আপনি তো থাকেন আমেরিকায়
বাংলাদেশকে কেমন মিস করছেন?
না, মিস করার যে অর্থ তাতে আমার কোনো আকুতি নেই। আমি নিজেকে লালন করি পরিবেশ প্রতিবেশের মধ্যে। আর সেটাই স্বাভাবিক। নাড়ির সাথে কখনো যোগসূত্র বিচ্ছিন্ন হয় না কোনো মানুষের। বাংলাদেশ আমার সেই নাড়ি। এর সাথে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। আর আমি আমেরিকার জনজীবনের মধ্যে মিশে যাইনি বটে, কিন্তু তার প্রতিবেশ-বিশ্বকে অস্বীকার করব কেমন করে? তার জনস্রোতের স্বভাবকে অস্বীকার করব কেমন করে? তার ঋতুচক্রকে আমি ভোগ করি, উপভোগ করি। অর্থাৎ আমার মানবধর্ম ও মানস সরোবর বাংলাদেশের যাপিত জীবনের শ্বাসটুকু নিয়ে বাঁচে, সাথে আমেরিকান প্রতিবেশের অন্তরেও সে তার শ্বাস ফেলে, শ্বাস নেয়। এই ইন্টারেকটিভ কালচারাল বৈভব আমাকে নানাভাবে সাহায্য করে। আমি নতুনভাবে, নতুন চেতনায় বেড়ে উঠি।
লেখক না হলে কী হতেন?
আমি লেখক হতে চেয়েছি এমনটা মনে পড়ে না। আমি যে সমাজের সদস্য, তাতে চাওয়ার যে চেতনা সেটা গড়ে ওঠেনি আজও। আমি ডাক্তার হতে চাই, ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই, মাস্টার হতে চাই ইত্যাদি। সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রত্যাশার সাথে লেখক হওয়ার কোনো চিন্তা এখনো আমাদের সমাজে নেই। কেন নেই তার কারণ ব্যাখ্যা করতে পারবেন কালচারাল এ্যানথ্রোপলজিস্টরা, আমি তার কিছুই জানি না।
ভাবনাকে মান দেয়ার যে ক্ষমতা লেখকের, তার প্রধান কারিগর অভিজ্ঞতা আর দ্বিতীয় কারিগর পাঠ অভ্যাস। পাঠ বলতে আমরা কেবল পুস্তক পাঠকেই বুঝি। একবারও ভাবি না যে এই বিশ্বপ্রকৃতি পাঠের অন্তর্গত। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণিজীবনের কর্মপ্রবাহ পাঠ আমাদের নিত্যবাস্তবজীবনের অন্তর্গত। এভাবেই একজন লেখকের জীবনদৃষ্টি গড়ে ওঠে। তার চিন্তাজগতের রূপরেখা আমরা টের পাই তার লেখকসত্তার কাজ দিয়ে। আমাকে বুঝতে হলে, আমার কাজগুলোর ভেতর দিয়ে যেতে হবে।
লেখকজীবন ও ব্যক্তিজীবনের পার্থক্য কী?
ব্যক্তিজীবন ও লেখকজীবন একটাই। লেখক তার গল্প-উপন্যাসে, কবিতায় তার জীবনকেই লেখেন বিভিন্ন চরিত্রের ছদ্মাবরণে। আমি তাই বিশ্বাস করি ব্যক্তিজীবন ও লেখকজীবন একটাই। এর মধ্যে কোনো ভাগাভাগি নেই।
বাংলা কবিতা নিয়ে আমেরিকায় বেশ ভালো কাজ হচ্ছে, কিভাবে?
ওই দেশে বাস করার সুবাদে যারা কবিতা বা গল্প-উপন্যাস লিখছেন, তারা যে মহামূল্যবান কিছু লিখেছেন, এমনটা নয়?
আমরা যারা নিউ ইয়র্কে বাস করি, তারা অধিকাংশ সময়ই বাংলাদেশী রেস্তেরাঁতে আড্ডা দিই, খাবার-দাবার খাই। আবার অনেক বাংলাদেশী আমেরিকান রেস্তোরাঁয় খেতে যান, সেখানেই খেতেই মজা পান। দুটোই ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের। আমেরিকান লেখক আর বাংলা লেখকও ভিন্ন চরিত্রের, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির। তাদের লেখার ধরনও ভিন্ন। বাংলাদেশী লেখকদের কারো পক্ষেই আমেরিকান মেইন স্ট্রিমের লেখকসত্তার ভেতরে ঢোকা সম্ভব নয়। হ্যাঁ, চার প্রজন্মের পর তারা আমেরিকান সত্তার অধিকারী হয়ে উঠবে। সে তখন বাংলা ভাষা ও বাংলা কালচারের অন্তর্গত থাকবে না। তখন তারা আর অরুন্ধতী বা ঝুম্পা লাহিড়ীর মতো কিংবা অমিতাভ ঘোষের মতো তার নাড়ির দেশের কাহিনী ফাঁদবে না।
আমেরিকায় বসে বাংলাদেশীরা বাংলায়ই লেখেন এবং বাংলাচেতনারই অনুবাদ করেন, তা তিনি যে ভাষাতেই রচনা করেন না কেন। আমেরিকান চেতনার অনুবাদ করেন না, ছুঁয়েছেনে যেতে পারেন বটে, কিন্তু সমাজের গহনের যে সৃষ্টি-বেদনা, তাকে স্পর্শ করতে পারেন না।
আমরা যেমন বাঙালি-তিরিশি কবিদের হাতে ও চিন্তার আলোকে ইউরোপীয় চেতনার বাংলা অনুবাদ পেয়েছিলাম, ঠিক তেমনি তারা করে থাকতে পারেন। আমি তার বিন্দু-বিসর্গও জানি না। কিন্তু আমি যতটা জানি তারা বাংলাকেই লেখেন।
কবিতায় নিজেকে কেমন অনুভব করেন?
খুব ভালো মনে করি। মনে করি অনেক বড় কবি আমি। এটা সব কবিই নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করেন। সেটাই তার জন্য স্বাভাবিক। আমিও তাই মনে করি। একটা উদাহরণ দিই, তাহলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। আমি বাংলা একাডেমির সাহিত্য পুরস্কার পেলেই প্রায় সবাই মনে করবে তিনি বড় কবি। কিন্তু বহু আবর্জনাও তো ওই পুরস্কার পেয়েছেন। আবার ধরুন, নোবল সাহিত্য পুরস্কার পেলেই তাকে আরেক রবীন্দ্রনাথ বা বিশ্বকবি অভিধায় সিক্ত করব আমরা। আসলে তারা যে বড়, সেটা মাপার মাপযন্ত্রটি কি? এ বছর নোবল পেয়েছেন লুইস গ্লিক (খড়ঁরংব এষঁপশ) আমি তার কিছু কবিতা পাঠ করেছি, একেবারেই সাধারণ মাপের কবি তিনি। আমার সাথে অনেকেই ভিন্নমত হবেন। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ সাম্রাজ্যবাদী চিন্তার প্রতিফলন এমনটাই। ভিন্ন মতই সৌন্দর্য। তারা যাকে, যে কারণে তুলে ধরবে, তারাই বড়, তারাই ভালো বলে মেনে নেবো আমরা। কারণ আমরা ধরেই নিয়েছি ওরা তকমা এঁকে দিলেই আমরা বাহবার স্রোত বইয়ে দেবো। আমাদের সেটাই শেখানো হয়েছে। তাদের কিছু নির্দিষ্ট এজেন্ট আছে দুনিয়াজুড়েই, তারাই এ কাজটা করেন। একে বলা যেতে পারে নোবর মার্কেটিং। এর সাথে বিত্ত, বৈভব আর অর্থের দাপট জড়িত। নোবেল পুরস্কারের মান নির্ণীত হয় তার দেয়া অর্থ দিয়ে। ধরা যাক, নোবেল পুরস্কার অর্থ ছাড়া একটি পুরস্কার হতো, তাহলে এর নাম ও প্রভাব এতটা ব্যাপক হতো না। আরো অনেক পুরস্কার আছে যেগুলোর অর্থমূল্য এতটা নয়। এর সাথে নোবেলের কারিশমাটিক মার্কেটিং তাকে জগতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছে প্রায়।
সমসাময়িক বাংলা কবিতাকে কিভাবে দেখছেন?
ভালো চোখে দেখছি। যদিও চোখের জ্যোতি কমেছে আমার। ‘বিশ্বমানের’। বিশ্বের সব কবিতাই একই রকম। শুধু প্রকাশভঙ্গি ও ভাষা আলাদা।
সমাজের প্রতি একজন কবির কী দায়?
কোনো দায় নেই। কবি রাজনীতিক নন যে সমাজের কাঁধে পা দিয়ে ক্ষমতার শীর্ষে উঠবেন। তবে বাংলাদেশে রাজনৈতিক কবির অগণন সংখ্যাই দেখতে পাচ্ছি। তাদের অনেকেই আমার মতে ভালো কবি, কিন্তু রাজনীতির লেজ ধরে আছেন।
সৃজনশীল রচনা শিল্পসম্মত হওয়ার পূর্বশর্ত কী?
অভিজ্ঞান। পারিপার্শ্বিক প্রতিবেশের অভিজ্ঞতা আর পাঠ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যা জানা ও বোঝা যায়, কবি তাকেই কাজে লাগান। তবে ‘শিল্পসম্মত’ শব্দবন্ধ আমাদের একটি গর্তের মধ্যে ঢেলে দেয়। কিছু লোক, তারা সাহিত্যের ‘নাপিত, কিছু মানদণ্ড নিরূপণ করেছে। আর আমরা তাকেই মান হিসেবে ধরে জ্ঞানী হয়ে উঠেছি। সৃষ্টির কোনো নির্দিষ্ট মান বলে কিছু নেই। আর পূর্বশর্ত মূর্খতারই লক্ষণ। শিল্প রচয়িতা বা সৃষ্টিশীল প্রাণীর প্রধান কর্তব্য হচ্ছে প্রচলকে ভেঙে ফেলা। তবে তা প্রচলকে ভেঙে নতুন কোনো প্রচল সৃজন নয়। আমি মনে করি, শিল্পের কোনো সংজ্ঞা নেই।
আমেরিকার সাম্প্রতিক কবিতার প্রবণতা কী?
রুটি সেঁকে তোলার মতোই মচমচে প্রবণতা। যাতে পাঠকের খেতে (পাঠ করতে) ভালো লাগে। মূল উদ্দেশ্য তো পাঠকের ভালো লাগা। কিছুটা নারীবাজি, কিছুটা পুরুষবাজি, সামান্য নপুংসকতা, লিঙ্গসমতা কায়েমের চেষ্টা এবং জাইরো’র মতো ভাসমান খাবারের স্বাদ তৈরি করে সমাজের অভ্যন্তরের রস তুলে ধরা। কবিতাকে পথচারীদের ভাষার মতো সহজ করে তোলা আর নিরেট বর্ণনা, যেখানে নগরও প্রকৃতি জড়িয়ে থাকে।
এখনো অপূর্ণ যে স্বপ্ন?
স্বপ্ন-কল্পনা তো কবিতার প্রধান সম্পদ। আর সামাজিক চেতনার দিক থেকে বলতে পারি আমি ঘুরতে পছন্দ করি। তা দেশে যেমন তেমনি, বিদেশে। কিন্তু আল্লাহ আমাকে সেই তৌফিক দেননি। অর্থাৎ এ যুগে বিত্ত না থাকলে আল্লাহর এই সৃষ্টি চর্মচক্ষে দেখা হবে না। আর এখন তো অনেক দেরি হয়ে গেছে।
জীবনের ব্যর্থতার কথা বলুন?
সাফল্য ও ব্যর্থতা দু’টিই নেতিবাচক শব্দ। আমি এগুলোকে গ্রহণ করি না।
আপনার কবিতার দর্শন কী?
আমি কবিতায় কোনো দর্শন লিখি না। তবে কবিতার কেন্দ্রে আছে মানুষ, সময় আব বিশ্বপ্রকৃতি।
নিজের সম্পর্কে যে অভিযোগ মিষ্টি মনে হয়?
এই কনোটেশন নিঃসন্দেহে অভিনব। অভিযোগ তো তেতো হবার কথা। অভিযোগের সাথে মিষ্টির সম্পর্ক কেমন যেন লাগে।
কোনো বই পড়ার ইচ্ছা এখনো তাড়িত করে?
করে। সে সব বই তো আমার কাছে আছে। কিন্তু পড়ার সময় কোথায়? নাগরিক জীবনের ঘাই কাউকেই রেহাই দেয় না, আমিও তার শিকার। কিছুই করার নেই।
নিজের লেখা কোন বইটি অধিক প্রিয়?
সব বই-ই প্রিয়। কী করে বলি আমার এই বইটি প্রিয়। পাঠক বলতে পারেন, যদি সত্যই কোনো পাঠক থাকেন, তারাই বলতে পারবেন।
কোন বাণী আপনাকে এখনো উজ্জীবিত রাখে?
আল্লাহ ছাড়া কারো বাণী আমাকে উজ্জীবিত করে না। তবে অনেকের রচনাই আমাকে ইগনাইট করে। ইচ্ছা হয় পড়ি।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : মেজবাহ মুকুল
