খুব ইচ্ছে করে ঝরাপাতার শব্দ শুনি। আহা! স্মৃতির বাঁশি হয়ে বাজে দূর শৈশবে। ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘ তরঙ্গায়িত ধোঁয়ার মতো উড়ে যায় কোনো গন্তব্যহীন আকাশপথে। আমার ভিজে ওঠা চোখের কোনায় জমে থাকা লাজুক জলে ভেসে উঠেছিল সেইসব মেঘের প্রতিচ্ছবি। আমি দরজার দুই প্রান্তে হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছি। তাকিয়ে আছি নিঃসঙ্গ আকাশের দিকে। দারুল উলুম বাদিহাটি তখন গোরস্থান মাদরাসা নামেই পরিচিত। প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা খোরশেদ আলম সাহেব। দিনটি ছিল আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় যাওয়ার প্রথম দিন। খোরশেদ আলম সাহেব পড়াচ্ছেন। ঘর ভরতি ছাত্র। আমরা পড়ছি ‘মদ্দ মোট দশ প্রকার। এক আলিফ মদ্দ তিন প্রকার। মদ্দে ত্ববায়ি, মদ্দে বদল, মদ্দে লিন’ ক্রমাগত। একসাথে অতগুলো ছোট ছোট বাচ্চার সুর করে পড়ার আওয়াজ যেন পাখির ডাকের মতোই কিচিরমিচির বলে মনে হচ্ছে। সুরে সুরে পড়ার আওয়াজে মুখরিত হচ্ছে বাদিহাটির মাঠঘাট।
প্রথম দিনের একেকটা নুন নুকতা উচ্চারণ করতে গিয়ে কেঁপে উঠি। কেঁপে ওঠে অন্তরাত্মা। নতুন বলে কোনো ছাড় নেই। পুরনোদের মতো আমাকেও জিজ্ঞেস করা হলো মদ্দের প্রকারভেদ ও মেছাল। আমি মদ্দ বলতে পারলেও আটকে যাই মেছালে, কোনো কোনোটায় মেছালের জড়তা খুলতে গিয়ে জড়িয়ে যাই অধিক ভুলের জালে। খোরশেদ আলম সাহেব সিরিয়াল ভঙ্গ করে মাঝখান থেকে আমাকে পড়া জিজ্ঞেস করলেন। আমি মদ্দ বললাম, কিন্তু আটকে গেলাম মেছালে। কেবল মেছাল না দিতে পারার অপরাধে আমার দাঁড়িয়ে থাকতে হলো। আমি ছোটবেলা থেকেই লাজুক প্রকৃতির মানুষ। উপরন্তু নতুন জায়গা, শিক্ষক আমার নতুন আত্মীয়। সবকিছুই নতুন। আমি এদিক তাকাই, ওদিক তাকাই, মুখ লুকানোর মতো কোনো জায়গা নেই। একটা গোপন অভিমানে পিরামিড দেবদারুর পাতায় আড়াল হতে খুব ইচ্ছে করে। লজ্জায় চেহারা লাল হয়ে যায়। বারবার মনে হচ্ছিল পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে না কেন? ঘরটির টিনের চালে একটা ফুটো। সেই ফুটো ভেদ করে ক্লাসরুমে সূর্যের আলো সরু হয়ে ঢুকছে। আরো আলোকিত করছে ক্লাসরুম। আমি ওদিকে তাকাই না!

আমার লজ্জা লাগে। আমি তাকিয়ে থাকি আকাশের উড়ন্ত মেঘদলের দিকে। মনে হচ্ছিলো মেঘ হয়ে তাদের সঙ্গে উড়ে যাই, যেখানে আমার লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া মুখ আর কেউ দেখবে না।
নির্জল সত্যটুকু লুকিয়ে রেখে বাদিহাটি হয়ে ওঠে আমার খুব প্রিয়। নতুন নতুন বন্ধু হয়। নিঃসঙ্গ দুপুরগুলো হয়ে ওঠে উন্মাতাল। ক্ষণিকের ছুটিও আমাদেরকে বানিয়ে তোলে একেকটা মাতাল ঘাসফড়িঙ, বুনোহাঁস। মাদরাসার সামনে যেই বিশাল ঈদগাহ মাঠ, সেখানে আমরা খেলায় মাতি। দৌড় খেলা। কখনো যেন উড়ি আকাশে। ক্ষণিকের মুক্তিতে যেন আমরা এক একটা মুক্ত ঘুড়ি। খেলায় মাতি মাঠের সবুজ সবুজ ঘাসফড়িঙের সঙ্গে। তারা মনুষ্য শরীরের ঘ্রাণ পেলেই লাফিয়ে ওঠে দুরন্ত তেজি ঘোড়ার মতো। আমরাও লাফাই। লাফাতে লাফাতে ঝাঁপিয়ে পড়ি মাদরাসার মাঠের পূর্বপাশে যেই পুকুর নব বর্ষার জলে যৌবন ফিরে পায়, সেই পুকুরে। যেন এক একটা বুনোহাঁস। হাঁসের মতোই ডুবসাঁতার খেলে পার করে দিই মুক্ত জীবনের চঞ্চল মুহূর্তগুলো।
আমাদের শৈশবে ডুবসাঁতার খেলা সেই পুকুরটি আর নেই। কী অদ্ভুত! পৃথিবীর যেকোনো পুকুরই এখন আমাকে স্মৃতিকাতর করে তোলে। দূর থেকেও মনে হয় আমার জন্য কেঁদে ওঠে বাদিহাটির একেকটা কুয়াশাসিক্ত সন্ধ্যা। ঘাসফড়িঙেরা স্মৃতিকাতর হয়ে হারিয়ে ফেলেছে সব বল। তারা আর লাফায় না। নিঃশব্দে পথ চলে উদাসীন। আমার শৈশবীয় চঞ্চল বন্ধুগণ! তোমরা আবারও নেচে ওঠো তুমুল উল্লাসে। আমি তোমাদের সেই নেচে ওঠা দৃশ্যের উৎফুল্লিত দর্শক হতে চাই ফের।