বাড়ি থেকে কিছু মুখে না দিয়েই প্রায় ছুটতে ছুটতে আসতে হয়েছে তাকে। আজ তার মামলার শুনানির তারিখ। সকালের দিকে হতে পারে শুনানি, উকিল সাহেব মোবাইলে জানিয়েছিলেন। তাই প্রায় দশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে অনেকটা পড়িমড়ি করে ছুটতে ছুটতে আসতে হয়েছে। এখানে আসার পর জমিলা খোঁজ নিয়ে জেনেছে, তার মামলার শুনানি হতে আরো কয়েক ঘণ্টা লেগে যাবে। এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আদালত চত্বরে বড় পুকুরপাড়ে গাছগুলো থাকায় মানুষের বেশ উপকার হয়েছে। গরমের দিনগুলোতে পুকুরপাড়ে গাছের ছায়ায় দুদণ্ড বসে কিছুটা স্বস্তিতে সময় পার করা যায়।
জীবনসঙ্গী নির্বাচনে তেমন উচ্চাভিলাসী না হলেও তাদের পরিবারের পাশে শক্তভাবে দাঁড়ানোর মতো এমন একজন পুরুষকে চাইছিল জমিলা। রতনকে তার কাছে তেমন কাক্সিক্ষত একজন বলেই মনে হয়েছিল তখন। এক বছর না পেরোতেই গার্মেন্টের চাকরি ছেড়ে বউকে সাথে নিয়ে বিদেশ যাওয়ার পাঁয়তারা শুরু করে রতন। শুরুতে ব্যাপারটা মোটেও পছন্দ হয়নি তার। কিন্তু বারবার স্বামীর মুখে বিদেশে গার্মেন্ট কারখানায় দু’জনেরই অনেক বেশি বেতনে কাজের সুযোগ রয়েছে- শুনতে শুনতে একসময় জমিলাও একধরনের মোহে পড়ে যায়। বেতনের টাকা জমিয়ে সামান্য কিছু জমি কিনেছিল সে। বিদেশে যাওয়ার খরচ মেটাতে সেই জমি বিক্রির সব টাকা পরম বিশ্বাসে স্বামী রতনের হাতে তুলে দিয়েছিল। কয়েক মাসের চেষ্টায় করিৎকর্মা রতন মিয়া সবকিছু ঠিকঠাক করে ফেলে। কথা ছিল স্বামী-স্ত্রী দু’জনই একসাথে বিদেশে যাবে। কিন্তু এয়ারপোর্টে ঢুকে রতন কিছুটা গোমড়ামুখে জমিলাকে জানায়, আমার ভিসায় সামান্য ঝামেলা হইছে, তোমার সাথে আমার যাওয়া হইবো না বোধ হয়।


সেই প্রত্যন্ত গ্রামে বেড়ে ওঠা মেয়ে জমিলা শহরে বেশ কয়েক বছর গার্মেন্ট কারখানায় কাজ করার সুবাদে কিছুটা অভ্যস্ত এবং স্মার্ট হলেও বিদেশ বিভূঁইয়ে একাকী প্লেনে চড়ে যাওয়া, তারপর অচেনা অজানা জায়গায় গিয়ে নতুন চাকরিতে ঢোকার কথা মনে হতেই বেঁকে বসেছিল। কিন্তু এয়ারপোর্টে সেদিন অনেক বলে কয়ে তাকে রাজি করিয়েছিল সুচতুর রতন।
তুমি কোনো চিন্তা করবানা। আমি তো কয়েক দিনের মধ্যে আসতেছি সেইখানে। ভিসার সমস্যাটা মিটলেই আমার ফাইট কনফারম হইয়া যাইবো। আমার পরিচিত লোকজন আছে সেই জায়গায়। তারাই তোমারে দেখবো, সাহায্য-সহযোগিতা করবো। দেখবা তো, সেইখানে গেলে তোমার কোনো অসুবিধা হইবো না।
তখনো জমিলা বুঝতে পারেনি, সেখানে তার ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে।
বিদেশের মাটিতে পা-রাখার কয়েক দিনের মধ্যেই জমিলা বুঝে নিয়েছিল স্বামী হলেও রতন তার সাথে জঘন্য প্রতারণা করেছে। মিষ্টি কথা বলে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে তার শেষ সম্বল সামান্য জমি বিক্রির সব টাকা আত্মসাৎ করে মধ্যপ্রাচ্যের মরুময় দেশটিতে পাচার করে দিয়েছে তাকে। গার্মেন্ট কারখানায় চাকরির কথা বললেও জমিলাকে সেখানে এক ধনাঢ্য পরিবারে গৃহকর্মীর কাজে লাগানো হয়। যা করার জন্য সে কোনোভাবেই প্রস্তুত ছিল না। সাথে সাথে প্রতিবাদ জানায়। কাজ করতেও অস্বীকৃতি জানায়। মরুময় দেশের মানুষগুলোর হৃদয়ে দয়ামায়া বলতে কিছু নেই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘরের নানা ধরনের কাজ শেষে কান্তিতে সারাটা শরীর যখন ভেঙে আসতে চাইতো তখন জমিলার শুরু হতো অন্য কাজের পালা। ওই বাড়িতে তার সাথে থাকা আরো কয়েকজন গৃহকর্মীর মধ্যে দেখতে শুনতে তুলনামূলক বেশি সুন্দরী এবং আকর্ষণীয় হওয়ায় সেটা তার জন্য অভিশাপ হয়ে উঠেছিল চরমভাবে। জমিলার প্রবাসজীবনে বিড়ম্বনা, লাঞ্ছনা, কষ্টের জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।


এভাবে কয়েক বছরের কষ্টকর, লাঞ্ছনা-গঞ্জনার দুর্বিষহ জীবন কাটিয়ে একদিন দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ওই বাড়ি থেকে পালিয়ে বাইরে গিয়ে স্থানীয় পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিল সে। সাথে সাথে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। দূতাবাসের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরে আসে জমিলা। দেশে ফিরেই সে তার স্বামী রতন মিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করে। প্রতারণার মাধ্যমে তার জমি বিক্রির টাকা আত্মসাৎসহ মিথ্যে কথা বলে বিদেশে পাচার করার অভিযোগ আনে সে। স্বামী হলেও লোকটা একটা সাক্ষাৎ শয়তান। যার মধ্যে নীতি, বিবেক, সততা, চরিত্র বলে কিছু নেই।
দেশে ফিরে স্বামী রতনের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল জমিলা। সেখানেও তার জন্য অনেক বড় চমক অপেক্ষা করছিল। রতনের বাড়ি গিয়ে সেখানে তার নতুন বউকে দেখে মাথাটা ঘুরে উঠেছিল। তার অনুপস্থিতিতে লোকটা আরেকটি বিয়ে করেছে। কয়েক মাস আগে বাচ্চাও হয়েছে সেই বউয়ের। জমিলা এতকিছুর পরও সতীনের সাথে এক সংসারে থাকার কথা জানিয়েছিল। তার কথা শুনে কুৎসিত হাসি ছড়িয়ে রতন বলে উঠেছিল, ‘কী কইলা, তোমারে লইয়া আমি আবার সংসার করমু ? নিজের কথা একবারও খেয়াল করছ! সেই দেশে কত পুরুষ তোমারে ভোগ করছে। তুমিও তো কত পুরুষের সাথে মজা লুটছ। এই অবস্থায় তোমারে আমি আমার সংসারে রাখমু- ভাবলা কীভাবে। ছি:, ছি:- জমিলা। এ জন্যই তো লাবনিরে বিয়া কইরা নতুন সংসার শুরু করছি। এখন লাবনি আমার বউ, আমার বাচ্চার মা হইছে সে। তারে নিয়া বেশ সুখেই তো আছি। তোমার কোনো দরকার নাই আমার। এই সংসারে তোমারে আইন্যা নতুন ঝামেলা বাড়াইতে চাই না আমি। তার চেয়ে তুমি তোমার বাড়ি ফিরা যাও, নিজের পথ নিজেই দেখো-’ স্বামীর মুখে তেমন কথা শুনে জমিলার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে যেন। রতন মিয়াকে আবার আরেক দফা নতুন করে চিনতে পারে।


প্রতারণা করে মিথ্যা কথা বলে তার শেষ সম্বল জমি বিক্রির সব টাকা আত্মসাৎ করে এক নরকে পাঠিয়েও ক্ষ্যান্ত হয়নি মানুষটা। গার্মেন্ট কারখানায় অনেক টাকা বেতনের আশ্বাসে বিদেশে পাঠিয়ে ঘরের দাসী-বাঁদীর কাজে নিয়োজিত করেছে। সেখানে প্রতিরাতে ঘরের পুরুষদের যৌন লালসাও মেটাতে হয়েছে তাকে। যাতে কোনোভাবেই সায় ছিল না জমিলার। স্বামীর পরিচয়ে তার এত বড় সর্বনাশ করেছে মানুষটা। সেখানে চাকরির বেতনের সব টাকাই জমা করেছে সে নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। এত সর্বনাশের পরও জমিলার কাছে শেষ ঠিকানা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে যে মানুষটির সংসার- অথচ আজ সেখানে তার কোনো জায়গা নেই। তাকে কুকুর- বিড়ালের মতো দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতে সচেষ্ট হয়েছে মানুষটা। বিদেশের মাটিতে লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, বিড়ম্বনা, সম্ভ্রম হারানোর অপরিসীম বেদনা সে বয়ে বেড়াতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠে সে। এরপরও যদি স্বামীর সংসারে স্ত্রীর মর্যাদায় ঠাঁই পেত। তাহলে সব হারানোর দুঃখ-কষ্ট ভুলে থাকতে পারত। আজকের এই পরিণতির জন্য একমাত্র দায়ী যে মানুষটা তার নির্মম নিষ্ঠুর আচরণ এবং কথাবার্তা শুনে বিমূঢ় হয়ে যায় জমিলা।
দেশে ফিরে জমিলা রতন মিয়ার নানা কাণ্ডকীর্তির কথা শুনেছে। রাজনৈতিক দলের গুণ্ডাপাণ্ডাদের সাথে তার ওঠাবসা এখন তার। আশপাশে কয়েক গ্রামজুড়ে তাদের আধিপত্য বিস্তারের খেলা চলে প্রায়ই। রতনের মতো একজন সাক্ষাৎ শয়তানের সাথে লড়তে হলে কৌশল অবলম্বন করতে হবে। সবকিছু বুঝেশুনে পা ফেলতে হবে। কারণ, তার কাছে বিদেশে কাজ করার বেতনের সব টাকাই রতনের কব্জায় রয়েছে। বিদেশ থেকে সব টাকাই তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি জমা হয়েছে। সেই টাকা উদ্ধারের জন্য রতনের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নেয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। তার সব অন্যায় অবিচার অপকর্ম প্রতারণার বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে।


জমিলা নিজেই অবাক হয়ে যায় তার গত কয়েক মাসের ঘটনাগুলোর কথা ভাবতে গিয়ে। রতন মিয়ার মতো একজন মানুষের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নেমেছে সে। শুরুতে তার মনে এক ধরনের অবিশ্বাস, অনিশ্চয়তা এবং ভয় ছিল নিজেকে নিয়ে। প্রতিপক্ষ হিসেবে তার তালাক দেয়া স্বামীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমে কতক্ষণ টিকতে পারবে, তা নিয়ে সংশয়ে ছিল। রতন মিয়ার সব অপকর্ম, অপরাধ, অন্যায়, প্রতারণা, জালিয়াতির প্রমাণসহ থানায় অভিযোগ করতেই পুলিশ নড়ে চড়ে বসেছে। এলাকার চিহ্নিত অপরাধী হিসেবে পুলিশের খাতায় তার নাম উঠলেও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকার কারণে রতনের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছিল না তারা। বিদেশে নারী পাচার, প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎসহ প্রথম স্ত্রীর অনুমতি না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করা এবং জোর করে তালাক দিতে বাধ্য করাসহ নানা অভিযোগে মামলা হলে পুলিশ আটক করে তাকে। কয়েক দিন পর জামিনে জেল থেকে বেরিয়ে মুখোমুখি না হলেও এর মধ্যে বিভিন্নজনকে দিয়ে হুমকি দিয়েছে রতন। জমিলাকে দেখে নেবে, কয়েকজনের কাছে বলেছেও।
বিদেশ যাওয়ার আগে তার জীবনটা ছিল যেরকম গোছানো, সুন্দর। রতনের প্রতারণা এবং মিথ্যা প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে তছনছ এলোমেলো হয়ে গেছে সেই গোছানো সুন্দর জীবনটা। কোনোভাবেই সে ফিরে পাবে না আগের জীবনটা। বিদেশে কাটানো সময়গুলোর দুঃসহ স্মৃতি এখন তাকে রাতদিন তাড়া করে ফিরে শুধু। আদালত চত্বরে পুকুরপাড়ে গাছের ছায়ায় বসে বসে নিজের জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে বুঝতেই পারে না জমিলা।


হঠাৎ করেই সামনে মাফলারে মুখ ঢাকা মানুষটিকে দেখে চমকে ওঠে সে।
রতন দাঁড়িয়ে আছে সামনেই। মাত্র কয়েক গজ দূরত্বে দাঁড়ানো মানুষটিকে দেখে প্রথমে চমকে উঠলেও সামলে নেয় নিজেকে। জমিলা গত কয়েক মাসের অভিজ্ঞতায় অনেকটা অভিজ্ঞ, পরিপক্ক হয়ে উঠেছে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, ন্যায়বিচার সে পাবেই। প্রতিপক্ষ যতই দাপুটে, শক্তিশালী প্রভাবশালী হোক না কেন সে তার অপরাধের শাস্তি পাবে। দেশের প্রচলিত আইন, বিচার ব্যবস্থার ওপর অনেকেই আস্থা হারালেও জমিলা কোনোভাবেই আস্থা হারাতে চায় না। আইনের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ রতন পরাজিত হবেই- তেমন আস্থাবোধ জাগতেই সারা দেহে এক ধরনের বিদ্যুৎ খেলে যায়। সাহসী ঋজুভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্তে সরাসরি চোখে চোখ রেখে তাকায় সামনে দাঁড়ানো মানুষটির দিকে। জমিলার দু’চোখে এক ধরনের উজ্জ্বল ঝিলিক যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে, তার চেহারায় অদ্ভুত এক দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ছে।
নিজের প্রাক্তন স্ত্রীর মধ্যে এতোটা পরিবর্তন দেখে অবাক হয়ে যায় রতন মিয়া। জমিলাকে অনেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ মনে হয় এ মুহূর্তে। এর আগে তাকে তেমনরূপে কখনো দেখিনি সে। এবার সে ভয় পেতে শুরু করে। ভেতরে ভেতরে একধরনের শঙ্কাভাব জড়িয়ে ধরে যেন তাকে। শেষ পর্যন্ত, জমিলা তার জন্য অনেক বড় সর্বনাশ হয়ে আনতে চলেছে, উপলব্ধি করতে থাকে।