লেখালেখির ভাষা হতে হবে সহজ সাবলীল। লেখালেখিতে জটিল ও দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহার করলে পাঠক এর সুফল লাভ ব্যর্থ হয়। তাই সাহিত্যের ভাষা হতে হবে সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল, ঝরনার মতো প্রবাহমান, যাতে তা সব মানুষের বোধগম্য হয়। কারণ, সাহিত্য রচনা যদি মানুষের বোধগম্য না হয় তাহলে সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়। লেখাটি যদি পাঠকের উদ্দেশে হয় আর পাঠকই তার মর্ম হৃদয়ঙ্গমে ব্যর্থ হয়, তাহলে এত কষ্ট করে রচনা লেখার সার্থকতা কোথায়? অপ্রচলিত ও দুর্বোধ্য ভাষায় সাহিত্য রচিত হলে পাঠক তার মর্ম উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়, আর তাতে সাহিত্যের মূল্য কমে যায়। পাঠক সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। পক্ষান্তরে সবার বোধগম্য সহজ-সরল ভাষায় সাহিত্য রচিত হলে পাঠক সহজেই তার মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারে। ফলে এ সাহিত্য পাঠকের কাছে গ্রহণীয় হয় এবং এর মূল্য অনেক বেড়ে যায়। সাহিত্যের ভাষা এমন হওয়া উচিত, যাতে সবাই তা পড়তে পারে, বুঝতে পারে। বর্তমানে অনেক উদীয়মান সাহিত্যিকগণ সাহিত্যের আদর্শ হিসেবে কঠিন, অপ্রচলিত, ভারী ও ওজনদার শব্দ বেছে নিয়েছেন। সে শব্দগুলো সাধারণত পাঠক বুঝুক আর নাই বুঝুক। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের স্থপতি, প্রখ্যাত ভাষাবিদ বঙ্কিকচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধে তিনি বলেনÑ ‘গ্রাম্য বাঙ্গালি নারীরা মনে করে, শোভা বাড়ুক আর নাই বাড়ুক ওজনে ভারী সোনা অঙ্গে পরলেই অলঙ্কার পরার গৌরব হলো’। এমনিভাবে এ যুগের তরুণ লেখকরা মনে করেন, পাঠক বুঝুক আর নাই বুঝুক, দুর্বোধ্য ও অপ্রচলিত শব্দ চয়নে সাহিত্য রচনা করলেই তা উৎকৃষ্ট সাহিত্যের মর্যাদা লাভ করবে। মূলত তাদের এ ধারণা সঠিক নয়। সাহিত্যের প্রধান গুণ এবং প্রথম প্রয়োজন সরলতা ও স্পষ্টতা। যে রচনা পড়ামাত্রই সবাই বুঝতে পারে, তাই উৎকৃষ্ট রচনা। তাই সাহিত্যের ভাষা হতে হবে সহজ সাবলীল, যাতে পাঠক তা বুঝতে পারে। সাহিত্য যদি কঠিন ও দুর্বোধ্য হয় তাহলে পাঠক তা পড়ে বুঝতে পারে না। আর যে সাহিত্য পড়ে বোঝা যায় না, তা রচনারও কোনো অর্থ হয় না। যেখানে যে শব্দ ব্যবহার করলে ভাষা সহজ ও বোধগম্য হয়, সেখানে সে ধরনের শব্দ ব্যবহার করাই উচিত।
আমাদের সাহিত্য আমাদের ইবাদত। সাহিত্য আমাদের আরাধ্য। যে সাহিত্যে কোনো লক্ষ্যের দিকনির্দেশনা নেই, আমাদের কাছে তা নিরর্থক। তার কোনো কার্যকর গুরুত্ব নেই জীবন ও সাহিত্যে। মানবতার সৌধ নির্মাণের পরিবর্তে সাহিত্যের দ্বারা মানবতা ও মনুষ্যত্ব ধ্বংসের কাজ আঞ্জাম দেয়া হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে। মানবিক রিপু ও তাড়নাকে চাঙ্গা করে তোলা হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে। সাহিত্য তো সেটাইÑ যার আবেদন মানবতার পুনর্গঠন, মনুষ্যত্বের বিকাশ সাধন ও মানবতার কল্যাণ সাধিত হয়। আরো সহজ ভাষায় বলা যায়, যে সাহিত্য মানবতার কাজে আসে না, নিছক আনন্দ-বিনোদনেই সীমাবদ্ধ এটাই অপসাহিত্য। নিছক ভাষাগত ও শাব্দিক কারুকার্য তো একটি তুচ্ছ ও নিষ্ফল ক্রীড়াশৈলী ও জাদুকরীর নামান্তর। এমন সাহিত্যের দ্বারা মানবতার কল্যাণ আসে না। যে সাহিত্য মানুষের মূল্যবোধ জাগ্রত করতে পারে না; যেখানে মনুষ্যত্বের বিকাশ নেই, যার মাধ্যমে হয় না আত্মার উন্নতি, মন হয় না প্রশান্ত, মানবতায় হৃদয় হয় না ভরপুর, সে সাহিত্য কখনোই আদর্শ সাহিত্য হয় না। সে লেখক কখনো হয় না আদর্শ লেখক। একজন সাহিত্যিকের কাজ শুধু প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের কথামালা উপস্থাপনের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। শুধু ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়া ধারণ করে এগিয়ে চলা নয়। তার কাজ হচ্ছে সত্য-ন্যায়, কল্যাণ ও সৌন্দর্যের স্বপ্ন দেখানো। সহজ-সাবলীল ও সুন্দর বর্ণনার মধ্য দিয়ে মানুষের মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তুলে আন্ধকারে আলোর মশাল প্রজ্বলিত করাই একজন সাহিত্যিকের প্রধান দায়িত্ব। হ