হেমন্তের শেষ বিকেল। আকাশে পাতাঝরা দিনের বিষণœতার আনাগোনা। সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়েছে। মন খারাপ করা বিকেল দ্রুত ফুরিয়ে শহরজুড়ে নেমে আসছে উদাসীন সন্ধ্যা। কুয়াশাভেজা শীতের আগমনী বার্তা জানান দিচ্ছে, এবার নিশ্চিত হাড় কাঁপাবে। আকাশে হালকা মেঘ-বৃষ্টি নেই, কিন্তু মেঘ-বাতাসে জলের ঘ্রাণ রয়েছে। কোথা থেকে এসেছে এত জল? উৎস কোথায়? হাসপাতালের চৌহদ্দির ভেতর দেয়ালে কান পাতলে হয়তো উত্তর মিলবে কিছুটা। প্রিয়জন হারানোর নোনাজলে সিক্ত চার পাশ। স্যাঁতসেঁতে। ভঙ্গুর হৃদয়ে উতালপাতাল ঝড় বইছে আমার। সকাল থেকে জিইয়ে থাকা গুমোট ভাবটা পাথরচাপা বুকে ক্রমেই প্রকট হতে শুরু করেছে। আজ বাবার অবস্থা ভালো না। মনে কু ডাক দিচ্ছে কিছুক্ষণ পরপর। বসে আছি বাবার শিয়রে। হাত চালিয়ে চুলে বিলি কেটে যাচ্ছি। জাগতিক কোনো শব্দই এ মুহূর্তে কানে আসছে না আমার। যেন নিঃসঙ্গ একাকী আমি কালাহারি মরুভূমির মতো একা বসে আছি, তেপান্তরের মাঠে। নৈঃশব্দে বাজে অনন্ত নির্ঝর পাতাঝরা দিনের বিষাদের সুর। যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো অনর্থক ঘটে যেতে পারে। কুমিল্লা কুচাইতলী সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স ও সিস্টারদের হঠাৎ ব্যতিব্যস্ততা খারাপ কিছুর দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। সকাল থেকে আজ একবারের জন্য কোত্থাও বের হওয়ার চেষ্টা করিনি। এ দিকে একটু পরপর ফোন বেজে উঠছে। পাশে কে যেন ফোনে কাকে বলছে, অদুদের অবস্থা আজ ভালো না, দোয়া করো সবাই। আমার বাবার নাম আবদুল ওয়াদুদ। অদুদ নামেই পরিচিত বেশি। পরিবার-আত্মীয়স্বজনদের সবার আগ্রহের কেন্দ্রে এখন আমার বাবা। সবাই অধীর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। কান পেতে আছে। একটু ভালো খবর শুনতে চায়। অনিচ্ছাসত্ত্বেও বেশির ভাগ ফোন-কল ইগনোর করছি। হঠাৎ স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি আমার বেবী আপার ফোন। ফেরদৌসী আক্তার বেবী। এই একটিমাত্র মানুষটাকে অবহেলা করার সাধ্যি নেই আমার। জগতের কিছু মানুষকে অবহেলা করা যায় না। গুনাহগার হতে হয়। তাকেও না। বেবী আপা আমার আপন জেঠাতো বোন। এই দুঃসময়ে থাকা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আপনজন। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আপার চাপা স্বর ও ক্ষীণ উদ্বেগ ভেসে আসে, ‘কী রে দুপুর গড়িয়ে বিকেল যায়, তুই খাবি কখন? গোসল করবি না? আয়, জলদি ফ্রেশ হয়ে খেয়ে যা। এভাবে চলতে থাকলে তুই যেকোনো মুহূর্তে মাথা ঘুরে পড়ে যাবি তো। নিজের সর্বনাশ আর করিস না। আয় আয় জলদি খেতে আয়। আপা তোর জন্য সেই কখন থেকে বসে আছি। কাকার কী অবস্থা?’ আমি কোনোমতে আমতা আমতা করে বলি, ‘জি আপা ভালো, আমি এক্ষুণি আসছি, এই তো আর একটু- অপেক্ষা কর...।’
আপার একনাগাড়ে বলে যাওয়া কথাগুলো আমার কানে ঢুকে না, মাথার ওপর দিয়ে যায়।
কুমিল্লা সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। বিশ্ব রোড জাঙ্গালিয়া বাসস্ট্যান্ড পেরিয়ে শহরের প্রবেশমুখে টমছমব্রিজ চৌরাস্তা থেকে পুবের রাস্তা ধরে আরো প্রায় দুই কিলোমিটার পথ এগোলে রাস্তার বামপাশে কুচাইতলীতে অবস্থিত। বাবার বেড পুবের নতুন সাদা ভবনের অষ্টমতলা ২৯ নম্বর পুরুষ ওয়ার্ডে। হাসপাতালের প্রায় দুই শ’ গজের ভেতর বেবী আপার সুন্দর পাঁচতলা বাসাটি অবস্থিত। বাবার বেড থেকে জানালার কাচ গলিয়ে পূর্ব দিকে তাকালে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সুরম্য বাসাটি স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। যেতে আসতে মাত্র মিনিট দশেকের পথ। অথচ তবুও মনে হয় কত সুদীর্ঘ পথ। পথের মাঝে আরো কত শত পথ! এবড়োথেবড়ো পথ। এ পথ যেন সহজে শেষ হয় না, শেষ হওয়ার নয়। পা ভেঙে ভেঙে আসে। যাবো যাবো করে আজো আর যাওয়া হলো না। বাবা নামের বটবৃক্ষটাকে আড়াল করতে মন কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না। বাবার পাশে চুপচাপ বসে মহান আল্লাহকে স্মরণ করছি। গত চার দিন চার রাত ঘুমহীন চোখে বাবাকে এভাবেই পাহারা দিয়ে যাচ্ছি। সেবা-শুশ্রƒষা করে যাচ্ছি ক্লান্তিহীন। বাবাকে প্রায় বলতাম, ‘বাবা রাতের একটা বাজুক, দু’টা বাজুক কিংবা চারটা- চোখ মেলে ইনশা আল্লাহ আগে আমাকে পাশে দেখতে পাবে। তুমি অযথা চিন্তা করো না, আমি আছি। মনে মনে মহান আল্লাহকে স্মরণ করো, নিশ্চয় শান্তি পাবে।’ বুঝতে পারতাম আমার সামান্য কয়েকটি কথাতে বাবা বেশ আশ্বস্ত হতো, ভরসা পেত। পরম নির্ভরতায় চোখ বুঝে ক্ষণে ক্ষণে চোখের লবণজল ফেলত। আরো একজন মানুষ আছে। তার কথা না বললেই নয়। আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন। হাসপাতালের প্রথম দিন থেকে রোবটের মতো চলছে ভাইয়ের বিক্ষিপ্ত ছোটাছুটি। ঢাকা চাকরি করার সুবাদে ঢাকা টু কুমিল্লা, কুমিল্লা টু ঢাকা ক্লান্তিহীন যাতায়াত আপডাউন চলছে। হাসপাতালে এসেও বাবাকে নিয়ে সীমাহীন ব্যস্ততা। আটতলা থেকে নিচতলা, হাসপাতালের এ-মাথা থেকে ও-মাথা। নিরন্তর চষে বেড়াচ্ছে। একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে টানা দৌড়ঝাঁপ। আমরা প্রত্যেকে যেন একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছি। সময় কখন যে বয়ে যায়, বুঝতে পারি না।
রাত ৮টার পর থেকে বাবার অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকে। শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রমশ বাড়তে থাকে, শরীরে খিঁচুনি উঠে আশঙ্কাজনকভাবে। সকাল থেকে বাবাকে অক্সিজেন দেয়া হয়েছে, তার পরও এখন হঠাৎ অক্সিজেন লেবেল সেকেন্ডের গতিতে হ্রাস পেতে থাকে। উভ্ম্রান্ত পাগলের মতো আমরা হাতেগোনা কয়েকজন মানুষ ছোটাছুটি করতে থাকি। যেন একটা ব্যূহ চক্রের ভেতরই ক্লান্তিহীন ছুটে চলেছি। এরই মধ্যে ত্বরিতগতিতে বেবী আপা চলে আসে। গ্রামের বাড়ি থেকে সকালে বাবাকে হাসপাতালে দেখতে আসা অসুস্থ মাকে সামলাতে সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ডাক্তারের নির্দেশনা তামিলে ব্যস্ত বড় ভাই লিফটের অপেক্ষায় না থেকে পাগলের মতো সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নিচে নেমে যায়। ফার্মেসিতে এটি খোঁজে ওটা খোঁজে। খোঁজার শেষ নেই। এ দিকে বাবার মাথা কোলে নিয়ে অনবরত পবিত্র কালেমা শাহাদতের তালকিন দিয়ে যাচ্ছি আমি। চোখ রাখছি বাবার হাতের আঙুলে রাখা অক্সিমিটারের দিকে। দেখি নব্বই থেকে নামতে নামতে পঁয়ত্রিশে নেমে পড়েছে। বলতে না বলতে পনেরো দশ। তার পর নয় আট সাত...! আরো উচ্চস্বরে কালেমার তালকিন দিতে থাকি আমি। আহা রে (!) বাবা চলে যাচ্ছে...। দুনিয়ার সমস্ত মায়ার বাঁধন, ব্যস্ততা ছিন্ন করে অভিমানী বাবা পাড়ি জমাচ্ছেন ওপারে। বাবার চোখেমুখে চুমুতে চুমুতে ভরে দিতে থাকি। কখন যে বাবার অস্থিরতা খিঁচুনি ও দ্রুত ওঠানামা করতে থাকা শ্বাস-প্রশ্বাস ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যায় বুঝতে পারিনি। রাত ৯টা বাজে তখন। হঠাৎ এক মুহূর্তের জন্য বাবা চোখ দুটো মেলে তাকায় আমার দিকে। তার পর একদম চুপ। কোনো সাড়াশব্দ নেই। নেই কোনো প্রাণের স্পন্দন। চিরতরের জন্য নিথর, নিশ্চুপ ও স্তব্ধ হয়ে যায়। বাবা আর নেই। একদম নেই। আমার বটবৃক্ষ বাবা একজন আবদুল ওয়াদুদ নামের হাস্যোজ্জ্বল সদালাপী মানুষটি আর নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন...। অভিমানী বাবা চিরদিনের মতো চলে যায় মহান সৃষ্টিকর্তার কুদরতি কোলে। মুহূর্তে খবর চতুর্দিকে চাউর হয়ে যায়। ফোনে রিং বাজতে থাকতে একটার পর একটা। এলাকার সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী ভূশ্চি বাজার বায়তুস সালাম কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সম্মানিত ইমাম ও খতিব আলহাজ আবু তাহের রহমতপুরী সাহেবের কণ্ঠে সর্বপ্রথম ভেসে উঠে, একটি শোক সংবাদ...!
আহা রে (!) বাবারা বুঝি এমনি। জীবনের একটা পর্যায়ে এসে অবোধ শিশুর মতো হয়ে যায়। নিজেকে একা, অসহায়ও ভাবতে শুরু করে। বড্ড আবেগী আর অভিমানী হয়। বাবা একটু অসুস্থবোধ হলে মুহূর্তে মৃত্যু ও পরকালভীতি পেয়ে বসতো মনে। রীতিমতো ঘাবড়ে যেত। ঘুটঘুটে অন্ধকার কবরের কথা মনে করে করে নীরবে চোখের অম্রু ফেলত। রাতে বিছানায় শুতে গেলে ডানে বামে ছটপট করত। তাকে ঘিরে চার পাশে পরিবারের সদস্যদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হতো। রুমের দরজা বন্ধ দূরে থাক, সামান্য একটু ভেজিয়ে রাখতে পারত না কেউ। বাবা ভয় পেত। খুব ভয় পেত। রুমে ১০০ ওয়াটের বাতিটা জ্বালিয়ে রাখতে হতো সবসময়। বাবার পাশের রুমে আমি থাকি। সামান্য অস্বস্তি হলে সহসায় বুঝতে পারতাম। ত্বরিত বেগে ছুটে যেতাম বাবার কাছে। একটু এদিক-ওদিক হলে বাবা আমাকে ঘন ঘন ডাকত। বলত, বাজান আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধর। আমার ভয় করে। অথচ সেই বাবা আজ সমস্ত ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে চলে গেছেন। বাবারা চলে গিয়ে বারবার বুঝিয়ে দেয়, চলে যাওয়াটাই সত্যি আর দুনিয়ার বাকি সব মিছে, মরীচিকা।
‘বাবা’ এমনি একটি শব্দ। যে মানুষটি আমার জন্ম থেকে তার শীতল ছায়া দিয়ে দিয়ে বড় করেছে। শৈশবে বয়স আমার তখন ছয়-সাত বছর। বাবা স্থানীয় ভূশ্চি বাজারে থান কাপড়ের ব্যবসা করত। দুপুরে খাবার খেতে বাড়ি আসার সময় হলে আমি কাউকে না জানিয়ে চুপিচাপি বাড়ির পাশে হতুরবার (হতুর বাপের) বাড়ির ঘাটায় চলে আসতাম। পুব দিকের কাঁঠালতলায় এসে বাজারমুখী হয়ে একদৃষ্টে পাখির চোখে তাকিয়ে থাকতাম। একটা সময় প্রতীক্ষার প্রহর পেরিয়ে বাবাকে দেখতে পেতাম। গায়ে সেই চিরপরিচিত প্রিয় হালকা-পাতলা সাদা রঙের হাফহাতা চেক শার্ট আর পরনে নীল লুঙ্গি। মাথার কালো লম্বা চুলগুলো তেলে ভেজা ও সুন্দর করে সিঁথি করা। ১০-১২ হাত দূরে থাকতে বাবার গায়ের অদ্ভুত সুন্দর গন্ধটা নাকে এসে লাগত। বাবা হাসতে হাসতে কাছে আসত। এসেই চট করে আমাকে পাঁজাকোলা করে শূন্যে তুলে নিয়ে বাড়ি অভিমুখে হাঁটা দিত। আমি অতিশয় আরামে ও আনন্দের আতিশয্যে আকাশের দিকে চোখ বুজে থাকতাম। মনে মনে পণ করতাম ঘরে ঢুকেই চোখ খুলব, তার আগে নয়। বাবা আমার চালাকি সহজে বুঝে ফেলত। কিছুদূর এসেই জিজ্ঞেস করত- বাজান, চোখ খুলেছিস? আমি বলতাম- উহু। বাবা ফের বলত, খবরদার! একদম চোখ খুলবি না। আমি মনে মনে হাসতাম। বাবা একেকটি পা ফেলত আর আমিও হিসাব কষে কষে বোঝার চেষ্টা করতাম-কতটুকু পথ এলাম। একসময় ঠিক সেই চোখ খুলতাম ঘরের দেউড়িতে বাবা পা রাখার পর।
একটা সময় বাবা মানুষের বাড়িতে বছর লাগিত কাজ করেছে। প্রায় পেটে ভাতে বলা যায়। খুব সামান্য মজুরি ছিল। সে সময়কালে ভাতের বড্ড অভাব ছিল। সামান্য কিছু পুঁজি জোগাড় হলে, পাশের ভূশ্চি বাজার, গৈয়ার ভাঙা বাজার ও বাগমারা বাজার থেকে ধান কিনে, সেই দেড় দুই মণ ধান কাঁধে ভার করে এনে, সিদ্ধ করে শুকিয়ে- ধানকলে চাল ভেঙে, পরদিন সকালে আবার সেই চাল কাঁধে ভার করে লাকসাম বাজারে বিক্রি করেছে। আহা রে (!) কত কষ্ট। ধান চালের ব্যবসা করলেও কখনো দু’বেলা ভাত জুটত না আমাদের। মা সারাদিন হাঁড়ভাঙা কাজ করে পুরো প্রক্রিয়ার সাথে বাবাকে সহযোগিতা করত। আর অধীর আগ্রহে থাকত, কখন বাবা বস্তার মুখ খুলে দু’মুঠো চাল দেবে ভাত রাঁধার জন্য। বাবার অদেখা মা কখনো কোনো দিন একমুঠ চালও এদিক-ওদিক করত না। বাবা চাল দিলে সেই ভাত হতে হতে দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল ঘনিয়ে আসত। গরম ভাতের ফেন থেকে উঠে আসা সু-ঘ্রাণে ক্ষণে ক্ষণে পেট মোচড় দিয়ে উঠত। এ দিকে আমরা মাটির থালা সাজিয়ে পাঁচ ভাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা গোল হয়ে বসে থাকতাম। আমাদের মুখে ভাত তুলে দিয়ে, সবার অলক্ষ্যে বাবা-মা সেই ধবধবে সাদা ফেন পেটে চালান করে দিত। বলত- আমাদের অনেক কাজ, তোরা বরং ঝটপট খেয়ে নে। আমরা গা-গোসল শেষে পরে খেয়ে নিবো। মাঝে মধ্যে আমাদের ভাতের বদলে জুটত সামান্য খুদ ভাত। তার সাথে মা রসুন আর শুকনো মরিচ বেটে এক ধরনের বিশেষ ভর্তা করত। খুদ ভাত আর লাল ভর্তা এককথায় অমৃত ছিল। তা খেয়ে গোটা আস্ত একটা দিন অনায়াসে পার করে দিতাম আমরা। বাবা-মা সবই বুঝত। বুঝতাম না শুধু আমরা। আমাদের অলক্ষ্যে চোখের জলে দুঃখকষ্টগুলো মুছে ফেলতেন তারা। কখনো কখনো বাবা না খেলে মাও ভাত মুখে তুলত না। এ কাজটা মা-বাবা দু’জন প্রায় নিয়মিত করত। অনেক সময় আমাদের শুনিয়ে শুনিয়ে বাবা বলত, বাজান ভাতের ফেনে অনেক ভিটামিন আছে। বড়দের শরীরে কাজ করার মুরোদ জোগায়।
কসম আল্লাহর সংসারে একগাদা দুঃখ-কষ্ট ছিল, অভাব-অনটন ছিল, কিন্তু কারো প্রতি কোনো প্রকার অভিযোগ-অনুযোগ ছিল না। পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতাম বাবার ঘামে ভেজা হাড়ভাঙা সংগ্রামী জীবনের গল্পগুলো। আর সেই গল্পের একজন হয়ে যেতাম কখনো কখনো। নিজের অজান্তেই সেই গল্পের আল ধরেই হেঁটে চলতাম আমরা। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে আবার পড়ালেখায় মন দিতাম। রাতের ঘোরলাগা মনোরম পরিবেশে একটা ঠাণ্ডা শীতল অনুভূতি দেহকে আবিষ্ট করে রাখত। অথচ এখন বাবা নেই বলে, গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে আমার গা পুড়ে ছারখার হবে। দগ্ধ হবে। ক্ষত-বিক্ষত হবে। কেউ আর বটবৃক্ষের ছায়া নিয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়াবে না। পাঁজাকোলা করে কেউ আর শূন্যে তুলে নেবে না। আমি প্রখর সূর্যের তেজে মোমের মতো গলে গলে নিঃশেষ হয়ে যাবো ধীরে ধীরে। আমার অস্তিত্ব বলে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
