জন্ম : ১ জানুয়ারি ১৯০৩, মৃত্যু : ১৩ মার্চ ১৯৭৬
পল্লীকবির বাবা মৌলভী আনসার উদ্দিন মোল্লা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। আনসার উদ্দিনের এক চাচার নাম দানু মোল্লা। দানু মোল্লা ছিলেন অন্ধ। জসীমউদ্দীনের এই দাদা ছিলেন বেজায় রসিক মানুষ। তিনি ছন্দ মিলিয়ে কথা বলতেন। সুললিত কণ্ঠে গান করে তিনি মানুষ মাতিয়ে রাখতেন। ছিলেন পুঁথি আর কেচ্ছা-কাহিনীর জীবন্ত এক ভাণ্ডার। এই অন্ধ মানুষটির কাছে বালক জসীমউদ্দীন ছিলেন অতি আদরের। দাদার মুখে তিনি শুনতেন গান, গল্প আর লোককাহিনী। এভাবেই ছোটবেলাতেই জসীমউদ্দীন গ্রামীণ ধারায় প্রভাবিত হন। তাই তো আমাদের জসীমউদ্দীন তার সাহিত্যকর্মে মাটি ও মানুষের এত গভীর জীবনবোধ তুলে ধরেছেন।
জসীমউদ্দীনের জন্ম ১৯০৩ সালে ফরিদপুর সদর উপজেলার তাম্বুলখানা গ্রামের মামাবাড়িতে। তার মামাবাড়ির কোনো উত্তরাধিকারী বেঁচে না থাকলেও তাম্বুলখানায় কবির নামে একটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নিজ বাড়ি অম্বিকাপুরে তার বাবার নামে রয়েছে একটি স্কুল। জসীমউদ্দীনের বাবা স্কুলশিক্ষক হওয়ার ছেলেবেলায়ই তিনি পড়াশোনায় মনোযোগী হন। প্রথমে তার বাবার হিতৈষী স্কুল এবং জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাস করে রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৫ সালে কল্লোল পত্রিকায় তার বিখ্যাত ‘কবর’ কবিতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে সাহিত্যাঙ্গনে যেন আরেক ধুমকেতুর আবির্ভাব ঘটে।
কবিতার কাহিনী উপাখ্যানের অনন্য জনক। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও গ্রামে বেড়ে উঠা জসীমউদ্দীন গ্রামীণ জীবনের রূপকে কবিতায় তুলে এনেছেন। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম একজন শ্রেষ্ঠ কবি। আমাদের ‘পল্লীকবি’ খ্যাত জসীমউদ্দীন। তবে তিনি কি শুধু পল্লী বা গ্রামের কথা লিখেছেন?
উত্তরটা হলোÑ তিনি জীবনের আদি-অন্ত নিয়েই সাহিত্য সাধনা করেছেন। নজরুল, ফররুখ ও জসীমউদ্দীন সবাই নিজেদের স্বাতন্ত্র্যে পরিস্ফুটিত। নজরুল আগেই আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন সৃষ্টিশীলতার বৈশিষ্টে বিদ্রোহী সত্তা বা জাতীয় সত্তার জাগরণকে উপজীব্য করেছিলেন বলে। সেখানে ফররুখ, নজরুলের মিল আছে। তবে জসীমউদ্দীন জীবনানন্দের মতো নিবিড় কল্পনালোকে না গিয়ে গ্রামীণ জীবনেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন। তাই তার কবিসত্তা এখানেই নতুন ধারাভাব জন্ম দিয়েছে।
বয়সে জসীমউদ্দীনের চেয়ে নজরুল মাত্রই কয়েক বছরের বড়। জীবনানন্দ দাশও নজরুলেরই সমবয়সী। তিনিও জসীমউদ্দীনের চেয়ে বয়সে অল্প প্রবীণ। উভয়েই রবীন্দ্রনাথের পরের কবি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের পরের কিছু কবি সচেতনভাবে নিজেদের রবীন্দ্রনাথের চেয়ে আলাদা বলে চিহ্নিত করতে চেয়েছিলেন। তাঁরা নিজেদের আলাদাভাবে ‘আধুনিক’ বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন। তাই জসীমউদ্দীনকে শুধুই পল্লীর কবি বলাকে অনেকেই সঠিক মনে করেন না।
সাহিত্যভাণ্ডারে জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা, ভ্রমণকাহিনী আর গল্প ও উপন্যাসকে আল মাহমুদ দেখেছেন সচেতনভাবে। কবিতার বাইরে জসীমউদ্দীন যে বড় একজন গদ্যশিল্পী ছিলেন, সেটা আল মাহমুদ অনেক লেখায়ই উল্লেখ করেছেন। তার সাবলিল শব্দচয়ন আর অনুপম শিল্পভাবনায় যে স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বিকশিত হয়েছে তা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করছে।
জসীমউদ্দীনের কবিতা এককথায়
আধুনিক মন, মনন ও একটি সামাজিক দর্শন। তার কবিতায় লোকজ সংস্কৃতির প্রভাবযুক্ত হলেও তিনি রূপাই, আসমানী ও পূর্ণিমার মতো অমর চরিত্রের জনক। সাহিত্যের বিষয়বস্তু যাই হোক না কেন, শিল্পের প্রকাশ শৈলীর ধরন ও ভঙ্গি অনুযায়ী তার চরিত্র নির্ধারণ হয়। তবু আসমানী ও রূপাইয়ের মতো জীবন্ত চরিত্রের সফল এই স্রষ্টা অন্য কবিদের থেকে আলাদা।
হয়তো এ জন্যই মানুষ জসীমউদ্দীনকে এতটা ধারণ করেছে। তার সময়ে অনেকে এই ধারণা করতেন যে, সমকালীন ঘটনা নিয়ে কাব্যচর্চা করে তিনি হয়তো কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাবেন।
একদিন এসবের পুনঃপ্রকাশ বা মানুষের মনে স্থান পাবে না, কিন্তু সেটা ভুল প্রমাণিত হয় কবরের মতো কালজয়ী কবিতা দিয়ে। বরং এই সময়ের কবিতাবিমুখ জাতি কবিতামুখী করার জন্য আজো জসীমউদ্দীনের কবিতার আবেদন শেষ হয়ে যায়নি। কবির নক্সী কাঁথার মাঠ, সুজন বাদিয়ার ঘাট, এক পয়সার বাঁশি, একের পর এক সংস্করণের পর সংস্করণ প্রকাশিত হচ্ছে। অতএব কবির কবিতা নির্মাণকল্পে এমন কিছু আছে যা বাঙালি জীবনের সমকালীনতাকে ধারণ করে।
জসীমউদ্দীনের লেখা ও সংগ্রহের ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি ও পল্লী গান এখনো শ্রোতার হৃদয় শীতল করছে। তার রাখালীয়া সুর ও পল্লীবালার কণ্ঠ যেন আজো মুগ্ধতার অবগাহন। পল্লীগীতি আর লোকসাহিত্যের প্রধান সঞ্চালক নদী। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের সংগৃহীত ও লেখা গান আজো তার প্রমাণ বহন করে। রঙিলা নায়ের মাঝি, পদ্মা পাড় গ্রন্থ দুটি বিখ্যাত গানের সঙ্কলন। তাঁর লেখা গান ও কবিতায় নদীভাঙন, আজন্ম নদীতে ভেসে বেড়ানো বেদে সম্প্রদায়ের জীবনকথার সরব উপস্থিতি। কালজয়ী সঙ্গীতশিল্পী আব্বাস উদ্দিনের কণ্ঠে ১৯৪৩ সালে রেকর্ড হয় ‘কূল নাই কিনার নাই’ গানটি। আব্বাস উদ্দীন গেয়েছেন ‘গহীন গাঙের নাইয়া,আরে ও রঙিলা নায়ের মাঝি’।
কবিতায় দেশ, কাল, সমাজ, মানুষ ও জীবনচিত্র চিত্রিত করেছেন তা শুধু কেবল সুন্দরই নয়, বলতে হয় কবি জসীমউদ্দীনের কবিতা সংহত, পরিপাটি ও অনুপম শিল্প আকার লাভ করেছে।
আধুনিক বাংলা কবিতার ভূমিতে গ্রামীণ জীবনধারা ও পল্লী প্রকৃতির একনিষ্ঠ রূপকার জসীমউদ্দীনকে চিনতে হলে তার কাব্যপ্রতিভার স্বাতন্ত্র্যমাত্রাকে অনুধাবন করতে হবে। কবিতার ভাষা, উপমা ও শিল্পকর্মে নতুন ধারা সংযোজনের মধ্য দিয়ে কবিসত্তায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। আর এর মধ্য দিয়ে যুগে যুগে জন্ম হয় কবিপ্রতিভার। নিজস্ব কাব্যপ্রতিভায় জসীমউদ্দীন তেমনি এক ‘পল্লীধারা’ বিপ্লবের সফল স্রষ্টা।
