স্থাপত্য একটি শিল্প, এ ব্যাপারে কোনো বিতর্ক না থাকলেও এর সংজ্ঞা নিয়ে স্থাপত্যবিদগণের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থাপত্য শিল্পকলা এবং বিজ্ঞানের সমন্বয়। স্থাপত্যকে এ কারণেই সব শিল্পকর্মের উৎস বা Mother of all arts বলা হয়েছে। স্থাপত্যের সংজ্ঞায় কোনো কোনো ঐতিহাসিক যেকোনো নির্মিত বস্তুকে স্থাপত্য বলে অভিহিত করেছেন। আবার কেউ কেউ সুদৃঢ় ও সুশোভিত প্রাসাদকে স্থাপত্য বলে চিহ্নিত করেছেন। স্থাপত্যশিল্প বুঝাতে ইংরেজিতে Architecture পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়। যার শাব্দিক বা আভিধানিক অর্থ হলো, ‘ভবনের নকশা বা নির্মাণ-কৌশল বা নির্মাণরীতি’। এ প্রেক্ষিতেই ড. এ কে এম ইয়াকুব আলী বলেছেন, সাধারণত Architecture বলতে আমরা মনুষ্যনির্মিত যেকোনো ধরনের স্বল্প পরিসরের কুঁড়েঘর বা প্রশস্ত অট্টালিকা বুঝি।
প্রফেসর ডব্লিউ. আর লেথাবি স্থাপত্যের সংজ্ঞায় লিখেছেন, Architecture is the practical art of building touched with emotion, not only past, but now and in the future. যদিও স্থাপত্য বলতে কেবল ইমারতেকই বোঝায় না, কারণ ভূমি পরিকল্পনা ও নির্মাণ প্রক্রিয়া ছাড়াও অসাধারণ ভাস্কর্য, চিত্রকলা এবং বিভিন্ন ধরনের নকশা বুঝায়। কিন্তু বর্তমান প্রবন্ধে স্থাপত্যশিল্প বলতে সাধারণভাবে বাড়িঘর, অট্টালিকা-প্রাসাদ, সুউচ্চ ও মনোরম স্থাপনাকে বুঝানো হচ্ছে। ভূমি পরিকল্পনা ভাস্কর্য, চিত্রকলা, নকশাসহ স্থাপত্যশিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলিকে বুঝানো হচ্ছে না।
মানুষ যুুগে যুগে যেসব শিল্পের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে, তন্মধ্যে অন্যতম হলো স্থাপত্যশিল্প। কারণ মানুষের এ পৃথিবীতে আগমনের পর হতেই শীতকালে ঠাণ্ডা হতে, গ্রীষ্মকালে গরম হতে, বর্ষাকালে বৃষ্টি হতে এবং রাতের অন্ধকারে পশু-প্রাণীর আক্রমণ হতে নিজেদেরকে বাঁচাবার জন্য এ শিল্পের প্রয়োজন হয়েছে। তা ছাড়া বিভিন্ন উপাসনা, শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা বা অন্য কোনো প্রয়োজনে এক স্থানে একত্রিত হওয়ার জন্যও তাদের এই স্থাপত্যশিল্পের প্রয়োজন হয়েছে। মানবসভ্যতার ইতিহাস অধ্যয়ন করলে জানা যায় যে, মিসরীয়, ব্যাবিলিয়ন, গ্রিক, রোমান ও সাসানি ইত্যাদি জাতি এ শিল্পের প্রতি সেই প্রাচীনকাল থেকেই যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করেছিল। গ্রিক জাতি শিল্প- সংস্কৃতিতে অতি উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। তারা স্থাপত্য শিল্পেও বেশ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিল। তারা এ শিল্পের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও শৈল্পিক দিকটির প্রতি গুরুত্বারোপ করেছিল। এ শিল্পে নির্মাণের কৌশলও তারা আবিষ্কার করেছিল। অতঃপর প্রত্যেক জাতি ও গোষ্ঠী তাদের নিজেদের স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে স্থাপত্যশিল্প নির্মাণ করতে থাকে। ফলে প্রত্যেক জাতির নিজস্ব স্থাপত্যশিল্প তৈরি হয়েছে এবং তাতে তাদের ধর্মীয় দর্শনের প্রতিফলন ঘটেছে সুস্পষ্টভাবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ইসলাম ধর্ম বৈরাগ্যবাদ সমর্থন করে না। কারণ নবী সা: বলেছেন, আমাকে বৈরাগ্যবাদ অবলম্বনের আদেশ দেয়া হয়নি।
ইসলাম মুসলিমদেরকে শিখিয়েছে যে, মানুষ চাইলে তার সমস্ত কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই তার প্রতিপালকের নিকটবর্তী হতে পারে, তার সন্তুষ্টি পেতে পারে, যদি তা দ্বীনের শিক্ষা ও বিধান অনুযায়ী আদায় করা হয়। সুতরাং আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য এবং তার সন্তুষ্টি পাওয়ার জন্য বৈরাগ্য সাধনের প্রয়োজন নেই। দুনিয়াদারি ছেড়ে দিয়ে ইবাদত-বন্দেগিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ার এবং দেহকে বিভিন্নভাবে কষ্ট দেয়ারও কোনো প্রয়োজন নেই। আল্লাহকে পাওয়ার জন্য আল্লাহ কর্তৃক মানুষের জন্য প্রদত্ত কোনো নিয়ামতকেও হারাম করার কোনো প্রয়োজন নেই। অন্য দিকে আমরা হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মের ধর্মীয় দর্শনে দেখতে পাই যে, স্রষ্টার সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য লাভ করতে হলে বৈরাগ্য সাধনা করতে হবে। দুনিয়ার ভোগবিলাস ত্যাগ করে পাহাড়-পর্বতে চলে যেতে হবে। সেখানে রাত দিন স্রষ্টার উপাসনায় ব্যস্ত থাকতে হবে। দুনিয়ার সমস্ত ভোগবিলাস ছেড়ে দিয়ে; মানবদেহকে নানাভাবে কষ্ট দিয়ে স্রষ্টার ধ্যান উপাসনায় মগ্ন থাকলেই তবে পাওয়া যাবে স্রষ্টার সন্তুষ্টি। তাই এসব ধর্মে অনুসারীদেরকে দুনিয়ার সমস্ত ভোগবিলাস ত্যাগ করে মানবদেহকে নানাভাবে কষ্ট দিয়ে পাহাড়-পর্বতে উপাসনায় ব্যস্ত হতে দেখা যায়।
উপর্যুক্ত এই দর্শনের প্রভাব আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর স্থাপত্যশিল্পেও। বিশেষত তাদের ইবাদত বন্দেগি ও পূজার জন্য নির্মিত বাড়িঘরে। তাই আমরা মুসলিমদের মসজিদগুলো দেখতে পাই যে, তা নির্মিত হয় ভেতর-বাইরে অতি সহজভাবে এবং সাদাসিধে করে, তাদের ধর্মের শিক্ষা ও ধর্মীয় দর্শনের আলোকে। তার অভ্যন্তর ভাগে থাকে না তেমন কোনো কারুকার্য, যাতে ভেতরে সালাতরত মুসলিমদের মন সে দিকে মগ্ন হয়ে না পড়ে। আর তার বাহির ভাগ নির্মিত হয় ইসলামী দর্শনের আলোকে প্রায় মিনারা বা আজানখানা সহকারে। আর তা-ও নির্মিত হয় জনগণের সমাবেস্থলে, সড়কের পাশে, বাজারে, চৌরাস্তার মোড়ে এবং এমন সব স্থানে যেখানে সহজেই পৌঁছা যায়। আর তাতে রাখা হয় সামনের বা কিবলার দিক ছাড়া বাকি তিন দিকে পর্যাপ্ত পরিমাণের জানালা ও দরজা। যাতে তাতে প্রচুর পরিমাণে আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে। অতএব, মুসলিমরা তাদের দুনিয়াবি কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করার পাশাপাশি তাদের ধর্মীয় এবং দুনিয়াবি কর্মকাণ্ড একই সাথে তাদের প্রতিপালকের আদেশ-নিষেধ মতে আদায় করে তার নৈকট্য লাভ করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় আর আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার।
অন্য দিকে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানরা তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তথা মন্দির, মঠ ও গির্জাগুলো নির্মাণ করে পাহাড়ের চূড়ায়, জঙ্গলে এবং লোকালয় থেকে বহু দূরে। আর যদি লোকালয়ের মধ্যে নির্মাণ করা হয়; তবে তার স্থাপত্য রীতিটি করা হয় প্রায় অন্ধকার করে, যাতে মানবসমাজ থেকে অন্তত রূপকভাবে হলেও দূরে অবস্থান করে দুনিয়ার ভোগবিলাস থেকে দূরে থেকে তাতে একান্ত মনে উপাসনায় নিয়োজিত হওয়া যায়। এভাবেই হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানরা যেমন তাদের স্থাপত্যশিল্পগুলো তাদের ধর্মীয় দর্শনের আলোকে তৈরি করেছে, তেমনিভাবে মুসলিমরাও তাদের ধর্মীয় দর্শন অনুযায়ী তাদের ধর্মীয় ইবাদতের স্থান মসজিদগুলোর স্থাপত্য রীতি আলাদা করে নিয়েছে। ফলে তাদের নিজস্ব স্থাপত্যশিল্প তৈরি হয়েছে।
আমরা যদি প্রাচীন মিসরীয় স্থাপত্যশিল্পগুলো দেখি তার সাথে গ্রিক স্থাপত্যশিল্পের তুলনা করি তাহলে আমরা দেখতে পাবো যে, এতদুভয়ের নির্মাণ কৌশলে বিরাট ব্যবধান রয়েছে। প্রথমোক্তদের স্থাপত্য শিল্পগুলো যেমন আকারে বড়, তেমনি শক্ত মজবুতও বটে। তা থেকেই বুঝা যায় যে, তারা একটি ধর্মে দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাসী ছিল। তাদের জীবনযাপন রীতি থেকে মনে হয়, তারা এ জীবনের পরে আরো একটি জীবনে বিশ্বাসী ছিল। অন্য দিকে গ্রিক জাতির স্থাপত্যশিল্পের দিকে তাকালে মনে হয়, তারা তা অতি সূক্ষ্মভাবে সুন্দর ও সুনিপুণভাবে তৈরি করেছে। কারণ তারা কেবল দুনিয়ার এ জীবনেই বিশ্বাসী ছিল। তাদের জীবনযাপন রীতিতে যুক্তির প্রখরতা ও বস্তবাদী দর্শনের প্রতিফলন হয়েছে। মোট কথা হলো, যেকোনো জাতির স্থাপত্যশিল্পে তাদের ধর্ম বিশ্বাস ও ধর্মীয় দর্শনের প্রতিফলন ঘটে। তেমনিভাবে শিল্পীর ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি ও চিন্তাভাবনার প্রতিফলনও ঘটে। আর যে যুগে তা নির্মিত হয়েছে সে যুগের মন মানসিকতা চিন্তাভাবনাও তাতে সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। তাই প্রত্যেক জাতি ও প্রত্যেক যুগের আলাদা বিশেষ স্থাপত্যশিল্প তৈরি হয়। তাতে তাদের চিন্তাদর্শন, ধর্মীয় বিশ্বাস ও অর্থনৈতিক ভাবনার প্রতিফলন ঘটে এবং তাদের জীবনবোধ ও সৌন্দর্যবোধ প্রতিভাত হয়।
স্থাপত্যশিল্প সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক; নেতিবাচক নয়। ইসলাম মুসলিমদেরকে স্থাপত্যশিল্প নির্মাণের অনুমোদন দেয়। তাতে শৈল্পিক ভাবনার প্রতিফলন ঘটানোর অনুমোদনও দেয়। বাড়িঘর এবং অট্টালিকা কারুকার্যময় করার অনুমতিও দেয়। তবে তা সবই হতে হবে অহংকার প্রকাশ না করার ও বিলাসিতা প্রকাশ না করার শর্তে এবং অপব্যয় ব্যতিরেকে। আল কুরআন এবং মহানবী সা:-এর হাদিসে এর প্রতি বারবার ইঙ্গিত করা হয়েছে। আল কুরআনে ‘হুসূন’ বা কিল্লা, সায়াসি বা দুর্গ, বুরুজ বা উচ্চ অট্টালিকা ও দুর্গ, কুসূর বা অট্টালিকা, গুরুফ, বা কক্ষ, জুদুর বা দেয়াল, সারাহ বা প্রাসাদ, কুরা মুহাসসানা বা ‘সুরক্ষিত জনপদ’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার হয়েছে। যেমন এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবে, যদিও তোমরা সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান কর। অর্থাৎ তোমরা সুদৃঢ় উচ্চ দুর্গে অবস্থান করলেও তোমাদের মৃত্যু অবশ্যই আসবে। তোমরা মৃত্যু থেকে কিছুতেই রেহাই পাবে না, পালাতে পারবে না। এ আয়াত থেকে প্রমাণ হয়, সুদৃঢ় উচ্চ দুর্গ ও অট্টালিকা নির্মাণ করা ও তাতে বসবাস করা বৈধ। আল্লাহ তায়ালা অপর এক আয়াতে বলেন, তাকে বলা হলো, ‘প্রাসাদটিতে প্রবেশ কর’। অতঃপর যখন সে তা দেখল, সে তাকে এক গভীর জলাশয় মনে করল এবং তার পায়ের নলাদ্বয় অনাবৃত করল। সুলাইমান বললেন, ‘এটি আসলে স্বচ্ছ কাচ-নির্মিত প্রাসাদ। এ আয়াতটিও প্রমাণ করে যে, অতি উচ্চমানের শিল্পসম্মত সুরম্য বাড়ি ও প্রাসাদ নির্মাণ করা বৈধ। কারণ সুলাইমান আ: একটি স্বচ্ছ কাচের উচ্চমানের শিল্পসম্মত প্রাসাদ নির্মাণ করে তার তলদেশ দিয়ে পানি প্রবাহিত করেন। তা এমন সুকৌশলে নির্মাণ করেন যে, যারা এর সম্পর্কে অবগত নয়, তারা মনে করে যে, তা পানি। অথচ পানি এবং পথচারীর মধ্যে স্বচ্ছ কাচের আবরণ রয়েছে। ফলে তার পায়ে পানি লাগার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ থেকে বুঝা যায় যে, সুলাইমান আ: নির্মিত এ প্রাসাদটিতে অতি উচ্চমানের শিল্পনৈপুণ্যের সমাবেশ ঘটেছিল। এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, এ জাতীয় শিল্পমানের প্রাসাদ তৈরি করা এবং প্রাসাদকে কারুকার্যময় করা, তাতে বসবাস করা ইসলামে বৈধ।
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, আর স্মরণ কর, যখন আদ জাতির পর তিনি তোমাদেরকে স্থলাভিষিক্ত করলেন এবং তোমাদেরকে জমিনে আবাস দিলেন। তোমরা তার সমতল ভূমিতে প্রাসাদ নির্মাণ করছ এবং পাহাড় কেটে বাড়ি বানাচ্ছ। সুতরাং তোমরা আল্লাহর নিয়ামতগুলোকে স্মরণ কর এবং জমিনে ফাসাদকারীরূপে ঘুরে বেড়িও না। উপর্যুক্ত আয়াতে ‘তোমরা তার সমতল ভূমিতে প্রাসাদ নির্মাণ করছ এবং পাহাড় কেটে বাড়ি বানাচ্ছ’ এ কথা বলার পর ‘সুতরাং তোমরা আল্লাহর নিয়ামতগুলোকে স্মরণ কর’ এ কথা বলা থেকে বুঝা যায়, প্রাসাদ আল্লাহ তায়ালার একটি বড় নিয়ামত। প্রাসাদ তৈরি করা বৈধ না হলে তাকে আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে উল্লেখ করা হতো না।
অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সা:ও তাঁর হাদিসে মু’মিনদেরকে এমন একটি অট্টালিকার সাথে তুলনা করেছেন, যার একটি অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে। তিনি বলেন, নিশ্চয় এক মু’মিন অপর মু’মিনের জন্য অট্টালিকাস্বরূপ, যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে। রাসূলুল্লাহ সা: তিনিসহ সব নবী-রাসূলকে একটি সুউচ্চ ও সুন্দর অট্টালিকার সাথে তুলনা করে বলেন, তারা বলল, এ প্রাসাদের নির্মাণ কৌশল কতই না চমৎকার হতো, যদি তাতে এই ইটটি বসানো হতো! অট্টালিকা নির্মাণ বৈধ না হলে রাসূলুল্লাহ সা: কখনো নবী-রাসূলদেরকে এবং মুসলিমদেরকে অবৈধ ও হারাম একটি জিনিসের সাথে তুলনা করতেন বলে মনে হয় না। ইসলামী শিল্পকলার কিছু কিছু পাঠক মনে করেন, বাড়িঘর ইত্যাদি সুনিপুণভাবে নির্মাণ করা, কারুকার্যময় করা, উচ্চ অট্টালিকা নির্মাণ করা ইসলামী শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ ইসলাম দুনিয়ার ভোগবিলাসিতাকে অপছন্দ করে। ইসলাম মুসলিমদেরকে ভোগবিলাস ত্যাগ করে ইবাদত-বন্দেগিতে ব্যস্ত হতে আহ্বান জানায়। কাজেই ইসলাম প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঘরবাড়ি তৈরি এবং তাতে কারুকার্য করতে নিষেধ করে।
ইমাম কুরতুরি রহ: বলেন, উচ্চ অট্টালিকা নির্মাণ অনেকেই মাকরুহ বলে মনে করেন। এ মত পোষণকারীদের মধ্যে বিশিষ্ট তাবিঈ আল-হাসান আল-বাসরি (২১-১১০ হি.) রহ: অন্যতম। তারা নবী সা:-এর নিম্নোক্ত হাদিসগুলো দ্বারা দলিল দিয়ে থাকেন। আল্লাহ কোনো বান্দাহকে অপদস্থ করতে চাইলে তখন তার সম্পদ বাড়িঘর, পানি ও মাটিতে ব্যয় করেন। অপর এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, যে ব্যক্তি তার প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি নির্মাণ করবে, কিয়ামত দিবসে সে তা তার ঘাড়ের উপর বহন করে নিয়ে আসবে। ইমাম কুরতুবি রহ: বলেন, এটা আমারও অভিমত। কারণ রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, মু’মিন যে অর্থই ব্যয় করে তার জন্য সে আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিদান পাবে। তবে বাড়িঘর নির্মাণের জন্য যা ব্যয় করে বা আল্লাহর নাফরমানি করতে গিয়ে যা ব্যয় করে তার জন্য সে কোনো উত্তম প্রতিদান পাবে না। রাসূলুল্লাহ সা: আরো বলেছেন, আদমসন্তানের জন্য কেবল এ জিনিসগুলো ছাড়া অন্য কিছু পাওয়ার হক নেই, বসবাসের জন্য একটি বাড়ি, সতর ঢাকার জন্য একটি পোশাক এবং রুটির টুকরা ও পানি।
কাইস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা খাব্বাব ইবনুল আরত রা:-এর কাছে তাঁকে অসুখের সময় দেখতে গেলাম। তখন দেখলাম যে, তিনি তাঁর একটি দেয়াল তৈরি করছেন। তখন তিনি বললেন, ‘মুসলিমকে সব কাজের জন্য প্রতিদান দেয়া হবে, কেবল এ মাটিতে যা করে তা ব্যতীত।’ ইতোমধ্যে তার পেটে সাতবার আগুনের ছ্যাঁকা (থেরাপি) দেয়া হয়েছে। তিনি আরো বললেন, যদি রাসূলুল্লাহ সা: আমাদেরকে মৃত্যুর জন্য দোয়া করতে নিষেধ না করতেন, তবে আমি মৃত্যুর জন্য দোয়া করতাম। (অপর বর্ণনায় অতিরিক্ত আছে) তারপর বলেন, আমাদের যেসব বন্ধু মারা গেছেন তাঁদের দুনিয়ার কোনো কিছু তাঁদের ক্ষতি করতে পারেনি। আমরা তাঁদের পরে এমন কিছু পেয়েছি যা রাখার জন্য এ মাটি ছাড়া আর কিছু পাই না। আনাস রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলল্লাহ সা: বলেছেন, সব খরচ আল্লাহর পথে খরচ বলে গণ্য হবে কেবল বাড়ির জন্য খরচ ব্যতীত। তাতে কোনো কল্যাণ নেই।
আবদুল্লাহ ইবন ওমর রা: থেকে বর্ণিত, নবী সা: বলেছেন, তোমরা বাড়িঘর নির্মাণে হারাম থেকে বিরত থাকো। কারণ তা সর্বনাশের মূল ভিত্তি। ইবন হাজার আল আসকালানি রহ: বলেন, যেসব বাড়িঘর বসবাসের জন্য প্রয়োজন নয়, যা মানুষকে ঠাণ্ডা গরম থেকে বাঁচায় না, সেসব বাড়িঘরের ক্ষেত্রেই হাদিসগুলোর উর্পযুক্ত বক্তব্যগুলো প্রযোজ্য। আনাস রা: থেকে একটি মারফু হাদিসে বর্ণিত আছে, ‘সব বাড়িঘর তার মালিকের জন্য ক্ষতিকর বলে পরিগণিত হবে, তবে যা তার বসবাসের জন্য আবশ্যক তা ব্যতীত। তিনি আরো বলেন, দাউদির কথা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সব রকমের বাড়িঘর নির্মাণ করা পাপ। আসলে ব্যাপার কিন্তু তা নয়। বরং এ ক্ষেত্রে কিছু বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে। যেসব বাড়িঘর প্রয়োজনে, তা সবই নির্মাণ করা পাপ নয়। বরং এরূপ কিছু কিছু বাড়িঘর নির্মাণ করা ছাওয়াবের কাজ। যেমন যে বাড়িঘর দ্বারা নির্মাতা ছাড়া অন্যরাও উপকৃত হয় তা দ্বারা নির্মাতা ছাওয়াব পাবেন। আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন।
শেখ আবদুর রহমান আল-বান্না এসব হাদিসের উপর টীকা লিখতে গিয়ে বলেন, ‘এই অভিসম্পাত তাদের উপর অর্পিত হবে যারা দুনিয়াতে চিরস্থায়ীভাবে থাকার আশায় বা অহঙ্কার প্রকাশের জন্য বা গরিব-দুঃখী মানুষের সামনে বড় লোক বলে জাহির করার জন্য বা যারা দুনিয়াতে চিরদিন থাকার চেষ্টা করে, তাদের সাদৃশ্য ধারণের জন্য বাড়িঘর নির্মাণ করে তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। যারা এরূপ করে তাদের নিন্দা করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর তোমরা সুদৃঢ় প্রাসাদ নির্মাণ করছ, যেন তোমরা স্থায়ী হবে।’
শেখ মুহাম্মদ আল-গাযালি বলেন, ‘যদি এসব হাদিসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করা হতো; তাহলে কোনো শহর-নগর ও গ্রাম গড়ে উঠত না। মানুষ ঝুপড়িতেই বসবাস করত। যেখানে তারা বিনা কষ্টে সতর ঢাকতে পারত না। সত্য কথা হলো : এসব হাদিস যারা নিজেদেরকে ধনী হিসেবে প্রকাশের জন্য বা গর্ব-অহঙ্কার প্রকাশের জন্য বা বড়লোক বলে জাহির করার জন্য বাড়িঘর করে তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। নিঃসন্দেহে অট্টালিকা নির্মাণ বৈধ।
অতএব, উচ্চ অট্টালিকা নির্মাণ ও তা কারুকার্যময় করা এবং তার সৌন্দর্য দেখে আনন্দ উপভোগ করা ইসলামের দৃষ্টিতে অবৈধ নয়; বৈধ। বরং তা কাক্সিক্ষত বিষয়ে পরিণত হয়, যদি অহঙ্কার প্রকাশ বা নিজেকে বড়লোক বলে জাহির না করে নির্মাণ করা হয়। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সা:-এর কোনো কোনো সাহাবিও বিনা দ্বিধায় অট্টালিকা ও প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন। সা’দ ইবন আবু ওয়াক্কাস রা: বসরায় একটি অট্টালিকা তৈরি করেছিলেন। সা’দ ইবন আবু ওয়াক্কাস রা: বসরার গভর্নর ছিলেন। তিনি এ অট্টালিকা নির্মাণের পর বলেন, এ অট্টালিকা তো লোকদেরকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে! এ সংবাদ ওমর রা: শোনার পর তিনি মুহাম্মদ ইবন মাসলামাকে বসরায় পাঠান এবং তাকে আদেশ দেন, যেন তিনি বসরায় পৌঁছে বাড়িটিতে আগুন লাগিয়ে দেন। তখন তিনি বসরা গিয়ে বাড়িটি আগুন লাগিয়ে দিয়ে পুড়িয়ে ফেলেন। আল্লামা ইবন তাইমিয়ার মতে, ওমর রা: এ কাজটি করেছিলেন অট্টালিকা তৈরি ইসলামে নিষিদ্ধ বলে নয়; বরং তিনি তা করেছিলেন একজন গভর্নর জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন বলেই। কারণ তিনি চাননি তার কোনো গভর্নর জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জনগণের দুঃখ-দুর্দশা না দেখে দায়িত্ব পালন করুক।
সাহাবিদের পরে তাবিঈ, তাবে-তাবিঈ ও আইম্মায়ে মুজতাহিদিনের যুগে এবং তার পরবর্তী যুুগেও মুসলিমরা পৃথিবীর সর্বত্র নির্দ্বিধায় অট্টালিকা ও প্রাসাদ নির্মাণ করেছেন। দুর্গ গড়ে তুলেছেন।
আমি মনে করি, কেবল নিজের পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাসের জন্য বহুতল অট্টালিকা ও প্রাসাদ নির্মাণ করা মাকরূহ থেকে মুক্ত নয়। তবে ব্যবসার মাধ্যম হিসেবে ভাড়া দিয়ে অর্থ রোজগার করার জন্য অট্টালিকা ও প্রাসাদ নির্মাণ করা মাকরূহ নয়। বরং তা সাওয়াবের কাজও হতে পারে, যদি মানুষের আবাসন সমস্যার সমাধানকল্পে তা তৈরি করা হয়। বিশেষত তা যদি বড় বড় শহরগুলোতে তৈরি করা হয়। কারণ বর্তমান যুগে আমাদের এই ঢাকা শহরের মতো শহরে বহুতল ভবন নির্মাণ করা না হলে; আরো দু-চার ১০টি ঢাকা শহরের মতো শহরের প্রয়োজন হবে। তখন দেখা দেবে তীব্র ভূমিসঙ্কট। ইসলাম এমন কোনো সিদ্ধান্ত দেয় না, যা মানুষের সমস্যা বাড়ায়। ইসলাম এসেছে মানুষের সমস্যা সমাধানের জন্য, সমস্যা বাড়াবার জন্য নয়। এ কারণেই ফকিহগণ বলেছেন, ‘যেখানেই মানবকল্যাণ সেখানেই ইসলাম’।
স্থাপত্য শিল্প তৈরি করার সময় তাতে উন্নত নির্মাণশিল্প কৌশল ব্যবহার করে, মজবুতভাবে, শান্তিতে বসবাস করতে পারার মতো করে এবং ইবাদত-বন্দেগি, বিশেষত সালাত আদায়ের পরিবেশ তৈরি করে তা নির্মাণ করতে হবে। আরো খেয়াল রাখতে হবে যাতে যেখানে দ্বীনের বিধান রক্ষা সহজতর হয়। আরো মনে রাখতে হবে যে, মানুষ এ পৃথিবীতে চিরস্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য আসেনি, তাকে তার রবের কাছে অবশ্যই এক দিন আবার ফিরে যেতে হবে। অতএব, স্থাপত্য শিল্প নির্মাণকালে এ কথা মনে রেখেই তা তৈরি করতে হবে। তাতে বাড়াবাড়ি ও বিলাসিতা যাতে না হয়, তার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। তবেই স্থাপত্য শিল্প ইসলামসম্মত হবে। বাংলাদেশ যেহেতু একটি মুসলিম দেশ।
এ দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলিম। তাই এ দেশের স্থাপত্য শিল্প অবশ্যই ইসলামী স্থাপত্য শিল্প-নীতিমালা অনুসরণ করে নির্মাণ করা বাঞ্ছনীয়। এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও চেতনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন স্থাপত্যকর্ম শিল্প বা সংস্কৃতির নামে তৈরি করা এবং তার পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান কখনোই কাম্য হতে পারে না।
এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের স্থাপত্য শিল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে দেশের অধিকাংশ ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মূল্যবোধকে ধারণ করে এমন একটি আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি। উল্লেখ্য যে, এ দেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশ হলেও অমুসলিম জনগোষ্ঠীর শিল্প, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করে না, বরং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করে, যা বিশ্বধর্ম ইসলামের উদারতার বহিঃপ্রকাশ।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে ইসলামী নির্দেশনা মতো স্থাপত্য শিল্প তৈরি করার তাওফিক দিন।
