আজ নির্ঝর খুব ভোরে ঘুম থেকে জেগেছে। স্বাধীনতার সূর্য দেখবে সে। নির্ঝর দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র। ছোট্ট শিশু নির্ঝর, বয়স তার আট বছর। স্বাধীনতার সূর্য তার কাছে গভীর কৌতূহল তৈরি করেছে। নির্ঝরের স্কুলের প্রধান শিক্ষক রেজা স্যার ক্লাসে বিজয় দিবসের পাঠদান করেছেন। রেজা স্যার আর্ট পেপারে নিজের হাতে মুক্তিযুদ্ধের চিত্রাঙ্কন করে এনেছেন। তিনি অঙ্কন করেছেন ভয়াবহ লড়াইয়ের চিত্র, এঁকেছেন গ্রাম বাংলার শ্যামল প্রকৃতির ছবি, আঁকা-বাঁকা নদী, মাঠভরা সোনালি ধান। অন্যদিকে এঁকেছেন গণকবর, কঙ্কাল, নদীতে কয়েকটা ভাসমান লাশ। একদিকে লাল-সবুজের পতাকা হাতে মুক্তিসেনার বিজয়োল্লাস। চিত্রের উপরে রক্তিম আকাশ। লালছে মেঘ ভেদ করে উদীয়মান লাল টগবগে সূর্য। বড় আর্ট পেপারে নিজের হাতে রাত জেগে এ চিত্র অঙ্কন করেছেন রেজা স্যার। তিনি একজন দায়িত্ববান টিচার। কারো কথা বা নির্দেশে নয়, নিজের দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আলোচনা করার জন্য মহান মুক্তিযুদ্ধের ওপর ভিত্তি করে একটি মাইন্ডম্যাপ তৈরি করেন। উদ্দেশ্য হলো- কচিকাঁচা শিক্ষার্থীদের মনোজগতে বাঙালি জাতির বহু কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামকে জীবন্ত করে তোলা। রেজা স্যার মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন আজকের শিশুরা আগামীর দেশ ও জাতির কাণ্ডারি। শিশুদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সত্য ইতিহাস জানতে দেয়া উচিত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমাদের নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলা প্রয়োজন। তাদের মাঝে দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তোলা দরকার। ছাত্রজীবনের ঊষালগ্নে যদি দেশপ্রেমের বীজ বপন করা যায় তাহলে এই এরা বড় হয়ে দেশ-জাতিকে সঠিক গন্তব্যের পথে নিয়ে যাবে। আজ ২৫ মার্চ। পূর্বের নির্ধারিত পাঠপরিকল্পনা নিয়ে প্রধান শিক্ষক রেজা ক্লাসে আসেন। ব্লাকবোর্ডে মাইন্ডম্যাপ ঝুলিয়ে শিক্ষানির্দেশক কাঠি দিয়ে শিক্ষার্থীদের বুঝানোর চেষ্টা করেন। আপন হাতে আঁকা চিত্রের দৃশ্য দেখিয়ে মুহূর্তের মাঝে শিক্ষার্থীদের নিয়ে যান কল্পলোকে, মুক্তির সংগ্রামে। রেজা স্যারের বর্ণনায় তারা যেন একাত্তরের রণাঙ্গনকে নিজের চোখে দেখছে আর কল্পনায় তাদের কেউ কেউ দিগি¦জয়ী বীর, কেউ হয়ে উঠছে মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক মুজিবীয় চেতনায় উজ্জীবিত, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ জিয়ার বীরত্বে উদ্দীপ্ত। কেউ বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর, কেউ রুহুল আমিন, কেউ হামিদুর রহমান, কেউ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর, কেউ মুন্সী আবদুর রউফ, কেউ বা আতাউল গণি ওসমানীসহ বীর শহীদের ভূমিকা নিয়ে বেড়ে উঠছে বারবার। রেজা স্যার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। নিজের চোখে তিনি যুদ্ধের বীভৎস দৃশ্য খুব কাছ থেকে দেখেছেন। আবার রণনৈপুণ্যে সম্মুখসমরে লড়েছেন। নিজের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞা অবলীলায় বলে যান রেজা স্যার। কীভাবে ঘুমন্ত বাঙালির ওপর পাকিস্তানি হায়েনারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল চিত্রে তাও নিখুঁতভাবে দেখিয়েছেন তিনি। এ দৃশ্যটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রেজা স্যার ২৫ মার্চের ভয়াল কালরাতের বিভীষিকাময় ইতিহাস শিক্ষার্থীদের সামনে আয়নার মতো পরিষ্কার করে দেন। চিত্রে আঁকা সশস্ত্র প্রতিরোধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মদানের অমরগাথা নিয়ে হৃদয়বিদারক আলোচনা করেন তিনি। গাঢ় সাদা আর্টপেপারে উজ্জ্বল রক্ত রঙে আঁকা ছবিগুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীদের মনের ক্যানভাসে। চিত্রের শেষ দৃশ্যটি দেখে অন্য শিক্ষার্থীদের মতো নির্ঝরের মনেও আনন্দের হিল্লেøাল বইছিল। একদিকে মুক্তিসেনাদের বিজয়োল্লাস, হাতে লাল-সবুজের পতাকা। অন্যদিকে, পরাজিত পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের চিত্র দেখে অকুতোভয় বীর বাঙালির অদম্য সাহসে যেন বলিয়ান হয়ে ওঠে নির্ঝর। রেজা স্যার দীর্ঘ ৯ মাসের অগ্নিঝরা ইতিহাসের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে যান। রেজা স্যার তখন নিজের ডান পা দেখিয়ে বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে আমিও গুলির আঘাতে একটি পা হারিয়েছি। এখন যে ডান দিকের পা টি দেখছ, তা আমার আসল পা নয়। এটি কৃত্রিম পা। এরপর তিনি উদীয়মান সূর্যের চিত্রটি দেখিয়ে বলেন, এটি হলো আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক ।
লাল টুকটুকে সূর্য। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাঙালি জাতির জীবনে অবিস্মরণীয় দিন। এদিন আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সেই থেকে দিনটি আমরা স্বাধীনতা বিজয় দিবস হিসেবে উদযাপন করে থাকি। এদিন জাতি স্বতঃস্ফূর্ত স্বাধীনতা উৎসব করে।
এটি আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক। প্রেরণার প্রতীক। এই সূর্যটি আমাদের জাতীয় পতাকার হৃদয়। সবুজের মাঝে লাল। সবুজ রঙ গ্রামবাংলার নৈসর্গিক পরিবেশের প্রতীক আর উদীয়মান রক্তিম সূর্যটি বীর জাতি বাঙালির বিপ্লবের প্রতীক। নির্ঝরের শিশু মনে রেজা স্যারের কথাগুলো দারুণ প্রভাব ফেলেছে। ক্লাস থেকে ফিরে এসে নির্ঝর সময় পার করতে পারছে না। স্বাধীনতার সূর্য দেখার অপেক্ষার উত্তেজনায় অস্থির নির্ঝর। কখন প্রভাত হবে? সূর্য উঠবে, স্বাধীনতার রক্তমাখা লাল সূর্য! সারা বিকেল থেকে নির্ঝর তার খেলার সাথীদের নিয়ে প্লান সাজিয়েছে। তারা খুব ভোরে ঘুম থেকে জেগে উঠবে। লাল-সবুজের প্ল্যাকার্ড নিয়ে উল্লøাস করবে। রাতে নির্ঝর বাড়ির উঠোনে বসে বন্ধুদের নিয়ে ছোট ও বড় কাগজে জাতীয় পতাকা অঙ্কন করে সেগুলোতে মনের আনন্দে সবুজ ও লাল রঙ দিয়ে রাঙিয়ে তুলেছে এবং বাঁশের চিকন চিকন কঞ্চি দিয়ে প্ল্যাকার্ড বানিয়েছে। নির্ঝরের বাবা একজন কলেজশিক্ষক। স্বাধীনতা দিবসকে ঘিরে নির্ঝরের এমন আগ্রহ দেখে বাবাও খুব পুলকবোধ করছেন। সেই উচ্ছ্বাসে তিনি শহর থেকে জাতীয় পতাকা অঙ্কিত কিছু ফিতা নিয়ে আসেন। ভোরে বাবার কাছে এমন চমৎকার উপহার হাতে পেয়ে নির্ঝর তো খুশিতে আত্মহারা। নির্ঝরের মা তার কপালে, কব্জিতে ফিতাগুলো নিজ হাতে বেঁধে দেন।
সেলিনা বেগম উচ্চশিক্ষিত। তিনি নিজের সন্তানকে দেশের ইতিহাস- ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় করাতে আগ্রহী। তাই ছোট বেলা থেকে তিনি মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বব্যঞ্জক গল্প বলে নির্ঝরের মনে যেমন সাহস সঞ্চার করে আসছেন আবার পাশাপাশি তাকে বাঙালি জাতির ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন করে তুলছেন। বাবার দেয়া অবশিষ্ট ফিতাগুলো নির্ঝর তার বন্ধুদের কপালে ও কব্জিতে বেঁধে দিয়ে মনের আনন্দে বিদ্যালয়ের মাঠে দলবেঁধে এগিয়ে যায়। তারা প্রিয় শিক্ষক রেজা স্যারের নেতৃত্বে বর্ণাঢ্য (র্যালি) শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করে। স্বাধীনতার মিছিলে মুখরিত শোভাযাত্রা পুরো গ্রামের মেঠোপথ ঘুরে এসে আবার ক্লান্তিহীন উচ্ছ্বাসে সমাবেশে মিলিত হয় সবাই। ওই দিন জেলার বেশ কয়জন দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধা তাদের বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। তারা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মুক্তিযুদ্ধের নানান বাস্তবতা নিয়ে বক্তব্য রাখেন। রেজা স্যার তো আজ রীতিমতো অভিভূত! তিনি ভাবতেও পারেননি তার অঙ্কিত চিত্রের ব্যাখ্যায় নির্ঝরের মনে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা দিবস নিয়ে এমন কৌতূহল সৃষ্টি হবে। খুশিতে তার দু’চোখে আনন্দাশ্রু টপটপ করে ঝরে পড়তে থাকে। তিনি অকপটে বলেন, আজ আমাদের সামনে যেসব শিশু স্বাধীনতার আনন্দে উজ্জীবিত, আমার চোখে তোমরাই একেকটা সূর্য, তোমরাই স্বাধীনতার সূর্যোদয়।