সত্য, সুন্দর ও নান্দনিক জীবনবোধের কবি গোলাম মোহাম্মদ। মানবতাবাদী এই কবি শাশ্বত সত্যের জয়গান গেয়েছেন তার কবিতায়। গোলাম মোহাম্মদ নিমগ্ন ছিলেন কবিতায়, চিত্রকলায় ও সঙ্গীতে। রেখে গেছেন উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি সম্ভার। কালের দিক থেকে গোলাম মোহাম্মদ আশির দশকের কবি। কিন্তু তাকে দশকবন্দী হিসেবে বিচার করা যায় না। তার দশককে তিনি অতিক্রম করেছেন। জাতশিল্পী হিসেবে তাকে চেনা যায়। আদর্শিক এক জীবন ও সাহিত্য কর্মের অধিকারী ছিলেন গোলাম মোহাম্মদ।
বাংলা কবিতার ঐতিহ্যিক ধারাটি আশির দশকের শুরু থেকেই নতুন যাত্রায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বিশ^াসী চেতনার উজ্জীবিত হয়ে আমাদের কাব্যভুবকে ভিন্ন স্বাদ এবং সুরে বিকশিত করে তোলে একদল সংগ্রামী কবি। আশির দশকের সেই বিশ^াসী কবিদেরই একজন গোলাম মোহাম্মদ। তিনি আশির দশকে কাব্যচর্চা শুরু করলেও উত্থান এবং পরিচিতি লাভ করেন নব্বই দশকে। গোলাম মোহাম্মদের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : অদৃশ্যের চিল [১৯৯৭], ফিরে চলা এক নদী [১৯৯৮], হিজলবনের পাখি [১৯৯৯], ঘাস ফুল বেদনা [২০০০], হে সুদূর হে নৈকট্য [২০০১]। শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ : ছড়ায় ছড়ায় সুরের মিনার [২০০১] ও নানুর বাড়ি [২০০২]। তিনি প্রায় সাত শতাধিক গান রচনা করেছেন।
গোলাম মোহাম্মদের রচনায় যে দৃশ্যটি বিশেষভাবে দৃশ্যমান তা হচ্ছে পবিত্রতা। পবিত্রতার এই কোমল সুষমা তার সব রচনায় বিদ্যমান। গোটা বাংলা সাহিত্যে এমন পবিত্র আলোক ছড়ানো কবির সংখ্যা নিতান্তই কম। গোলাম মোহাম্মদের কাছে কবিতা আত্মার মতো পবিত্রার পরশ। চিত্রকল্পের লাবণ্যে, উপস্থাপনের ভঙ্গিতে, শব্দাবলীর পারস্পরিক সম্পর্কে তারই আত্মার আলোক হিসেবে ফুটে উঠেছে। গোলাম মোহাম্মদ এই পবিত্রতা অর্জনে নিবিষ্ট ছিলেন গোটা জীবন। আমরা তারই কবিতা ‘বিনীত সময়’ থেকে পেশ করতে পারিÑ ‘নরম হেজাব ঢাকা রাত যেন কামিনীর মুখ/বিনীত সময় আর নিজেকে নিকেশ করা বীরাল চাবুক/কিছুই যায় না দেখা, দেখা যায় নিজেকে শুধুই/কোলাহল থেমে যায় নীরব সময় নড়ে/বাসা বোনে দিলেন বাবুই/ ...নিরাপদ যুদ্ধহীন; আয়োজন তুলে রেখে পৃথিবী ঘুমায়/যেই রাতে সিজদার স্মরণের বিনীত সময়/সে রাতে আঁধার নেই, আলো আর আলোর বিজয়।’
আত্মা ও পবিত্রতা এই বিস্ময়কর সম্পর্কের মধ্যদিয়েই গোলাম মোহাম্মদের কবিতায় পবিত্রতার আবহটি সৃষ্টি হয়েছে। গোলাম মোহাম্মদের আরেক কাব্যিক বৈশিষ্ট্যটি রোমান্টিকতা। পবিত্রতার বাতাবরনে স্বপ্নকল্পনার জগৎ সৃষ্টিতে তার পরমাত্মা প্রতিষ্ঠিত। তার কল্পনার জগৎ কতদূর বিস্তার লাভ করেছিল, কিসের সন্ধানে বিস্তৃত হয়েছিল, তা উপলব্ধি করা যায় ‘হে সুদূর, হে নৈকট্য’ কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতায়Ñ “হে সুদূর, হে নৈকট্য/নীরব শিথিল এলোকেশ রাত কোমলতা/অথচ মানুষ উদয় কামনা করে চিরকাল/কত কোটি অস্থির ওপর দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবী/কত বোটি রোদের প্রক্ষেপণ এই মাটির উপর/মৃত্তিকা, মানুষ, বৃক্ষ সবই এক সারিতে দাঁড়ানো/অণু-পরমাণু মহিমান্বিত ক্ষুদ্রের সমাবেশ/প্রসারিত নিদ্রার মধ্যেই অনন্ত জীবনের শুরু।”
গোলাম মোহাম্মদের কাব্যচর্চায় রয়েছে ব্যাপক বৈচিত্র্যময়তা। তিনি যেমন বিশ^াসী চেতনার পরিস্ফুটন ঘটিয়েছেন তেমনি মানুষের হৃদয়বৃত্তি এবং প্রকৃতির নিপুণ সৌন্দর্যকেও ধারণ করেছেন। তিনি চমৎকার ইসলামী ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। যেমনÑ ‘হেরার তোরণ তার দুই চোখে ভাসে কারুময়/ডাহুকের মতো কাঁদে কত দেরী রাত পোহাবার/আকাশ সমান উঁচু সেই মাথা ভীত নত নয়/ব্যথার ইথার বুকে, বঞ্চিতের জ্বালা যেন বুকে।’
গোলাম মোহাম্মদ সৃষ্টি জগৎকে উপলব্ধি করতে গিয়ে সুন্দরকে খুঁজেছেন। তাইতো তার লেখার প্রতিটি পঙ্তিমালায় সঠিক ও সরল পথের সন্ধান পাওয়া যায়। তার লেখার বিষয়বস্তুতে মানব-মানবীয় প্রেম যেমন এসেছে-প্রকৃতিপ্রেম, দেশপ্রেম, ইতিহাস-ঐতিহ্য প্রভৃতি বিষয়ও এসেছে খুব সাবলীলভাবে। সাথে সাথে তিনি সত্য ও সুন্দরকে ধারণ করতে পেরেছিলেন। কবির লেখায় ‘প্রতিবাদে বিভাসে’ কবিতায় তারই প্রতিফলন দেখতে পাইÑ “হে মানুষ তুমি সুন্দর হও/বৃক্ষ, পত্র, ফুল দেখনি। ঝরনার নিক্কন শুনেও/কেন তুমি সুন্দরের পাগল হতে পার না/¯িœগ্ধ বহতার মতো তুমি সুন্দর হও/নীল আকাশের ভালোবাসার মতো নিসর্গ/প্রভাতের উদয় যেমন বর্ণের কারুতায় সিক্ত হয়/সুন্দর হও সাদা মেঘ শরতের মতো/বকের ডানার মতো জোসনা, কুয়াকাটা/সুন্দরবন, মাধবকুণ্ডের ঝরনার মতো/নীলভেদী সাদা মিনার যেমন/পিকাসোর চিত্রকলার মতো প্রতিবাদে বিভাসে/তুমি সুন্দর হও।”
অসাধারণ চিত্রকল্পের ভেতর দিয়ে ফুটে উঠেছে কবি গোলাম মোহাম্মদের সময় দর্শন। অস্তগামী সূর্যের বিলাফ দেখে তার হৃদয় হাহাকার করে ওঠে। যা পাঠকের মনে অস্ত যাওয়ার চিন্তাকে জাগিয়ে তোলে। এই কারুময় চিত্র তার কাছে ধরা দিয়েছে আশ্চর্য ধাঁধার মতো। তিনি লিখেছেনÑ “আমি চলেছি নিশানাহীন এক গন্তব্যে/যার বাজার মূল্য অতি সামান্য/অথচ তাই-ই লাগিয়ে দিয়েছে আমার চোখে আশ্চর্য ধাঁধা/পা আটকে গেছে এমন এক বন্ধনে/যা থেকে মুক্তির বাস্তবিক কোন সম্ভাবনা নেই/কি আমার ভালোবাসা নগণ্য নিবেদন/সামান্য মূল্যে বেচে ফেলেছি পুরোটা পৃথিবী।”
দেশবরেণ্য সাহিত্য সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দ তার শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘হে সূদূর হে নৈকট্য’ সম্বন্ধে বলেছেন, “কবি গোলাম মোহাম্মদের ‘হে সূদূর হে নৈকট্য’ বইটি গভীরভাবে তাৎপর্য নিয়ে দেখা দিয়েছে। যেন বইটির নামের মধ্যে বেজে উঠেছে গূঢ় গভীর অন্য এক ব্যঞ্জনা, আত্মনিবেশী কবি শিল্পী গোলাম মোহাম্মদ এই বইয়ে অনেক পাতার আড়ালে পরিপক্ব ফল নিয়ে উপস্থিত। আত্মার যে গভীরতর তল থেকে কবিতা তথা তাবৎ শিল্পের উৎসারণ, অদৃশ্যের সেই মৌচাক এই বইয়ে বাসা বেঁধে আছে। চমকে উঠেছি এই বইয়ে জীবন ও মৃত্যুর স্পাইরাল বুনটের গ্রন্থনায়। তার অপরূপ স্বজ্ঞাবলে গোলাম মোহাম্মদ কি আগেই জেনে গিয়েছিলেন তার আসন্ন পরিণাম? কী রকম একটি বিধুরতায় তাই ভরে উঠেছে এই গ্রন্থের কবিতার অনেক পঙ্ক্তি।”
মূলত কবি হিসেবে খ্যাতি পেলেও লিখেছেন অসংখ্য ছড়া, প্রবন্ধ ও গান। নন্দিত সব গান লিখে গীতিকার হিসেবেও তিনি সমধিক জনপ্রিয়। অন্তরাল পরায়ন হলেও কবির নান্দনিক উপস্থাপনা ও সৃষ্টিশীলতা তাকে দিয়েছে ব্যাপক পাঠক প্রিয়তা। কবি গোলাম মোহাম্মদ ১৯৫৯ সালের ২৩ এপ্রিল মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর থানাধীন গোপাল নগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ঝিনাইদহ কেসি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং মাগুরা সরকারি কলেজ থেকে বিএসসি পাস করেন। কবি গোলাম মোহাম্মদ ২০০২ সালের ২২ আগস্ট ইন্তেকাল করেন। মোহাম্মদ তার স্বল্পায়ু জীবনে যে উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি সম্ভার রেখে গেছেন তা কালের সাক্ষী হয়ে থাকবে।
সত্য, সুন্দর ও নান্দনিক জীবনবোধের কবি গোলাম মোহাম্মদ। মানবতাবাদী এই কবি শাশ্বত সত্যের জয়গান গেয়েছেন তার কবিতায়। গোলাম মোহাম্মদ নিমগ্ন ছিলেন কবিতায়, চিত্রকলায় ও সঙ্গীতে।...
