অনেক সময় ধরে কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ডাকছে। মারুফ সাহেব ধড়ফড় করে উঠে বসেন। খুব সম্ভব দুটো আড়াইটা হবে। মাঝরাতে বা শেষ রাতে কুকুরের ডাক কয়েকটি প্রশ্ন জাগায়- এক. চোর ডাকাত এলো নাকি; দুই. কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে কিনা!; তিন. ভালো মানুষ কুকুরের রোষানলে পড়েছে! সব কিছুর পর মাঝ রাতে কুকুরের ডাক শুনে ঘুম ভাঙলে কেমন যেন লাগে! রাত ১০টার পর কুকুরগুলোর মুখে স্কচটেপ মেরে দেয়া গেলে কুকুরের ডাক শুনে আর কারো সুখের ঘুম নষ্ট হতো না! মানুষরূপী কিছু কুকুরও যে আছে। ওদের ঘেউ ঘেউ দিন-রাত। অতিষ্ঠ মানুষ। টেপ মারে সাধ্য কার! এই যেমন তার স্ত্রী লায়লা। এতটা খারাপ না হলেও ১৫ বছর একনাগাড়ে চিৎকার করে যাচ্ছে। মুখে টেপ মারা যায়নি। প্রথম দিকে কিছুদিন রাগ ধাক করে হিতে বিপরীত হয়েছে। সর্বশেষ কাচের গ্লাস ছুড়ে মাথা ফাটিয়ে দেয়ার পর থেকে বউয়ের কাছে একেবারে ভেজা বেড়াল হয়ে গেছেন। কিছু বললে শুধু মিউমিউ করে সায় দেন। ঘটনাটি নিয়ে অফিসেও কম হাসাহাসি হয়নি। মাথায় চার সেলাইয়ের মারুফ সাহেবকে নিয়ে জটলা পাকে। কিভাবে হলো প্রশ্নের জবাব জনে জনে ভিন্ন হওয়ায় হাসাহাসি হয়। হাসির কিছু নয় তবু মানুষ হাসছে। মুখ টিপে, মাথা ঘুরিয়ে। শেষমেশ সরাসরি বিভাগীয় প্রধান ডাকেন, মারুফ সাহেব।

-হু, স্যার।
-কিভাবে কী হলো!
-ওই যে ফজলি আম গাছের ডাল ভেঙে পড়ে গেলাম।
-আপনার বাড়ি ফজলি আমগাছ আছে!
-না, স্যার।
-তো!
-এটি রাজশাহীর ঘটনা। রাজশাহীর ফজলি আম...
-কাল অফিস করলেন। রাজশাহী কখন গেলন, এলেন কখন! যেতে আসতেই তো দেড় দিন লাগে।
বিষয়টি মারুফ সাহেবের একান্ত ব্যক্তিগত। মাথাটা তার এবং সেটি ফেটেছে। ফাটিয়েছে তারই বউ। এ নিয়ে অন্যদের এত মাথাব্যথা, প্যাঁচাপ্যাঁচিতে আটকা পড়ে কিছুটা রাগই হয়। ক্ষোভ নিয়ে বলে, কাল রাতে বাথরুমে পড়ে গেলাম।
বিভাগীয় প্রধান মুচকি হেসে বলেন, আচ্ছা যান। একজন মানুষও তার ব্যথায় সমব্যথী হয়নি। আগুনে ঘি ঢালার মতো তীব্র ব্যথায় বর্শার আঘাত।

সন্ধ্যার পর প্রতিদিন মারুফ সাহেব ও তার বন্ধুরা এক জায়গায় জড়ো হন। উদ্দেশ্য- খেলা দেখা। আজ হঠাৎ বজ্রপাত আর কালো মেঘ দেখে বাড়ি থেকে বের হননি। এক সাথে মজা করে খেলা দেখতে না পারার ব্যথা নিয়ে ঘুপচি মেরে পড়ে থাকা। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন টের পাননি। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেন রাত আড়াইটা বাজে। কোপা আমেরিকার খেলা। ঘুম আসছে না দেখে ভাবেন, যাক কোপা আমেরিকার খেলাটা দেখলে মন্দ হয় না। চুপিচুপি ড্রয়িং রুমে ঢুকতেই অবাক। লায়লা বসে আছে। টেলিভিশনে কী একটা গানের অনুষ্ঠানের পুনঃপ্রচার হচ্ছে। শিল্পী গলা ছেড়ে সুর টেনে শুধু বলছেন, কোনো এক বর্ষায় ... বর্ষায় ...
উপস্থাপক মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলেন, কোনো এক বর্ষায় কী!
-বর্ষায় ভেজা...। কাক ভেজা।
-ওহ স্যার। আপনি নর্দমায় পড়ে গিয়েছিলেন?
-মানে!
-ওই যে বললেন কাক ভেজা। একেবারে ময়লা আবর্জনা থেকে উঠে আসা কাকের মতো ভেজা কালো মানুষ।
শিল্পী হঠাৎ রেগেমেগে মাইক ছুড়ে ফেলে বলেন, আমার সাথে বেয়াদবি? তোদের অনুষ্ঠানের নিকুচি করি।
-স্যার লাইভ অনুষ্ঠান চলছে। করছেন কী?

-হোর তোর লাইভ ফাইভ। শিল্পী চেয়ার থেকে উঠে তিড়িং বিড়িং করেন।
উপস্থাপক বলেন, স্যার আপনি নাচবেন ঠিক আছে কিন্তু সে পর্ব তো গান শেষ হলে।
নাচের কথা শুনে শিল্পী কিছুটা ঠাণ্ডা হন। এতদিন গান শুনিয়ে ধন্য করেছেন এবার করবেন নাচ দিয়ে।
কথা শেষ না হতেই শিল্পী ফিক করে হেসে ওঠেন।
মারুফের গা জ্বলে ওঠে। রিমোট হাতে নিয়ে বলে ধুর এই ছাতামাতা মানুষ দেখে।
-আরে করছ কী! একটু পরেই নাচ হবে, গান হবে।
-রাখ তোমার নাচা গানা। আমি কোপা আমেরিকা দেখব।
লায়লা বেগম চিৎকার করে বলেন, দেখো এ কদিন কিচ্ছু বলিনি। বিশ্বকাপ বিশ্বকাপ করে আমার ১৭০ পর্ব সিরিয়াল মিস করিয়েছ। শো মিস করেছি। রাত ৩টার সময় এসেছে খেলা দেখতে...
মারুফ সাহেবের পেছনের কথা মনে পড়ে। মিনমিন করে বলেন, কই বিশ্বকাপ তো মোড়েই দেখলাম।
লায়লা বেগম লাল চোখে তাকিয়ে বলেন, তুমি যাবে এখান থেকে?
মারুফ সাহেব দাঁড়ান না। কিছুটা ভয় নিয়ে বেরিয়ে আসেন। পেছন থেকে কিছু ছুড়ে মারে কিনা কে জানে! বাইরে ঝপঝপিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির শব্দে উপেক্ষিত। মারুফ সাহেবের কানে বর্শার মতো বিদ্ধ হয় শিল্পীর সে কটু গলার স্বর- কোনো এক বর্ষায় ...।