সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ‘পরাণের গহিন ভিতর’ কাব্যগ্রন্থটি একটি অনবদ্য মৌলিক সৃষ্টি। সত্তরের দশকের শেষ দিকে ‘পরাণের গহিন ভিতর’ প্রকাশিত হওয়ার বহু আগেই সৈয়দ হক আপামর বাঙালির পরানের গহিনে আবাস গড়ে নিয়েছেন। সাহিত্যের সব ক’টি শাখায় ছিল তার সমান বিচরণ। যে দিকে হাত দিয়েছেন, সে দিকেই সফলতা পেয়েছেন। সৈয়দ শামসুল হক চলচ্চিত্রের জন্যও অনেক কাহিনী রচনা করেছেন। রচনা করেছেন ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গানও। তার অমর কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘পরাণের গহিন ভিতর’ অন্যতম। সৈয়দ হক বরাবরের মতোই ভালোবাসারই কবি। তিনি প্রতিটি সাহিত্যকর্মে অমর ভালোবাসার স্বাক্ষর রেখেছেন। দেশ, নদী, নারী, মাটি, প্রকৃতি সব কিছুর প্রতি তার ভালোবাসা অকৃত্রিম। সব উজাড় করে এমন ভালোবাসার কথা বলেছেনÑ ‘তোমারে যে ভালোবাসে এর থিকা আরো পাঁচ গুণ/আল্লাহর কসম আমি দিমু তারে এই জামাখান/আমার কলম আমি দিমু তারে, শরীলের খুন/দোয়াত ভরায়া দিমু, অনুরোধ খালি একখান/সে য্যান আমার থিকা আরো ভালো পদ্য লেখে আর/যাদুমন্ত্রে রূপার শিকল হাতে দিতে পারে তার।’
আঠারো মাত্রার তেত্রিশটি সনেটে সাজানো গ্রন্থটিতে আছে কবির আঁকা কয়েকটি স্কেচও। গেল শতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষের দিকে সৈয়দ শামসুল হক বিদগ্ধ কাব্যিক হৃদয় উজাড় করে রচনা করেন, ‘পরাণের গহিন ভিতর’। এই কাব্যগ্রন্থে তিনি গ্রামীণ বাংলার মধ্যবিত্ত জীবনের প্রেম, ভালোবাসা, আবেগ, অনুভূতি প্রান্তিক জনপদের লোকজ ভাষায় প্রকাশ করেছেন। কাজটি কিন্তু মোটেও সহজ ছিল না। কিস্তু সৈয়দ হক সর্বসাধারণের বোধগম্য ভাষায় খুবই সাবলীলভাবে সেই দুঃসাধ্য কাজটি করে দেখিয়েছেন। সহজবোধ্য ভাষা, বৈচিত্র্যময়তা, চয়ন ও বচন, ভাষা ও বাক্যবিন্যাসে সৈয়দ এখানে শতভাগ সফল। ভালোবাসার জন্ম এবং বসতঘর হৃদয়ের গহিনে। পরাণের গহিন ভিতর থেকেই যেন ঝরে পড়ছে সৈয়দ হকের আকুতি, ‘কি আছে তোমার দ্যাশে? নদী আছে? আছে নাকি ঘর?/ঘরের ভিতরে আছে পরাণের নিকটে যে থাকে?/আমার তো দ্যাশ নাই, নদী নাই, ঘর নাই, লোক/আমার বিছানে নাই সোহাগের তাঁতের চাদর/আমার বেড়ায় খালি ইন্দুরের বড় বড় ফোক/আমার বেবাক ফুল কাফনের ইরানী আতর/তোমার কি সাধ্য আছে নিয়া যাও এইখান থিকা/ আমার জীবন নিয়া করো তুমি সাতনরী ছিকা।’ ভালোবাসার শক্তি সম্পর্কে কবি যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। অনেক সময় এই শক্তির কাছে ইচ্ছা-অনিচ্ছা নির্বাসিত হয়, ‘নিজেই তাজ্জব তুমি একদিকে যাইবার চাও/অথচ আরেক দিকে খুব জোরে দেয় কেউ টান ... এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর/যে তার রুমাল নাড়ে পরাণের গহিন ভিতর’। প্রিয়তমা সুখ খুঁজে মেঘাচ্ছন্ন অজানা আকাশে। অথচ কবির ভালোবাসার সহজ সমীকরণ বোঝে না, ‘মেঘের ভিতরে তুমি দ্যাখো কোন পাখির চক্কর/এমন সরল পথ তবু ক্যান পাথরে টক্কর?’
নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতি সমর্পিত না হয়ে প্রিয়জন সমর্পিত হয় ক্ষতিকর লোকের প্রতি। মন্দলোকের নীল দংশনে প্রিয়তমার সর্বাঙ্গে বিষক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। তবুও সে ফিরে না, ফিরে আসার বাসনাও করে না। সৈয়দ হকের কলমে ঝরে পড়ছে একরাশ আক্ষেপ, ‘সে কোন বাটিতে কও দিয়াছিলা এমন চুমুক/নীল হয়ে গ্যাছে ঠোঁট, হাত পাও শরীল অবশ/অথচ চাও না তুমি এই ব্যাধি কখনো সারুক’। পরাণের গহিন ভিতর যার নিত্য বসবাস, তার সন্ধানে কত গহিন গ্রাম বা অরণ্যে হন্য হয়ে ঘুরেছেন কবি, ‘কতবার গেছি আমি গেরামের শ্যাষ সীমানায়/আদাড় বাদার দিয়া অতিঘোর গহিন ভিতরে।’
‘পরাণের গহিন ভিতর’ কাব্যগ্রন্থে সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রেম-বিরহ খাঁটি লোকজ ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। সামান্য বেশি সুখ আর প্রাপ্তির প্রত্যাশায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রেম উচ্চবিত্তে ঝাঁপ দেয়। পূর্বে প্রকাশিত পরাণের গহিন ভিতরে রোপণ করা অকৃত্রিম প্রেম নিমেষেই উড়াল দেয়। হঠাৎ প্রিয় মানুষের আচার-আচরণ পরিবর্তন যেমন বিস্ময়কর, ঠিক তেমনই বিয়ের পর অন্যজনকে নিয়ে স্বপ্ন দেখাও নির্মম পীড়াদায়ক। সৈয়দ হকের কাব্য ভাষা বরাবরের মতোই প্রাণবন্ত, জীবন্ত, ‘আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দ্যায় ক্যান/ক্যান এত তপ্ত কথা কয়, ক্যান পাশ ফিরে শোয়/ঘরের বিছন নিয়া ক্যান অন্য ধানখ্যাত রোয়/অথচ বিয়ার আগে আমি তার আছিলাম ধ্যান।’ প্রিয়জনের কাছে যে প্রত্যাবর্তন করবে, সে ধরনের কোনো সুযোগ আর অবশিষ্ট নাই। যার কাছে যাওয়ার কথা সে বেমালুম ভুলে গেছে, ‘আসুম? আসার মতো আমি কোন ঘর দেখি নাই/যামু যে? কোথায় যামু, বদলায়া গ্যাছে যে বেবাক।’ কবি কখনো কখনো নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে মনের দহন বন্ধ করতে চান। এক প্রিয়তমা গেলেও নদী আর বৃক্ষের প্রিয়জন বিয়োগের অনন্ত ইতিহাস কিছুটা হলেও প্রেরণাদায়ক। নদী আর বৃক্ষের উদাহরণ টেনে তাদের দুঃখের ফিরিস্তি টেনেছেন, ‘মনে হয় আমার থিকাও একা বৃক্ষের পরাণ/আমার থিকাও দুঃখী যমুনার নদীর কিনার/আমার তো গ্যাছে এক, কত কোটি লক্ষ গ্যাছে তার।’
যতই উপমা-উদাহরণের ফিরিস্তি টানা হোক না কেন, প্রিয়জনের অন্য ডালে লাফ দেয়া কোনোক্রমেই মেনে নেবার মতো নয়। বাড়ির আঙিনায় ফুলগাছ শোভা পেলে যেমন সব সুন্দর হয়ে যায় না, দুঃখভরা জীবনও সুন্দর হয় না, ‘আঙিনার পাড়ে ফুলগাছ দিলে কি সোন্দর হয়/দুঃখের কুসুম ঘিরা থাকে যার, জীয়ন্তে কবর।’ সৈয়দ শামসুল হক আবার গ্রামীণ লোকজ উপাদান পুকুরকেও টেনে এনেছেন সান্ত্বনাসূচক উপমার মোড়কে। গ্রীষ্মকালেই প্রয়োজন হয় পুকুরের জল। অসংখ্য পুকুরই মানুষের সেই প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ। পুকুরের মতো প্রিয়তমাও ব্যর্থ প্রয়োজনে সুখ দিতে, ‘কত না পুকুর দিতে পারে নাই পানি গ্রীষ্মকালে।’
মানবদেহের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অঙ্গ হৃদয়। হৃদয়ের সাথে প্রতারণা কোনোক্রমেই মেনে নেয়ার মতো নয়। দৈহিক খুন আর আত্মিক খুনের তফাৎও ব্যাপক। হৃদয়ের সাথে প্রতারণার নির্মম বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, ‘অঙ্গের কুসুম নিয়া খেলা করছে দুফর দারুণ/যেদিন ফালায়া গেল আমারে সে আমার ভিতর।’ হঠাৎ করে প্রিয়জনের কথা বলার ধরন পাল্টে যায়। অথচ মৌখিক ভাষাই মানুষকে আপন বা পর করে, ‘এখন আমার ঠোঁটে শুনি আমি অন্য এক স্বর/ভাষাই আপন করে আর সেই ভাষা করে পর।’ এত কষ্ট দেয়ার পরও প্রিয়জনকে ভোলা যায় না। বারবার পুরুষের নির্লজ্জ প্রত্যাবর্তন হয় প্রিয়তমার কাছে। পরাণের গহিন ভিতরে বসবাসরত বখে যাওয়া প্রিয়তমাকে বশ করতে খিজিরের সহায়তাও প্রার্থনা করেছেন। ‘মাছের পাহারা ঘেরা খিজিরের অতল আস্তানা/আছে তার ইশারায় আগুনের দেহ এক জ্বীন/যদি ইচ্ছা করে তার অসম্ভব নাই কোন কাম/যারে না পাইতে পারি তারো সাথে দিতে পারে মিল।’
বাংলা সাহিত্যের সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক থাকবেন বাঙালির পরাণের গহিন ভিতর।
সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ‘পরাণের গহিন ভিতর’ কাব্যগ্রন্থটি একটি অনবদ্য মৌলিক সৃষ্টি। সত্তরের দশকের শেষ দিকে ‘পরাণের গহিন ভিতর’ প্রকাশিত হওয়ার বহু আগেই সৈয়দ...
