আধুনিক বাংলা কবিতার পটভূমিতে গ্রামীণ জীবনধারা ও পল্লী প্রকৃতির একনিষ্ঠ রূপকার জসীমউদ্দীনকে চিনতে হলে তার কাব্য প্রতিভার স্বাতন্ত্র্যমাত্রাকে অনুধাবন করতে হবে। কবিতার ভাষা, উপমা ও শিল্পকর্মে নতুন ধারা সংযোজনের মধ্য দিয়ে কবিসত্তায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। এর মধ্য দিয়ে যুগে যুগে জন্ম হয় কবি প্রতিভার। নিজস্ব কাব্য প্রতিভায় জসীমউদ্দীন তেমনি এক ‘পল্লীধারা’ বিপ্লবের সফল স্রষ্টা।
জীবন ও জনপদের নারীকে কাব্যিক উপমায় অতি সাবলীলভাবে তুলে ধরার এক অসামান্য দক্ষতা ছিল তার। তিনি দেখেছেন শৈশব-কৈশোরের নারী ‘আসমানী’, ‘খোসমানী’ ও পূর্ণিমাসহ আরো অনেককে। দেখেছেন গ্রাম্য ষোড়শী সাজুকে, যে নেচে গেয়ে গ্রাম মাতিয়ে রাখে। আত্মজৈবিক সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা এসব নারী চরিত্রে নারী কখনো রুগ্ণ খোকার শিয়রে আদরে হাত বুলানো ‘পল্লীজননী’। যে সন্তানকে ভোরের স্বপ্ন দেখায়। শীতের কনকনে বায়ুতে ছেলেকে বুকে আগলে রাখে, ঘুমপাড়ানি গান শোনায়। পরম আদরে খোকার নানা উৎসুক জিজ্ঞাসার জবাব দেয়। যেমনÑ
ছেলে কয় মারে, কত রাত আছে? কখন সকাল হবে।
ভালো যে লাগে না, এমনি করিয়া কেবা শুয়ে থাকে কবে।
পাণ্ডর গালে চুমো খায় মাতা, সারা গায়ে দেয় হাত।
পারে যদি বুকে যত স্নেহ ঢেলে দেয় তারি সাথ ;

রোগে-শোকে একান্ত পাশে থাকা মমতাময়ী মায়ের কথা শব্দকল্পের এক গ্রামাণ্যচিত্রের মতো জসীমউদ্দীনের ‘পল্লীজননী’ কবিতায় বর্ণিত হয়েছে। পল্লীকবির নকশীকাঁথার মাঠ কাহিনী কাব্যটি সাজু নামক এক চঞ্চলা, চপলা গ্রাম্য নারীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। চৈত্র-বৈশাখে গাঁয়ের মেঠোপথ ধরে ঘর-ঘুপড়িতে সখিদের সাথে সে ‘দেয়ার গান’ গায়। একদিন বাড়ির আঙিনায় সাজুকে দেখে মুগ্ধ হয় যুবক রুপাই।
রুপাই ছিল ঘর বাঁধিতে, পিছন ফিরে চায়।
পাঁচটি মেয়ের রূপ বুঝি এই, একটি মেয়ের গায়।

গেরোস্থ যুবক রুপাইয়ের দেখা একটি মেয়েই হলো সাজু। সাজুর প্রেমালিঙ্গনে আবদ্ধ হওয়ার কিছু দিন পর রুপাই দেশান্তর হয়। ষোড়শী সাজু এই বিয়োগ ব্যথায় অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে।
সাজুর হাত ঘুরে চিত্রায়িত হয় এক নকশা কাব্য কাঁথা। যেখানে নারী মনে বেদনার যে শব্দ তা চিত্রাঙ্কনে প্রকাশিত হয়েছে। প্রিয় সঙ্গীর অপেক্ষার জানান নিতে নিতে এই নকশীকাঁথা গায়ে জড়িয়েই সাজু চিরনিদ্রা যায়।
কবি মনে সামাজিক ক্রিয়া থেকে মনোজগতের যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় তার শৈল্পিক বুননই তো একজন কবি স্রষ্টার সম্পদ। জসীমউদ্দীনের বেলাতেও আমরা সেটাই দেখি। তার কালজয়ী ‘কবর’ কবিতাকে তার শ্রেষ্ঠ রচনা বলা যায়। ১৯২৫ সালে ‘কল্লোল’ পত্রিকায় এটি প্রকাশিত হওয়ার সময় তিনি স্নাতক বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তার ছাত্রজীবনেই কবিতাটি প্রবেশিকার সিলেবাসভুক্ত হয়।
অন্তপুরের যাত্রায় জীবন যখন মাটি স্পর্শ করে, মানুষ তখন পরম আদরে আপনজনকে বিদায় দেয়। ঠিক তেমনি এক দাদা তার নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র সাথী প্রিয় নাতিকে তার প্রেমময় স্ত্রী, সন্তান, পুত্রবধূ, পুত্তুলী মেয়ে আর নাতনীর শেষ বিদায়ের কথা শোনাচ্ছেন। দাদার সে আকুতি শুনে ঊষার মরুর ধূসর বুকেও বেদনার ফুল ফোটে। তার স্মৃতি এখানে পাথরের মতো কঠিন আর কথাগুলো করুণ সুরের আর্তনাদ। মনকোণে জমে থাকা সেই আকুতি আশা-আকাক্সক্ষার সীমানা ভেদ করে যেন খোদার আরশে পৌঁছাবে। প্রেয়সীকে হারানো ত্রিশ বছরের বিয়োগাত্মক জীবনের হৃদয়গ্রাহী অব্যক্ত কথাই কালজয়ী ‘কবর’ কবিতা।
এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে
ত্রিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।

মানব সৌন্দর্যচেতনার সংমিশ্রণে কবির উপমা-রূপক-প্রতীক ও চিত্রকল্প সৃজনের পরিচয় ও প্রকাশ; যা তাকে এই ‘কবর’ কবিতার মধ্য দিয়ে কবি খ্যাতি এনে দিয়েছে। শুধু ‘কবর’ নয়, এ ধারা অব্যাহত থাকে তার পরবর্তী সব সৃষ্টিকর্মের মধ্যে।
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সমকালীন সময়ে তিনি পল্লী-প্রকৃতির জীবনকথাকে উপজীব্য ধরে কবিতা লিখেছেন। লোকসাহিত্য আর জীবনানন্দ দাশের নিসর্গতার মাঝমাঝি স্থানে দাঁড়িয়ে তিনি রচনা করেছেন, ‘বামুন বাড়ির মেয়ে’, ‘নমুদের কালো মেয়ে’, ‘গৌরী গিরির মেয়ে’ ও ‘কল্যাণী’ শীর্ষক কবিতা। শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ ‘এক পয়সার বাঁশি’তে আমরা দেখি ‘খোসমানী’, ‘পূর্ণিমা’ আর ‘আসমানী’র মতো বিখ্যাত কবিতা। সমাজের প্রান্তিকতায় ও প্রকৃতির আদিতে বসবাস করা জীবনের বিচিত্রতাকে তিনি তুলে এনেছেন অবলীলায়।
এসব কবিতায় গ্রাম্য উঠতি কিশোরীর প্রত্যহ জীবনে যে বাস্তব দৃশ্যকল্প অঙ্কিত হয়েছে তাতে জসীমউদ্দীনকে জীবনবোধের এক অনন্য রূপকার বলা যায়। তার আরেকটি কবিতা ‘কৃষাণীর দুই মেয়ে’র এ চরণটির কথাই ধরুন;
একটি মেয়ে লাজুক বড়, মুখর আরেকজন;
লজ্জাবতীর লতা যেন জড়িয়ে গোলাপ বন।

কবির বিখ্যাত ‘আসমানী’ চরিত্রটি কৃষকের অভাবী সংসারে অযতেœ অবহেলায় গড়ে ওঠা এক প্রতিমা। যার জন্মই হয়েছে বিসর্জনের জন্য।
জসীমউদ্দীনের বাড়ির অদূরেই শহরতলির গ্রাম টেপাখোলা। এখানে পূর্ণিমাদের বাড়ি। বাড়ির ধারে বয়ে যাওয়া পদ্মার মুক্ত বাতাসে বেড়ে ওঠা পূর্ণিমা একদিন কলকাতায় পাড়ি জমায়।
পূর্ণিমাদের আবাস ছিল টেপাখোলার গাঁয়,
একধারে তার পদ্মানদী কলকলিয়ে যায়।
তারপর-
কোন দস্যু করল হরণ আলো বাতাস তার,
কে হরিল খেলারপুতুল নাচের নূপুর পার।

স্বপ্নের শহর কলকাতার যান্ত্রিকতা আর অলিগলির জীবনে পুত্তুলীকন্যা পূর্ণিমার অসহায়ত্বেই ‘পূর্ণিমা’ কবিতার মূল প্রতিপাদ্য।
পল্লীকবি তার কবিতায় নারীকে কখনো কখনো প্রতিবাদী, জীবন সংগ্রামী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ‘সকিনা’ কাব্যগ্রন্থের সকিনা এক সদ্য বিধবা নারী। সমাজপতিরা যার ওপর সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা কালো অন্ধকারের দায় ছাপাতে চায়। তবু সেসব বাধা পেরিয়ে চলে।
কবির বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছ কুমর নদ, অদূরেই প্রমত্তা পদ্মা নদী। হাজারো নদী স্রোতধারায় বিধৌত জনপদের নদীরূপে তিনি মুগ্ধতায় ডুবে গেছেন। এই নদীরূপ আকণ্ঠ পান করতে তিনি ছুটে গেছেন নদীর এ-ঘাট থেকে ও-ঘাটে, এ-পাড় থেকে ও-পাড়ে। নদীর উত্থান-পতন যুগ যুগ ধরে কবি মনকে গভীর অনুরাগে ভাবিয়েছে। তাতে সৃষ্টি হয়েছে দর্শনের নতুন সংজ্ঞা ও রূপভেদ। নারী যদি সৃষ্টির অর্ধেক হয় তবে নদীতে প্রাণের সঞ্চার। পল্লীগীতি আর লোকসাহিত্যের প্রধান সঞ্চালক নদী। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের সংগৃহীত ও লেখা গান আজো তার প্রমাণ বহন করে। রঙিলা নায়ের মাঝি, পদ্মাপাড় গ্রন্থ দু’টি বিখ্যাত গানের সঙ্কলন। তার লেখা গান ও কবিতায় নদীভাঙন, আজন্ম নদীতে ভেসে বেড়ানো বেদে সম্প্রদায়ের জীবন কথার সবর উপস্থিতি কালজয়ী সঙ্গীতশিল্পী আব্বাস উদ্দীন কণ্ঠে ১৯৪৩ সালে রেকর্ড হয় ‘কূল নাই কিনার নাই’ গানটি। আব্বাস উদ্দীন গেয়েছেন গহিন গাঙের নাইয়া, আরে ও রঙিলা নায়ের মাঝি।
তাই তো তার কবিতার উঠোনজুড়ে পল্লীপ্রকৃতি, মানবপ্রেম, আত্মজৈবিক সংমিশ্রণ কথা। দ্রোহ, প্রেম-বিরহ, প্রবঞ্চনা ও যাপিত জীবনের নানা অনুষঙ্গ সৃজনের এই শৈল্পিক পুরুষ ১৯০৩ সালে ১ জানুয়ারি ফরিদপুরের তাম্মুলখানায় মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। নিজস্ব কাব্যধারা ও আজন্ম মাটি মানুষের কথা বলে কাব্যগতিপথ সৃষ্টিকারী এই দিকপাল অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে। হ