[গত সংখ্যার পর]
এভাবে অনেক কবিতা উল্লেখ করলে পাঠকের কাছে অসহনীয় হতে পারে বিধায় প্রাইমারি ও হাইস্কুলে যেসব কবিতা পড়েছি সেগুলোর শুধু কবিতা ও কবির নাম তুলে ধরছি। তালগাছ-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রতিদান-জসীম উদ্দিন, ভোর হলো -কাজী নজরুল ইসলাম, দুইবিঘা জমি- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুখ-কামিনী রায়, চাষী-রাজিয়া খাতুন চৌধুরাণী, মামার বাড়ি-জসীম উদদীন, জীবনের হিসাব- সুকুমার রায়, সবার আমি ছাত্রÑ সুনির্মল বসু, পাছে লোকে কিছু বলে- কামিনী রায় ইত্যাদি। এসব কবিতা আমাদের কাকুদের মতো নিরক্ষর মানুষেরা শুনে শুনে মুখস্থ করতেন। অনেকেই এসব কবিতাকে পদ্য বলে আখ্যায়িত করবেন। সেটা করতেই পারেন। এই দীর্ঘ ভূমিকা লিখার অর্থ এই যে আমরা আজকে বাংলা ভাষায় যে কবিতা চর্চা করছি তার একটু পর্যালোচনা করা। প্রাইমারি ও হাইস্কুলে যেসব কবিতা ও গল্প শিক্ষার্থীদের আমরা পড়াচ্ছি এবং শিখাচ্ছি তার ফল এখন আমাদের সমাজ হাতে হাতে আসলে নগদে পাচ্ছে। শিক্ষক এখন শিক্ষার্থীকে অসভ্যতা বা অসদাচরণের কারণে শাসন করতে ভয় পায়। এখন মুরব্বিরা আর ছোটদের শাসন করেন না পাছে অপমান হবেন বলে। ছোটরা বড়দের সম্মান করে না আবার বড়রা ছোটদের ¯েœহ করেন না। এখন মেয়েরা রাস্তায় লজ্জাহীনভাবে বুক ফুলিয়ে চলে। ওড়না রাখতে চায়না বুকে। মাথায় কাপড় দিয়ে সম্ভ্রান্ত মহিলার পরিচয় দিতে মহিলারা এখন সঙ্কোচ করে। মুরব্বি বা পুরুষ মানুষ মেয়েদের সামনে পড়লে আর রাস্তার ধারে গিয়ে তারা সাইড দেয় না বরং মুরব্বি এখন রাস্তা ছেড়ে দিয়ে পাশের্^ দাঁড়িয়ে থাকেন মেয়েটির অতিক্রম পর্যন্ত। ছোটরা এখন বড়দের সামনে প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে বিড়ি সিগারেট ফুঁকে ধোঁয়ার রিং ছেড়ে দেয়। ছেলে এবং মেয়েরা রাস্তায় মুরব্বিদের সামনে প্রকাশ্যে প্রেম নিবেদন করতে একটুও ভয় পায় না বা লজ্জাবোধ করে না। পুত্র এবং পুত্রবধূ এখন বৃদ্ধ বয়সে পিতা মাতার দায়িত্ব নিতে চায় না। আস্তে আস্তে আমরা ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছি। সাহিত্যের কবিতা ও গল্পের দ্বারা শিশুদের মানসিক গঠন হয়। সাহিত্যের গল্প, কবিতা, ছড়া পাঠের দ্বারা এই শিশু ও কিশোর বেলায় তাদের মধ্যে মানব প্রেম, দেশ প্রেম, অন্যায়,অসত্য ও পাপের প্রতি ঘৃণা, সত্যের পথে চলতে অনুপ্রেরণা, মানুষকে ভালোবাসতে শেখা, অসহায় গরিব-দুখির প্রতি মমত্ববোধ, অন্য ধর্মের অন্য বর্ণের মানুষের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। এই বয়সে তারা সময়ানুবর্তিতা, সততা, ন্যায়পরায়নতা, সত্যের প্রতি ভালোবাসা শিখে থাকে। আর এসব গুণাবলী তার সারা জীবনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এখন কিসব গল্প, কবিতা পাঠ্যভুক্ত করা হয়েছে যেগুলো পাঠ করে শিশুরা সভ্যতা ভুলে অসভ্য হয়ে বেড়ে উঠছে। ফলে মানুষের চেয়ে অমানুষের দ্বারা দেশ ভরে যাচ্ছে। এখানে বলে রাখা আবশ্যক যে, সাহিত্য জীবনের সাধ, সাহিত্য জীবনের সাধনা, সাহিত্য আরাধনার ধন। এ যে প্রেমের যোগ, কল্যাণের সাধন। সাহিত্যের লক্ষ্য মানবিকতার বিকাশ সাধন, ব্যক্তিগঠনের মধ্য দিয়ে সমাজকে সুবিন্যস্ত করা। জাতিসত্তার বিকাশে সাহিত্য অত্যাবশ্যক (এয়াকুব আলী চৌধুরী)। এখন বাংলাদেশে বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, সাহিত্য পত্রিকা, লিটিল ম্যাগাজিনে প্রচুর কবিতা প্রকাশিত হচ্ছে। তরুণ এবং প্রাজ্ঞ কবিরা প্রতিনিয়ত এবং একুশের বইমেলা উপলক্ষে প্রচুর কবিতার বই প্রকাশ করে থাকেন। প্রকাশিত এসব বই কত কপি বিক্রি হয় এবং পাঠক স্বতঃস্ফূর্তভাবে কতটি কবিতা পাঠ করে এবং কতটি কবিতা পাঠক মুুখস্থ করতে উৎসাহবোধ করে তা নিয়ে সাহিত্যের বোদ্ধা মহলকে ভাবতে হবে। বাংলা কবিতা সাহিত্যের শরীরে প্রতিনিয়ত মেদ চর্বি এবং গোশত সঞ্চিত করে স্থূূল থেকে স্থূলাকার করে চলেছি তাতে এই সাহিত্যের শরীর ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। বেশি স্থূল শরীর আবার অপমৃত্যুর শিকার হয়। এখন যেসব কবিতা প্রকাশিত হয় সেগুলো ভাষার কারুকার্যে, বিষয়ে বিচিত্র থাকে কিন্তু ভাবে ও মর্মে হয় গরিব। কবিতাকে শুধু ‘সুন্দর শব্দের কারুকার্য বললে চলবে না, কবিতাকে শুধু উত্তম শব্দের সমষ্টি হলেই চলবে না। কবিতায় জীবনের কথা থাকতে হবে। কবিতায় মানুষের হাসি, কান্না, অশ্রু বেদনা, সমাজের ক্ষতস্থানের কারণ নির্ণয় ও উপশমের পথনির্দেশিকা থাকতে হবে। আমরা বেশি কথায় না গিয়ে বলতে চাই যে কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ফররুখ আহমদ, জসীম উদ্দীন,আল মাহমুদের কথাই যদি বলি তাহলে দেখব যে তাদের কবিতা পাঠকের কাছে গিয়েছিল এবং পাঠক কবিতাকে হাত পেতে নিয়ে আদর করেছে। কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় একটি ঘুমন্ত আধ-মরা জাতির দেহে জমাট বাঁধা রক্ত পুনঃসঞ্চালিত হয়ে আকাশ বাতাস মোথিত করেছে। ঘুমন্ত, অর্ধমৃত জাতি আবার বাঁচার আকুতি নিয়ে জেগে উঠেছে। কবির গান ও কবিতার চাবুকের কশাঘাত সবুজ গাছের ডালে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি করেছে। জসীম উদ্দীনের কবিতার সুর সবুজ ধানের মাঠে ঢেউ খেলে প্রকৃতিকে উন্মাদ করেছে। ফররুখের কবিতা আবার বিশ^াসীদের বিশ^াসকে মজবুত করে দরিয়ায় নতুন সফরের জন্য আন্দোলিত করেছে। ঘুমন্ত নাবিককে ধাক্কা মেরে জাগিয়ে তুলেছে আবার হা’ল ধরার জন্য। আল মাহমুদের কবিতায় আমাদের বাংলার ভুলে যাওয়া হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের সন্ধান পেয়েছি। মায়ের হারিয়ে যাওয়া নোলক খুঁ-জ-তে খুঁ-জ-তে বাংলার সকল নদীতে অবগাহন করা হয়েছে আমাদের। এখনকার আধুনিক কবিতার নামে অকবিতা আর আমাদের কাকুদের মনযোগ কাড়ে না। আমাদের শিশুরা আর কবিতা শুনে শুনে মুখস্থ করার আগ্রহ পায় না। শিশুরা এসব ছাইপাশ পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়েছে। শিক্ষা হতে হবে আনন্দের সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এসবে আর আনন্দ পায় না, মনের খোরাক পায় না। এসবের দ্বারা বিকৃতির শিকার হয়ে শিশুরা অমানুষিক জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছে। দেশপ্রেম আজ উধাও হয়েছে। নাগরিক জীবনে দেশের প্রতি ভালোবাসা নাই। মানব প্রেম, জীবের প্রতি দয়া নিরুদ্দেশ হয়েছে। পাড়ায়-পাড়ায়, গ্রামে-গ্রামে ঠুনকো বিষয় নিয়ে কোন্দল থেকে মারামারি খুনাখুনিতে পর্যন্ত ঠেকেছে। এসব দেখে শুনে আমাদের শিক্ষা মনোবিজ্ঞানী, শিক্ষা দার্শনিক, সমাজ দার্শনিকের কোনো বোধোদয় হয়েছে বলে মনে হয় না। আধুনিক শিক্ষার মাধ্যমে আমরা অমানুষ তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছি। এমন এক প্রজন্ম তৈরি করেছি যারা ঠুনকো বিষয়ে মতপার্থক্যের কারণে সহপাঠী, প্রতিবেশী,সমবয়সীকে হত্যা করতে কুণ্ঠিত হচ্ছে না। দেশের সম্পদ নির্বিচারে লুণ্ঠন করা, পাচার করা, দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেয়া-এই আধুনিক শিক্ষিতরাই করছে। জাতির কষ্টের টাকা খরচ করে আধুনিক শিক্ষার নামে আমরা কি অর্জন করলাম? আজও গ্রাম-গঞ্জের হাটে-বন্দরে আব্দুল আলীম, আব্বাস উদ্দিন, ফেরদৌসী, নীনা হামীদের গান, লালনের গান কর্মঠ মানুষরা গলা ছেড়ে দিয়ে গায়। কাজের ফাঁকে বিশ্রামে বিড়ি টানে আর ভাওয়াইয়া ভাটিয়ালী সুরে গান গায়। রেডিও টিলিভিশনে প্রতিনিয়ত আধুুনিক গানের নামে কত গান যে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে, এসব গান কেউ শোনে না, কোনো মানুষের কণ্ঠে শোনা যায় না। পুরনো বাংলা লিরিক কবিতার প্রতি মানুষের যে আকর্ষণ সেই আকর্ষণ আর আধুনিক কবিতায় নেই। কবিদের নিরুৎসাহিত করছি না আমি, বলতে চাচ্ছি যে কবিতা যেন জীবনের কথা হয়। হৃদয়ের না বলা কথা প্রকাশ করে কবিতা যেন মানুষকে জীবনবোধে, মানবতাবোধে উজ্জীবিত করে, সুন্দর ও সত্যের দিকে আকৃষ্ট করে। কবিতা যেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে এবং ন্যায়ের আদেশ করতে শেখায়। কবিতা যেন দেশকে ভালোবাসতে, মানুষকে ভালোবাসতে উজ্জীবিত করে। কবিতার শিল্পরূপ যেন মানুষের জীবন সমাজ থেকে নেয়া হয়। কবিতা যেন ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধে উজ্জীবিত করে। আগের কবিতা ছিল মানুষের হৃদয়ের ভাষার শিল্পিত রূপ। এখন কবিতা হয়েছে মুখের কথার চর্বিত রূপ। সকলের মুখে চিবানোর রুচি না থাকায় কবিতা এখন সাহিত্য সম্পাদক ও অপরাপর কবিদের পাঠ্য বিষয় হয়েছে। কবিদের কবিবন্ধু ছাড়া সাধারণ মানুষ আর কবিতা পড়ে না। কেন পড়ে না সেটা কবিদের আর ভাবনার বিষয় নয়। তারা ভাবতে চায় না। তারা মনে করছেন বছরে আমি কতটি কবিতার বই প্রকাশ করতে পারলাম, এ পর্যন্ত কতটি কবিতার বই প্রকাশিত হলো। তারা তৃপ্তি বোধ করেন কতটি বই প্রকাশ করতে পারলাম। সেসব কবিতা কতজন পড়লেন সে বোধের খবর নেয়ার গরজ কবিরা করেন না। আমার মনে আছে ছোট বেলায় স্কুলজীবনে কোনো এক শ্রেণীতে ‘সাধু সঙ্গ’ নামে একটি কবিতা পড়ে স্যারের মুখে এর ব্যাখ্যা শুনে অভিভুত হয়েছিলাম।
পরবর্তী জীবনে নবীজীর সা: সেই হাদিসটির কথা মনে হয় ‘তোমরা যদি আতরের দোকানে যাও, আতর ক্রয় না করলেও এর সুগন্ধ পাবে, আর কামারের দোকানে গেলে বিশ্রীগন্ধ এবং কালির ছোঁয়া কাপড়ে লাগবে।’ হাদিসটির শিক্ষা হলো জীবনের বন্ধু বা সাথী সৎ চরিত্রবান হলে তুমি সত্যপথের দিশা পাবে আর বন্ধু যদি অসৎপরায়ন হয় তাহলে তার প্রভাবে তুমি পাপের পথে চলে যাবে। শিক্ষকরা বলতেন ‘সৎ সঙ্গে সর্গ বাস হয় আর অসৎ সঙ্গে নরক বাস হয়।’ এত কথা বলার কারণ হলো আধুনিক কবিতা তার গতিপথ হারিয়ে ফেলেছে। কথার ঝঙ্কার, শিল্পের সমৃদ্ধির দ্বারা সমৃদ্ধ হয়েছে কিন্তু হারিয়ে ফেলেছে স্পিরিচুয়াল ভাব। হ
