বাইরে যেতে হবে বলে সকাল সকাল গোসল সেরে নিলেন নাজমা চৌধুরী। বয়স হয়েছে তাই আজকাল বেশির ভাগ সময় ঘরেই কাটান তিনি। তবে মাঝে মাঝে মনটা বাইরে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। সারাজীবন বাইরে কাজ করেছেন, ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। আজ চরম বার্ধক্যে একা ঘরে বসে বই পড়ে সময় কাটাতে হয়। বাইরে যান মাঝে মাঝে কোনো ফুলের দোকানে, কখনো কোনো আত্মীয়ের বাসায় কিংবা কোনো শপিংমলে দরিদ্র শিশুদের জন্য জামা কাপড় কিনতে। নাজমা চৌধুরী বৃদ্ধা হলেও এখনো বেশ স্মার্ট। তার চলাফেরা এবং পোশাক নির্বাচন খুব সুন্দর, মানানসই। দেখলেই বোঝা যায় তিনি একজন সুরুচিশীলা এবং একসময় খুব সুন্দরী ছিলেন। আজ তিনি হালকা আকাশি রঙের শাড়ি আর ফুলহাতা কালো ব্লাউজ পরেছেন। ছোটখাটো একটি কালো চাদর ফেলে রেখেছেন গায়ের ওপর। কালো ভ্যানিটি ব্যাগটা হাতে নিয়ে গেটের বাইরে পা দিলেন তিনি। সামনে তাকাতেই দেখতে পেলেন একটি ফুটফুটে কিশোরী। তাকিয়ে রইলেন আনমনে। মেয়েটি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলÑ ফুল কিনবেন ম্যাডাম?
মুচকি হাসলেন নাজমা চৌধুরী। বললেনÑ দাও দেখি একটি গোলাপ।
লাল টকটকে তরতাজা গোলাপটি বেশ বড়। ভেজা ভেজা। দেখে মনে হচ্ছে ভোরের কুয়াশার আদরমাখা ছোয়া লেগে আছে ফুলটিতে। মুগ্ধ হয়ে দেখলেন নাজমা চৌধুরী। মেয়েটির আগোছাল চুলের ঢিলেঢালা খোঁপায় পরিয়ে দিলেন গোলাপটি। খোঁপার এক পাশে রাখা গোলাপটি কিশোরীর মুখ আরো উজ্জ্বল করে তুলল। নাজমা চৌধুরী খুশিতে বলে উঠলেনÑ বাহ্ খুব সুন্দর মানিয়েছে। তোমার নামটি তো জানা হলো না।
মেয়েটি অবাক হলেও হেসেই উত্তর দিলোÑ আমার নাম ফুলভানু। তয় সক্কলে আমারে ফুল বইলাই ডাকে।
খুব সুন্দর। যেমন তুমি তেমন তোমার নাম। সত্যিই তুমি একটি ফুল।
ম্যাডাম আপনে ফুল কিনলেন আবার আমারেই দিয়া দিলেন ব্যাপারটা কী ?
ফুলটি আমি তোমার জন্যই কিনেছি। তোমার হাতে কত ফুল কিন্তু তোমার অত সুন্দর মুখের পাশে খোঁপায় ফুল নেই। আচ্ছা আমি এখন যাই। তুমি এখানে এসো মাঝে মাঝে।
নাজমা চৌধুরী গাড়িতে উঠলেন। ড্রাইভার গাড়িতে স্টার্ট দিতে দিতে ভাবলÑ ম্যাডামের মাথায় মনে অয় গণ্ডগোল আছে। মাথার আর কী দোষ। এই বয়সে নিজের আপন কেউ যদি কাছে না থাকে মন মেজাজও তো ভালো থাকে না। তয় আমাগো ম্যাডাম খুব ভালো মানুষ। কোনো দিন কোনো কারণেও চইটা কথা কয় না।
ফুল নাজমা চৌধুরীর গাড়ির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর মনে মনে বললÑ এমন মানুষও আছে। আমার ফুল আমার মাথায় গুঁইজা দেয় আবার ফুলের দামও দেয়। কি জানি পাগল মনে অয়। আসলে বড় লোকেগোতো ঢংয়ের অভাব নাই। ট্যাকা পয়সার চিন্তা নাই খাওনের চিন্তা নাই। যা করবার মন চায় তাই করে। তয় মানুষটা তো ভালোই মনে অইল।
নাজমা চৌধুরী গাড়িতে বসে ভাবেÑ এখন আর ফুলের জন্য বসন্তের অপেক্ষা করতে হয় না। সারা বছরই ফুল পাওয়া যায়। মাত্র বসন্তের শুরু তাই ফুলের দোকানগুলোতে কেমন তাজা ফুলের সমারোহ। এখন ফুল ব্যবসার পণ্য হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে। এখন ফুল লোকদের ফ্যাশনের বস্তু হয়ে উঠেছে। তবে ক’জনইবা ভালোবাসে ফুলকে। অনুষ্ঠান শেষ হলেই সব ফুল চলে যায় ডাস্টবিনে। বড় অপচয় হয় ফুলের। এসব কথা ভাবতে ভাবতে চোখে ভেসে ওঠে তার হারিয়ে যাওয়া ফুলের বাগান। গাছ লতা পাতা ভরা সুখের নীড়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানির ছাত্রী ছিলেন তিনি। ছাত্রী বয়সেই বউ হয়ে এসেছিলেন গুলশানের একটি শান্ত ছায়াঘেরা বাড়িতে। বেশ বড় এড়িয়া নিয়ে বানানো হয়েছিল সেই টিনশেড বাড়িটা। একতলা সেই বাড়ির পেছনে ছিল বড় বড় আম, জাম, কাঁঠাল ইত্যাদি ফলের গাছ। সামনে বিশাল বারান্দা আর বারান্দার সামনেই ছিল সুুদীর্ঘ ফুলের বাগান। শাশুড়ি রুমেনা চৌধুরী ছিলেন নাজমা চৌধরীর খুব প্রিয় মানুষ। রুমেনা চৌধুরী ছিলেন শিক্ষিতা ভদ্র একজন রুচিশীলা ভালো মানুষ। তারই উদ্যোগে বাড়িটা ভরে উঠেছিল গাছ লতা পাতায় আর ফুলে ফলে। বেশ বড় সেই বাড়িটার খানিকটা দূরে দূরে ছিল বকুল, কাঠ মালতি, গন্ধরাজ এ ধরনের বড় বড় গাছ। বাগানের ভেতরে ছিল শতাধিক দেশী বিদেশী ফুলের গাছ। ফুলের মওসুমে বাগানের দিকে তাকালে মনে হতো লাল নীল গোলাপি খয়েরি কমলা হলদে নানা রঙের মিশ্রণে ভরা একটি সুন্দর ছাপার শাড়ি মেলে রাখা হয়েছে।
বাগানের মূল পরিচর্যা করতেন রুমেনা চৌধুরী নিজেই। তাকে সাহায্য করত জমির আলী। একজন বয়স্ক লোক জমির আলী। সারাক্ষণ বাড়ির গাছপালা ফুলের বাগানের পরিচর্যায় ব্যস্ত। গাছের পরিচর্যার জন্য তাকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত করা হয়েছে।
রুমেনা চৌধুরী তার ব্যবসায়ী ছেলের জন্য নাজমা চৌধুরীকে নিজেই পছন্দ করে ঘরে তুলে ছিলেন। তবে তিনি জানতেন না যে তার বউ ও একজন ফুলের প্রিয়াসী। এক কথায় ফুল ও ফল গাছপালার প্রেমে পাগল পাড়া। ধীরে ধীরে রুমেনা চৌধুরী বুঝতে পারেন তার বউমার ফুল অনুরাগের ব্যাপারটি। একদিন নাজমা চৌধুরী বাগানের সামনে দাঁড়িয়ে বাতাসে ফুলের দোলা দেখে আনমনে হাসছিলেন। ব্যাপারটি তার শাশুড়ির চোখ এড়ায়নি। খুশিতে রুমেনা চৌধুরী বউকে জড়িয়ে ধরে আদর করলেন। বললেন, এবার আমার উত্তরসূরি পেয়ে গেছি। এই ফুলের বাগান, কোনায় কোনায় হাজারী গোলাপের ঝোপ, সন্ধ্যা মালতির ঝোপ, দোলন চাঁপার ঝোপ আর বড় বড় ফুল গাছগুলো সব তোমার। আজ থেকে তুমি নিজে দায়িত্ব নিয়ে ওদের দেখাশোনা করবে।
নাজমা চৌধুরী শ্বশুরবাড়িতে পা দিয়েই এ বাড়ি দেখে খুব খুশি হয়েছিলেন। মনে মনে বলেছিলেন, এমন একটি বাড়ি আমি পেলাম যে বাড়িটা আমার স্বপ্ন ছিল। তবে আমি কোনো দিন ভাবিনি স্বপ্নের বাড়িটা একদিন বাস্তবে রূপ নেবে। সে দিন শাশুড়ির কথায় তিনি নিজেকে এই স্বপ্নপুরীর রানী ভেবেছিলেন। তাই তিনি উল্লাসে বলে উঠেছিলেনÑ এই ফুলে ফুলে ভরা সোনার স্বপ্নপুরীটা আমার।
ছেলের বউয়ের আবেগ দেখে সে দিন রুমেনা চৌধুরীও তার নিজের আবেগ ভরা চোখের পানি লুকিয়ে রাখতে পারেননি।
এক আত্মীয়ের বাসায় সারা দিন কাটিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলেন নাজমা চৌধুরী। গাড়ি থেকে নেমেই দেখতে পেলেন সেই মেয়েটা, সকালে যার সাথে দেখা হয়েছিল। হাতে কোনো ফুল নেই। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পিঠের উপরে পড়ে আছে। ওর মুখের দিকে ভালোভাবে তাকালেন তিনি। দেখতে পেলেন দু’চোখে জলের ধারা। লাইট পোস্টের আলোতে তার জলেভরা মুখটি চকচক করছে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেনÑ কী হয়েছে মা? কাঁদছ কেন? এই সন্ধ্যাবেলায় এখানে কেন বসে আছ ? কথা বল মা। তুমি তো ফুল। ফুলেরা কি কখনো কাঁদে? ওরাতো হাসে।
নাজমা চৌধুরীর কথা শুনে ফুল ডুকরে কেঁদে ওঠে। বলেÑ ম্যাডাম গো, আমাগো মতো ফুলেরা কোনো দিন হাসে না। খালি কান্দে। আমাগো যে দুঃখের কপাল। আমাগো তো জমেও চোক্কে দ্যাখে না।
কী হয়েছে মা, আমায় খুলে বলো।
আইজ তেমন বিক্রি অয় নাই। আর ম্যালা ফুল নষ্ট অইয়া গেছে। গাড়ির ভিড়ে রাস্তা পার অইতে ছিলাম। এমন সময় কোন গাড়িতে যে আমারে ধাক্কা মারল বুঝবার পারলাম না। আমি ছিটকা দূরে গিয়া পড়লাম। তার পর আমি আর কিচ্ছু জানি না। ম্যালাক্ষণ পর চোখ মেইলা দেখি এক খালায় আমার মাথায় পানি ঢালতাছে। তারে আমি চিনি না। তার বস্তির ঘরে আমারে ম্যালা সেবা করল। কয়ডা ভাতও খাওয়াইল। তার পর আমার মনে অইল ফুলের ডালির কথা। আমি খালারে জিগাইলামÑ আমার ফুলের ডালি কই?
খালায় কইলÑ বেবাগ ফুল নষ্ট অইছে আর ডালাডাও ভাইঙা গেছে। আমি উইঠা খাড়াইলাম তহনই বুঝবার পারলাম পায়ের মধ্যে বড় একখান চোট পাইছি। পা-খান ব্যথায় ঝিন ঝিন করতাছে। খালাডা খুবই ভালো। নিজে আমারে আমাগো বস্তিতে দিয়া আইল। মাইরে ঘটনাখান বুঝাইয়া কইল। তয় এত কিছুর পরও আমার মার মনে কোনো দয়া অইল না। ঘরে ফিরতে দেরি অইছে, ফুল নষ্ট অইছে, ডালাডাও ভাঙছে আর ফুল বেইচা যে টাকা পাইছিলাম তাতো ডালার মধ্যেই আছিল টাকাগুলানও হারাইছে। তাই রাগের চোটে আমার চুল ধইরা কি মাইরডাই মারল। কতক্ষণ চুল ধইরা মারল কতক্ষণ লাঠি দিয়া মারল। তার পর ঘর থিয়া বাইর কইরা দিল।
ফুলের কষ্ট দেখে নাজমা চৌধুরী খুবই মর্মাহত হলেন। মেয়েটিকে কাছে টেনে আদর করলেন। বললেনÑ কেঁদো না মা, আর কেঁদো না। আচ্ছা তোমার মা কি তোমার নিজের মা ?
না গো ম্যাডাম, আমার মায়তো ছোট্ট থুইয়া মইরা গেছে। আর ছোট্ট থিকাই আমার এমন দুঃখের কপাল।
থাক মা আর কথা বলতে হবে না। তুমি আমার সাথে চলো। তোমাকে ডাক্তার দেখাতে হবে। মুখটা ফুলে গেছে। পা ফুলে গেছে। নিশ্চয়ই অনেক ব্যথা করছে। এই তো মা সামনেই একটা ফার্মেসিতে ডাক্তার বসে। ওখানে চলো। কষ্ট করে চলো মা।
ফার্মেসিটা কয়েক কদমের রাস্তা। তবুও ফুলের খুব কষ্ট হলো। ব্যথায় অস্থির মেয়েটা। কোনো রকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। ফুলের যেটুকু সম্ভব ট্রিটমেন্ট করা হলো। ঔষধ কিনে দেয়া হলো। ডাক্তার বললেন, পা ভাঙেনি তবে আগামীকাল একটা এক্সরে করিয়ে রিপোর্টটা দেখাবেন।
নাজমা চৌধুরী ফুলকে জিজ্ঞেস করলেনÑ নিশ্চয় খাওনি!
ফুল উত্তর দিলোÑ না, মায়তো আইজ আমারে ভাত দেবো না। ডর লাগতাছে ঘরে গেলে আবার যদি আমারে মারে।
আহারে সারাটা শরীর ব্যথা হয়ে আছে। গায়ে জ্বর এসেছে। পেটে ক্ষুধা। এ অবস্থায় আবারো মারবে? তোমার মা মানুষ নয়। আচ্ছা মা তুমি কষ্ট করে আমার বাসায় চলো। লিফটে দাঁড়ালেই বাসায় যেতে কষ্ট হবে না। ভয় নেই আমি তোমাকে আমার বাসায় থাকতে বলব না। আমিনার মা নিশ্চয় আমার জন্য রান্না করে রেখেছে। তোমাকে না খাইয়ে আমি খেতে পারব না। চলো মা, একটু কষ্ট করে চলো।
আমিনার মা নাজমা চৌধুরীর রান্না এবং যাবতীয় কাজ করে থাকে। তার সব ধরনের দেখাশোনা করে। নাজমা চৌধুরী বাসায় গিয়ে আমিনার মাকে বললÑ এই মেয়েটিকে খেতে দাও। কী কী রান্না করেছ সব ওকে দিয়ো। মিষ্টি কিছু থাকলেও দিও। ওর চুলগুলো আঁচড়িয়ে বেঁধে দিও।
আমিনার মা ফুলকে যতœ করে খাওয়াল। চুল বেঁধে দিলো। তার পর নিজে ঘরে নিয়ে পৌঁছে দিলো। নাজমা চৌধুরীর রাতে আর খাওয়া হলো না।
রাত গভীর হলো কিন্তু নাজমা চৌধুরীর চোখে ঘুম নেই। শুধু ফুলের কষ্টের কথাগুলো মনে পড়ছে। ফুলের কথা ভাবতে ভাবতে নিজের জীবনের কথা মনে পড়ে যায়। তিনি মনে মনে বলেন, পৃথিবীতে হয়তো খুব কম মানুষই সুখে আছে। ফুল যেমন একটি দুঃখী মেয়ে তেমনি আমি ফুলের মতো অভাবী না হলেও যদি বলি আমি খুব সুখী, তাহলে সত্য কথা বলা হবে কি? আমিও যে মনে মনে খুব অভাবী। ভালোবাসার অভাব, স্বজনের অভাব। আমি যে বড় একা। আমার সব থাকতেও কিছুই নেই, কেউ নেই সবাই দূরে চলে গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে ওখানেই শিক্ষকতার সুযোগ পান তিনি। পরপর তৌহিদ, তৌকির আর ত্বন্বি এলো তার জীবনে।
পার হলো বেশ কিছু সময়। বড় হলো ওরা। একদিন তার স্বামী বিখ্যাত শিল্পপতি নাজিম চৌধুরী তার মা ও স্ত্রী নাজমা চৌধুরীকে ডেকে বলেন, অনেক দিন অপেক্ষা করেছি আর অপেক্ষা করা সম্ভম নয়। এবার তোমাদের গাছ পালা ফুলের বাগান সরিয়ে দিয়ে অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করব। এই জায়গাটার এত সুন্দর পজিশন আর এত বড় জায়গা এভাবে কেউ ফেলে রাখে।
ছেলের কথা শুনে বৃদ্ধা রুমেনা চৌধুরীর দু’চোখ ভিজে ওঠে। তিনি বলেন, এই গাছগুলো এই ফুলের বাগান সব তুই কেটে ফেলবি? পারবি এ কাজ করতে ? এতটুকু মায়া হবে না?
না মা, মায়া করে তো লাভ নেই। তা ছাড়া এসব আবেগ নিয়ে কখনো বড় হওয়া যায় না। এ কাজ আমায় করতেই হবে মা। তুমি আর অমত করো না।
আরো তো অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। এত দিয়ে কী করবি বাবা? তোর বাবার হাতের স্মৃতি এভাবে নষ্ট করিস না। এ গাছ পালা এ ফুলের বাগান আমরা দুজন গড়ে তুলেছিলাম। বড় আদরে বড় ভালোবাসা দিয়ে পালন করেছি যতœ করেছি। আমার বউমা এসে তার মনের মাধুরী দিয়ে ওদের আদরে যতেœ আরো সুন্দর করে তুলেছে। আমার এ বাড়ি এখন ফুলে ফুলে ভরা সুখের সর্গ। শুনে রাখ বাবা এরা আমার প্রাণ। এ বয়সে এদের নিধন আমি দেখতে পারব না। যেদিন এ প্রাণ চলে যাবে সেদিন আমিও এ পৃথিবী থেকে বিদায় নেবো। হয়তো পৃথিবীতে আমি আর বেশি দিন থাকব না। যে ক’টা দিন বেঁচে আছি অন্তত সে ক’টা দিন অপেক্ষা কর বাবা। এভাবে নিজে হাতে আমাকে মেরে ফেলিস না।
দুই ছেলে তৌফিক তৌকিরও বাবার সাথে একমত। মেয়ে ত্বন্বি গাছ পালা ফুল লতা পাতা পছন্দ করলেও সে কোনো প্রতিবাদ করল না। তবে সেবারের মতো গাছগুলো রক্ষা পেল।
তিন বছর পর রুমেনা চৌধুরী মারা গেলেন। শাশুড়ির মৃত্যুতে বড় একা হয়ে পড়লেন নাজমা চৌধুরী। শাশুড়ি যে তাকে বড় ভালোবাসতেন। বাড়িতে তার একজন খুব প্রিয় সঙ্গী ছিলেন তার শাশুড়ি।
নাজিম চৌধুরী সারা জীবনই টাকা রোজগার নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন। স্ত্রীর মনের কাছাকাছি আসার সময় তার কখনো হয়নি। তবুও নাজমা চৌধুরী তার শাশুড়ি, এমন সুন্দর বাড়ি, তার ছেলেমেয়ে তার প্রফেসন লেখাপড়া নিয়ে সুখেই ছিলেন। অনেক সময় স্বামীকে কাছে চেয়েও পাননি। তার সাথে প্রীতি ঘন কোনো মুহূর্তের প্রত্যাশা করেননি তা নয়। তবে তিনি প্রথম থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন তার স্বামীর চরিত্র। নাজিম চৌধুরী স্ত্রী পুত্র কন্যা মা এবং সংসারের সব দায়িত্ব ভালোভাবেই পালন করতেন। কখনো কোনো দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেননি। কখনো তিনি নাজমা চৌধুরীর সাথে খারাপ ব্যবহার করেননি। তবে তিনি ছিলেন অন্য রকম মানুষ। তিনি মানুষের বৈষয়িক চাহিদাগুলো বুঝতেন। মানুষিক চাহিদার কোনো দাম তার কাছে ছিল না। তাই নাজমা চৌধুরী কোনো দিন নিজের মনটা স্বামীর কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেননি। শাশুড়ির মৃত্যুর পর তার মনে একটা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল। সারাক্ষণ তার মনে হতো কখন যেন বাগানটা তছনছ হয়ে যায়। এসব চিন্তায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তবু তিনি মনের ব্যাকুলতা কারো কাছে ব্যক্ত করেননি। তবে তিনি জানতেন এসব একসময় তাকে বিসর্জন দিতেই হবে। ঠিক তিন মাস পরই হঠাৎ একদিন তার নিজের ঘর থেকে গাছ কাটার শব্দ শুনতে পান। তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন নাজমা চৌধুরী। খুব ভালো করে বুঝতে পারেন আজই সেই বিসর্জনের দিন। এক সপ্তাহ ধরে গাছ কাটা চলতে থাকে। তারপর হাত দেয়া হয় ফুলের বাগানে। এতবড় বাগান। শতাধিক ফুলের গাছ আর হাজার হাজার ফুটন্ত ফুল। হাজারো ফুলের বাহার।
এসব দেখে নাজমা চৌধুরী কান্নায় ভেঙে পড়েন। খাওয়া গোসল বন্ধ হয়ে যায় তার। তবুও স্বামীকে তিনি কিছুই বলেননি। নাজমা চৌধুরী সেদিন মরে গিয়েছিলেন। তার পর থেকে তিনি এতদিন মরে বেঁচে ছিলেন।
ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা শেষ করল তাদের বিয়েশাদি হলো। ছেলে দুটো বিদেশে পাড়ি জমাল। আরো বেশি উন্নত জীবনযাপনের প্রত্যাশায়। মেয়েও জামাইয়ের হাত ধরে আমেরিকা চলে গেল। চাকরি থেকেও অবসর গ্রহণ করলেন তিনি। হাতে তার কষ্ট অনুভব করার জন্য পড়ে রইল অফুরন্ত সময়। ইতোমধ্যে সেই ফুলে ফুলে ভরা সুন্দর বাড়িটা বিশাল এক এপার্টমেন্টে পরিণত হলো। দয়া করে বলা হলো তার জন্য ছাদে ফুলের বাগানের ব্যবস্থা করা হবে। তবে বেশ কিছু দিন চলে গেল ওসব ব্যবস্থা আর হলো না। যদিও নাজমা চৌধুরী আশাও করেননি। তারপর হঠাৎ একদিন নাজিম চৌধুরী হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন। পড়ে রইল নাজমা চৌধুরী একা। আর তার একাকিত্ব।
নাজমা চৌধুরীর চোখে আজ কিছুতেই ঘুম আসছে না। তিনি মনে মনে বলেন, ফুলের কষ্ট একরকম আর আমার অন্যরকম। বাহির থেকে আমাকে সুখি মনে হতেই পাড়ে। এত বড় একটা ফ্ল্যাট একা ভোগ করছি। টাকা পয়সার কোনো অভাব নেই। আমার জন্য তিনজন কাজের লোক রয়েছে। একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার প্রতি সপ্তাহে আমাকে চেকআপ করে যান। দামি গাড়ি রয়েছে আমার জন্য। এক কথায় আমার সুখের কোনো অভাব নেই। কিন্তু আমি যে বড়ই দুঃখী মানুষ। আমার হৃদয় ক্ষতবিক্ষত করে আমাকে অবহেলা করে আমার সাধের ফুলের বাগান ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। আমার ছেলেমেয়েরা আমাকে একা রেখে দূরে চলে গেছে। আমাকে ধন সম্পত্তি টাকা পয়সা দিয়ে গেছে কিন্তু ওরা চলে গিয়ে আমাকে নিঃস্ব করেছে। স্বামী আমাকে চির দিন উপেক্ষা করেছে। কোনো দিন আমার মনের খবর রাখেনি।
রাত গভীর হয়। নাজমা চৌধুরীর ভাবনাগুলো মনের মধ্যে এলামেলো হয়ে যায়। একসময় তার বুকে ব্যথা শুরু হয়। তিনি একজন বৃদ্ধ মহিলা। বড় অসহায় হয়ে পড়েন। বুকের ব্যথাটা বাড়তে থাকে। তার দু-চোখ ছাপিয়ে পানি আসে। তিনি আপন মনে ছেলেমেয়েদের ডাকেন, বলেন-তৌফিক--তৌকির--ত্বন্বি তোমরা খুব ভাল থেকো। তোমাদের সাথে আমার আর দেখা হলো না। আমায় তোমরা চিরদিনের জন্য ভুলে যেও সোনারা। আমার আদরের লক্ষ্মী সোনারা ভালো থেকো তোমরা। তোমাদের আজ বড় দেখতে ইচ্ছে করছে।
অস্থির হয়ে বালিশের নিচে রাখা ডাইরি আর কলমটা বের করেন তিনি। খুব কষ্টে কাঁপা কাঁপা হাতে লেখেনÑ আমি খুব সুখী মানুষ।
পরের দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠেই আমিনার মা প্রতিদিনের মতো নাজমা চৌধুরীর ঘরে যায়। ঘরে গিয়ে দেখে তিনি অস্বাভাবিকভাবে শুয়ে আছেন। পাশে খোলা ডায়েরি, হাতে কলম ধরা। আমিনার মা চিৎকার দিয়ে অন্য কাজের লোকদের জড়ো করে। সাঙ্গ হয় নাজমা চৌধুরীর একাকিত্ব আর সব অভিমান। হ
