আধুনিক বাংলা সাহিত্য বিনির্মাণে যারা নিরলস কাজ করছেন তাদের মধ্যে অন্যতম কাব্যনির্মাতা কবি মোশররফ হোসেন খান। তিনি এখন বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে খ্যাতিমান কাব্যপুরুষ। নিজের পরিশ্রম আর কাব্যপিপাসায় তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন কবি হিসেবে। এই বরেণ্য কবির ৬৬তম জন্মদিনে জানাই নিরন্তর শুভেচ্ছা। মোশাররফ হোসেন খান জন্ম নিয়েছেন ১৯৫৭ সালের ২৪ আগস্ট। তাঁর জন্মস্থান যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া গ্রামে। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়েছে সেখানেই সাপ্তাহিক মুজাহিদের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে। মোশাররফ হোসেন খান ১৯৮৫ সালে ঢাকা আসেন এবং বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করে নিজের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করেন।
কবি মোশাররফ হোসেন খানের জন্ম, শৈশব, বেড়ে ওঠা, যৌবন ও এগিয়ে যাওয়া সবই বাংলাদেশকে ঘিরে। স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ, বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রাম, স্বাধীনতা-উত্তর শোষণ-বঞ্চনা ও বৈষম্য কবির কাব্যসাধনার প্রেক্ষাপটকে অনাকাক্সিক্ষত করে তুলেছে। তবুও তিনি বাধ্য হয়েছেন এসব প্রেক্ষাপটকে কাব্যসাধনার বিষয়বস্তু করতে। কবির অধিকাংশ কবিতার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে ক্রীতদাসের চাপকানো পিঠের মতো ক্ষতবিক্ষত অসামাজিক শরীর। সেই শরীর থেকে বের হওয়া ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ছিটকে পড়ে রাজপথ মাঠঘাট সর্বত্র শঙ্কা আর অনিশ্চয়তার ছোপ ছোপ দাগ ফেলেছে। কবির কবিতা পাঠক মনে এমন এক আবহ তৈরি করে যে, পাঠক দীর্ঘ নিঃশ^াস ছেড়ে বলতে বাধ্য থাকবে, এ সমাজ মুক্তিসংগ্রামের চেতনার সমাজ নয়। এ যেন দৈত্যদানবীয় আতঙ্কের ভুতুড়ে অন্ধকার সমাজ। দাঁতকেলিয়ে অট্টহাসির রাক্ষসপুরীর মতো বন্যসমাজ। এই ভয়ঙ্কর সমাজের চিত্র তার কবিতায় উঠে বসেছে সাবলীলভাবে। এমন কদাচার থেকে মুক্ত হওয়া দরকার। সে জন্য তিনি বিপ্লবের গান গেয়েছেন। মুক্তির নেশা তাঁর কাব্যসাধনার হয়েছে আরেক প্রেরণা।
কবিতার গঠন এবং রূপবৈচিত্র্যকেই ইংরেজি ভাষায় বলা হয়- stylistics. বাংলাতে বলা হয়েছে নির্মাণশৈলী। অর্থাৎ কাব্য পঙক্তিতে কাব্যরস তৈরি ও চিত্রকল্প প্রণয়নে শব্দের শৃঙ্খলা বিন্যাসকেই কবিতার শিল্পশৈলী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। মোশাররফ হোসেন খান তাঁর কবিতার শিল্পশৈলীতে কতটা পারঙ্গম সে বিষয়ে দু’-এক কথা বলা যেতে পারে। সাহিত্য নির্মাণে প্রত্যেক লেখকেরই এক ধরনের নিজস্ব ঢঙ থাকে। মোশাররফ হোসেন খানও তাঁর নিজস্ব ঢঙে কবিতার শরীর তৈরি করেছেন। কবিতার সেই শরীরকে সাজিয়েছেন রূপ, রস, ছন্দ উপমা, অলঙ্কারে।
কবিতা রচনা করতে গিয়ে কবিরা প্রথমে যে কাজটি করেন সেটি হলো- কোনো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে ভাবতে থাকেন। বিষয়টির জ্ঞান সম্পূর্ণ আত্মস্থ করার পর বিষয়টিকে কতটা সুন্দর করে, সুখকর করে, স্পষ্ট করে রসে চুবিয়ে পরিবেশন করা যায় সে জন্য তারা উপযুক্ত শব্দ খুঁজতে থাকেন। এই শব্দচয়ন ও পঙক্তিতে সংযোজন করাটাই হলো কাব্যশৈলী। মোশাররফ হোসেন খান তার নিজের মধ্যে তৈরি হওয়া ভাব ও চিন্তাকে যথোপযুক্ত শব্দের উপর ভর করাতে পেরেছেন বলেই মনে হতে পারে। তবে সমান্তরালভাবে তার সব কবিতার ক্ষেত্রে এ বক্তব্য গ্রহণ করা না গেলেও তার প্রায় সব কবিতাই এ বক্তব্যের সমর্থনে অগ্রগামী হয়ে থাকতে পারে। কবি তার চিন্তাকে কতটা সূক্ষ্মভাবে শব্দের উপর বিছিয়েছেন সেটি নিম্নে বর্ণিত কবিতা থেকে অনুমান করা যেতে পারে। এই কবিতায় ভাষা ভাবের অনুগামী হয়েছে। যেমন-
আমি তো সকল ঘৃণা, নির্মমতা ও জিঘাংসার উন্মুলের গন্ধ শুঁকেছি
প্রণয় ও প্রণতির বীভৎস রূপ আমি দেখেছি
অজস্র নীরবতার মধ্য থেকে আমি
বিদ্বেষ ও বিষাদের ধোঁয়াও দেখেছি।
আমাকে আর কোন বৈরী বাতাসের ভয় দেখাও?
প্রতিটি শব্দের ব্যাখ্যাতীত ব্যাখ্যা ও রহস্য আমার জানা আছে
কে আমাকে আর পরাস্ত করতে চায়।
(মুখোমুখি : কবিতা সমগ্র-২, পৃষ্ঠা-২৪৭)
মোশাররফ হোসেন খানের কাব্যপ্রতিভার তোয়াজ করতে হয়। তাঁর কবিতার বিষয়বস্তুতে যেমন উচ্চমার্গীয় চেতনা ঠায় করে নিয়েছে তেমনি কবিতার গঠনশৈলীতেও স্থান পেয়েছে শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কারের সৌন্দর্য। মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত কবিতাগুলোর প্রতিটি পঙক্তিতে লক্ষ করা গেছে অলঙ্কারের ঝঙ্কার। প্রতিটি কবিতায় রয়েছে অনুপ্রাস, যমক, শ্লেষ, উপমা, রূপক, উৎপ্রেক্ষার সরস উপস্থিতি। ফলে কাব্যসৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে আশানুরূপভাবে। এতে কবিতার গঠনশৈলী পাঠকের দৃষ্টি এড়ায় না। শব্দ চয়ন, অর্থের পরিপূর্ণ বিকাশে শব্দ নির্বাচনে কবি যে কৌশলী হয়ে উঠেছেন তা অনুমান করতে কষ্ট করতে হয় না। যেমন ‘কালসমাচার’ কবিতায় যমকের ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে এভাবে-
শোকের আগুনে পোড়ে সোনার স্বদেশ
মানুষ মানুষ নেই ইতর বিশেষ
এ কবিতার পঙক্তিতে মানুষ শব্দটি দু’বার ব্যবহার হয়েছে কিন্তু দুই মানুষের অর্থ দু’রকম হয়েছে। এটিই শব্দ প্রয়োগের কৌশল; অনুপ্রাস; কাব্যসৌন্দর্য। কবির ‘দানবীয় দাঁত’ কবিতায় উপমার ব্যবহার অতি চমৎকার।
তুর্কি ঘোড়ার মতো ছুটছে বাজার দর, বাড়ি ভাড়া
অগ্নিমূল্য সকল কিছু
খুনও সস্তা এখানে নুনের চেয়ে।
এ কবিতায় কাব্যালঙ্কার অত্যন্ত স্পষ্ট। এখানে উপমার ব্যবহার হয়েছে সচেতনভাবে- যেমন তুর্কি ঘোড়ার মতো বাজার দর। আবার শ্লেষ ব্যবহার হয়েছে এভাবে- ‘খুনও সস্তা নুনের চেয়ে’। এ দু’টি অলঙ্কার কবিতাটিকে চিত্রকল্পে রূপান্তরিত করেছে। আবার ‘গরম’ কবিতায় কবি ‘গরম’ শব্দটি একাধিকবার ব্যবহার করে অনুপ্রাস সৃষ্টি করলেন এভাবে-
গরম গরম কী যে গরম / গরম গোটা দেশ
এই গরমে তরু-ছায়ায় / তবু আছি বেশ।
আবার অন্য একটি কবিতায় শব্দ কবির সচেতন শব্দ চয়নের কারিশমা লক্ষ করা যায় এভাবে-
নাতিও যায় বেডায়ও যায় / ডায়নি বাজায় ঢোল
বঙ্গে বসে জয় মাতরুম’ / বোল তুলেছে বোল।
(পলাশীর ছড়া)
আবার ছড়া কবিতা ‘অষ্টপ্রহর’ এ ‘ষ্ট’ তিনবার ব্যবহার করে কবি অনুপ্রাসের দৃষ্টান্ত সচল রেখেছেন- ‘অষ্টপ্রহর কষ্ট দেয় নষ্ট কাল’। স্বল্পপরিসরে একজন কবির কাব্যপ্রতিভা বিশ্লেষণ করা দুরূহ ব্যাপার। তবে খণ্ড খণ্ড পরিসরেও একজন কবিকে পরিপূর্ণভাবে জানতে দোষের কিছু নেই। কবি মোশাররফ হোসেন খানের কাব্যপ্রতিভার অনুসন্ধান সময়সাপেক্ষ। তাঁর ‘কবিতা সমগ্র-২’ গ্রন্থটির শেষে যে ছড়া কবিতার সন্নিবেশ হয়েছে সে সব কবিতায় মোশাররফ হোসেন খানকে জানার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। অসাধারণ প্রতিটি কবিতার বিষয়, আঙ্গিক ও অলঙ্কারে সৌন্দর্য কবির সৃজনশীলতাকে অনন্য করেছে। কিশোর উপযোগী এসব কবিতার আবেদন অনিশেষ। তার ‘হায় বাঙালি’ কবিতাটি স্মরণাতীত সৌন্দর্যের আধার। তিনি লিখেছেন-
যে বাঙালি ভূত তাড়ালি / একাত্তরের রাতে,
সেই বাঙালি ক্ষুধায় মরে / শকুন বসে পাতে।
আশা করি এ গুণবাণ শব্দশিল্পী কাব্যজগতের কালোত্তীর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত হতে থাকবেন স্বমহিমায়।
