ধনুকের মতো জনমানবহীন রাস্তাটা কিছু দূর এগিয়ে গিয়ে আবার মোচড়ানো দিয়ে সোজা চলে গেছে দৃষ্টিসীমানারও অনেক দূর পর্যন্ত। ধু ধু মাঠ পেরিয়ে চলে গেছে তেপান্তরের দিকে। চার দিকে মাঠ আর সবুজের প্রাচুর্য। একধারে নদী বয়ে গেছে কুলুকুলু নদে, অন্যধারে পড়ে রয়েছে ধু ধু প্রান্তর। তার বুকের ওপর দিয়ে চলে গেছে রাস্তাটা। এবড়োথেবড়ো রাস্তা আর একোণ-ওকোণ পথটাতে যানবাহন চলার খুব একটা জো নেই। ইশতিয়াক আহমেদ চৌধুরী ঠিক একটু আগেও সেই মোচড়ানো কুঁজো জায়গায় একটি অশ্বত্থ বৃরে নিচে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। নিজের সাথে নিজে অনর্গল কথা বলে গেছেন। তার পিঠে গজিয়ে ওঠা কুঁজোর সাথে রাস্তাটার কোথাও যেন বড্ড মিল খুঁজে পান। বাড়ির পাশ-ঘেঁষা বলে এ জায়গাটি তার এমনিতেও খুব পছন্দের। সেই ছোটবেলা থেকে এ জায়গার প্রতি কেমন জানি একটা ঘোরলাগা মায়া জন্মে আছে। অদ্ভুত মাদকতায় আচ্ছন্ন হয় দেহমন। চোখে মুখে মুগ্ধতা ঝরে পড়ে। তাই তো একটু সময়ও ফুরসত পেলে তিনি ছুটে চলে আসেন এখানে। একান্ত নীরবে-নিবৃত্তে নিজের সাথে নিজেই কিছুটা সময় কাটান।
দুপুরের সময়টা একটু ভুতুড়ে লাগলেও বৈকালিক আবহে এখানকার দৃশ্যপট বিমূর্ত ও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে। রহস্যময় হয়ে ওঠে চারপাশটা। এখন সময় কত বদলেছে। ছন্দপতনও ঘটেছে। দিন মাস তিথি গেছে। উল্টেছে ক্যালেন্ডারের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। ইশতিয়াক চৌধুরীও নেই এখন সেই আগের মতো। ছেলেবেলার দুরন্তপনা ও দস্যুতায় ভাটা পড়েছে কবেই। আপাদমস্তক তিনি এখন একজন বিপন্ন ও বিপর্যস্ত মানুষ। বয়সের ভারে অনেকটা ন্যুব্জ। এ মুহূর্তে আপাতত বাড়ির পাশে পতিত একখণ্ড জমিতে এক টুকরো সাদা কাগজ হাতে উপুড় হয়ে বসে রয়েছেন। দূর থেকে যে কারো দেখলে মনে হবে কোনো অশীতিপর বৃদ্ধ বুঝি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। অথচ না, গভীর মনোযোগে তিনি উপুড় হয়ে অঙ্ক মেলাচ্ছেন। জীবনের অঙ্ক। যাপিত জীবনের লাভ-তির চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির সমীকরণ। কিন্তু কোনোভাবেই অঙ্কখানা মেলাতে পারছেন না। তবুও বারবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ঘেমে-নেয়ে একাকার। ঘর্মাক্ত দেহ ভিজে জবজবে অবস্থা। বিড়বিড় করে কথা বলে যাচ্ছেন আপনমনে একনাগাড়ে। ইদানীং তিনি দিনের বেশির ভাগ কথা সেরে নিচ্ছেন নিজের সাথেই।
এ দিকে রেহনুমা বেগম স্বামীকে নিয়ে পড়েছেন মস্তবড় বিপাকে। খোদার কাছে কান্না-রোনাজারিসহ কত মান্নত ও চেষ্টা-তদবির করে যাচ্ছেন স্বামীকে সারিয়ে তুলতে। কিন্তু পারছেন না। চোখের সামনে দিন দিন মানুষটা কেমন জানি নির্বিষ হয়ে যাচ্ছে। ঘুমের ঘোরেও কী সব অঙ্ক-পঙ্ক কষছেন। আজকাল কোনো মানুষ তার সাথে খুব একটা কথাও বলতে চায় না। পারতপে সবাই এড়িয়ে চলতে পারলেই বাঁচে। অথচ একদিন কত মানুষের আনাগোনা ছিল চৌধুরী সাহেবের আশপাশে। সময়ের দুষ্টচক্রে কালের অতলে বিলীন হয়েছে সেসব দিন। অবশ্য তাই বলে চৌধুরী সাহেবের কথা বলাও কিন্তু থেমে নেই। হরওয়াক্ত গাছের সাথে, মাছের সাথে কিংবা প্রকৃতির নানা কিছুর সাথে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন। এই তালিকা থেকে বাদ নেই পশুপাখি, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগিও। পরিচিত-অপরিচিত কাউকে ধারে-কাছে পাওয়া মাত্র কাগজখানা উঁচিয়ে ধরে বলছেনÑ ‘ও ভাই, আমার অঙ্কখানা একটু কষে দিন না প্লিজ!’ সারাণ তার মুখে একটাই বুলিÑ অঙ্ক!! মানুষ ইশতিয়াক চৌধুরীর কথায় কর্ণপাত না করে দ্রুত পায়ে হাঁটা দেয়। কেউ কেউ আড়ালে-আবডালে বলে, ‘নিশ্চয়ই লোকটার মাথায় মারাত্মক ছিট আছে। পেছন থেকে চৌধুরী সাহেব তবুও বিরক্তিহীন কণ্ঠে চেঁচিয়ে ডাকে, ‘ও ভাই... ও ভাই একটু দাঁড়ান, প্লিজ আমার অঙ্কটা একটু কষে দিন।’ মানুষজন পড়িমরি করে ত্রস্তপায়ে পালিয়ে যেতে পারলেই বাঁচে।
অঙ্কটা মিলে যাওয়ারই কথা ছিল। কিন্তু মনে হচ্ছে এই জন্মেও আর মেলার সম্ভাবনা নেই। সেই সম্ভাবনার সলতেতে পর্যাপ্ত জ্বালানি নেই। তাই আশাটুকুও ীণ ও সুদূরপরাহত। ইশতিয়াক চৌধুরীর টাকা-পয়সা ও জমিজিরাত সবই ছিল। ছিল আরো অনেক কিছু। সুনাম, প্রতিপত্তি ও মতারও কোনো অভাব বা কমতি ছিল না। মানুষ হিসেবেও তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত সজ্জন। সৎ, আদর্শবান ও পরহেজগার ব্যক্তিত্ব হিসেবেও তিনি ছিলেন অতুলনীয়। চতুর্দিকের আশপাশের কয়েক গ্রাম পর্যন্ত তিনি ছিলেন মধ্যমণি। নিজ খরচে এলাকায় একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান খুলেছেন। গাঁটের পয়সা খরচ করে স্কুল-মাদরাসা ও এতিমখানাসহ বিভিন্ন শিাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। নিজের তিন ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে করেছেন সুপ্রতিষ্ঠিত। ছেলেরা এখন সবাই স্ব স্ব অবস্থানে দেশ-বিদেশে উচ্চপর্যায়ে রয়েছেন। বড় ছেলে শাকিল চার বছর আগেই আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছেন। এখন বউ-বাচ্চা নিয়ে সেখানে সেটেলড। বিয়ে করেছেন ওখানকার এক সিটি মেয়রের কন্যাকে। মেজো ছেলে অনিকও অনেক কারিশমার পর লন্ডনে স্ত্রী-কন্যাদের নিয়ে স্থায়ী হয়েছেন। বিয়ে করেছেন ব্রিটেনের এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর মেয়েকে। ছোট ছেলে নওফেলও মোটামুটি সফল ও করিৎকর্মা ব্যবসায়ী। তিনিও ঢাকায় অল্প সময়ের মধ্যে বাড়ি-গাড়ি করে ফেলেছেন। বউ-বাচ্চাদের নিয়ে তিনিও মহাব্যস্ত। বিয়ে করেছেন শোবিজ জগতের এক সুন্দরী তন্বী মডেল কন্যাকে। ইশতিয়াক আহমেদ চৌধুরীর যাবতীয় সহায়সম্পত্তির সমুদয় অংশ আগেই তিন ছেলের মাঝে সমান হিস্যা অনুযায়ী ভাগবাটোয়ারা করে দিয়েছেন। শুধু ভাগাভাগি হয়নি তাদের দু’জনের। কেউ তাদের দায়িত্বভার পারতপে গ্রহণ করেননি। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দিকে নজর ফেলার মতো ফুরসতও কোনো ছেলের নেই। তাদেরকে এ বয়সে দেখভাল করার চিন্তা-ফিকির কোনো ছেলের মাঝেও আদতে দেখাও যাচ্ছে না। সবাই সবার স্ব স্ব বউ বাচ্চাকাচ্চা ও সম্পদের পেছনে অবিরাম কান্তিহীন ছুটে চলেছে। প্রথম দিকে পিতামাতার জন্য সন্তানেরা একটু দায়সারাভাবে খোঁজখবর রাখলেও গত পাঁচ বছরে তাদের টিকিটির নাগালটুকুও পর্যন্ত কেউ খুঁজে পায়নি।
সময় কারো জন্য বসে থাকে না। গতি-দুর্গতি দুটোই সমান পাল্লা দিয়ে চলে। বেলা-অবেলার দুষ্টচক্রে কেটে যায় যাপিত জীবন। অভাব-অনটনে ও ধারদেনায় জর্জরিত রেহনুমা বেগম স্বামীকে নিয়ে রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠেছেন। ছেলেদের কাছ থেকে এমন নিদারুণ প্রতিদান পাবেন জীবনে ঘুণারেও কল্পনা করতে পারেননি। মাঝে মাঝে নিজের পেট কেটে জরায়ু থলিটাকে বড্ড দেখতে ইচ্ছে করে। এমন তিন-তিনটে পাষণ্ড সন্তানকে কোথায় ধারণ করেছেন? দশ মাস দশ দিন সময়ের হিসেবে তো নিশ্চয়ই চাট্টেখানি কথা নয়! এ দিকে ইশতিয়াক চৌধুরী সারাজীবনের অর্জিত সততা ও আদর্শের পুরস্কার এভাবে পাবেন দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি। সারাজীবন মানুষের কল্যাণেই শুধু দিনরাত কাজ করে গেছেন, অথচ জীবনের এই সমীকরণ তিনি আজ কিছুতেই মেলাতে পারছেন না। সব কিছুু থেকেও তিনি সহায় সম্বলহীন, রিক্ত ও নিঃস্ব। শরীরের ভাঁজে ভাঁজে ও শিরায় শিরায় গিঁটবাতসহ নানারূপ অসুস্থতার প্রকোপ দানা বেঁধেছে স্বামী-স্ত্রী দু’জনের। রেহনুমা বেগম পেটের দায়ে বেশ কিছু দিন অন্যের বাড়িতে কাজ করলেও ইদানীং স্বামীকে একা ফেলে কোথাও বের হতে খুব একটা সাহস পাচ্ছেন না। বৃদ্ধ মানুষটাকে চোখে চোখে রাখতে হচ্ছে। কখন কোন সময়ে অনর্থক ঘটিয়ে ফেলে কে জানে। সহায়সম্পদ বলতে নিজেদের জন্য আছে শুধু মাথাগোঁজার সামান্য ভিটেমাটিটুকুই। রোগ-শোক ও মানসিক অস্থিরতায় বেশ কয়েক বছর ধরে মানুষটিও প্রায় পাগলপারা। রেহনুমা বেগম স্বামীকে নিয়ে পড়েছেন মস্তবড় দ্বন্দ্বে। নিয়তির কঠিন চ্যালেঞ্জের ঘোর অমানিশায় প্রতিনিয়ত তিনি খাবি খাচ্ছেন। অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছেন নিজের শূন্য হাতখানা। স্বামীর চিকিৎসায় নিজের সর্বস্ব দিয়ে প্রাণান্তকর লড়াই করে যাচ্ছেন। টিকে থাকার সে এক কঠিন লড়াই। যে লড়াইয়ের কোনো আদিঅন্ত নেই। ওই দিকে ইশতিয়াক আহমেদ চৌধুরীও বসে নেই। মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষটির ব্যস্ততাও কম নয়। বেলা-অবেলার শেষ বিকেলে এসে এখনো হন্যে হয়ে বেড়াচ্ছেন জীবনের সবচেয়ে জটিল অঙ্কখানা মেলাতে। হ
ধনুকের মতো জনমানবহীন রাস্তাটা কিছু দূর এগিয়ে গিয়ে আবার মোচড়ানো দিয়ে সোজা চলে গেছে দৃষ্টিসীমানারও অনেক দূর পর্যন্ত। ধু ধু মাঠ পেরিয়ে চলে গেছে তেপান্তরের...
