মধ্য দুপুরে ভ্যাপসা গরম পড়েছে আজ। প্রকৃতি যেন একেবারে নিবাত-নিষ্কম্প। ঘুম ঘুম আমেজ তুলে নিশ্চিন্তে উড়ে যাচ্ছে এক চিলতে কালচে রঙের মেঘ। এমন সময় দানের আয়োজনে আকাশ অন্ধকার করে অঝোর ধারায় নেমে এলো বৃষ্টি। ভ্যাপসা গরমে একটু প্রশান্তি দান করতে। বৃষ্টির নরম নরম জলকণাগুলো জানালার গরাদের ফাঁক গলে রুমে ঢুকছেÑ জুড়িয়ে দিচ্ছে আমার তনুমন। খুব একা লাগছে আমারÑ কে যেন চমৎকার করে কাঁদছে এখানে। বৃষ্টি এলেই এ রকম নিঃসঙ্গ লাগে কেন নিজেকে? এর কারণ আজো বের করতে পারিনি।
বৃষ্টির ঝনঝনানি শব্দের প্রতি গভীর মনোনিবেশ হতেই মনে পড়ে গেল, দূরে ফেলে আসা শৈশবের বৃষ্টির দিনগুলোর কথা। মেঘলা দিনের শীতল বাতাসে মেঘের মতোন থমকে থাকা আকাশ। বর্ষার নবধারার জলে স্নান, যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে শৈশবের পিছুটান। আজো স্মৃতিস্পটে ভেসে উঠে গ্রামের বাড়িতে কাটানো মধুময় দিনগুলোর কথা। কানে আসে সেই টিনের চালে বর্ষিত বৃষ্টির ঝুমুর ঝুমুর বাজনাÑ ছোট্ট জানালা দিয়ে আনমনে দেখে যাওয়া বৃষ্টি। একে একে মনে পড়ে সব। ও আমার বৃষ্টিস্নাত স্মৃতি! আমাকে নিয়ে যাও আরো দূর দেশেÑ যেখানে হিম হয়ে আছে আকাশ।
সবাই জানালা দিয়ে মুগ্ধমনে বৃষ্টি দেখে না। নিজের আনন্দঘন প্রকাশ করতে সবাই বৃষ্টিতে ভিজেও না। ভিন্ন ভিন্ন মানুষের জন্য ভিন্ন ভিন্ন বর্ষাদিনÑ আর ভিন্ন ভিন্ন ব্যর্থতা। আমার ভালোই লাগে নিজেকে ভেজাতে বর্ষার বিপুল জলরাশিতে। ভালো লাগে, বৃষ্টি নিয়ে বহুল পরিকল্পনা। আহা, যদি বৃষ্টি হতে পারতাম! অবশ্য এটি সম্ভব নাÑ অনেকটা হেঁয়ালি করেই বলা। ক্ষেত্রবিশেষ হেঁয়ালিকেও ভালো লাগে আজকাল।
বৃষ্টির তুমুল বর্ষণকালে গ্রামের একদল কিশোর মিলে, সব হিংসা ভেদাভেদ ভুলে মেতে উঠতাম বৃষ্টি বিলাসেÑ নববর্ষার জলে ভাসাতাম কলা গাছের ভেলা। তার পর মন খুলে সুউচ্চ সুরে গেয়ে উঠতাম বৃষ্টির গান। ঝুম বৃষ্টির সাথে গরম খিচুড়ি আষাঢ়ের শান্ত স্নিগ্ধ প্রকৃতিÑ মুগ্ধতার মানস্পটকে নিয়ে যায় আরো বহুদূর। সারাদিন দাপাদাপির পর সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় নিয়ে আসতাম মুঠোভর্তি শাপলা, শালুক কিংবা সমূহ কুমুদফুল। রাতে জ্বরপীড়ার প্রচণ্ড রকম আক্রমণ। তবুও বাদ যেত না গল্প, আড্ডা, খুনসুটি। বহুরাত পর্যন্ত জমে থাকত আমাদের সেই আড্ডার আসর।
আচ্ছা! এ রকম হয় কেন মেঘের রঙ, রঙিন হয় না কেন মেঘ? বৃষ্টি এলেই বিষণœতায় মুখ লুকায় কেন আমার মন? মেঘে কি শুধু উদাসীনতা আর বিষণœতার ছাপ? হৃদয়ের গহিনে এমন অসংখ্য প্রশ্ন নিয়ে পড়ে আছি ইট-পাথরের এই ব্যস্ত নগরীতে। কোনো দিন ভাবিনিÑ এমন দুর্দিন আসবে আমাদের। আধুনিকতার প্রতিযোগিতায় পাল্টে গেছে সব। দুঃসময়ের হাত ধরে ছেড়ে দিয়েছিলাম গ্রাম। ফিরে কি পাবো হারিয়ে যাওয়া শৈশব! এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার আগে। হ