয়াজে/ যখন দর্জি কাপড় হয়ে গেল মাংসভুক চেষ্টায়।Ñ (একেকটি দিন একেকটি সবুজভুক সিংহ)
এ রকম চেতন-অবচেতন, আধাচেতন-আপাতচেতন চিত্র-উপমাদি ছাড়াও অনেক বাসাতবসম্মত চিত্রগুচ্ছ আবদুল মান্নান সৈয়দের সমগ্র কাব্যচেতনার প্রাণস¤পদ হয়ে আছে।
‘ভেঙে যাব, কষ্ট পাব-ডাক্তারের কথা শুনব না।
শোনো, শোনো, বিচ্ছেদ-ব্যাপারে ষড়যন্ত্র করছে সেও।
এ কি ডোবা না পুকুর? কে রুখবে সমুদ্রের ঢেউ?
দেশ, কাল, সমাজ-সকলেরই বিরুদ্ধাচরণ
সহ্য করব তুমি আমি। কিন্তু আমরা মানব না হার।
কেন? নাÑ পর¯পরের কণ্ঠে পরিয়ে দিয়েছি
বকুলফুলের দু’টি হার।’ Ñসমুদ্রের ঢেউ
তার মতো চিত্রকল্পের ব্যবহার আধুনিক কবিতায় খুব কম কবিই ব্যবহার করেছেন। তাই বলা হয়ে থাকে আবদুল মান্নান সৈয়দ চিত্রকল্পপ্রধান কবি।