ছোটবেলায় স্কুলের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেলে শীতকালে খেজুর রসের শিরনি আর পিঠার সাথে রাতে জিন-ভূতের প্রচুর গল্প শুনেছিলাম। গ্রামের কিছু দূরে বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তরে বিশাল বটগাছের ঝুপড়িতে তাকিয়ে থেকে ভাবতাম, ওই যে ঝুপড়ির অন্ধকার ওখানেই থাকে ভূত আর তার ছানারা। ভাবতেই ভয়ে গায়ের রোমকূপগুলো শিরদাঁড়া হতেই চোখ ফিরিয়ে নিতাম। পাঠ্যবইয়ের গল্প পড়ে বন্ধুরা যখন গল্প বলত তখন মজা করে শুনলেও কয়েক পাতার গল্প পড়ার মতো ধৈর্য তখনো তৈরি হয়নি। বরং কবিতা পড়ে কবিতার মায়ায় জমে যেতাম। যেমনÑ ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।’ পড়তে পড়তেই সুদূর গ্রামের দাদা বাড়ির ডাকাতিয়া নদী আর তার চার পাশের হাঁটু পানিতে নেমে পড়া, পড়ার টেবিলকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যেত নদীতীরে। তীরের গ্রামে হারিয়ে যেত শিশুমন তখন। সুর করে প্রথম পড়া ‘ভোর হলো দোর খোলো খুকুমনি ওঠরে’ বলতে বলতে খালাতো বোনদের ঘুম ভাঙাতাম। ভোর সকালে ছোট ছোট সব ভাইবোন মিলে নানার বিশাল চাদরের ভেতর থেকে পাখির ছানাদের মতো ওম পোহানো মুখ বের করে জানালার পাশে বসে সকালের প্রথম রোদের উঠানের দিকে তাকিয়ে একসাথে পড়তাম ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি। তারপর একসময় কুরআন শরিফ, সাহাবিদের জীবনী, পড়ে যখন কৈশোরে পা রেখেছি, তখনো পাঠ্যবইয়ের গল্প পড়ি না। প্রশ্ন ও উত্তর পড়ি পরীক্ষা পাসের জন্য। গল্পের বই পড়ার সময় কই। আমাকে ডাকছে ফুটবল খেলা, ক্রিকেট খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, মোরগ লড়াই। কমলাপুর স্টেশনের ট্রেন বগিতে ঘুরে বেড়ানো, যাকে স্টেশনের ভাষায় বলে ট্রেন শান্টিং। ওয়ার্কশপে পড়ে থাকা নষ্ট ইঞ্জিনের ভাঙা অংশ। অসংখ্য চাকাহীন এলোমেলো পড়ে থাকা বগি, খোলা প্রান্তরে পড়ে থাকা বিচিত্র যন্ত্রাংশ, জনমানবহীন আমাদের ইচ্ছেমতো স্বাধীন জায়গার রোমাঞ্চ মনের মধ্য কেমন এক উঁকি ঝুঁকি খেলতো। ছুটে যেতাম। তখনই হাতে পেলাম হাকল বেরি ফিন। সেই রেল বগিতে একজন পড়ে বাকিরা শুনি। এভাবে দল বেঁধে হাকল বেরি ফিনে মগ্ন হয়ে, হয়ে গেলাম উদাসীন। ছোট ভাইয়ের ছোট্ট নতুন মশারি নিয়ে জাল নিয়ে খালে নেমে পড়া, তখন আমাদের বাসাবো সবুজবাগ এলাকায় প্রচুর গাছপালা, ডোবা-নালা ছিল। এরই মধ্যে টেলিভিশনে টারজান চলে এসেছে। ঘন বনে-জঙ্গলে এক মানব সন্তানের কাহিনী টারজান। একগাছ থেকে আরেক গাছ, গাছ থেকে পানিতে ভেলা ভাসিয়ে কী দুরন্ত গতিতে ছুটে চলা, মনে ধরে গেল। বন্ধুরা সবাই তখন কে কত আগে কত বড় টারজান তার প্রতিযোগিতায়। কলাগাছ কেটে ভেলা বানিয়ে খাল দিয়ে দূরে ভেসে চলে যাওয়া। দূরে বিলের পানিতে, কখনো ডোবা সেচে মাছ ধরা। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে কখনো কখনো নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী, নরসিংদীর টিলাগুলোতে ঘুরে আসার অ্যাডভেঞ্চার। তারপর কিভাবে যেন রবিনসন ক্রুসো হাতে এলো। ছাদে একত্রিত হয়ে রবিনসন ক্রুসো পড়েই ব্যস। হাকল বেরি ফিনের সাথে রবিন সন ক্রুসোর মিলিত স্রোত আমাদের করে তুলল সেই অল্প বয়সে দুরন্ত বোহিমিয়ান। রেল স্টেশনের ডকইয়ার্ডের ইঞ্জিন ঘুরানোর নির্জন জায়গার পাশে বিশাল অব্যবহৃত পুকুর, আর তার চার পাশের গড়ে ওঠা তীব্র ঘন জঙ্গল কেটে বাড়ি থেকে নিয়ে আসা ছালা-বস্তার তৈরি তাঁবুই হলো আমাদের নতুন আস্তানা। বাড়ি থেকে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়া। ডকইয়ার্ডের নির্জন পুকুরে মাছ শিকার করে, জঙ্গলে তাঁবু বানিয়ে, ইট দিয়ে চুলা বানিয়ে শুকনো পাতা ডালে আগুন জ্বালিয়ে সেসব মাছ পুড়িয়ে খাওয়া। নিজ নিজ বাড়ি থেকে কেউ মুরগি, কেউ কবুতর, হাঁস, কখনো পাখি ধরে সেখানে পুড়িয়ে খাওয়া। রেলওয়ের গাছ থেকে আম-কাঁঠালের মোচার ভর্তা খেয়ে দেয়ে ক্লান্তিতে তাঁবুর ভেতর থেকে মাথা বের করে শুয়ে বিশাল নীল আকাশ দেখা। তার নিচে শাদা মেঘের দলের পাশ দিয়ে চিলদের চক্কর দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়া। তার পর সেই অ্যাডভেঞ্চার মাথায় নিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা। মায়ের হাতে কড়া ধোলাই খাওয়া, বকা খাওয়ার মাঝেও মন খারাপ না হয়ে মনে রোমাঞ্চ অনুভব করার কারণ ছিল সেসব বইয়ের প্রভাব। তারপর তারুণ্যে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইয়ের গল্প শুনে শুনে তাদের পাঠচক্রের বই জসীমউদ্দীনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ পড়া। দুজন সহজ সরল ছেলেমেয়ের প্রেমের মিলন ঘটল না ধর্মের কারণে। ব্যস, কচি মনে প্রথম বইয়েই ধর্মের প্রতি অনীহা? ভালো লাগল না। এরপর নিকোলাই গোগলের ‘তারাস বুলবা’ কথা। বাবা দেশপ্রেমিক পুত্র শত্রু দেশের মেয়েকে ভালোবেসে ফেলেছে? এখন দেশ নাকি প্রাণপ্রিয় সন্তান? সন্তানের কাছে তার প্রিয়তমা নাকি স্বদেশ? কোনটা জরুরি? এসব প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মধ্য দিয়ে রাশান সাহিত্যের পড়া শুরু। তার পর একে একে ম্যাক্সিম গোর্কির ‘পৃথিবীর পাঠশালায়,’ ‘মা’, নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ‘ইস্পাত’ পড়ে তত দিনে বিপ্লবী। অনেক পরে লিও টলস্টয়ের ‘আনাকারেনিনা,’ ‘রেজারেকশন’। রেজারেকশন পড়ে মনের ভেতর জমে থাকা অনেক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সমাধা ঘটল। বিশাল প্লাটফর্মের এই বইটি সমাজের সক্ষমতা-অক্ষমতা ব্যক্তির প্রায়শ্চিত্ত ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের চিত্র সরল অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে এক অনবদ্য সৃষ্টি হয়ে প্রকাশ পেয়েছে টলস্টয়ের লেখায়। রাশান সাহিত্যের জীবনঘনিষ্ঠ, মানবঘনিষ্ঠ সমাজ-সংসার, সংগ্রাম বিমোহিত করে তুলল। তত দিনে অবশ্য আমেরিকান সাহিত্যও অনেকটা গলধঃকরণ করে ফেলেছি। ও হ্যানরির অসাধারণ সব ছোটগল্প ‘বিশ বছর আগে ও পরে’ দুই বন্ধু বেকার ভবঘুরে। এরপর দ্য লাস্ট লিফ, জিম অ্যান্ড ডেলার প্রেমসহ অজস্র গল্পের মধ্য দিয়ে ও হ্যানরি মন জয় করে নিলো। ইউরোপের সাহিত্যের ন্যুট হামসুনের ভ্যাগাবন্ড অবশ্য আমাদের মতো ভ্যাগাবন্ড নয়, তারা প্রচণ্ড কর্মমুখর। কর্ম ও কাম প্রবণতার মধ্য দিয়ে গড়ায় তাদের ব্যক্তিজীবন, আশা-হতাশা। ইউরোপ সাহিত্যের বেশির ভাগ জায়গা করে নিলো নাটক ও কবিতাÑ শার্ল বোদলেয়ার লোরকা, এপেলিনিয়র, গ্রিক ট্র্যাজেডি, শেকসপিয়র, ইবসেন, ব্রেখেটর বানলায় অনুদিত নাটক দেওয়ান গাজী।
মঞ্চনাটক করার কারণে একসময় প্রচুর মঞ্চনাটক পড়তে হয়েছিল। নরওয়ের নাট্যকার ইবসেনের গণশত্রু খুবই ভালো লেগেছিল। অন্ধবিশ্বাস আর বৈজ্ঞানিক যুক্তি ব্যাখ্যার দ্বন্দ্বের কারণে। সুইডিস নাট্যকার স্যামুয়েল ব্যাকেটের ‘ওয়েটিং ফর গডো’ গডোর প্রতীক্ষায় থাকা ভøাদিমির আর এস্ট্রাগনের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে কতটা অর্থহীন আমাদের মানব অস্তিত্ব। আর সেই অস্তিত্বকে ঘিরে থাকা প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির অযথা হাপিত্যেস, এর শিল্প রূপই বলা যায়। এবসার্ড শব্দটার সাথে এই সময়ই পরিচয়। আরেকজন এবসার্ড নাট্যকার ইউজিন আয়োনেস্ক। যার নাটক পড়ে শুধু শুধুই বক বকানিই মনে হবে।
বিশ্বসাহিত্যের অন্যরকম বাঁক দেখাল থিওডোর ড্রাইজার। তার উপন্যাস সিস্টার ক্যারি। ড্রাইজার তার সাহিত্যে আমেরিকান সমাজের নীচুতলা ও উঁচুতলার মানুষের লোভ, জাতে ওঠার চাওয়া-পাওয়ার গল্প যেভাবে প্রকাশ করেছেন তা অতুলনীয়। তার সাহিত্যেই প্রথম দেখলাম নায়ক বলে কেন্দ্রীয় কোনো চরিত্র নেই। যে চরিত্রটার প্রতি মায়া জন্মায় মুহূর্তেই সেই চরিত্রতা হয় ঘৃণিত। অসহায় চরিত্রগুলো আসলে সুযোগের অভাবে অসহায়। আমেরিকান জীবনের আলোটা যে কতটা নোংরা অন্ধকার জীবনের মুখোশ পরা তা ড্রাইজারের সাহিত্যে স্পষ্ট। আরেকজন আমেরিকান সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’ যুদ্ধের উপন্যাস। এরকম যুদ্ধ উপন্যাস প্রথম যখন পড়ি তখন কিছুটা ভালো লাগলেও পরে একঘেয়েমিতে পেয়ে বসেছিল। জার্মান উপন্যাস ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ দিয়ে যুদ্ধের গল্প শুরু করেছিলাম। কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল এটি, এ কারণে যে, একদিন যারা তরুণ। তারুণ্যের উজ্জ্বলতা উচ্ছলতা নিয়ে ঘুরে বেড়াত। ছুটে বেড়াত। স্বপ্নময় রঙ্গীন সরল আনন্দে ভাসত। যুদ্ধের সৈনিক জীবন তাদের তারুণ্য যৌবন, সহজ সরল সব আনন্দ নষ্ট করে দিয়েছিল। ফলে যুদ্ধ থেমে গেলে, শেষ হয়ে গেলেও তারা মনের সেই আনন্দে আর ফিরে যেতে পারেনি নিজেদের ঘরে। যুদ্ধ তাদের জীবনের রূপ-রস-গন্ধ-আনন্দ সব কেড়ে নিয়ে গিয়েছিল। জয়-পরাজয়ের চেয়ে যুদ্ধের নির্মমতা বেশি মনকে নির্মম করেছে।
হেমিংওয়ের ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ পড়ে মন অবস ছিল অনেক দিন। বৃদ্ধ জেলে সান্তিয়াগো বিরাশি দিনেও একটাও মাছ পায়নি। অথচ সবাই জানে, সে এ অঞ্চলের বিখ্যাত জেলে। তার বিশালত্ব ছিল মনোবলে। সে জানত এক দিন সে তার কুফা ঘোচাবে। সবার ঠাট্টা মশকরার জবাব দিতে একদিন খুব ভোরে নেমে পড়ে তার নৌকা নিয়ে বহু দূরের নির্জন সমুদ্রে।
যেখানে সে একা, শুধু কিছু সামুদ্রিক পাখি। একাই ক্ষুধা যন্ত্রণাকে জেদে চেপে ধরে ফেলল বিশাল এক মাছ। এত বড় মাছ যে নৌকায় তোলা গেল না। নৌকায় বেঁধে ভাসিয়ে নিয়ে আসতে হলো। তীরে যখন আনা হলো তখন মাছটা আর নেই, আছে শুধু মাছটার কঙ্কাল। মাছটা ধরতে তাকে যে সংগ্রাম করতে হয়েছে, মাছটা ধরার পর মাছটাকে খেতে আসা হাঙ্গরদের সাথে যে লড়াই করতে হয়েছে তাতে করে তার শরীর ও মনের সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। মাছটা দেখে সবাই অভিভূত হলো এবং একই সাথে আফসোসও করল। এত বড় মাছ ধরা তো দূরের কথা, কেউ কোনো দিন কল্পনাও করেনি। এত বড় মাছ ধরার খ্যাতি তার জীবনে কোনো কাজে আসবে না। কারণ তার খাওয়া-পরা জীবনধারণ এক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করানো, বিশাল আকৃতির কঙ্কালসার মাছটার মতোই। একদিন হঠাৎ মনে হলো অনেক হয়েছেÑ ইউরোপ, আমেরিকা এবার একটু অন্য দিকে মুখ ফেরানো যাক। চলে গেলাম ল্যাটিনে। ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্যে তখন মিলান কুন্ডেরা, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ অনেক বড় নাম। পড়লাম, বিস্মিত হলাম মার্কেজের ছোটগল্পে। আমি শুধু ফোনটি করতে চেয়েছিলাম, গল্পে কিভাবে একটা মেয়ে টেলিফোন করতে টেলিফোন বুথ খুঁজতে গিয়ে একটা পাগলাগারদের বাসে উঠে পড়ে এবং একসময় সুস্থ মেয়েটিকে পাগল বানিয়ে দেয়। তারপর ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’ গল্পে কর্নেল অপেক্ষায় থাকে তার চিঠি আসবে। চিঠিটা তার সৌভাগ্যের প্রতীক। কিন্তু চিঠিটা আসে না। চিঠির অপেক্ষায় থেকে থেকে তারা নিঃশেষ হয়ে গেলে কর্নেলের স্ত্রী কর্নেলকে জিজ্ঞাসা করে, এখন আমরা খাবো কী? কর্নেলের উত্তর, দেয়, গু। ওফ! বর্তমান সময়ের যাঁতাকলে মানুষ কতটা নিষ্ঠুর পরিণতির শিকার, মার্কেজের গল্পে তা অনবদ্যভাবে এসেছে। মার্কেজের আরেক বিস্ময়কর জিনিস ‘শতবর্ষের নির্জনতা’ পড়ার আগেই পড়ে ফেলেছিলাম আফ্রিকার আমোস টুটুওয়ালার তাড়িখোর’ উপন্যাসটি। গল্পের শুরুতেই চমকে উঠলাম। একজন তাড়িখোর যার কিনা সকালে ঘুম থেকে উঠেই কয়েক ঠিল্লা তাড়ি খেতে হয়। আজ তার তাড়ির ঠিল্লা কেন আসেনি? খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা গেল, তালগাছ থেকে যে তাড়ি পেড়ে দেয়, সে একটা তালগাছের নিচে মরে পড়ে আছে। এবার সে চিন্তা করল, তালগাছিকে বাঁচিয়ে আনতে মৃত্যুদূতের কাছে যাবে। শুরু হলো তার যাত্রা। এরপর মৃত্যুদূত, প্রেতাত্মা, অশরীরী সব বিষয় আশয়। আহ! কি যে উদ্ভট আর অসম্ভবকে নিয়ে গল্প বলা সহজ সাবলীল ঢঙ্গে। আফ্রিকার উপকথা লোকগাথা আর জীবন যাত্রার মিথকে একাকার করে তোলার দারুণ এক উপহারই বলা যায়। মঞ্চনাটক করার কারণে একসময় প্রচুর নাটকের বই পড়তে হয়েছিল। নরওয়ের নাট্যকার ইবসেনের গণশত্রু ভালো ছেলে ছিল। অন্ধ বিশ্বাসের সাথে বৈজ্ঞানিক যুক্তি ব্যাখ্যার দ্বন্দ্ব। স্যামুয়েল ব্যাকেটের, ওয়েটিং ফর গডো’তে গডোর প্রতীক্ষায় থাকা ভøাদিমির আর এস্ট্রাগনের মধ্য দিয়ে কতটা অস্তিত্বহীন আর অর্থহীন আমরা আর আমাদের লোভ, হিংসা, প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির এক শিল্পিত রূপই বলা যায়। এবসার্ড শব্দটার সাথে তখনই স্পষ্ট পরিচয়। আরেকজন এবসার্ড নাট্যকার ইউজিন আয়নেস্ক। যার নাটক পড়ে শুধু বকবকানিই মনে হবে এবং বকবকানিগুলোও খুবই অর্থহীন। অন্তঃসারশূন্য সব, এ কথাই তিনি বারবার বলে গেছেন। সময় ক্ষেপণ করে মৃত্যুর দিকেই কেবল ধাবিত জীবন যাপন। জীবনের যা কিছু অর্জন-গর্জন-বর্জন সব আসলে জীবন থেকে পালাতে অথবা সময় ক্ষেপণ করতে। নাটকের মধ্য দিয়েই বাংলা ভাষায় সাহিত্যের দিকে চোখ ফেরানো। বিশ্বসাহিত্যের এক অসাধারণ নাট্যকার মনে হলো সেলিম আল দ্বীনকে। তার শকুন্তলা, মুনতাসির ফ্যান্টাসি, কেরামত মঙ্গল, হাত হদাই, চাকা, কি অনবদ্য সব সৃষ্টি। দুই গাড়োয়ান একটা লাশ আর একটা গরুর গাড়ির গ্রাম্যপথের যাত্রা। গ্রাম্যপথ, পথের দুই ধারের বর্ণনা আর খুঁজে ফেরা, লাশটা কার? গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে চলা গাড়োয়ানরা আর তাদের গরুর গাড়ি। কেউ চেনে না, কেউ জানে না লাশের মালিকানা। শেষমেশ এই লাশটাই অশিক্ষিত মূর্খ গাড়োয়ানদের মায়ায় দাফন হয় এক নদীর পাড়ে। লাশের পরিচয় আসলে গ্রাম নয়, শহর নয়, কোনো মানুষজনের কাছে নয়। তার গন্তব্য আসলে কবর। কেরামত মঙ্গল নাটকে কেরামতের জীবনের তারুণ্য, যৌবন, বার্ধক্যের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ বাংলা, পাক বাংলা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের যে ইতিহাস, গ্রামীণ জীবন, হাট-ঘাট-বন্দর ও জনপদের মানুষের জীবনযাত্রা, জন্ম, ধর্ম, বর্ণ, যাপিত জীবনের চিত্র তিনি এঁকেছেন অসংখ্য চরিত্রের মধ্য দিয়ে এবং প্রত্যেকটি চরিত্র আলাদা আলাদা করে স্পষ্টভাবে তার তুলনা শুধু বাংলা সাহিত্য নয়, বিশ্ব সাহিত্যেও বিরল ঘটনা বলে মনে হয়। সৈয়দ শামসুল হকের নুরল দ্বীনের সারা জীবন নাটকীয় আঙ্গিকে বাংলাদেশের নাটকের নতুন বাঁক তৈরিতে উচ্চারিত। নুরুল মোমিনের জেনেসিস প্রথম বাংলা একক নাটক হিসেবে দারুণ সমাদৃত। বাদল সরকারের হট্টমালার ওপারে, দুই চোর পালিয়ে এক নতুন দেশে চলে গেল। সেখানে গিয়ে নতুন উদ্যমে চুরি শুরু করল আর বারবার ধরা পড়তে লাগল, কিন্তু শাস্তির বদলে অসহায় ভেবে চোরদের প্রতি তাদের মায়া জন্মাল। সেই দেশে সবার খাওয়া পরার সমান অধিকারের উপস্থাপন দারুণভাবে মন কেড়েছিল। নাটকের ভালোলাগা থেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প প্রাগৈতিহাসিক পড়ে উচ্ছ্বসিত হওয়া। ডাকাত ভিক্ষুর জীবনে ধরা খাওয়া, মার খাওয়া পালিয়ে যাওয়া, উপকার করতে আসা বন্ধুর পতœীর দিকে জৈবিক তাড়নাড় হাত বাড়িয়ে তাড়া খাওয়া, ভিক্ষা করা, ভিক্ষুকের সাথে ঠকবাজি। বেঁচে থাকা, বাঁচার আনন্দে জৈবিক তাড়নার প্রাগৈতিহাসিক রূপই বলা যায়। তারপর পদ্মা নদীর মাঝিতে জেলেজীবনের চাওয়া-পাওয়ার সামান্যতাও কত মায়াময়। মৃত্যুতে শোক মাতম নেই আবার জন্মে আনন্দও নেই। প্রকৃতি মানে নদী, নদী তীরের মানুষের সংগ্রাম, মাছধরা, তারপর কামময় প্রেম। তাদের যৌবনা নারীরা চোখে মুখে দেহে কামভাব জাগিয়ে রাখে ইশারায় ইশারায়। সে ইশারায়। সে ইশারায় জেলেপল্লির পৌরুষ জেগে ওঠে। নিম্ন বর্ণের মানুষের জীবনের গল্প দারুণভাবে মনে দাগ কেটেছে। ভালো লাগল ইমদাদুল হক মিলনের নদী পাড় ও চরকেন্দ্রিক মানুষদের নিয়ে লেখাÑ নদী উপাখ্যান ও জার্মান প্রবাসী এক যুবকের সূদুর জার্মানে একটু ভাত খাওয়ার জন্য যে হাহাকারের মধ্য দিয়ে যে দেশপ্রেম তুলে ধরেছেন, তা সত্যিই অতুলনীয়। বিভূতিভূষণের আরণ্যকে প্রকৃতির সাথে মানুষের প্রেম, প্রকৃতিনির্ভর দরিদ্র মানুষের নির্ভার জীবন। প্রকৃতির অনবদ্য বর্ণনার সাথে একাকার মানুষের সহজ সরল জীবনের সৌন্দর্য অনবদ্যভাবে তুলে ধরেছেন। তার কাহিনীর সৌন্দর্য বোধ হয় এখানেই যে, তার সাহিত্য মানবমনের জটিলতা-কুটিলতাহীন মানবজীবন। তার চরিত্রের অসহায়ত্ব মূলত ক্ষুধায়, ঝড়-ঝঞ্ঝায়, আবার এই ক্ষুধার জন্য দায়ী যে প্রকৃতি সেই প্রকৃতিই আবার তাদের ক্ষুধা মেটায়, শীতে, সূর্যালোকে রোদে জ্যোৎস্নায় তৃষ্ণা মেটায়। আরণ্যকের পর ‘চাঁদের পাহাড়’ পড়তে পড়তে সেই রিখটারস ভেল্ট পর্বতমালা, সেই পর্তুগিজ বৃদ্ধ আর বাংলার সেই যুবকের বন্ধুত্ব তারপর স্বর্ণ খোঁজার অ্যাডভেঞ্চারে মোম্বাসা কেনিয়ার দুর্গম বন-জঙ্গল-পর্বত, বুনিপ নামের ভয়ঙ্কর জন্তুর আখড়া, পাহাড়ি নদী, কালহারি মরুভূমিতে পৌঁছে গেলাম। আহা! এমন লোমহর্ষক অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীর আর তার অসাধারণ উপস্থাপন পড়লে শুধু অ্যাডভেঞ্চার নয়, আফ্রিকা না দেখেও আফ্রিকার সেসব অঞ্চল ভ্রমণের সাধ মেটানো যায়। যেমন সাধ মিটিয়েছিলাম সুনীলের সেই সময়ে না থেকে সেই সময়ের সময় বাংলা ও বাংলার বিখ্যাত সব চরিত্রগুলোকে পড়ে চেখে দেখে। সহজ সরলভাবে চরিত্র চিত্রণ ও মানুষদের গল্প বলার ক্ষেত্রে অসাধারণত্ব দেখেছি হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যে। জীবনের নেগেটিভ দিকগুলোকে প্রাত্যহিক ঘটনাবলির মধ্য দিয়ে দারুণ বিশ্বাসযোগ্যভাবে পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গিতে নিয়ে যাওয়ার এক দারুণ শিল্পী হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন সাহিত্যের সাথে প্রথম পরিচয় হুমায়ূন আহমেদের অন্যদিন পড়ে। অন্যদিন অন্যরকম আনন্দ দিয়েছিল। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মিলনস্থল এক মেসবাড়ি। সত্তর দশকের ঢাকার এক মেসবাড়ির জীবন সংগ্রামী মানুষগুলোর প্রতি যে মায়া হুমায়ূন সাহিত্যে জেগেছিল। তা খুব কম সাহিত্যই দিয়েছে। জীবনের প্রতি মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, একাত্মতা, মিলেমিশে একাগ্র হয়ে যাওয়া ঘটনাগুলোকে চরিত্রগুলোকে খুব কাছের মনে হয়। আজো চারপাশে এসব চরিত্রদের ঘোরাফেরা দেখি। খারাপ মানুষটিকেও এখন আর খুব খারাপ মনে হয় না, হুমায়ূন সাহিত্যের কারণেই। বাংলা সাহিত্যে অসাধারণ কিছু ছোট গল্পের সাথে পরিচিত হলাম। তার একটি শাহেদ আলীর জিবরাইলের ডানা। শহিদুল জহিরের চতুর্থ মাত্রা এবং শাহাদুজ্জামানের গল্পগুলো বিষয় বৈচিত্র্য ও আঙ্গিকের নতুনত্বের অন্যরকম লেগেছে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাই এ অন্যরকম স্বাদ তৈরি হতে হতে সেই ত্রিশের দশকের পশ্চিমবঙ্গের আধুনিক বাংলা সাহিত্যিকদের মতো জোরাজুরি করে উপস্থাপনের কারণে মনে হয় পড়তে গিয়ে খেই হারিয়েছি। আল মাহমুদের জলবেশ্যা ও পানকৌড়ির রক্ত গল্পের ডিটেইলে গদ্যছন্দের ব্যবহার ও প্রকাশভঙ্গির কারণে বেশি টেনেছে। জলবেশ্যা গল্পে নদীতীরের গঞ্জে আসা বণিকদের নৌকার জীবন ও মালামাল বেচা কেনার দালাল, ফঁড়িয়াদের জীবন জীবিকার সাথে বণিকদের আকৃষ্ট করার জন্য গঞ্জে ভেসে আসা বেদেনীদের রাতযাপন ছলনা শঠতার যে ডিটেইলের ব্যবহার এক কথায় তা অনবদ্ধ। পানকৌড়ির রক্ত গল্পে পাখি শিকারের সাথে পাখির রক্তাক্ত দেহের সাথে সদ্য বিবাহিত বউয়ের দৈহিক মিলনের এক শৈল্পিক উপস্থাপনার কারণে অতুলনীয় হয়ে উঠেছে। যার দ্বারা দেহমনকে অনাচার তৈরি করে না বরং দেহমন প্রেমময় হয়, সুগন্ধ ছড়ায়। প্রবন্ধ নিবন্ধ পড়তে গিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সরদার ফজলুল করীম, সৈয়দ আলী আহসানের লেখা খুবই ভালো লেগেছে। মাসরুর আরেফিনের লেখা প্রবন্ধ পড়ে পিটার হ্যান্ডকের লেখাপড়ার আগ্রহ জন্মেছে। ভ্রমণকাহিনীও পড়ি ব্যাপক। মন টেনেছে সৈয়দ আবুল মকসুদের লেখা ভ্রমণকাহিনী। অন্নদা শঙ্কর রায়ের পথে প্রবাসের প্রতি পরতে পরতে ইঙ্গ ফ্রেঞ্চ জীবন যাত্রার গুণকীর্তন আর এ দেশের জীবনযাত্রা সন্তান আর পুরনো হিসেবে উপস্থাপনটাকে মনে করিয়ে দেয় সাহিত্য ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের কথা, যদিও খুব চৌকস লেখা। ছোটবেলা থেকেই কবিতার প্রতি টানে সবসময় কবিতাকে হাটে-ঘাটে-মাঠে উচ্চারণ করে গেছি। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, দাউদ হায়দার, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, বুদ্ধদেব বসু, সুবাস মুখোপাধ্যায়, নাজিম হিকমত, মাহমুদ দারবিশ, আল্লামা ইকবাল, রবার্ট ফ্রস্ট, পাবলো নেরুদা, নজরুল, রবীন্দ্র, জীবনানন্দ প্রমুখ। শামসুর রাহমানের কবিতায় আমাদের নগর বিশেষ করে ঢাকা, আমাদের নাগরিক জীবন, জীবনের আশা আকাক্সক্ষা, দুঃখ আনন্দ, দ্রোহ দারুণভাবে উঠে এসেছে। কবিতার বাক্য গঠনের পরতে পরতে চিত্রকল্প তৈরিতে অনবদ্য। যেমনÑ ‘স্বাধীনতা তুমি কবি নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো।’ এরকম অসংখ্য বাক্য, অসংখ্য চিত্রকল্পের কবিতায় অমর হয়ে থাকবেন বাংলা সাহিত্যে। অন্য দিকে, আল মাহমুদের কবিতায় আবহমান বাংলার গ্রাম্যজীবন, জীবনের কোলাহল, বৈচিত্র্যময় পরিবেশ তার কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে। কি রূপকল্প, কি চিত্রকল্প, কি শব্দ চয়নে। গ্রামীণ জনপদের, ফসলের, মাঠের, মাছের, গাছের, ঘাসের গন্ধ যেন লেগে আছে তার কবিতায়। পড়তে পড়তে সেই সুবাস নাকে চোখে লেগে থাকে। কানে অনুভূতিতে মস্তিষ্কে আরামের পরশ বুলিয়ে দেয়। নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ নিয়ে সবাই সবসময় বলে, তাই আমি এ ব্যাপারে নীরবতাই অবলম্বন করলাম। শুধু বলি বাংলা ভাষার এই পাঁচ কবিকে নিয়ে বিশ্বের দরবারে ভাবার অনেক বিষয় আশয় ছিল এবং আছেও। জাপানি সাহিত্য যৎসামান্য যা পড়েছি তাতে অসহায়ত্ব কাজ করেছে মনে। কাজের বাইরে তাদের যে জীবন জেনেছি তা খবই নগণ্য।
রোড টু মক্কা পড়ে মধ্যপ্রাচ্য তথা আরব বিশ্বের প্রতি আগ্রহ বেড়ে গেছে। মরুভূমির মতো খটখটে জীবনযাত্রা, তাদের আধ্যাত্মিকতা, দুঃসাহসী মনোবল, দারুণ আকৃষ্ট করেছে। কাহলিল জিবরানের দ্য প্রফেট মুহাম্মদ, আসাদের রোড টু মক্কা পড়ে অভিভূত আমি। সাংবাদিক হিসেবে খবর সংগ্রহের উদ্দেশ্যে জার্মান থেকে আরব বিশ্বে পাড়ি জমানো। সেই আরব যে আরবে তখন ইবনে সউদের বাবা পরাজিত। তরুণ ইবনে সউদ লড়াইরত। অতঃপর জয়ী এবং সৌদি আরব প্রতিষ্ঠা ও ইবনে সৌদের রাজত্বকাল। সেই সময়ের আরব জাতি, তাদের অসংখ্য দল, উপদল, কাবিলা, বেদুইন জীবন প্রণালী। মাইলের পর মাইল তপ্ত মরুর বালুতে হাঁটা আবার কখনো উটকে সাওয়ারী বানিয়ে বছরের পর বছর আরবকে দেখে আরব ভূখণ্ডের মানুষকে দেখে তাদের জীবনের আশাবাদ দেখে এতটাই অভিভূত হলেন যে, ইহুদি থেকে মুসলমান হয়ে গেলেন। নাম হলো মুহাম্মদ আসাদ, আর তার এই আরব ভূমির অভিজ্ঞতার নামই রোড টু মক্কা। তাই তার রোড টু মক্কার পরতে পরতে দেখা যায় মরুভূমির মতোই কড়কড়ে কঠোর জীবন সেখানকার মানুষের। অথচ তারা দারুণ আশাবাদী। দারিদ্র্যে আশাবাদী, ক্ষুধা তেষ্টায় আশাবাদী, কষ্ট-দুঃখে আশাবাদী, জীবনে আশাবাদী, মৃত্যুতেও আশাবাদী। এই আশাবাদিতায় তারা দুঃখ করে, আনন্দ করে, হাসে-কাঁদে, কিন্তু হারে না। তাই তারা প্রচণ্ড সংগ্রামী। তাদের অন্তরের আধ্যাত্মবাদ আর বিশ্বাসের তীব্রতাই তাদের জীবনে-মনে-মননে হতাশার কোনো স্থান তৈরি হতে দেয়নি। এ শুধু বিস্ময় নয়, অবাক বিস্ময়। আমাকে আরো অভিভূত করেছে যখন পড়েছি হাফিজ, ওমর খৈয়াম, জালালুদ্দিন রুমী, ইমাম গাজ্জালিদের বই। তাদের অসংখ্য লেখা পড়ার আগ্রহে বিভিন্ন অনুবাদ ঘেঁটে অবাক হয়ে দেখেছি, বিশ্বের বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানীরা যখন মানুষের মনের হতাশা দূর করতে মানুষকে উজ্জীবিত করতে নিত্যনতুন আবিষ্কার ও ফর্মুলায় নিজেদেরকে বছর বছর ধরে সাধনায় লিপ্ত রেখেছেন, সেখানে আরব বিশ্বের সাহিত্যে ও তাদের লেখায় জেগে উঠেছে একের পর এক জীবনের জয়গান। কখনো তাদের জীবন শান্ত, নির্জন, নিরিবিলি। আবার প্রয়োজনে আরবি ঘোড়ার মতো প্রচণ্ড গতিশীল বেগবান বেদ্ইুন, তেজস্বী বীরযোদ্ধা। মনের অনেক জটিল সমাধান ঘটেছে এই সব আরবি সাহিত্য পড়ে। জীবনে চলার পথে বই আনন্দ দিয়েছে, হাসিয়েছে কাঁদিয়েছে, অভিভূত করেছে, উন্মত্ত করেছে, অস্থির করেছে। বলতে দ্বিধা নেই, আরবি সাহিত্যে এসে শুধু যাপিত জীবন নয়, জীবনের শেষ যাত্রা মৃত্যুতেও আশাবাদী করে তুলেছে। মৃত্যু মানে শেষ নয়, আরেকটা শুরু। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আরেকটা পথের যে শুরু তা জয় করার উচ্ছ্বাসেও জীবনে সেইরকম একটা বইকেই সঙ্গী করা জরুরি অনুভব করছি। যার ভেতরে আছে জীবনের আদি-অন্ত সব কিছুর সুস্পষ্ট সমাধান। হ