কয়েক দিন ধরে বিপ্লবের মেজাজ গরম। বয়স হলে মানুষ একটু খিটখিটে টাইপের হয়। বিপ্লব ত্রিশ ছোঁয়া মানুষ, তাকে এ পাল্লায় মাপা যাবে না। গরম পড়ছে মেজাজ বাড়ছেÑ এটা হতে পারে। তবে যুক্তিটা নির্ভুল বলা যাবে না। তার বয়সী অনেক মানুষ প্রচণ্ড গরমেও একেবারে শান্ত শীতল ব্যবহার করে। কথা শুনলে মন জুড়িয়ে যায়। সদ্য বিবাহিত বিপ্লবের স্ত্রী নিশি ভাবে এই যে আবির ছেলেটা। সকাল-বিকাল তার সাথে দেখা হয়। কী সুন্দর মুচকি হাসি! দরদ মাখা গলা। নিশির মনে হয়, আবিরের কথায় বরফ গলে যাবে। শীতকালে জমে থাকা নারিকেল তেলও গলবে। জমে থাকা গোশতের ঝোল গলবে। আর কী গলতে পারে! নিশির ভাবনার সময় বিপ্লবের খ্যাঁকানো গলার চিৎকার, এই যে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কার অপেক্ষা? কেঁপে ওঠে নিশি। এত সকালে বিল্পবের ওঠার কথা নয়। আবির উঠবে। মুখোমুখি ফ্লাটের মুখোমুখি দরজা। ভার্সিটিতে যাওয়ার আগে দেখা হবে। একটা মুচকি হাসি। দু’চার কথা! বিপ্লব উঠবে তার দু’ঘণ্টা পর। উঠেই অফিসে যাওয়ার জন্য মহাব্যস্ত। হাঁসফাঁস করে খাবার গিলবে। গিলতে গিয়ে গলায় খাবার আটকে চোখ বড় বড় হবে। একঢোক পানি গিলে আবার খাবে। নিশির জবাব না পেয়ে আবার জোরালো প্রশ্ন তোলে বিপ্লব, দরজা খুলে কার অপেক্ষা? জবাব দাও।
ঠিক সে সময়ে আবির দরজা খোলে। আজ নিশি দরজার সামনে আছে ঠিক, কিন্তু মায়াবী মুখখানা উল্টো দিকে।
নিশি গদগদ কণ্ঠে বলে, দিন দিন তোমার ব্যবহারটা বেশ রুক্ষ হয়ে উঠছে। আমি কার অপেক্ষায় থাকি তুমি জানো না?
আহ! কী কথা? আবির সামান্য সামনে এগিয়ে বলে, বুঝিতো। আমার অপেক্ষায় দিনরাত। কিন্তু ব্যবহার...? আমার ব্যবহার কী রুক্ষ, নিশি ম্যাডাম?
নিশি চমকে ওঠে। সর্বনাশ! এক মুহূর্ত দেরি না করে ঘুরে দাঁড়ায়। আবিরের গালে চটাশ করে পাঁচ আংগুলের শক্ত একটা থাপ্পড় মারে। বেয়াদব ছেলে, আমি তোর অপেক্ষায় থাকি...। আমার সাথে ফাজলামো?
আবির মাথা নিচু করে একেবারে শান্ত ছেলের মতো বেরিয়ে যায়। যাওয়ার আগে শুধু বলে, এই প্রতিফল! এই বিচার?
নিশি গলা ফাটিয়ে বলে, ফের কথা বললে তোকে জুতাপেটা করব। স্টুপিড।
বিপ্লবের মুখখানা মুহূর্তে জ্বলজ্বলে খুশির আভায় ভরে ওঠে। কাজের মহিলা রহিমার আজই বিদায় ঘণ্টা বাজবে। বিদায়ের আগে ওকে ঠিক আবিরকে দেয়া থাপ্পড়ের মতো দুটো থাপ্পড় মারতে হবে। স্বামী-স্ত্রীর সংসারে ফাটল ধরানোর প্রচেষ্টার জন্য তাকে আরো বড় শাস্তি দেয়া দরকার। গরিবের মেয়ে বলে অল্পতে ছাড়। মানবিক কারণ। গম্ভীর মেজাজে ড্রইং রুমের সোফায় বসে বিপ্লব। বিচার বা শাস্তি দেয়ার আগে মানুষকে গম্ভীর হতে হয়। আবেগ ঝেড়ে ফেলতে হয়। স্বামীকে আদালতের জজ সাহেবের মতো বসে থাকতে দেখে নিশির ভয় করে। পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। বিপ্লব তুমি কী আমাকে সন্দেহ করছ?
- না। গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দেয় বিপ্লব।
- তাহলে এভাবে বসে কেন!
- বিচার করব। ৯টায় বিচার হবে। রহিমা এলে। তুমি এখন যাও নিশি।
নিশির ধড়ফড়ানি বেড়ে যায়। রহিমা সব জানে। তাহলে কী রহিমা আসলে...! ভাবতে গেলে মাথা ঘুরে ওঠে।
৯টার সময় রহিমা আসে। ভেতরে যাবে সে সময় গম্ভীর কণ্ঠে গর্জন করে বিপ্লব। দাঁড়াও।
রহিমা থমকে দাঁড়ায়। স্যার। কিছু বলবেন?
বিপ্লব আস্তে আস্তে ওঠে। রহিমার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সজোরে দুই গালে দুটো থাপ্পড় কষে দেয়। কূটনামি করো? আমার নিশি প্রেম করে? বের হ বেয়াদব মেয়ে।
- স্যার...
রহিমার মুখের কথা কেড়ে নেয় বিপ্লব। আর একটা কথা বললে তোকে জুতা পেটা করে তাড়াব।
রহিমা চোখ মোছে। একেবারে নীরবে, নিভৃতে চলে যায়।
নিশি বিপ্লবের একটা হাত ধরে, এসো নাস্তা করবে। অফিসের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।
- হু। চলো।
নাস্তা সেরে কয়েক দিন পর ফুরফুরে মেজাজে অফিসে আসে। অফিসে এসেও শান্তি নেই। শেষ বিকালে জিএম স্যার এলেন। দাঁড়ালেন না। একটু বাদেই বিশ্রী গন্ধ। যায় না। মনে হয় নাকে গন্ধ মেখে দিয়েছেন। পেছন থেকে আয়নাল সাহেব হাঁক দেন, বিপ্লব সাহেব।
- হুঁ।
- প্যান্ট ভরে ঝেড়ে দিয়েছেন নাকি?
গরমে মেজাজ গরম। বিপ্লব সোজা জিএম সাহেবের রুমে চলে যায়। ঢুকেই হড়বড় করে বলে, স্যার আপনি গেলেন। চলে এলেন। ব্যাস পুরো এলাকা...
বিপ্লবকে থামিয়ে দেন জিএম সাহেব, সরি মিষ্টার বিপ্লব। আসলে পেটে গ্যাস হয়েছে।
স্যারের কথা শুনে হো হো করে হেসে ওঠে, ও আচ্ছা। আমার ওখানে গিয়ে সেল করে দিয়ে এলেন স্যার! গ্যাসের দাম কিন্তু বাড়ছে। আর শুনুন আয়নাল সাহেব আমাকে নিয়ে বাজে কমেন্ট করেছে। বিচার দিয়ে গেলাম।
- আচ্ছা দেখব।
সিটে এসে বসতেই আবিরকে দেখে চমকে ওঠে। সকালের থাপ্পড় খাওয়া ছেলেটা তার অফিসে, তার সামনে!
- কী চাই?
- বিচার।
- মানে!
- নিচে চলুন। আপনার প্রেস্টিজ রক্ষা করতেই বলছি।
মারবে নাকি ছেলেটা? নিচে নিয়ে কিলঘুষি! আবিরের মোবাইলটা বেজে চলে। অফিসে সবার সামনে কিলঘুষি খাওয়ার চেয়ে নিরিবিলি খাওয়া ভালো। মান সম্মান বাঁচবে। বিপ্লব নেমে যায়। রাস্তা ধরে বেশ কিছুটা পথ মাড়িয়ে নিরিবিলি স্থানে গিয়ে দাঁড়ায়। আবার আবিরের মোবাইলটা বেজে ওঠে। ফোন রিসিভ করে লাউড স্পিকার চালু করে। ওপাশে নিশির গলা, আবির কথা বলো। প্লিজ আবির। বিশ্বাস করো এ ছাড়া আমার আর কোনো পথ ছিল না। আবির। আবির আমি তোমাকে ভালোবাসি...
আবির ফোন কেটে দেয়। মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি নিয়ে বলে, বিচার দিয়ে গেলাম।
বিপ্লবের মাথার ভেতর চক্কর দেয়। আবির চলে যাওয়ার পর কত সময় দাঁড়িয়ে ছিল অনুমান করতে পারে না। মানুষের হুড়োহুড়ি, চিৎকারে ঘোর কাটে। স্লোগান, মারপিট, ভাংচুর। একজন ছাত্র সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। ড্রাইভারের বিচার চায় সবাই। বিচার! বিপ্লব নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। হঠাৎ একটা পাথর উড়ে এসে বিপ্লবের মাথায় লাগে। কিছু রক্ত চুল ছুঁয়ে গড়িয়ে পড়ে। চোখ মুখ ভিজে যায়। বিপ্লবের খারাপ লাগে না। রহিমাদের বাড়ি যাবে সে। বাড়ি বলতে বস্তির এক কুঁড়েঘর। বাবা-মা নেই। নানির কাছে থাকে। গরিব, এতিম। সহজ-সরল, মায়াবী চেহারা। শুধু পয়সা থাকলে রহিমার বিয়ে হতে পারত বিপ্লবের চেয়ে অনেক ভালো কোনো ছেলের সাথে। সন্ধ্যা নামে, রাতের বেশ কিছু অংশ পেরিয়ে যায়। বিপ্লব হাঁটতে থাকে। নিশি ফোন দিচ্ছে। রিসিভ করলে নিশ্চয়ই বলবে, তুমি কোথায় বিপ্লব। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। এসব শোনার চেয়ে ফোন বন্ধ করে দেয়া ভালো। ফোনটা বন্ধ করে দেয়।
রহিমাদের বাড়ির সামনে এসে একটা ডাক। রহিমা। রহিমা বিপ্লবের মৃদু স্বরের ডাক শুনতে ভুল করে না। ছুটে আসে। বিপ্লবকে দেখেই কেঁদে ফেলে। স্যার আপনার কী অবস্থা? কী হয়েছে স্যার! রহিমার কান্নাকাটিতে ছুটে আসে তার বৃদ্ধ নানি।
জড়ানো কণ্ঠে বিপ্লব বলে, একটা বিচার আছে। রহিমা বিচারটা তুমি করবে। অসহায় মানুষকে আঘাত করার বিচার। অন্যায়ভাবে অভিযোগ দেয়ার বিচার...
বিপ্লবকে ঢুলতে দেখে রহিমা দৌড়ে এসে জাপ্টে ধরে। চিৎকার করে বলে, নানি একটা কিছু করো। স্যারকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে।
বিপ্লব বিচার করতে পারে না তাকে কে ধরেছে। নিশি না রহিমা? ভনিতা না ভালোবাসা? সত্য না মিথ্যা! রহিমার কয়েক ফোঁটা চোখের পানি বিপ্লবের গায়ে মুখে লেপ্টে থাকা রক্তের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়। চোখ দুটো বন্ধ হয়। রহিমা আর্তনাদ করে, স্যার চোখ খুলুন। স্যার...