রোজিনা বেগম প্রতিদিন সূর্যোদয়ের সময় খড়খড়ে গলায় বলবে, প্রতিদিন ডালভাত খেয়ে মরার উপক্রম। তুমি তো মানুষ না। ফরিদ সাহেব যত বোঝাবেন, ‘এখন সময় খারাপ। বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না।’ রোজিনা বেগম ততই তেতে উঠবে। ফরিদ সাহেব জবাব না দিয়ে চুপ করে থাকেন। এদিকে অফিস বন্ধ। বেতন বন্ধ। দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতি। সঙ্কট। এর ভেতর চাল শেষ। ফরিদ সাহেব বাজারে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়েন। রাস্তায় মানুষ নেই বললেই চলে। প্রাণোচ্ছল শহরের বড় ফাঁকা রাস্তা অনেকটা বজ্রপাতে মৃত শুকিয়ে যাওয়া গাছের মতো মনে হয়। দেখা যায় না এমন এক ভাইরাস কোটি কোটি মানুষকে ঘরবন্দী করে ফেলেছে। বিচ্ছিন্ন পৃথিবী। মানুষের চোখে মুখে অদ্ভুত এক আতঙ্ক। ফরিদ সাহেব বাজারের দিকে হেঁটে চলেন। সাবের তার খুব পরিচিত দোকানদার। তিনি সাবের স্টোরের দীর্ঘ দিনের নগদ বাকির কাস্টমার। দোকানের সামনে গিয়ে বলেন, এক বস্তা চাল দাও তো ভাই।
সাবের দীর্ঘ বছর ধরে যে প্রশ্ন করেনি সেটা করল, নগদ না বাকি?
-বাকি। বেতন পেলেই দিয়ে দেবো।
-বাকি হবে না ভাই। নগদ কাস্টমার ঠেকাতে পারছি না...
ফরিদ সাহেব সাবেরের এমন কথার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। লজ্জা আর ব্যথা মিলেমিশে দাপিয়ে বেড়ায় মোটা চামড়ার আবরণের ভেতর। কোথায়! ফরিদ সাহেব লাল মুখে বলেন, আচ্ছা। বিপদের দিন টাকা ধার পাওয়া মুশকিল। মাসুম সাহেব দূর সম্পর্কের আত্মীয়। ধনী মানুষ। তার কাছে যাওয়া যেতে পারে। সে পথেই এগোতে থাকেন। নবাবপুর গোরস্থানের পাশের রাস্তা ধরে যাওয়ার সময় একটা গাড়ি আর ছয় সাতজনের একটা দল দেখে থমকে দাঁড়ান। নভোচারী, ডুবুরি, রোবটের মতো মানুষগুলো একটা কফিনবন্দী লাশ নিয়ে কবরস্থানের দিকে যায়। কৌতূহল নিয়ে ফরিদ সাহেব ও তাদের পিছু নিতে একজন মোটামুটি দূরত্ব বজায় রেখে বলেন, এই আপনি কে?
-আমি ফরিদ। শেখ ফরিদ উদ্দিন। আপনাদের তো চেনার উপায় নাই। চাঁদের দেশের মানুষ মনে হচ্ছে।
লোকটার গলায় কটাক্ষ না অসহায়ত্বের সুর বাজে বোঝা যায় না, ‘আমরা! পৃথিবীর বড় বড় ক্ষমতাধর মানুষ পর্যন্ত নভোচারী বনে গেছেন। আপনি কেটে পড়েন।’
ফরিদ সাহেব কেন যেন তাদের পিছু পিছু হেঁটে চলেন, ‘লোকের আত্মীয়স্বজন নাই?’
-আছে।
-তারা শেষ বিদায় জানিয়ে চোখের অশ্র“ ফেলে কাঁদবে না?
-ভয়ে পালিয়েছে।
- বলেন কী!
-হু। মারা যাওয়ার পর পুরো বাড়ি ফাঁকা। যে যেদিকে পেরেছে ভেগেছে। করোনাভাইরাস, বোঝেন না?
ফরিদ সাহেব ঘাড় নাড়েন, ‘হুঁ।’
-এ তো সাধারণ একজন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী আক্রান্ত শুনে তার উপদেষ্টা পেছন দরজা দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেছে। এই আপনার পিপিই নেই। আর একটুও সামনে আসবেন না। ফরিদ সাহেব দাঁড়িয়ে যান। কিছুটা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন। মরে যাওয়া মানুষকে কবরে নামাবে সে সময় একঝাঁক মানুষ ভিড় করে। সবার মুখে মাস্ক। সবাই চিৎকার করে বলছে, এখানে করোনাভাইরাসের রোগী কবর দেয়া যাবে না। নভোচারী টাইপ মানুষগুলো খুব করে বোঝাতে চেষ্টা করেন, এতে কোনো সমস্যা নেই। মরা লাশ দাফনের পরে সেটা ঝুঁকি বা ক্ষতির কারণ হয় না। আপনাদের কোনো ক্ষতি হবে না। এর চেয়ে আপনারা যে ভিড় করে চিল্লাচিল্লি করছেন এতে আপনারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। কেউ রোগাক্রান্ত থাকলে সেটা সবার ভেতর ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তাদের কথা কেউ আমলে নিতে আগ্রহী নয়। জটলা বড় হয়। সেই সাথে মানুষগুলো আরো বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। কোনো অবস্থাতেই তারা এখানে তাকে কবর দিতে দেবে না। দরকার হলে নিজেদের দু’একজন কবর হবে, তবু!
ফরিদ সাহেব বাড়ির পথ ধরেন। মাথার ভেতর বেশ কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। সে যদি মারা যায় তার বউ, ছেলেমেয়ে ভয়ে পালাবে? প্রতিবেশী বন্ধু মানুষগুলো করব দিতে গেলে বাধা দেবে? যদি তারা মারা যায় তাহলে অন্য কেউ? একটা ভাইরাস পৃথিবী ও তার মানুষের অনেক ভেতরে থাকা একটা চেহারা টেনে বের করে প্রকাশ করে যেন বলছেÑ ধোঁকা। মিথ্যা মায়াজালে সাজানো সব। মিথ্যা। ভাবতে ভাবতে মাথাঘুরে পড়ে যান।
ঠিক কতটা সময় পেরিয়ে গেছে কে যানে। তিনি একটা রুমে আবদ্ধ। নভোচারী টাইপ একজন পুরুষ সামনে এসে বলেন, ভয় পাবেন না। আপনাকে সন্দেহজনক হিসেবে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। আপনার জ্বর নেই। হালকা কাশি আছে। আশা করি রিপোর্ট ভালো আসবে। নেগেটিভ হলেই ছেড়ে দেবো।
ফরিদ সাহেব বাড়ির কথা ভাবেন। চাল নেই। ওরা কী খাবে? মনটা অস্থির হয়। ঝটপট উঠে বসেন, আমি বাড়ি যাবো।
-সরি।
-সরি মানে?
-আপনি আপাতত যেতে পারছেন না।
-আমার ঘরে চাল নেই। ছেলেমেয়েরা না খেয়ে থাকবে।
-আপনার বাড়িতে যোগাযোগ করা হয়েছে।
-কী বলেছেন?
-আপনার মোবাইল থেকে নম্বর নিয়ে আপনার স্ত্রীকে বলা হয়েছে আপনি হাসপাতালে।
ফরিদ সাহেব আবেগতাড়িত গলায় বলেন, ওরা এসেছে? কোথায় আছে?
-না, আসেনি। করোনা সন্দেহে ভর্তি জানানোর পর তারা আর কেউ যোগাযোগ করেনি। মোবাইল বন্ধ। আমাদের লোক আপনার বাসায় গিয়ে কাউকে পায়নি। পালিয়েছে। আপনি একটু সাহায্য করবেন। তাদের খুঁজে বের করে কোয়ারেন্টিনে রাখতে হবে।
ফরিদ সাহেবের মাথার ভেতর চক্কর দেয়। বিড়বিড় করে বলেন, ধোঁকা। সব ধোঁকা।