ডেকেছ তুমি দু’হাত বাড়িয়ে সত্য জানাবে বলে, হৃদয়েতে তাই জ্ঞানের পিপাসা উছলায় কূলে কূলে। হ্যাঁ, আমি বইয়ের কথাই বলছি। যার পাতায় চোখ বুলালে জ্ঞানের ও মনের পিপাসা মিটে। তবে আজ বইমেলা নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। মেলার মানেই তো মিলন। তাই মেলা মিলিয়ে দেয় মানুষে মানুষে, দেশে দেশে। এই মিলনের মাধ্যমেই আমরা চিনতে পারি মানুষ, দেশ, শিল্প, সংস্কৃতি ও সমাজকে। তবে মেলা তো নানা রকমের হয়। মেলা পণ্যেরও হয় আবার জ্ঞানভাণ্ডার আহরণেরও হয়। বইমেলার একেকটি স্টলে কত কত জ্ঞানভাণ্ডার রয়েছে।
বই মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাণসত্তা। বই মানুষে মানুষে প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করে। বই আমাদের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের সেতুবন্ধ। আমাদের সুন্দর চিন্তার বিকাশ সাধনের চাবিকাঠি বই। গ্রন্থপাঠে মানুষের এক দুর্নিবার আকর্ষণ। এই আকর্ষণেই মানুষ ছুটে যায় বইমেলায়। বইমেলা পরিবার, সমাজ, দেশ সারা বিশ্বের অগ্রগতির হাতিয়ার। আর বইমেলা এক মহৎ অনুভবের প্রেরণাস্থল। যেখানে মানুষ এক অনাবিল আনন্দ অবগাহন করে। ভুলে যায় প্রতিদিনের জীবনের কষ্ট মালিন্য। আহরণ করে এক সুন্দর প্রাণশক্তি। বইমেলায় আছে এক অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ।
বইমেলা বইয়ের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়ায়। মেলা শুরু হলে বই কেনার প্রতি বিশেষ তাগিদ অনুভব করি আমরা। তা ছাড়া দূর-দূরান্ত থেকে বহু প্রকাশক আসেন বইমেলায়। আসে নানা ধরনের বই। অচেনা অজানা অনেক বইয়ের সন্ধান মেলে। ইচ্ছে অনুযায়ী সেগুলো কেনার সাধ্য হয় অনেকের। অন্তত মেলার সুবাদে কিছু বইয়ের সাথে ক্ষণিকের জন্য হলেও পরিচয় মেলে। বইমেলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রকাশক একে অন্যের সাথে ভাব বিনিময়ের সুযোগ পান। বই প্রকাশ সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনারও অবকাশ পান। এ ছাড়া পাঠকদের চাহিদা সরাসরি লক্ষ করে নতুন নতুন বই প্রকাশের ক্ষেত্রে তারা তাদের কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে পারেন। বইমেলায় নানা ধরনের প্রকাশক স্টল খুলেন। একেক প্রতিষ্ঠান একেক ধরনের বই পছন্দ করে। ফলে ক্রেতারা তাদের অভিরুচি অনুযায়ী স্টল নির্বাচন করে বই কিনতে পারে। এ ছাড়া মেলা প্রাঙ্গণের সীমানায় অসংখ্য ধরনের বই পাওয়া যায় বলে ক্রেতাদের পক্ষে অল্প আয়াসে নিজ নিজ চাহিদা অনুযায়ী বই সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। বইমেলার সুরুচিসম্মত ও মনোরম পরিবেশ ক্রেতাদের সৌন্দর্য পিপাসাকে উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে বই কেনার ব্যাপারে উৎসাহ জোগায়। এ ছাড়া বইমেলায়। বইয়ের মূল্যের দিক থেকে ক্রেতাদের কিছুটা কমিশন দেয়া হয়।
মেলার বর্ণাঢ্য পরিবেশ বড়দের বই কেনার আগ্রহ যেমন বাড়িয়ে তুলে ছোটদের কল্পনাকেও তেমনই উজ্জীবিত করে। মেলা প্রাঙ্গণে লেখক ও প্রকাশকদের সমাবেশ ক্রেতাদের উৎসাহিত করে। বইমেলা বিখ্যাত লেখক ও প্রকাশকদের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের সুযোগ করে দেয়।
কর্মব্যস্ত মানুষ, যারা বই কিনতে যাওয়ার সময় পায় না। তারাও অনেকেই বইমেলায় গিয়ে হাজির হন। বইয়েই টানের সাথে বাড়তি যে জিনিসটি থাকে তা হলো মেলার টান। সেখানে শুধু নিজে গিয়েই তৃপ্তি নেই। আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবাইকে নিয়ে গিয়েও আনন্দ।
আমাদের জাতীয় মমনের প্রতীক বাংলা একাডেমির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এই মেলার সাথে একুশের জাতীয় চেতনা যুক্ত থাকে। বাংলা একাডেমির এই মেলা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়াও একদল পাঠানুরাগী প্রজন্ম গড়ে তুলতে এবং আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির লালন ও পৃষ্ঠপোষকতায় একুশের বই পালন করে আসছে অগ্রণী ভূমিকা। ফলে এই দিবসটি স্মরণ করে প্রকাশকরা নতুন নতুন প্রকাশনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। লেখক-লেখিকারা নব উদ্দীপনায় ও নতুন চেতনায় নতুন নতুন বই প্রকাশে হাত দেন। কেউ উপন্যাস, কেউ গল্প, কেউ বা কবিতার বই লিখেন। আবার কেউ কেউ রচনা এবং প্রকাশনা দু’কাজেই ব্যস্ত হন।
বইমেলার প্রাঙ্গণে বিচিত্র পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হতে হয়। মেলা চলাকালীন সময়ে প্রতিদিনই মেলাতে বিভিন্ন আলোচনা সভা, কবিতা পাঠের আসর বসে। প্রতি সন্ধ্যায় থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ ছাড়া মেলাতে লেখককুঞ্জ রয়েছে, যেখানে লেখকরা উপস্থিত থাকেন এবং তাদের বইয়ের ব্যাপারে পাঠক ও দর্শকদের সাথে মতবিনিময় করেন। এ ছাড়া মেলার তথ্যকেন্দ্র থেকে প্রতিনিয়ত নতুন উন্মোচিত বইগুলোর নাম ও লেখকের নাম ঘোষণা করা হয়। দৈনিক প্রকাশিত বইয়ের সামগ্রিক তালিকা লিপিবদ্ধ করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন রেডিও টেলিভিশন চ্যানেল মেলার মিডিয়া হয়ে মেলার তাৎক্ষণিক খবরাখবর দর্শক শ্রোতাদের অবহিত করে।
মেলার প্রাঙ্গণে মানুষের বিচিত্র পদচারণা লক্ষণীয়। কোথাও ইউনিফর্ম পরা স্কুল-কলেজের ছেলে-মেয়েরা লাইন ধরে এগোচ্ছে, কোথাও আবার কোনো প্রবীণ তার অনেক দিন আগেরকার কোনো প্রীতিভাজনকে খুঁজে পেয়ে দু’হাত বাড়িয়ে দেন, কোথাও বা বইয়ের প্যাকেট হাতে দ্রুত হেঁটে চলছে দোকানি, কর্মচারী, কোথাও আবার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ নিয়ে মন্থরগতি জ্ঞানান্বেষী। কোথাও আবার চা, কফি, কোমল পানীয় খেতে খেতে বইপ্রেমিকদের বিশ্রাম। এ ছাড়া বইয়ের বিভিন্ন স্টলেও নানা শ্রেণীর মানুষ, কেউ প্রাণপণ চেষ্টায় ঠেলাঠেলি করে কাউন্টারের দিকে এগোতে ব্যস্ত, কেউ সবার ভিড় এড়াবেন বলে স্টলের দরজায় দাঁড়িয়ে অন্যমনস্ক। কেউ এক একটা বই হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে পাতা উল্টাচ্ছেন, কেউ বা সন্ধানী আলোর মতো চোখ বুলাচ্ছেন সাজিয়ে রাখা বইগুলোর ওপর। কেউ দেখছেন অনেক, কিনছেন সামান্য। কেউ আবার ঝোঁকের মাথায় না দেখেই অনেক কিছু কিনে ফেলছেন। মানুষের মধ্যে বই পড়ার প্রবণতা বাড়াতে হবে। পড়ার অভ্যাসে বই কেনার অভ্যাস গড়ে উঠবে। বইমেলা সার্থক হবে। বিগত কয়েক বছরে আমাদের দেশে বইমেলার জনপ্রিয়তা অনেকটা বেড়েছে। বাংলা একাডেমি আয়োজিত গত কয়েক বছরের বইমেলাই তার প্রমাণ। প্রতি বছর এখানে ক্রেতা ও বইয়ের স্টলের সংখ্যা বাড়ছে। তরুণ প্রজন্মদের বইমেলার প্রতি আগ্রহী করে তোলা আমাদের কর্তব্য। তাদের বইমেলায় নিয়ে গেলে, মেলার উদার উন্মুক্ত পরিবেশে তারা মুক্তির খুঁজ করবে। বিভিন্ন বইয়ের স্টলে নানা ধরনের প্রচুর বই দেখে তারা আনন্দে আত্মহারা হবে। এবারো হবে আমাদের প্রাণের বইমেলা। সবাইকে আহ্বান জানাই, আসছে বইমেলা চলুন মেলায় হাজারো বইয়ের মাঝে প্রাণের খোঁজ করি।