হারুন সাহেব নিচতলার জানালা ধরে কিছুটা অবচেতন মনে পেছনের কথা ভাবছেন। বৃষ্টির দিনে তার ভাবনাগুলো জাগ্রত হয়। ঝুম বৃষ্টিতে সেগুলোয় ডালপালা গজায়। কয়েক দিন ধরে একনাগাড়ে বৃষ্টি নামছে। নিচু অঞ্চল প্লাবিত, নদীর সাথে ভেসে যাচ্ছে মানুষের স্বপ্ন। স্বপ্ন কী! হারুন সাহেবের মাঝে মাঝে মনে হয় আসলে স্বপ্ন বলে কিছু নেই। অতীত হয়ে যাওয়া সবকিছু স্বপ্ন। এই মুহূর্তে যা বাস্তব সময়ের ব্যবধানে তা স্বপ্ন, মরীচিকা। মিথ্যা।
বৃষ্টির দিনে বৃষ্টি নেই। নামটা বৃষ্টি না হয়ে অন্যকিছু হলে আজ এ বর্ষায় বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটায় ওর কথা মনে পড়ত না।
আফরিন রহমান বৃষ্টি হারুন সাহেবের ৩০ বছরের সহধর্মিণী। করোনা বিভীষিকার শুরু হতে প্রায়ই বলত, যদি মরে যাই ক্ষমা করে দিও। হারুন সাহেব সান্ত¡না দিয়েছেন, এত ভয় পাচ্ছ কেন? কিচ্ছু হবে না তোমার।
Ñপ্রতিদিন মৃত্যু সংবাদ পাচ্ছি, বড্ড ভয় করে, কথা বলতে বলতে গলা কেঁপে ওঠে।
সত্যি তো, অ্যাম্বুলেন্সের মুহুর্মুহু হুইসেল জানান দেয়, মানুষের বিপদ ও অসহায়ত্বের কথা। ভয়ের সময়, তবু মানুষ আশা নিয়ে স্বপ্ন সাজায়।
সর্বশেষ হারুন সাহেব যেদিন অফিস শেষে জ্বর নিয়ে বাসায় ফিরলেন সেদিন আফরিন এতটুকু ভয় পায়নি। হারুন সাহেব বলেন, আমার জ্বর। বলা তো যায় না, তুমি আলাদা রুমে থাকো।
আফরিন মুচকি হেসে বলে, এতদিনে আমাকে এই চিনেছ তুমি!
কথার সাথে সাথে হারুন সাহেবের পাশে এসে কপালে হাত রেখে বলে, হুম গা বেশ গরম হয়েছে দেখছি।
হারুন সাহেব যতই দূরে সরাতে চান আফরিন ততই কাছে আসে। দীর্ঘদিন করোনার ভয়ে ভয় কাতুরে আফরিন সাহস জোগায়, তুমি তো আর পরীক্ষা করোনি। বৃষ্টির সময়, বৃষ্টি ভেজাতে জ্বর আসতেই পারে। তিন দিন একাধারে সেবা করে আফরিন যখন জ্বরে আক্রান্ত হয় তখনো হারুন সাহেব পুরো সুস্থ না। জ্বর গেলেও ক্লান্তি, কাশি, হালকা শ্বাসকষ্ট সেই সাথে করোনা পজিটিভ। দু’জনই বিমর্ষ। একমাত্র মেয়ে ফারিয়া অসুস্থতার খবর জানার পরেও আসতে পারেনি। শ্বশুরবাড়ি অনেক মানুষ। তাদের ঝুঁঁকি আছে। আপন দু’ভাই আরো কত স্বজন কেউ আসেনি। এ এক দুর্বোধ্য ভাইরাস; গোটা দুনিয়ার মানুষকে ইয়া নাফসি কথাটা বুঝিয়ে দিয়েছে চোখে আঙুল দিয়ে।
আফরিনের জ্বর ও তীব্র শ্বাসকষ্ট। দ্বিতীয় দিনে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে চল্লিশে আসে। ক্লান্ত, অসহায় শরীর; একা মানুষ কী করবেন হারুন সাহেব! পড়িমরি করে দ্রুত রাস্তায় নামেন। আফরিন শুধু বলে, আমাকে ছেড়ে যেও না। আমি তোমার বুকেই মরতে চাই...।
সব সময় আবেগী কথা শুনতে হয় না। হারুন সাহেব ও শোনেনি। আফরিনকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। লকডাউনের জন্য রাস্তায় গাড়ি নেই বললেই চলে, যা দু’-একটা আছে সেগুলো থামছে না। নিরুপায় হয়ে মামাতো ভাই জাহিদের কাছে ফোন করেন। জাহিদ একটা প্রাইভেট হাসপাতালে চাকরি করে।
Ñহ্যালো জাহিদ।
Ñহুম।
Ñতোর ভাবী তো খুব অসুস্থ।
Ñওনার করোনা পজিটিভ না?
Ñহু।
Ñআমাদের হাসপাতালে তো ভাই করোনার চিকিৎসা হয় না।
ফরিদ সাহেব ক্যাকানো গলায় বলেন, সে জন্য নয়, একটা অ্যাম্বুলেন্স যদি জোগাড় করে দিতে পারতি।
Ñসেটা দেয়া যাবে। আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি। শুনুন আপনি ভাবীকে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
কথা শেষ হতেই ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টি উপেক্ষা করে হারুন সাহেব অ্যাম্বুলেন্সের জন্য উসখুস করেন। চুল বেয়ে বৃষ্টির পানি গড়ায়। চোখের পানির সাথে বৃষ্টির পানির বেশ মিল আছে। স্বচ্ছতা ও পরিচ্ছন্নতায় মিল।
মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মানুষের জটলা, কান্না আর আর্তনাদ বলে দেয় আমরা বড় বিপদে আছি। আফরিনের যদিও আইসিইউ দরকার কিন্তু একটা বেডও ফাঁকা নেই। তিন দিন অক্সিজেন, স্যালাইন, ওষুধের পর ওষুধ; তবু চলে যায় আফরিন। চোখে পাহাড়সম ক্লান্তি, বুক ভরা ব্যথা নিয়ে হারুন সাহেব নিষ্পলক তাকিয়ে থাকেন আফরিনের সাদা প্যাকেটে জড়ানো দেহের দিকে। অনেকটা বাকহারা মূর্তির মতো। হাসপাতাল থেকেই কোনো একটা সংগঠনের লোকজন আফরিনকে দাফনের জন্য লাশ গাড়িতে তোলে। আফরিন এখন লাশ। একটু আগেও ছিল আফরিন, এখন লাশ কেন? প্রশ্নটা হারুন সাহেবের মাথার ভেতর ঘুরপাক খায়।
পাঁচজনের জানাজা। দাফন শেষে দ্রুত বিদায় নেয় সংগঠনের চারজন। হারুন সাহেব আফরিনের শেষ ঠিকানার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। কবরস্থানে আরেকটা লাশ এসেছে। ইদানীং প্রচুর লাশ আসছে, লাশের সাথে মানুষ আসছে না, হাতেগোনা দু’-একজন। তারাও চন্দ্র অভিযানের নিল আর্মস্ট্রংয়ের মতো পোশাক পরিহিত।
সন্ধ্যার পর থেকে এক নাগাড়ে বৃষ্টি হচ্ছে? কখনো ঝেঁপে বৃষ্টি কখনো রিমঝিম। আচ্ছা রিমঝিম নামে কী কোনো উপন্যাস আছে? খুঁজে দেখতে হবে। পাশের রুমে তার বড় ভাই সেকেন্দার শেখ নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন। স্ত্রী বিয়োগে ছোট ভাইয়ের অসহায়ত্ব বুঝে ছুটে এসেছেন। যদিও এক সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পর। হয়তো পারিবারিক চাপ ছিল। আগে তার ছোট ছেলে নিশ্চিত হয়েছেন চাচা করোনা নেগেটিভ। তারপর হঠাৎ করেই সেকেন্দার শেখের আগমন। আসলে পৃথিবীতে সবাই বাঁচতে চায়। বেঁচে থাকার এ প্রবল ইচ্ছা অনেকটা নেশার মতো।
আফরিনের মোবাইলটা বেজে ওঠে। মানুষ মরে গেলে কিছু নিয়ে যেতে পারে না বলেই সেটা এখন আফরিনের হাতের পরশ বুলানো স্মৃতি। হারুন সাহেবের কাছে রিংটোনের শব্দ বিউগলের করুণ সুরের মতো মনে হয়। হারুন সাহেব ভাবেন একই রিংটোন কখনো আনন্দের, কখনো ব্যথার।
Ñহ্যালো কে?
Ñআমি ঝর্না?
ও আচ্ছা ঝর্না। ঝর্না, নদী, পাহাড়, সাগর, বৃষ্টি আমার খুব প্রিয়।
ওপাশে শোনা যায়, দুলাভাই আমি বৃষ্টির বান্ধবী। ক্লাসমেট।
Ñহু
Ñবৃষ্টির সাথে কথা হয় না বহুকাল। একটু ওর কাছে দিন তো।
Ñকোন বৃষ্টি?
Ñআফরিন বৃষ্টি... মজা করছেন দুলাভাই?
হারুন সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, বৃষ্টি আছে সে নেই।
মানে!
হারুন সাহেবের কথা বলতে ইচ্ছা করে না। কলটা কেটে দেন। হ
হারুন সাহেব নিচতলার জানালা ধরে কিছুটা অবচেতন মনে পেছনের কথা ভাবছেন। বৃষ্টির দিনে তার ভাবনাগুলো জাগ্রত হয়। ঝুম বৃষ্টিতে সেগুলোয় ডালপালা গজায়। কয়েক দিন ধরে...
