ঘন মেঘ করেছে, বৃষ্টি আসছে প্রবল। তার সাথে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে আমার হৃৎপিণ্ডের। কয়েক বছর আগে এইরকম বর্ষাকালে আটকে পড়েছিলাম রাস্তার পাশে শিার্থী ছাউনির নিচে। আমার মতো ছিল আরো কয়েকজন অসহায় ছেলে আর মেয়ে। আজো মনে পড়ে যায় বৃষ্টির দিনের কথা। আমি প্রায়ই নিজের সাথে ছাতা নিতে ভুলে যাই। বর্ষাকালে হুট করে কখন যে বৃষ্টি নামবে বলা যায় না। বৃষ্টি শুরু হলে বেশ কয়েকজন রাস্তার পাশে শিার্থী ছাউনির নিচে আশ্রয় নেই। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি হুট করে বলে উঠল, এই যে ভাইয়া রুমাল থাকলে দেন তো! আমি থ মেরে শুনলাম। আমাকে বলছে নাকি অন্য কাউকে! মেয়েটি বিরক্তি দৃষ্টিতে আবারো বলল, বললাম রুমাল আছে কাছে? রুমাল ব্যবহার করেন না? আমি বললাম না নেই! তার পর একটু চিৎকার দিয়েই বলল কারো কাছে শুকনো রুমাল বা কাপড় হবে কি মাথা মোছার জন্য? বাহিরে ঝড় হাওয়া প্রবল হচ্ছে, সাথে বৃষ্টি। বাতাসের প্রবলতার কারণে বৃষ্টির পানি সব গায়ে এসে পড়ছে আমার ও দাঁড়িয়ে থাকা অন্য সবার। আমি নিজেই ভিজে একাকার হয়ে আছি আর মেয়েটা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে মাথা মোছার জন্য। একটু অবাক হলাম। মেয়েটি রুমাল বা শুকনো কাপড় নেয়ার জন্য সবার কাছে অনুরোধ করছে। যেভাবে ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়েছে বাঁচি না মরি আল্লাহ জানে আর মেয়েটি ঠাণ্ডা লাগার ভয়ে মাথা মোছার জন্য রুমাল খুজছে! সত্যিই হাস্যকর। আমি কথাগুলো ভাবছি আর মনে মনেই মেয়েটির প্রতি নিজের বিরক্তি প্রকাশ করছি।
শিার্থী ছাউনি পুরোটা মানুষে ভরে গেছে। বৃষ্টির পানি গায়ে পড়ার সাথে সাথে ঠাণ্ডায় গা যেন কাঁপতে শুরু করেছে। ভাবলাম, পুরো শরীর ভিজে গেছে, সর্দিজ্বর তো মাস্ট আসবেই আজ। রুমাল পেলে অন্তত মাথাটা মুছতাম। পরণে পেছনের পকেটে হাত দিয়ে দেখি রুমাল আছে! আমি রুমাল সাধারণত ব্যবহার করি না। বর্তমানে টিস্যু পেপারে মানুষের চাহিদা বেশি। মনেই ছিল না যে আমার পকেটে রুমাল আছে। ব্যাস! রুমাল বের করে মাথা মুছতে থাকলাম। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সমবয়সী একটি ছেলে আমার দিকে হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমার মাথা মোছা দেখছে। কিছুটা বিব্রত হলাম, পরে ভাবলাম সেও হয়তো তার মাথা মুছবে, হয়তো রুমালটা চাওয়ার সাহস পাচ্ছে না। মেয়েটির কথা তো ভুলেই গেলাম। পাশেই ছিল হয়তো আশপাশেই আছে। কিন্তু চোখে পড়ছে না। এত বৃষ্টির মধ্যে মেয়েটি আবার কই গেল। হুট করে মাথায় ভাবনা উদয় হলো। মেয়েটিকে বলে ফেলেছি যে রুমাল নেই। এখন যদি মেয়েটি আমার হাতে রুমাল দেখে ফেলে তাহলে কী ভাববে? আমি বা কী বলব তাকে! আমার কাছে রুমাল থাকতেও কেন দিলাম না।
পাশের লোকটি অন্য একজনের সাথে বলাবলি করছে; মানুষ আজকাল জলজ্যান্ত মিথ্যা বলতেও পিছপা হয় না। কী যুগে আমরা এসেছি, অসহায়কে সাহায্য করতেও মানুষের আগ্রহ শেষ হয়ে যাচ্ছে। কথাগুলো শুনে খারাপ লাগল আমার। তারা হয়তো আমাকে নিয়েই বলছে। কিন্তু আমি তো খেয়াল করিনি যে রুমাল আমার কাছেই ছিল। আমার কী দোষ? আর মেয়ে মানুষ বলেই কী রুমাল দিতে হবে? আমিও তো নিজেই ভিজে গেছি, আমারো তো জ্বর সর্দি হতে পারে। হায়রে মানুষের মেয়েদের প্রতি এত সহমর্মিতা। এগুলো ভাবছি আর মনে মনে বলছি দূর, কারো টাইম নেই এখন। যে পরিস্থিতি নিজের জান বাঁচানো ফরজ। কে কী বলল এসব কান না দেয়াই বেটার।
হঠাৎ পেছনে ফিরে দেখি সেই মেয়েটি। শিার্থী ছাউনির সিটে বসা এক বৃদ্ধার মাথা মুছে দিচ্ছে। মেয়েটির কাছেও শুকনো কাপড় ছিল না। অন্য একজনের কাছে হয়তো রুমাল পেয়েছে সেটি দিয়ে আমার দাদু বয়সী লোকটির মাথা মুছে দিচ্ছে আর বলছে; ঝড়বৃষ্টির দিনে একা বাইরে বের হয়েছেন কেন? আপনার তো কাশি হচ্ছে। বাসায় গিয়ে আগে ওষুধ খাবেন। বিকেল থেকে সন্ধ্যা নেমেছে। বৃদ্ধ লোকটার চেহারা ঠিকভাবে দেখতে পাচ্ছিলাম না। তার মধ্যে আবার ঠেলাঠেলি করে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। এই দৃশ্য দেখে লজ্জিত হলাম নিজেই! অজান্তেই কী ভুল হয়ে গেল। আমি অযথা মেয়েটিকে মনে মনে গালমন্দ করছি। সে তো ওই বৃদ্ধ লোকটির জন্য শুকনো কাপড় খুঁজছিল। আমি অযথাই মেয়েটিকে ভুল বুঝলাম। এখন কী করা যায়? বৃষ্টি কমে এসেছে, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। মেয়েটির কাছে গিয়ে কথা বলার ইচ্ছে হলো। আমি যে আমার রুমাল দিয়ে নিজের ভেজা মাথা মুছছি মেয়েটি নিশ্চয় দেখেছে। আমার সম্পর্কে খারাপ ধারণা জন্মেছে হয়তো। আমার পাশের বাসায় এক দাদু আছেন। যাকে আমি খুব ভালোবাসি। আর সব প্রবীণদের সম্মান আর সাহায্য করা উচিত। এটা আমাদের কর্তব্য। আমি আমার কাছেই যেন অপমানিত হলাম।
আস্তে আস্তে শিার্থী ছাউনিটা ফাঁকা হতে লাগল। মেয়েটি একপলক তাকালো আমার দিকে। দেখল আমার হাতের রুমালটা। তারপর আস্তে করে বৃদ্ধ লোকটিকে একটি রিকশা ডেকে বসিয়ে দিলো। বৃদ্ধ লোকটি মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন বেঁচে থাকো মা। মেয়েটি বলল, নিজের খেয়াল রাখবেন। আর একা বাইরে বের হবেন না, বিশেষ করে এই ঝড়বৃষ্টির দিনে। বৃদ্ধ লোকটি চলে গেল। ঠাণ্ডা লাগার কারণে সজোরে একটা হাঁচি দিলাম আমি। মেয়েটি তাকাল, তার দৃষ্টিভঙ্গি দেখে আমার বোঝার বাকি থাকল না, যে মেয়েটি আমার সম্পর্কে ভুল ধারণা করেছে। কথা বলে ভুল বুঝিয়ে দেয়ার ইচ্ছে হলো। কিন্তু সাহস হচ্ছিল না। মেয়েটি তার বান্ধবীর সাথে একটি রিকশায় উঠে চলে গেল আর আমি হা করে তাকিয়েই রইলাম।
ঘটনার পর প্রায়ই আমি এই শিার্থী ছাউনির নিচে এসে দাঁড়াই। হয়তো ওই মেয়েটির সাথে পুনরায় দেখা হওয়ার ব্যাকুলতায়। আমার সম্পর্কে মেয়েটির যে ভুল ধারণা আছে সেটি না ভাঙার ব্যর্থতা আমাকে মাঝে মাঝে অস্থির করে তোলে। বৃষ্টি এলেই এ অস্থিরতা বেড়ে যায় আরো।