রাত ১২টায় মিতু লিখেছে- শুভ রাত্রি; আই লাভ ইউ জান। হাসান সকালে ঘুম থেকে জেগে মেসেজ দেখে ধড়ফড়িয়ে ওঠে। দু’হাত দিয়ে ভালোমতো চোখ দুটো কচলিয়ে নিশ্চিত হয়। হ্যাঁ, মেসেজটা ঠিকই আছে। ছয় মাস সাধনা করে যে মেয়েটার টিকিটা ছোঁয়া যায়নি সে লিখেছে- জান! আই লাভ ইউ! অবাক ব্যাপার! এটিই জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার। সাথে সাথে রিপ্লøাই দেয়, গুড নাইট মিতু। আই লাভ ইউ।
একটু পরেই মিতুর ফোন, কী মেসেজ লিখেছেন!
-উত্তর দিয়েছি।
ওপাশে বজ্রকণ্ঠ, এখন সকাল ১০টা বাজে, লিখেছেন গুড নাইট।
-কাল রাতের মেসেজের রিপ্লøাই দিয়েছি।
-তা আই লাভ ইউ লেখার মানে কী?
-তুমি আই লাভ ইউ জান লিখতে পারলে আমি আই লাভ ইউ লিখতে পারব না?
-দেখুন ফাজলামোর কিন্তু সীমা আছে।
হাসানের বুকের ভেতর ধড়াস করে ওঠে। মশার মতো পিনপিনে গলায় বলে, সাগরের যখন সীমা আছে, ফাজলামোর সীমা থাকাও স্বাভাবিক। কেন কী করেছি?
-বোঝেন না! দিনের পর দিন জ্বালাতন করছেন। আপনি কী মানুষ না পাগল?
-বুঝলাম না। মানুষ না পাগল! মানুষই তো পাগল হয়। পাগল কী মানুষ না?
-একদম বাজে বকবেন না। আর শুনুন, এরপর ফোন করলে বুঝতে পারবেন কত ধানে কত চাল। মেয়েটি ফোন কেটে দেয়।
হাসান কূলকিনারা খুঁজে পায় না। মিতুকে আবার ফোন করা দরকার। এমন অপমান সহ্য করা যায় না। তাকে বলতেই হবে, কেন গতকাল রাতে লিখল- শুভ রাত্রি, আই লাভ ইউ জান। আবার কল করে। দু’বার রিং বাজার পর ফোন রিসিভ হয়। বুড়ো কণ্ঠের কর্কশ গলা। বুড়োদের কর্কশ গলা মানায় না। কাকের কা কা মনে হয়।
-হ্যালো কে?
-আমি হাসান।
-কী সান?
-কোন সান না। সান, মুন এগুলো হলে কী প্রেম নিবেদন করে বেড়াতাম।
-তুমি কী চাইছেন?
বয়সের ভারে লোকটা আপনি তুমি গুলিয়ে ফেলছেন। হাসান বলে, আমি মিতুকে চাচ্ছি।
-চাচ্ছি মানে! মিতু কি চাল, পেঁয়াজ নাকি! চাল, পেঁয়াজের যে দাম তাতে সে অবস্থাও নেই যে ভিক্ষুক চাইল আর দিয়ে দিলাম। আমার একমাত্র আদরের পেতœী।
-পেতœী !
-পেতœী মানে নাতনী। আমি পেতœী ডাকি, কারণ রাত বিরাতে সে আমাকে ভয় দেখায়। গতকাল রাতে লোডশেডিং হলো। মিতু ভেউ দিলো। দিনকাল ভালো না। আমি বুড়ো মানুষ, ভয়ে অস্থির। অন্ধকারে চিৎকার করছি। আলো কই। মিতুই আবার মোবাইলে আলো জ্বালিয়ে আমার কাছে রেখে গেল। কারেন্ট আসার পর আমি আর মোবাইলের আলো নেভাতে পারি না। টিপতে টিপতে কী হলো কে জানে। একটু পরেই ফোন। তুমি কী আমার কথা শুনছেন?
এবার হাসান কিছুটা অবাক হয়। লোকটা আপনি তুমি গুলিয়ে ফেলছেন! না এটি তার কথা বলার সিস্টেম? প্রথমে বলবে তুমি একেবারে শেষে আপনিতে গিয়ে শেষ করবেন। হাসান জবাব দেয়- হু, শুনছি।
-একটা মেয়ে। এই আমার নাতনীর বয়সী হবে। আমাকে বলে আমিও আপনাকে ভালোবাসি, বৃষ্টিভেজা দিনে স্বাগতম। আমি তো অবাক। এ যুগে সস্তা দরের ভালোবাসা চলছে। আমাদের সময় এসব ছিল না। তুমি বলো আমার কি ভালোবাসার বয়স আছে। অর্ধেক বডি মাটির নিচে অর্ধেক উপরে। কী সান কথা কি শুনছেন?
-জি, শুনছি। আর শুনুন, কী সান না আমার নাম হাসান।
-ও আচ্ছা। বয়স হয়েছে তো শুধু ভুল করি। কিছু মনে করো না।
-মনে করার কিছু নেই। মিসটেক।
-মিসটেক! উনি কি বিদেশী কোনো তরুণী?
-মিসটেক হলো ভুল, তরুণী হতে যাবে কেন?
-মিস শুনেই না তোমার নানীর কথা মনে পড়ে গেল। কী অপরূপ দেখতে। বিয়ের আগে, তখন ব্রিটিশ আমল। মিস আর মিসেসের ছড়াছড়ি। ওকে সবাই ডাকত মিস কুলসুম নামে। নতুন বছর আর এখনকার কড়া শীতে আমাদের বিয়ে হলো। আমি তো প্রথম দেখাতেই অজ্ঞান।
বুড়োর সাথে কথা না বললে বোঝা যাবে না একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ এমন হড়হড়ানে কথা বলতে পারে।
হাসান বলে, তারপর আপনার জ্ঞান ফিরল কখন?
মিতুর গলা শোনা যায়, জ্ঞান আর ফেরেনি।
এই মেয়েটাকে মোবাইল কোম্পানির কাস্টমার কেয়ারে বসিয়ে দিলে কী হতো কে জানে! কেউ একজন ফোন করল, ম্যাডাম আমার মোবাইলে কী একটা সমস্যা।
মিতু খ্যাঁকানো গলায় বলবে , তা আমি কী করতে পারি? ইস ওনার মোবাইলে একটা সমস্যা...
-এটা মোবাইল কোম্পানির কাস্টমার কেয়ার না?
-হ্যাঁ, তা কী হয়েছে?
ধমকে লোকটা খানিক ভড়কে যাবে। ভাববে কাস্টমার কেয়ারের মেয়েরা এমন হয়! হয়তো তার ভুল হয়েছে। মিসটেক।
মিতুর গলা শোনা যায় নরম সুর তার গলায় নেই, শুনুন আমার ইয়ে আছে।
-ইয়ে আছে! ঠিক বুঝলাম না।
-যার জন্য ওই এসএমএস লেখা। বুঝেছেন।
-জি, বুঝেছি।
-নানা টেপাটেপি করে মেসেজটা বেশ কয়েকজনকে ফরোয়ার্ড করে দিয়েছেন। এ জন্য কেউ ফোন করলে তাকে ধরিয়ে দিচ্ছি। মিসটেক সে করেছে আমি কেন যন্ত্রণা পোহাতে যাবো।
-হুম, শাস্তি হিসেবে ওনার কানের সাথে মোবাইলটা লটকিয়ে দিতে পারো।
আবার মিতুর গর্জন, একদম রসিকতা করবেন না। আপনি ভুল জায়গায় নক করেছেন। গ্রেট মিসটেক।
কল কেটে দেয়।
হাসান ওপরের দিকে তাকায়। আকাশ দেখবে। থোপ থোপ কালো মেঘে ঢাকা আকাশ। সে এখন চার দেয়ালের মাঝে আবদ্ধ। ওপরে জমাটবাঁধা সিমেন্ট বালি। মিতুর কথা মনে পড়ে, যদিও ছাদের সিমেন্ট বালির মতো জমাট বাঁধা শক্ত তার মন। বিড়বিড় করে বলে, মিসটেক। মিতুর নামটা মিস টেক হলে মন্দ হতো না।