পরম করুণাময় নিজে সুন্দর। সুন্দর তার সৃষ্টি। তার তুলির আঁচড়ে সৃষ্টি এই পৃথিবী আর তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। রাব্বুল আলামিনের এক মহান দান আমাদের বাংলার প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্য। নিসর্গের এত অপরূপ শোভা বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথায় আছে। তাইতো বারবার কৃতজ্ঞতা জানাই সেই মহান সৃষ্টিকর্তার। ছয়টি ঋতুর স্বতন্ত্র রূপ আপন আপন সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে বাংলাকে করে তোলে লাবণ্যমণ্ডিত। এ তো এক মহান শিল্পীর আঁকা নিখুঁত চিত্রকর্ম।
শীতের কুয়াশার চাদর ছিঁড়ে আবির্ভাব হয় বসন্তের। সবুজ কিশলয়ে ভরে ওঠে চারিদিক। দক্ষিণের মিষ্টি হাওয়া আনমনে বয়ে যায় সবুজ ধানক্ষেতে। সবুজ ধানের চারা আনন্দে আন্দোলিত হয়। নীল আকাশে বলাকার ঝাঁক উড়ে যায়। ফুলে ওঠে নৌকার পাল। বৃক্ষের বাকল চিরে বেরিয়ে আসে নতুন পাতা।
প্রকৃতি যেন অপেক্ষায় ছিল এই বসন্ত ঋতুর জন্য। তার বিরহী মন নিয়ে রাতভর চোখের পানি ফেলে অপেক্ষা করছিল প্রিয় বসন্তের জন্য। কবির ভাষায় বলতে হয়-
কঠোর হিমের বিরহী পাথার একাকিনী নিশি জাগি।
গুনিয়াছে দিন নিরজনে বসি নয়ন বসনে ঢাকি।
চাঁদ জাগিয়াছে মুখ চাহি তার
নিবিড় ব্যথায় ছেয়েছে আঁধার
আকুল পবন দিয়ে গেছে দোল ব্যাকুলিয়া সারা মন
নয়নে ঝরেছে বেদনা শিশির নিশি ভরি সারাক্ষণ
দীর্ঘ অপেক্ষার পর জেগে ওঠে বসন্ত। শীত শেষে দক্ষিণা হাওয়া আর ফুলপাখিদের কলরবে পরিবেশ মুখরিত হয়। নানা জাতের, নানা বর্ণের, নানা সুবাসের ফুল ফোটে এই বসন্তে। চারিদিক হয় সুরভিত। বিকেলের শেষ আলোয় ধ্বনিত হয় আজানের সুর। মহান সেই ডাকে আমাদের মন ব্যাকুল হয়। সাড়া দিতে ছুটে যাই জায়নামাজে। বসন্তের আরামদায়ক শান্ত পরিবেশে মন নিবিষ্ট করি। সব ভুলে ইবাদতে মশগুল করি নিজেকে। ফাল্গুন চৈত্র দুই মাস বসন্তকাল। এই বসন্ত প্রকৃতিতে নিয়ে আসে নব ছন্দের ব্যাকুল শিহরণ। পুরাতন জীর্ণ সব মুছে দিয়ে বসন্তের নবীন পাতায় জেগে ওঠে সবুজের আভা।
বসন্ত নিয়ে আসে পুষ্পারতির পরম লগ্ন। মৃদুমন্দ দক্ষিণা বাতাসের জাদুস্পর্শে বর্ণ বিরল পৃথিবীর সর্বাঙ্গে লাগে অপূর্ব পুলক প্রবাহ।
বনবিথীর রিক্ত শাখায় জাগে কচি কিশলয়ের অফুরন্ত উল্লাস। বাতাসের মর্মর ধ্বনি, দূর বনান্তরাল থেকে ভেসে আসা কোকিলের কুহুগীত তারই কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যিনি সৃষ্টি করেছেন এত সৌন্দর্য। অশোক পলাশের বিহবলতায়, শিমুলের বিপুল উল্লাসে, বিকশিত মধুমালতী আর মাধবী মঞ্জরির গন্ধ মদীর উচ্ছলতায় সারা আকাশ হয় সুরভিত। তাইতো কবি লিখেছেন-
‘হিম কুহেলির অন্তরতলে আজিকে পুলক জাগে
রাঙ্গিয়া উঠেছে পলাশ কলিকা মধুর রঙিন রাগে।
আজকের বসন্ত আর কয়েক যুগ আগের বসন্তের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। আগের বসন্ত আরো সুন্দর আরো প্রাণবন্ত ছিল। সবুজের আয়োজনে চারিদিক ছিল আরো সবুজ। ফুলের সুরভিতে পাখির কূজনে ভরপুর ছিল। মানুষের অনৈতিক চলনে অনেকটাই ব্যাহত হয়েছে। হারিয়ে যেতে বসেছে প্রিয় সবকিছু।
বসন্ত ঋতু আল্লাহর এক মহান নিয়ামত এবং রহমতের বীজ বপনের ঋতু। এই সময় ফুল পাখি, কীটপতঙ্গ আরো নানা প্রাণী করুণাময়ের নির্দেশে এক মহান দায়িত্ব পালনে ব্রতী হয়। মানুষের কল্যাণে সৃষ্টিকর্তার এক মহা উদ্দেশ্য রয়েছে এই দু’টি মাসে। গাছ ফুল পাখি আর কীটপতঙ্গ নিয়ে কিছু আলোচনা করা দরকার।
গাছ অধিকাংশ পাখির বাসস্থান। গাছেই ফুল হয়। বৃক্ষের সবুজে পৃথিবী হয় সবুজ। গাছ থেকে পাই অক্সিজেন যা বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। গাছ তার শিকর দিয়ে আঁকড়ে রাখে মাটি। গাছের ফুল থেকে হয় ফল, শস্যদানা, মধু, আরো অনেক কিছু। গাছ থেকে এবং কোনো কোনো ফুল থেকেও ঔষধ তৈরি হয়। এসব জিনিস আমাদের বেঁচে থাকার জন্য কতটা দরকার তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই বসন্ত কালেই ফুলের সবচেয়ে বেশি সমাগম হয়।
যে বৃক্ষের এত প্রয়োজন তা আমরা অমানবিকভাবে নিধন করে থাকি। আজ অনেক বৃক্ষের অনেক প্রজাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। হাজারো ফুলের অপচয় করে আমরা বসন্ত বরণ উৎসব পালন করি।
সারা বছর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ফুলের ব্যাপক ব্যবহার হয়। অনুষ্ঠান শেষে শত শত ফুল ডাস্টবিনে ফেলা হয়। যে ফুল জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় রসদ জোগায়। এই অমানবিক কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। তা না হলে আমরা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হব। তার গজবে পতিত হব। বন্যা, খরা, ভূমিকম্প ইত্যাদি দুর্যোগের কবলে আমাদের পড়তে হবে। অবশ্য এসব দুর্যোগ অনেক আগে থাকেই আমাদের জীবনে শুরু হয়ে গেছে। তবুও আমরা সতর্ক হইনি।
পাখি কীটপতঙ্গ বিভিন্ন প্রাণী আমাদের জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় রসদ তৈরিতে নিয়োজিত থাকে। এরা শীতকালে শীতনিদ্রায় ঘুমিয়ে থাকে। বসন্তের ছোঁয়া পেয়ে তারা জেগে ওঠে। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে বসন্ত। তারপর ফলে ভরা গ্রীষ্মকাল। বসন্তকালে ফুলে ফুলে পরাগায়ণ হয়। আর এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ফুল থেকে ফল হয়। আল্লাহর নির্দেশে এই পরাগায়ণের কাজটি কীটপতঙ্গরাই করে থাকে। পাখিরা বীজের বিস্তারণ ঘটায়। রাব্বুল আলামিনের কী অপূর্ব নিয়ম আর তার কাজের ধারাবাহিকতা। আমরা বসন্তে পাই ফুলের আচ্ছাদন আর গ্রীষ্মে পাই ফল।
পশু পাখি কীটপতঙ্গ আমাদের খাদ্যশস্য, শাক-সবজি, ফল ইত্যাদি উৎপাদনে সাহায্য করে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে পরিবেশ সুন্দর রাখে। অতীতে গাছপালা, ফুল-পাখি, পিক-পাপিয়া, প্রজাপতির ঝাঁক ছিল অফুরন্ত। খুবই দুঃখের বিষয় আজ মানুষের অসাধু আচরণে অনেক গাছসহ কীটপতঙ্গের অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। স্রষ্টার অপূর্ব সৃষ্টি প্রজাপতি আজ মহা সঙ্কটাপন্ন। আমরা বন কেটে পাখির বাসস্থান ধ্বংস করছি। তেমনি ভয়ঙ্কর কীটনাশক দিয়ে কীটপতঙ্গ মেরে ফেলছি। মৌমাছিরা মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বিষ খেয়ে মারা যাচ্ছে।
মানুষের বিবেক জাগ্রত করতে হবে। নচেৎ হারিয়ে যাবে সব কিছু। আর বসন্ত আসবে না। আসুন আমরা নিজেদের প্রয়োজনেই আল্লাহর সৃষ্টজীবের প্রতি দায়িত্বশীল হই। বন্ধ করি সব অমানবিক কাজকর্ম। রক্ষা পাক সৃষ্টিকুল। মানুষ বাঁচুক, সুন্দর হোক পৃথিবী। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে প্রার্থনা করি। তিনি যেমন সুন্দর, আমরাও যেন পাপমুক্ত হয়ে সুন্দর থাকতে পারি। পরিবেশকে সুন্দর রাখতে পারি।
পরম করুণাময় নিজে সুন্দর। সুন্দর তার সৃষ্টি। তার তুলির আঁচড়ে সৃষ্টি এই পৃথিবী আর তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। রাব্বুল আলামিনের এক মহান দান আমাদের বাংলার প্রাকৃতিক...
