লেখক না হলে কী হতেন?
ছোটবেলায় একজন আঁকিয়ে ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা ছিল না তার। তবু খুব বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করতাম তিনি আমাদের ছবি এঁকে দিচ্ছেন। তখন খুব ইচ্ছে হয়েছিল আমিও এরকম একজন আঁকিয়ে কিংবা চিত্রকর হবো। লেখক না হলে হয়তো আমি চিত্রকরই হতাম। কৈশোরে আমার ইচ্ছা হয়েছিল ইবনে বতুতা কিংবা মার্কোপলোর মতো পর্যটক হওয়ার। শেষপর্যন্ত এর কোনোটাই হতে পারিনি।
লেখক ও ব্যক্তিজীবনের পার্থক্য কী?
লেখক মানবীয় অস্তিত্বের বিচিত্রতার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেই তার সৃজন অভীপ্সার মধ্যে মগ্ন থাকেন। আত্মবিশ্লেষণ বা আত্মোপলব্ধির দ্বারা জীবনের চিত্র আঁকার প্রয়াস নেন। অপর দিকে ব্যক্তিমানুষ জৈবনিক জিজীবিষায় ব্যাপ্ত থাকেন কিংবা থাকতে বাধ্য হন। ব্যক্তিজীবন জীবনের নানা অনুষঙ্গের সাথে বিচিত্রভাবে গ্রথিত।
বাংলাদেশকে কেমন মিস করেন?
বাংলাদেশকে তো মিস করিই। প্রতিনিয়ত একটি পাললিক মাটির, নিসর্গের টান চোরাস্রোতের মতো বহমান থাকে। শারীরিক উপস্থিতির অভাব তো প্রতিনিয়ত অনুভূত হয়। তবে হালে ভার্চুয়াল নৈকট্য অনেকখানিই পুষিয়ে দেয় বলে অভাবটা থিতিয়ে আসে। শারীরিক উপস্থিতির অভাব তবু পূরণ হওয়ার নয়।
বাংলা কবিতা নিয়ে আমেরিকায় বেশ ভালো কাজ হচ্ছে কিভাবে?
এখানে বেশ কিছু সাহিত্য সংগঠন আছে, যেগুলো খুব নিয়মিত সাহিত্য অনুষ্ঠান করে থাকে। এগুলোতে লেখাপাঠ ও আলোচনা হয়। কবি শহীদ কাদরী জীবিত থাকাকালীন তার পরিচালনায় ‘একটি কবিতা সন্ধ্যা’ দেশে-বিদেশে প্রভূত সাড়া জাগিয়েছিল। এর মাধ্যমে কবি ও কবিযশোপ্রার্থীরা নিয়মিত একত্রিত হতেন। কবিতা পাঠ হতো, বাংলাদেশের সিনিয়র কবিদের কবিতা আবৃত্তি হতো। শহীদ কাদরীর আলোচনা, পর্যালোচনায় সেটি অনবদ্য হয়ে উঠতো। এখন ‘সাহিত্য একাডেমি, নিউ ইয়র্ক’ এ কাজটি নিয়মিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এখানে বেশ ক’টি বাংলা পত্রিকা বেরোয়। এগুলোর কয়েকটির সাহিত্য পাতাটি ক্রমশ সমৃদ্ধ করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
কবিতায় নিজেকে কেমন অনুভব করেন?
বলতে গেলে কবিতা যাপিত জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কবিতা থেকে বিচ্যুতি এখনো ভাবতে পারি না। দেশ ও বিদেশের কবিতা পাঠ, নিজের কবিতা নির্মাণে নিমগ্ন থাকতে পেরে আনন্দে থাকি, অনেক দুঃখ কিংবা বিষাদ ভুলে যাই।
সমাজের প্রতি একজন কবির কী দায়?
দীর্ঘকাল আগে পেটো এই প্রশ্ন তুলেছিলেন। তার বিচারে দায়িত্ব সমাজের কাছে, সত্যকথনের দায়িত্ব, ন্যায়বোধের দায়িত্ব। বাংলা সাহিত্যের দুই প্রধান পুরুষ বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ এই প্রশ্নে দু’রকমের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন। বঙ্কিম খুব স্পষ্ট করেই জানিয়েছিলেন সমাজের কল্যাণ সাধন সাহিত্যের উদ্দেশ্য; যদি লেখার দ্বারা সমাজের হিত না হয় তা হলে লেখনী ধারণ অকর্তব্য। অপরপক্ষে রবীন্দ্রনাথ এ ক্ষেত্রে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। সমাজের প্রতি তার সুগভীর দায়িত্ববোধ ছিল ; সে দায়িত্ব পালনে তিনি মোটেই পরাক্সমুখ ছিলেন না ; নানাবিধ উদ্যোগের দ্বারা সমাজের উন্নতি সাধনে তিনি তার জীবনের অনেকখানি শক্তি এবং সময় নিয়োজিত করেছিলেন। একটা সময় শ্রেণীসংগ্রামে বিপ্লবের হাতিয়ার হওয়াই সাহিত্যের মুখ্য ভূমিকা এবং দায় বলে সোচ্চার প্রচারণা হয়েছিল। সুতরাং এই দায় অনেকটাই সময় ও কালের প্রেক্ষিতে আপেক্ষিক। তবে সমাজের প্রতি যদি কোনো দায় বা দায়িত্ব থাকে তবে তা সমগ্রভাবে মানবসমাজের কাছে-কোনো শ্রেণী, দল, বিশেষ সমাজ বা রাষ্ট্রের কাছে নয়।
সৃজনশীল রচনা শিল্পসম্মত হওয়ার পূর্বশর্ত কী?
নন্দন-জিজ্ঞাসা ও জীবনঘনিষ্ঠতার সমন্বয় সাধনই শিল্পসম্মত হওয়ার অন্যতম পূর্বশর্ত বলে মনে করি। শুদ্ধ অনুভবের ভেতর অন্তবিক্ষোভকে চূর্ণ করার মধ্য দিয়েই শিল্পরচনা বহুলাংশে নির্ভর করে।
আমেরিকার সাম্প্রতিক কবিতার প্রবণতা কী?
মূলত পঞ্চাশের দশক থেকেই আমেরিকার কবিতা একটি নতুন মোড়ের দিকে যাত্রা করে। প্রচলিত ধারাকে উপেক্ষা করে তারা নতুন ধারা সৃষ্টিতে প্রয়াসী হন। এ্যালেন গিন্সবার্গ, ফিলিপ লারকিন, রবার্ট লাওয়েল, চার্লস ওলসন প্রমুখ কবিরা নতুন ধারার কবিতা লিখে সাড়া জাগান। এই ধারাটি বর্তমান সময়ে এসেও সোচ্চার ভূমিকা রাখছে। আত্মতা, মনোবিকলন, অন্তর্জগতের অনিকেত পরিস্থিতি, বুদ্ধিদীপ্ততা ও সমাজহিতৈষণার এষণা এসে যুক্ত হয়েছে কবিতায়। উত্তর-আধুনিকতার প্রবণতাও কিছু কিছু ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায়।
জীবনের ব্যর্থতার কথা বলুন?
মানুষের জীবনে চাওয়া এবং পাওয়ার তো কোনো শেষ নেই। সেইক্ষেত্রে ব্যর্থতা থাকাটাই স্বাভাবিক, তবে ব্যর্থতার চেয়ে জীবনের সফলতার কথা বলা বরং ভালো। আপেক্ষিকভাবে যদি বলি তবে বলব জীবনের খামতিগুলোর চেয়ে পাওয়ার ভাগটাই তো বেশি।
কবিতা যেমন উন্নত হতে হবে, কবিকেও হতে হবে উন্নত মানুষ, আমাদের কবিরা কি এ কথা ভাবেন?
এর উত্তর অনেকটা দ্ব্যর্থবোধক। হয়তো ভাবেন কিংবা ভাবেন না। একজন কবির কবিতা উন্নত কিংবা মানসম্মত অথচ কবি ব্যক্তিজীবনে স্বেচ্ছাচারী, আবার কবি ব্যক্তিজীবনে উন্নত মানুষ কিন্তু তার সৃষ্টি তেমন উন্নত নয়। আবার একই সাথে তিনি উন্নত মানুষ এবং কবিতায়ও তিনি অসাধারণ এরকমও হতে পারে। এর উদাহরণ বাংলা সাহিত্যে এবং বিশ্বসাহিত্যে ভূরি ভূরি মিলবে। সুতরাং একক কোনো সিদ্ধান্তে আসা সহজ নয়।
আপনার পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের মধ্যে আপনার প্রিয় কে কে?
আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের অনেকেই ভালো লিখছেন। সুযোগ পেলেই তাদের কবিতা আমি পড়ি। এদের মধ্যে কয়েকজন আমাকে প্রায়শই মুগ্ধ করেন। তাদের কবিতায় অধিকতর মনোযোগ দিই। তবে আলাদা করে তাদের নাম না বলাই উত্তম।
সমসাময়িক বাংলা কবিতাকে কিভাবে দেখছেন?
কবিতার বিষয়টি একটি স্বতশ্চল নদীর মতো। পৃথিবীর আদি কবি এনহেদুয়ান্না থেকে শুরু করে আজ অবধি কবিতা নানা বাঁক বদলে বদলে এগিয়েছে। বাংলা কবিতায় সেই চর্যাপদ থেকে আজকের কবিতা নানা রূপ ও বাঁক বদলের প্রয়াস চালিয়েছে। তবে এ কথা মানতে হবে তিরিশের দশকে কবিতা বাঁক বদলে যে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল তা আর দেখা যায়নি। সবাই মিলে আমার মনে হয় একই ধরনের কবিতা লিখে যাচ্ছি আমরা। সাড়া জাগানো কোনো একক কবির দেখা মিলছে না। এক প্রকার ফ্ল্যাট অবস্থা যাচ্ছে। এটা শুধু বাংলা কবিতায় নয়, সারা বিশ্বেই একই অবস্থা। ইতিহাস ঘাঁটলে এই অবস্থার নজির মিলবে। তবে ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হতে বাধ্য।
আপনার কবিতার দর্শন কী?
প্রথমত মানবতা। মানবিক যা কিছু তা ধারণের, আত্মস্থের, প্রকাশের সদিচ্ছা। দ্বিতীয়ত রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী'র উদ্ধৃতি দিয়ে বলা যায়, ‘ভূয়োদর্শন বলিতেছে, আজ যে নিয়মে জাগতিক কার্য চলিতেছে, হাজার বৎসর পূর্বেও ঠিক সেই নিয়মে চলিয়াছিল। আবার হাজার বৎসর পরে কেমন চলিবে তাহাও আমরা গণিয়া বলিতে পারি। গণনা ও ঘটনা উভয়ে মিল ভিন্ন অমিল কখনও দেখা যায় নাই। কিন্তু একটা কথা আছে, ভূয়োদর্শন ভূয়োদর্শন মাত্র ; ভূয়: শব্দের অর্থ ভূয়:, চির নহে।’ আমি সেই ‘চির নহে’র বাইরে নিয়ত অনুসন্ধিৎসু। এক অর্থে একেই আমার দর্শন বলা যেতে পারে।
খ্যাতির তৃষ্ণা একজন কবির জন্য ক্ষতিকর নয় কি?
অবশ্যই ক্ষতিকর। খ্যাতির তৃষ্ণা সৃজনশীলতাকে অনেকটাই রুদ্ধ করে। একজন সৃজনশীল কবি যখন তার সৃষ্টিকে ঋদ্ধ করেন তখন খ্যাতি এমনিতেই আসে। একজন বড় মাপের কবি তার সৃষ্টিতেই মগ্ন থাকেন। খ্যাতি এলো কি না তার থোড়াই তোয়াক্কা করেন।
নিজের সম্পর্কে যে অভিযোগ মিষ্টি মনে হয়?
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : মেজবাহ মুকুল
লেখালেখি আর পড়াশোনায় সময় কাটিয়ে দিলো। জাগতিক বা বৈষয়িক বিষয়ে কোনো সিরিয়াসনেস দেখা গেল না। এমত অভিযোগ নিকটজনদের।
এখনো অপূর্ণ যে স্বপ্ন
স্বপ্ন মানুষ সারা জীবনই দেখে যায়। ফ্রয়েডের ভাষায়, ‘স্বপ্ন হচ্ছে মানুষের অবচেতন মনের গভীরে যাওয়ার বড় রাস্তা। অবচেতন মনে কী ঘটছে, তার প্রতিফলন হচ্ছে স্বপ্ন।’ সে অর্থে অপূর্ণ স্বপ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে জীবনের শুরুতে স্বপ্নের যে তীব্রতা থাকে তা সময়ের সাথে অনেকটাই হ্রাস পায়। সব স্বপ্ন পূরণ হওয়ার নয়।
কোন বই বারবার পড়ার ইচ্ছে এখনো তাড়িত করে?
একক কোনো বই নয়। এ জীবনে বলতে গেলে পড়ার মধ্যেই অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছি। তবু মনে হয় এ কিয়দংশ মাত্র। জ্ঞানরাজ্যের বিপুল সম্ভার ছুঁয়ে দেখার সুযোগ হলো কই। কত বই পড়ার যে ইচ্ছে হয়। একজীবনে তা হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই।
নিজের লেখা কোন বইটি অধিক প্রিয়?
লেখকের কাছে তার সব বই-ই প্রিয়। মায়ের সব সন্তানের মতো। তবু আমার ‘অনিবার্য পিপাসার কাছে’,‘আনন্দময় নৈরাশ্য ও ইস্পাত মানুষেরা’, এবং ‘আমাদের কোনো প্লাতেরো ছিল না’ হালে বেশি মনোযোগ দিয়ে পড়ি।
পাঠকের ভালোবাসা কেমন পান?
পাঠকের ভালোবাসা পাই। দেশে এবং বিদেশে পাঠকের ভালোবাসায় আপ্লুত হই। পাঠকের ভালোবাসা লেখকজীবনের অন্যতম চালিকাশক্তি।
এখনো উজ্জীবিত রাখে যে বাণী?
‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন?/কাণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র।’ Ñকাজী নজরুল ইসলাম
