মানুষ ভাবে। তাকে তার আশপাশের নানা অনুষঙ্গ ভাবায়। নিজের চিন্তাজগতে প্রভাব বিস্তার করে বলয় তৈরি করে সেই অনুষঙ্গগুলো। কেউ সেই ভাবনার বিষয়গুলো প্রকাশ করে নিজের কাছের মানুষদের কাছে। করে হা-হুতাশ। কেউ কেউ সেই বিষয়গুলোকে নিপুণ তুলির আঁচড়ে স্থান দিতে চায় লেখনীর সরঞ্জামে। আর সেই লেখনী পরবর্তীতে দেশ-কালের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে যায় পৃথিবীর প্রায় সবার কাছে। পৃথিবীব্যাপী অনুরণিত হয় সেই অনুষঙ্গগুলো।
মানুষ আজ প্রকৃতির ওপর খড়গহস্ত। আমাদের ঘর বা আবাসস্থল ছিল বড় বড় বৃক্ষের ছায়াতলে। আর এখন সেই বৃক্ষগুলো কিভাবে বনসাই বা টপবন্দী হয়ে আমাদের বারান্দায় স্থান পেয়েছে। কী অমানবিকতা! কী নিষ্ঠুরতা! আমরা দিন দিন কী রকম প্রকৃতি বিপরীত স্রোতমুখী! আমরা কি ধবংসের দ্বারপ্রান্তে? প্রকৃতির ওপর খড়গহস্ত কিছু মানুষ ও কর্তৃপক্ষ তাদের অমানবিক কাজের দ্বারা বিষিয়ে তুলছে বাসযোগ্য এই পৃথিবীকে। পক্ষান্তরে, কিছু মানবিক মানুষ বা চরিত্র এই প্রকৃতিকে রক্ষার জন্য হয়েছে উদ্যোগী। কিন্তু তারা সেই মানুষরূপী হায়েনার ছোবলে হয়েছে ক্ষতবিক্ষত। এমনই একটি চমৎকার ও মানবিক বিষয় নিয়ে উপন্যাস লিখে বিশ্বের অন্যতম সম্মানের পুরস্কার পুলিৎজার ২০১৯ এ ভূষিত হয়েছেন মার্কিনি ঔপন্যাসিক কল্পনার রাজপুত্র রিচার্ড পাওয়ার্স।
বিখ্যাত সেই উপন্যাসটির নাম দ্য ওভারস্টোরি।
৫১২ পৃষ্ঠার এ উপন্যাসটি ২০১৮ সালের প্রকাশ করে মার্কিন প্রকাশনা সংস্থা ডব্লিউ ডব্লিউ নর্টন অ্যান্ড কোম্পানি। দ্য ওভারস্টোরি ২০১৮ সালের ম্যান বুকার পুরস্কারের শর্টলিস্টে স্থান করে নেয়ার পাশাপাশি ইতোমধ্যেই জিতে নিয়েছে ফ্রান্সের গ্র্যান্ড প্রিক্স ডে লেটারাটুর আমেরিকেনে এবং আমেরিকার পেন/জিন স্টেইন বুকসাহিত্য পুরস্কার দ্য ওভারস্টোরি রিচার্ড পাওয়ার্সের দ্বাদশ উপন্যাস।
ইলিনয়েসের এভানস্টোন নামক স্থানে এক প্রিন্সিপ্যালের পরিবারে ১৯৫৭ সালের ১৮ জুন জন্মগ্রহণ করেন পাওয়ার্স। পাঁচ ভাই-বোনের সংসারে বেড়ে উঠতে থাকেন পাওয়ার্স। পাওয়ার্সের বয়স যখন এগারো তখন তার বাবা থাইল্যান্ডের ব্যাংককে এক ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে চাকরি পেয়ে সপরিবারে চলে যান। সেখানেই পাওয়ার্স সঙ্গীতের নানা বিষয়ে জ্ঞান আহরণ করেন ও পারঙ্গম হয়ে ওঠেন। পুরানকার মহাকাব্য যেমন ইলিয়াড ও ওডেসি পড়ে ফেলেন।
১৯৭৫ সালে ব্যাংকক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরেন তারা। অতঃপর ডেকালব হাইস্কুল, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়েস এট আরবানা চ্যাম্পেইন এ পড়েন। পদার্থ নিয়ে প্রথম সেমিস্টার পড়েন সেখানে। কিন্তু পদার্থ ভালো না লাগায় ইংরেজি সাহিতের ওপর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেন।
রিচার্ড ইলিনয়েসে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শিখছিলেন। ১৯৮০ সালে একটি প্রদর্শনীতে কিছু ছবি দেখে প্রকৃতির প্রতি, কৃষকের প্রতি মমত্ববোধ জাগে। তার পর দুই দিনের মাথায় চাকরি ছেড়ে একটি উপন্যাস লেখার প্রত্যয় গ্রহণ করেন।
দুই বছর সময় নিয়ে থ্রি ফারমার্স অন দেয়ার ওয়ে টু আ ডান্স লিখে ফেলেন; যা উইলিয়াম মরো কর্তৃক ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয়। এ উপন্যাস লিখতে সঙ্গীত, কম্পিউটার বিজ্ঞান আর বংশগতির জ্ঞানকে কাজে লাগিয়েছিলেন পাওয়ার্স।
দ্বিতীয় উপন্যাস অপারেশন ওয়ান্ডেরিং সউল (১৯৯৩)। এটি তাকে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ডের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়েছিল। একটি হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে শিশুর নোংরা আত্মীয়স্বজনের সাথে এক যুবক চিকিৎসকের নানা ঘটনা এখানে চিত্রিত হয়েছে। ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে থাকাকালে এটি রচনা করেন পাওয়ার্স।
তৃতীয় উপন্যাস গ্যালাতেয়া ২.২ (১৯৯৫)। ক্ষুদ্রায়তনের একটি গ্রন্থ। এটা পাওয়ার্সের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটি রোবটের ওপর তির্যক লেখা। ইলিনয়েসের বেকহ্যাম ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্স সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলোজির শিক্ষক থাকাকালে একটি এক্সপেরিমেন্টস এটি।
চতুর্থ উপন্যাস গেইন (১৯৯৮)। সার্ধোশত বয়স্ক একটি রাসায়নিক কোম্পানি সম্পর্কিত উপন্যাস এটি। একজন নারী জরায়ু ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছে। যার বাস এই কোম্পানির একটি প্লান্টের কাছে। প্লান্টের রাসায়নিক বিক্রিয়ার বায়ুপ্রবাহের ফলে নারীর এই মারাত্মক রোগ হয়। ১৯৯৯ সালে জেমস কুপার প্রাইজ ফর বেস্ট হিস্টোরিকাল ফিকশন অ্যাওয়ার্ড পায় এই উপন্যাসটি।
পাওয়ার্সের পঞ্চম উপন্যাস প্লোয়িং দ্য ডার্ক (২০০০)। এ উপন্যাসটি অন্যান্য উপন্যাসের আখ্যানশৈলীর মতোই আখ্যানে গঠিত। আমেরিকান সেটেলমেন্ট গবেষকেরা যখন যুগান্তকারী ভারচুয়াল রিয়েলিটির এক ভিত গঠন করছিলেন। ঠিক তখনই মার্কিনি এক অধ্যাপক বৈরুতে জিম্মি।
দ্য টাইম অব আওয়ার সিংগিং (২০০৩) পাওয়ার্সের ষষ্ঠ উপন্যাস। ১৯৩৯ সালে লিংকন মেমোরিয়ালের উদোগে আয়োজিত এক কনসার্টে সাক্ষাৎ হওয়া বিখ্যাত গায়ক ম্যারিয়ান এন্ডারসন এর সাথে মিলনে জন্মনেয়া এক শিশুর ঘটনা আলোচিত হয়েছে। ভিন্ন জাতীয় দু’জন মানুষের মাঝে এক সম্পর্ক, সঙ্গীতের নানা বিষয়, পদার্থবিদ্যার বিশদ ব্যবহার ইত্যাদি এ উপন্যাসটিকে করেছে অনন্য।
পাওয়ার্সকে যে উপন্যাসটি খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে দেয় তা হচ্ছে তার নবম উপন্যাস দ্য ইকো মেকার (২০০৬)। ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। এমনকি পুলিৎজারের ফিকশন বিভাগে চূড়ান্তে উঠেছিল তার নাম। একটি ট্রাক দুর্ঘটনায় মস্তিষ্কে আঘাতপ্রাপ্ত এক তরুণের জীবনবৃত্তান্ত উপস্থাপিত হয়েছে এখানে। ছেলেটি কিছুটা আরোগ্য লাভ করেছিল। নিউরোলজির চিকিৎসা, হাসপাতাল, সেবিকা, ছেলেটির সহোদরা ইত্যাদি হলো আখ্যানের উপাদান। জ্ঞানগত বিষয়ের গভীরতা এখানে পাওয়া যায়। মানুষের মস্তিষ্ক আর কল্পনাজগৎ এর এক সম্পর্ক, বৈপরীত্য উঠে এসেছে এখানে। একজন নিউরোলজিস্ট অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংলাপের মাধ্যমে খোলাসা করেছেন। অভিবাসী লোকজনের পানি ও বাসস্থান সমস্যাও নিপুণভাবে এঁকেছেন পাওয়ার্স।
জেনেরোসিটি : এন ইনহ্যান্সমেন্ট নামক উপন্যাসটি তার দশম উপন্যাস। এটি প্রকাশিত হয় ২০০৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর। রাসেল স্টোন নামক এক লেখক তদর্থক এর সম্বন্ধে উপন্যাসটি। থাসা নামক আলজেরীয় এক নারী শিক্ষার্থীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল এই রাসেল। এই সম্পর্কে উভয়েই সুখী ছিল। কিন্তু এই সম্পর্কের ভেতর একজন সাংবাদিক আর্থিক ফায়দা হাসিলের খতিয়ান দেখেন।
অরফেও নামক একটি উপন্যাস ২০ জানুয়ারি ২০১৪ প্রকাশ হয়। যেটি পাওয়ার্সের ১১তম উপন্যাস। পিটার এলস নামক একজন গীতিকার সম্পর্কিত এই উপন্যাসটিতে পিটারের প্রভাবশালী গীতিকারিতা ও এক সন্ত্রাসীর নানা বিষয় লিখিত হয়েছে।
পাওয়ার্সের দ্বাদশ উপন্যাস ওভারস্টোরি। যে উপন্যাসের জন্য তার এই খ্যাতি। তার এই দেশ, মহাদেশের গণ্ডি পেরুনো এই উপন্যাসটি হচ্ছে দ্য ওভারস্টোরি। বিয়োগাত্মক অথবা পরিত্রাণের দিকে ধাবিত ঘটনার ঘনঘটার মাধ্যমের এক স্বতন্ত্র সম্পর্কের বেশ কয়েকটি চরিত্র এই উপন্যাসে এগিয়ে যায় পরিণতির দিকে। প্রায় সবাই বৃক্ষপ্রেমী। আর তারা হচ্ছে নিকোলাস হোয়েল, মিমি মা, এডাম এপিচ, রয় ব্রিঙ্কম্যান, ডোরোথি ক্যাযালি, ডগলাস প্যাভলিচেক, নিলয় মেহতা, প্যাট্রিসিয়া ওয়েস্টফোর্ড এবং ওলিভিয়া ভ্যান্ডারগ্রিফ।
দ্য ওভারস্টোরি উপন্যাসটির সারাংশ হচ্ছে, ১৯৮৯ সালে ওলিভিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন উপরে উঠে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মুমূর্ষু হয়। আরোগ্য লাভের পর তার মনে হয় যে, উপরের শক্তি তাকে একটি বার্তা দিতে চায়।
একটি দল উদ্যোগ নিয়েছে যে, তারা অবশিষ্ট তিন শতাংশ লাল পেড়ে গাছকে রক্ষা করবে। এই খবর দেখে ওলিভিয়া সিদ্ধান্ত নেয় তাদের সাথে যোগ দিবে। সেখানে ৩৫ বছর বয়সী নিকোলাস হোয়েলের সাথে দেখা হয় ওলিভিয়ার। নিকোলাস তার বীমার প্রায় সবটাকাই খরচ করে ফেলেছে। তার হোয়েল বাগানও বেচে দিয়েছে। কেননা বাণিজ্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল তার হোয়েল ফার্ম।
পোর্টল্যান্ডে একই সময়ে চীনদেশীয় প্রকৌশলীর আত্মজা মিমি মা আত্মহত্যা করার জন্য প্রতিজ্ঞ হয়। একদল কর্পোরেট লোক তার বাড়ির কিছু ছোটগাছকে ধ্বংস করতে চায়। সে নানাভাবে দৌড়ঝাঁপ করে কিন্তু রাতের বেলা নগরের মানুষেরা কেটে ফেলে গাছগুলো। বিখ্যাত এক লোক ডগলাস প্যাভলিচেক পাঁচ বছর ধরে বড় বড় কোম্পানির হয়ে গাছ পুনঃরোপণ কর্মসূচি পালন করছিল। কিন্তু তার মোহভঙ্গ হয়ে যায় গাছগুলো দ্রুত ধ্বংস হয়ে যাওয়ায়। ডগলাস এরেস্ট হওয়া সত্ত্বেও তার কাজ চালাতে চায়। এভাবেই তার সাথে সাক্ষাৎ হয় আত্মহত্যায় উদগ্রীব মিমি মায়ের সাথে। দু’জন মিলে এক হয়ে পরিবেশ ধ্বংসকে রুখে দেয়ার আন্দোলন করে।
নিক আর ওলিভিয়া মিলে একটি ছোট্টদল গঠন করে। যার নাম হচ্ছে ‘ট্রি’।
মিমি আর ডগলাস প্রতিবাদ চালাতে থাকে। মিমি চাকরি ছেড়ে এখন পুরোদস্তুর পরিবেশ কর্মী।
তাদের সাথে যোগ দেয় নিক ও এডামস। তারা একই রকম কাজের একটি ক্যাম্প পরিচালনা করে। মাইনিং কর্তৃপক্ষ তাদের এ কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং তাদের জন্য নানা প্রকার হুমকি এবং জীবননাশের কাজ পরিচালনা করে। কিন্তু এই পরিবেশবাদী দলটি নির্ভয় থেকে তাদের কাজের গতি বাড়িয়ে নেয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালাতে থাকে। একবার মাইনিংয়ের কর্তৃপক্ষ মাইনিং চালালে মিমি এবং ডগলাস মারাত্মকভাবে আহত হয়।
আরেকবার মাইনিং কর্তৃপক্ষের দ্বারা ছড়িয়ে দেয়া আগুনে ওলিভিয়া আহত হয়ে মারা যায়। বাকি তিনজন ভস্মীভূত হয় এবং তাদের অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আর এভাবেই মাইনিং কর্তৃপক্ষ তাদের ধ্বংসাত্মক কাজ চালিয়ে যেতে থাকে।
মানুষ, মানবিকতার মুমূর্ষুতার এই যুগে; তথ্যপ্রযুক্তির সয়লাবের যুগে; বন উজাড়ের এই যুগে; প্রকৃতির ধ্বংসলীলার এই যুগে; উচ্ছন্নে যাওয়ার যুগে; পাঠক খরার যুগে রিচার্ড পাওয়ার্সের মতো প্রকৃতি ও মানবিক লেখকের সৃজনকর্ম আমাদের উদ্দীপ্ত করুক। প্রকৃতিকে ঘরে বা বারান্দায় আড়ষ্ট না করে, আমরাই চলুন প্রকৃতির অপার ক্রোড়ে করি খেলা! হ
