দু’কদম এগিয়ে এককদম পিছিয়ে আসে রুস্তম। খানিকটা ভূত দেখার মতো হঠাৎ চমকে ওঠে। বাম হাতের উল্টো পিঠে বারকয়েক চোখ মুছে। না, ঠিকই দেখছে সে। পৌষের কুয়াশাঘেরা হিমেল সকালে ঘরের দেউড়িতে ঝাড়ু হাতে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে রানুদি। ঝাট দিতে দিতে কখন যে স্থির দৃষ্টিতে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় অন্যমনস্ক হয়ে যায় বুঝতে পারেনি। দুটো চড়ুই পাখি জানালার কার্নিশে বসে পরস্পর নিজেদের মধ্যে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। কিছুক্ষণ পরপর মিলিত হচ্ছে। প্রকৃতির চিরায়ত সেই অপরূপ দৃশ্য দেখে রানে রান চিপোচ্ছে রানুদি। নিজের বহুদিনের উপোসী শরীরটা মুহূর্তে ঝাঁকুনি দেয়। বাইন মাছের মতো ঈষৎ মোচড় দিয়ে উঠে। সেই রগরগে দৃশ্য উপেক্ষা করা কঠিন। দীর্ঘদিনের অবদমিত কাম মুহূর্তে জেগে উঠে। তার ঊষর বুকে সিঞ্চিত শীতল জলের ধারার ক্ষীণস্রোত চুইয়ে চুইয়ে ক্ষরণ হয়। গরিবের পেটের খিদে আছে বলে কাম তো একেবারে মরে যায়নি। তবুও দাঁতে দাঁত কামড়ে দম খিচে স্বামীর ভিটে মাটিতে জীবন কাটিয়ে দেয়ার পণ করে। কখনো মুহূর্তের ভুলে একটিবারও বিপথে পা মাড়ায়নি। স্তূপসদৃশ দ্রুত অপসৃয়মাণ জীবনের রঙিন স্বপ্নগুলো দলামোছা করে অকালে কৃষ্ণগহ্বরে পতিত হবে দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। হাসি, খুশি তাগড়া যুবক আশরাফের কথা মনে পড়ে যায় রানুদির। বিয়ের মাত্র এক বছরের মাথায় মানুষটা কোথাও যেন হারিয়ে গেছে। নিখোঁজ হয়ে যায়। নেই নেই একদম নেই। রানুদি কত জায়গায় যে খুঁজেছে, কত মানুষের হাতে পায়ে পর্যন্ত ধরেছে। কাজের কাজ কিচ্ছুটি হয়নি। কেউ কোন সন্ধান দিতে পারেনি। কোত্থাও জলজ্যান্ত মানুষটির টিকিটির খোঁজ মেলেনি। বিধাতা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। স্বামীসুখ রানুদির ভাগ্যে বেশি দিন জোটেনি। সেসময়ে পেটে রেখে যাওয়া আশরাফের একমাত্র ভালোবাসার স্মৃতিচিহ্ন তিন মাসের গর্ভজাত সন্তান হলোÑ বাবুল। দিনে দিনে বাবুলও আজ এক বাড়ন্ত যুবক। পা পড়েছে বছর পনেরোতে। ততদিনে গ্রামের সুন্দরী বধু রানুও সকলের নিকট পরিচিত হয়ে উঠেছে প্রিয়মুখ রানুদি নামে। এদিকে বাঁশঝাড়ের পেছনের রাস্তার টিনশেড বাউন্ডারির ফুটোতে চোখ রেখে রানুকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে রুস্তম। সেদিকে রানুর কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। রুস্তম এই এলাকার পাটোয়ারির ছেলে। শহরে বন্দরে তাদের একাধিক দুনম্বরী কাজকারবার, অবৈধ মজুতদারি ও ভেজালের ব্যবসা রয়েছে। সে বখাটে যাওয়া মাতাল, নারীলোভী, লম্পট। লোকসমাজে চাউর রয়েছে একটা কথা। আশরাফের নিরুদ্দেশ হওয়ার পেছনে নিশ্চয় রুস্তম-পাটোয়ারি বাপবেটার যোগসাজশ রয়েছে। আশরাফের সাথে রুস্তমের একবার ঝগড়া হয়েছিল কী জানি একটা বিষয় নিয়ে। প্রায় হাতাহাতি পর্যায়ে চলে গেছিল সেদিন। রানুু অনেক চেষ্টা করেও প্রকৃত বিষয়টা স্বামীর মুখ থেকে শুনতে পারেনি। সেই থেকে সেও তক্কে তক্কে আছে। জোচ্চোরকে বাগে পেলে এক কোপে কল্লাটা ধড় থেকে আলাদা করার। একমাত্র ছেলেটাও কিছুক্ষণ হলো দু’মুঠো পান্তা খেয়ে কাজে বেরিয়েছে। ফিরবে সেই অনেক রাত করে। অথচ ছেলেটাকে শিক্ষিত করে তোলার দু’চোখে স্বপ্ন ছিল তার। ছিল আরো কতশত স্বপ্ন, সাধ। একটা মাত্র মানুষ নিরুদ্দেশ হওয়ার সাথে সাথে স্বপ্নগুলো পেজা তুলোর মতো হাওয়ায় উবে গেছে। যার ভাতার নেই, তার ভাতও নেই। দু’বেলা দুমুঠো ভাত জোগাতেই এখন দিনরাত যতো কষ্ট। রীতিমতো গলদঘর্ম ছুঁটে যায়। তবুও চেষ্টার কমতি ছিল না রানুদির। প্রয়োজনে পেটে পাথর বেঁধে হলেও ছেলেকে মানুষ করতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি। একমাত্র ছেলেটার পড়ালেখার খরচ জোগাতে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। বউঝিদের থালাবাসন মেজেছে। মেধা ও মননে ছেলেটাও তার বাবার মতোই অসম্ভব মেধাবী হয়েছে। কিন্তু মানুষের নজর প্রতিনিয়ত রানুদির দেহ পল্লবের ভাঁজে ভাঁজে, গুপ্তগিরিতে ঘুরে ফিরেছে। এই সমাজে কোনো মানুষ থাকে না, থাকে রুস্তম আর পাটোয়ারির মতো একদল মনুষ্যরূপী অমানুষ। যাদের জোত জমিদারি, লোক লস্কর, অবৈধ ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তির কাছে সাধারণ মানুষেরা অনেকটা অসহায়। তাইতো একপ্রকার বাধ্য হয়ে রানুুুদি নিজেকে স্বেচ্ছায় ঘরবন্দী করে রাখে। বইপত্র ও কাগজকলম শিকেয় তোলে, এতটুকুন একরত্তি ছেলেটাকে কাজে বের করে দিতে হয়েছে তাকে। ঘরে চড়ুই পাখি দুটো বাসা বেঁধেছে মাত্র কিছুদিন হলো। নয়া সংসারে ওদের কিচিরমিচির, ঝগড়া, খুনসুটি, ভালোবাসাবাসি, দানা খুঁটে খাওয়া যাপিত জীবনের ক্লান্তিহীন সংগ্রাম প্রতিনিয়ত দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছে রানুদির। আশরাফ ও রানুুুদির অনেক কিছুর সাথে চড়ুই পাখি দুুটোর বড্ড সাদৃশ্য খুঁজে পায়। হঠাৎ টনক নড়ে তার। ধারেকাছে কোথাও একটা শব্দ হলো বুুুঝি। রাস্তার ধারে বাঁশঝাড়ের ওদিকে মনে হলো। ভাঙাচুরা টিনশেডের দিকে তাকিয়ে রানুদি কয়েক সেকেন্ড থমকে যায়। দেখতে পায় একজোড়া লোলুপ দৃষ্টি তাকে গভীরভাবে অনুসরণ করে যাচ্ছে। ঠুণ্ডা ঝাড়ুটা তার হাতেই ছিল। পাশে আমড়াগাছে গেঁঁথে রাখা বটিখানাও ছো মেরে হাতে তুলে নেয়। ‘শুয়োরের বাচ্চা আজ এক কোপে তোর কল্লা ফালামু’ বলে সে রুদ্ররূপ ধারণ করে। তড়িৎ বেগে রুস্তমকে পেছন থেকে দেয় ধাওয়া। ঘটনার আকস্মিকতায় বখাটে রুস্তম পড়িমরি করে ‘দে ছুট’। কোনোরকম হাঁপাতে হাঁপাতে কুকুরের মতো জীবন বাঁচিয়ে পালায়। এদিকে প্রচণ্ড ক্ষোভে-রাগে গজরাতে গজরাতে রানুদি চিল্লায়।
নবাবপুর গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে রানুদির ছোট্ট আবাস। বর্ষার মৌসুমে পুরো বাড়িটিকে গ্রাম থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে তোলে। চতুর্দিকে অথৈ জলরাশির মধ্যে বাড়িটি যেন একটি ছোট্ট বদ্বীপ। কোমরজলে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। বর্ষার মনোহারিণী রূপ, দেহজুড়ে অবিরাম বর্ষণের বারিপাত, কণ্ঠজুড়ে মেঘের গুড়গুড় শব্দ, মাথায় কালো মেঘের কেশপাশ, পা ধৌত করছে এক মাঠ জল। মাঠে দিগন্ত বিস্তীর্ণ শস্যশিশুর জলকেলি নৃত্য দেখতে দেখতে কৃষ্ণধূসর মেঘ বালিকার পাশ কাটিয়ে শ্বেত বক-কন্যারা যেন নিরুদ্দেশ যাত্রা করে। সূর্য লুকোচুরি খেলে মেঘের সাথে। মেঘের ভৈরবী রূপের গলায় বিজলী যেন গহনা পরিয়ে দেয়। সে আনন্দে বর্ষা ঝমঝম শব্দে অবিরাম নৃত্য শুরু করে। রানুদির ছবির মতো সুনিপুণ বাড়িটি সেই রূপ-আনন্দের উপলক্ষ হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। একমাত্র সরু রাস্তা যদিও বা বাড়ির পাশ ঘেঁষে ধনুুুুকের ন্যায় গঞ্জের দিকে চলে গেছে, সেটিও শ্রাবণ ভাদ্র মাসের দিকে প্রায় ডুবো ডুবো অবস্থা। শুষ্ক মওসুমে আবার সেই দৃশ্যপট রাতারাতি পাল্টে যেতে সময় লাগে না। বাড়ির চারপাশে তখন ধু ধু অঞ্চলজুড়ে শুধু ফসলি জমি হলুদের রাজ্যে ঢেউ খেলে। বেশির ভাগই মনলোভা সর্ষেক্ষেত। নবাবপুর থেকে তার পৈতৃক ভিটা সৈয়দপুর মাইল চারেকের পথ। রানু গতকালই ছেলেকে বলে রেখেছে, আজ নানাবাড়ি থেকে অন্তত একবার ঘুরে আসতে। সেখানে বাবা-মা’র দেয়া তিন বিঘা জমিতে ফি বছর বিভিন্ন তরিতরকারি চাষাবাদ করা হতো। মা যতদিন বেঁচেবর্তে ছিল, সবকিছু একপ্রকার ঠিকঠাক ছিল। চাষবাস থেকে শুরু করে সমস্ত কিছু তিনিই দেখভাল করতেন। মাসে মাসে মেয়ের জন্য আলু, লাউ, কুমড়া, বেগুন, মুলা, মরিচ ও বিভিন্ন পদের শাকসবজি বস্তাপুরে অটোরিকশায় নিয়ে আসতেন। বাকিগুলো স্থানীয় হাঁটে পাইকারদের নিকট বিক্রি করে দিতেন। এখান থেকে মাসে মাসেও কিছু টাকাপয়সা মেয়ের নিকট হাতখরচার জন্য আসত। কিন্তু আশরাফ নিরুদ্দেশ হওয়ার কিছুদিন পরে মা মারা যায়। লোকে বলে মা মারা গেলে বাপ হয়ে যায় তালই। অবস্থাদৃষ্টে হয়েছেও তাই। বুড়ো বয়সে বাবা ঘরে একখান শনি নিয়ে আসেন শাদি করে। দুই ভাইয়ের সংসারে বাবার ভূমিকাও ক্রমশ সঙ্কোচিত হতে হতে অপাঙ্ক্তেয় হয়ে ওঠে। ব্যস তারপর থেকে নিজের জন্মদাতা পিতাও কেমন জানি হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে রানুদিকে নিজ দায়িত্বে নিজের পতিত জমিখানার দেখভাল করতে হয়। কিন্তু এতদূর থেকে কাজকম্ম পরিচালিত করা অনেকটা অসাধ্যই বলা চলে। তারওপর রয়েছে সৎ মায়ের অযাচিত খবরদারি। অনেক দিন হয় সেখান থেকে কিচ্ছু আসে না। বাপ ভাই থেকেও নেই। এদিকে রানুদির সংসারের উনুন প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। অভাবের সংসারে চলা অনেকটা দায় হয়ে গেছে। ছেলের আয়রোজগার এখনো বলার মতো কিছু হয়নি। যেটুকু পায় তা দিয়ে মাসের এক-তৃতীয়াংশও চলে না। একরত্তি ছেলেটা সবি বুঝে, তবুও চুপটি মেরে থাকে। মায়ের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে দিনরাত খাঁটুনি খাটে। আজ কাজ নেই। সকাল হতে না হতে বাবুল রেডি হয়ে যায়। চতুর্দিকে বিজয় দিবসের উদযাপন ধ্বনি। মাইকে মাইকে দেশাত্মবোধক গানের সুললিত মধুর সুরে মুখরিত চারপাশ। সর্বত্র ছেয়ে গেছে লাল সবুজের বর্ণিল পতাকায়। মাথায় শক্ত করে লাল সবুজের একখান পতাকা বেঁধে নেয় বাবুল। গতকালই সে এটা কিনেছে। হাসি হাসি মুখে বাধ্য ছেলের মতো মায়ের সামনে এসে দাঁড়ায়।
'বাহ! আমার বাজানটাকে তো আজ চেনাই যাচ্ছে না। খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। তা, শুকনো মুখেই বের হবি নাকি বাপ? কিছু মুখে দিবি না?'
'না না মা, খাব না। নানুবাড়ি গিয়ে বরং পেটভরে খাব।'
'তা হয় নাকি? খালি পেটে সাতসকালে কেউ কোত্থাও বেরোয়? যা, রসুইঘরে তক্তপোষের ওপর লাল বয়ামে সামান্য মুড়ি রয়েছে, জলদি দুমুঠো খেয়ে এক আজলা পানির ঢুক দে।'
'পেটে ভুখ নেই মা। রাতে জবর খানা খেয়েছি।'
রানুদি ছেলের কথা শুনে অবাক হয়। মনে মনে ভাবে, রাতে কী এমন খেয়েছে আমার ছেলেটা, যার দরুণ সকালেও পেটে ভুখ নেই।
'কস কিরে বাবা!'
'হ মা, মালিক কাল সবাইরে কাজে খুশি হইয়া গোশত ভাত খাওয়াইছে। এই দ্যাখ না হাতে এখনো গন্ধ লেগে রয়েছে।'
বাবুল মিছেমিছি ডান হাতের তালুটা মায়ের সামনে শুকে। রানুদি একজন মা। মায়েদের চোখ সবি বুঝতে পারে। তবুও কথা বাড়ায় না আর।
'তুই এগিয়ে যা বাপ, সাবধানে বেরিয়ে পড়। এদিকটা আমি বেশ সামলে নেবো। বেলা থাকতে থাকতে ফিরিস কিন্তু। জানিস তো, বিকেলের দিকে ঝেঁকে শীত নেমে আসবে।'
'আচ্ছা মা, আমি আসছি।'
সাইকেল ঘুরিয়ে খুব জোরে প্যাডেলে চাপ দেয় বাবুল। শাঁ শাঁ করে সাইকেল দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকে পূবের রাস্তা ধরে সৈয়দপুরের উদ্দেশ্যে। মায়ের স্বপ্নভরা চোখ দুটোই বাবার অপ্রত্যাশিত নিখোঁজ হওয়া, সংসারের অভাব-অনটন, টানাপোড়ন, গঞ্জনা সব ভুলিয়ে রাখতে সাহায্য করে বাবুলকে। রানুদি বাড়ির খিড়কির পথে দাঁড়িয়ে শুকনো কলাপাতার ফাঁকে দৃষ্টিসীমানা পর্যন্ত ছেলের গমনপথের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে।
শীতের প্রকোপটা হঠাৎ গত দুদিনে আশঙ্কাজনক ভাবে বেড়ে গেছে। উত্তরের হিমশীতল বেয়াড়া বাতাস সারাক্ষণ কানে মুখে ফুঁ দিচ্ছে। তীক্ষè ছুরির ফলা দিয়ে সমস্ত শরীর ফালি ফালি করে কাটছে যেন। আজকাল সারাবেলায় সূর্যের নাগালটুকু পর্যন্ত দেখা মিলে না। ঝিম খিচে থাকা রুক্ষ প্রকৃতির গুমট বাঁধা সময়টা ক্রমশ গাঢ় থেকে আরো গাঢ়রূপ ধারণ করে। ভোরের ঘন কুয়াশা কাটতে না কাটতে আবার চতুর্দিকে দুনিয়া আন্ধার হয়ে আসে। রানুদি বাড়ির দক্ষিণে ডোবার পাশে দীঘিলা জমির আইলে নতুন গজিয়ে ওঠা কিছু কচি কচুশাক তুলে আনে। একটা জোঁক রক্ত খাবে বলে কখন যে ঊরুতে কামড়ে ঝুলে আছে, বুঝতে পারেনি সে। রক্ত খেয়ে ঢোলের মতো হয়ে গেছে বেচারা। তবুও রক্ষে, মনুষ্যরূপী জোকগুলো এর চেয়ে আরো ভয়ঙ্কর। মাংস ছাড়া মুখ রোচে না। যাক আজ এরচে বেশি কিছু জোগাড় করতে পারেনি। এটুকুতেই মা ছেলের ঢের কেটে যাবে। ছেলে বাবার বাড়ি থেকে শাকলতা যা কিছু আনুক, সেটা দিয়ে কাল থেকে নিশ্চয় চালিয়ে নেয়া যাবে। পাটোয়ারি পুত্র রুস্তম এরকম একটি মোক্ষম সময়ের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষায় ছিল। ফাঁকা বাড়ি। সুনসান নিস্তব্ধতা। রান্নাচড়ানো শেষে দুপুরের নাগাদ রানুদি পুকুরঘাটে গিয়ে গা গতর ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে, স্নান সারে। তারপর মোড়া পেতে উঠোনে গোল হয়ে বসে হাতে পায়ে হাল্কা সর্ষে তেল মাখে। এই সময়ে সে প্রায়শ উদাস থাকে। আশরাফ গঞ্জ থেকে শীতের দুপুরের পড়িমরি করে এসে, দ্রুত গা গোসল সেরে ভাত খেতে বসতো। উঠোনের মাঝে কাঠের পিড়িতে বসে। রানুদি পাশে বসে নববধূর ঘোমটা টেনে স্বামীকে তৃপ্তিপুরে খাওয়াত। প্রথম প্রথম ঘোমটা দিলেও বেশিদিন সেটা স্থায়ী হয়নি। পর্দা কার সাথে করবে। আশরাফের তিনকূলে কেউ নেই। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান সে। দু’জনেই গত হয়েছেন বেশ কয়েক বছর হলো। তাই বলতে গেলে পুরো বাড়িটি একপ্রকার ফাঁকা, রাজ্যের নীরবতা। একটা পাতা পড়লেও স্পষ্ট শব্দ হয়। রুস্তম গুটি গুটি বিড়াল পায়ে পেছন থেকে এসে রানুদিকে জাপটে ধরে। দ্রুত একখান গামছা দিয়ে হাত, মুখ ও চোখ বেঁধে ফেলার জোর জবরদস্তি চালায়। রিক্তহস্তে বাবুল বিকেলের আগেই বাড়ি ফিরে আসে। দেখতে মনমরা ও বিধ্বস্ত লাগছে। নিশ্চিত পেটে দানাপানি কিচ্ছুটি পড়েনি। মায়ের তিনবিঘা জমিতে ফসলের চিহ্নও অবশিষ্ট নেই। মামারা জোর করে দখল করে নিয়েছে যে যার মত। রাগে, ক্ষোভে ও ঘৃণায় বাবুল আর একমুহূর্তও দেরি করেনি। বাড়ির পথে সাইকেল ঘুরায়। সাইকেলটা কোনোরকম খিড়কি'র পথে রেখে শুকনো মুখে উঠোনে আসতেই অদূরে গোঙানি ও ধস্তাধস্তির আওয়াজ শুনতে পায়। রানুদি জোরে চিৎকার করতে গিয়ে দেখল গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না কোন। মুহূর্তে মাথায় খুন চেপে যায় বাবুলের। দৌড়ে বটিটা তুলে নেয় হাতে, ক্রুর মূর্তি ধারণ করে রুস্তমকে পেছন থেকে এলোপাথাড়ি কোপাতে থাকে। মাথা থেকে লাল সবুজের পতাকাটা খুলে চোখ বুজে মাকে জড়িয়ে নেয়। শীতের আকাশে আকাশে ছড়িয়ে পড়ে পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘের ভেলা। বাবুল সীমাহীন অপমানে, রাগে, ক্ষোভে ও বঞ্চনার গ্লানিতে মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। ছেলেকে গভীর মমতায় জড়িয়ে কাঁদতে থাকে মাও। চতুর্দিকে মাইকে বেজে ওঠা বিজয়ের সঙ্গীতে চাপা পড়ে ম্লান হয়ে যায় মা-ছেলের গভীর আর্তস্বর। যুগল মানুষের অবিশ্রান্ত অশ্রু ধারা বর্ষণের মধ্য দিয়ে মুহূর্তে বর্ষা নেমে আসে বাংলার এক টুকরো শ্যামল মাটিতে।
