ক্লাস শেষ করে অফিস রুমে ঢুকতেই মোবাইলটা বেজে উঠল। তাকিয়ে দেখি ‘ফাতি’র নাম ভাসছে স্ক্রিনে। একটা মধুর আবেশে ভরে গেল আমার মন। কেননা, খালাতো, মামাতো সব ভাইবোনের মধ্যে ফাতি আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। আর সবার চেয়ে আমরা দু’জন দু’জনকে যতটা বুঝি, অনুভব করি তা অব্যক্ত-অবর্ণনীয়। সেই ছোটবেলা থেকেই খালুজানের দেশের বাইরে থাকার কারণে ও আমাদের বাসায় থেকেই মাধ্যমিক শেষ করেছিল আমার সাথে একই স্কুলে পড়ে। তবে ওর এসএসসি আমার এক বছর পরে। তাতে কি! গলায় গলায় খাতির। আমাদের আত্মার স্পন্দনও যেন একই সাথে বাজতো। আমার অনর্গল কথা বলা আর ওর শুধু মুখ চিপে চিপে হাসিতেই জমে উঠত আমাদের বোনদের মিলনমেলা এক হৃদ্যিক পরিবেশে। সেই ফাতি! আমার সব অন্যায়গুলোও ওর চোখে সুন্দর হয়ে ফুটতো আজ মনে পড়লে অনুশোচনায় আক্রান্ত হই। বড় হওয়ার কর্তৃত্বে কি জ্বালাতনই না করেছি ওকে। তবু উদার প্রাণা বোনটি আমার আল্লাহর দান ডাগর ডাগর চোখের হাসি দিয়ে সব মুছিয়ে নিয়েছে। আজ আমরা দু’জনেই নানী হয়েছি, দাদী হয়েছি কিন্তু সম্পর্কের টানাপড়েন ঘটেনি কোনো কালে। এ জন্য মহান আল্লাহর অপার কৃপা নেট রাজ্যকে জানাই সাধুবাদ।

- আসসালামুআলাইকুম। কি রে এ সময়! অফিস টাইমে?
- আর বলো না। একটা বিষয়ে তোমার শরণাপন্ন হলাম।
সেই ঝংকৃত কণ্ঠস্বর! যে স্বরের আবৃত্তিতে আমি প্রতিনিয়ত মুগ্ধ হতাম। একটা কবিতা লিখলে প্রথমেই ওকে দিয়ে পাঠ করাতাম। এখন ও মাধ্যমিকের বাংলার শিক্ষক। বাংলা ভাষার শুদ্ধচর্চা আর প্রমিত উচ্চারণে কথা বলা, আবৃত্তি করা ওর বিশেষ স্টাইল!
এপাড় থেকে আমি বললাম : বল! কি বলছিলে। ও বললো : বলো তো ‘কালসার’ অর্থ কি? এ আবার কেমন শব্দ? কোথায় পেলে? এই দেখো না! নবম শ্রেণীর পদ্যাংশ বইতে ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ঝর্নার গান কবিতাটি পড়াচ্ছিলাম ছাত্রদের। কিন্তু এ ‘কালসার’ শব্দটিতে এসে আটকে গেলাম। আগামী ক্লাসের জন্য পড়া দিয়ে আপাতত উদ্ধার পেয়েছি যদিও কিন্তু কিভাবে কী বুঝাবো বুঝতে পারছি না।
ওর হতাশার সুরকে পানিঢালা করতে এ পাশ থেকে বললাম, ‘হ্যাঁ : তুমি হলে হাই স্কুলের শিক্ষক আর আমি তো পেরাইমারির ঘণ্টা পিটানী। ‘কীয়ে আর কীয়ে পান্তা ভাতে ঘিয়ে।’ আমাকে বলছ এর ব্যাখ্যা জানাতে!
-আরে না না না! স্বভাবসুলভ জোর প্রতিবাদে ও আমাকে সাথে সাথে একগাল শুনিয়ে দিল্যাখ, তারপরেও তুমিই আমার চেয়ে বেশি অধ্যবসায়ী। সেই স্কুলজীবন থেকে পড়াশোনা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি তোমারই বেশি হয় যেহেতু তুমি কবি, সাহিত্যিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক তুমিই বলতে পারবে এর সঠিক অর্থ।
এক টানে কথা ক’টি যেন রেলগাড়ি ছুটে গেল। পড়লাম বিপাকে। এক নিঃশ্বাসে এত স্তুতি! স্তুতি শুনতে মনের অজান্তেই পুলক জাগে কিন্তু দায় বাড়িয়ে দেয় একহাত। এখন তো আর ভুলভাল বুঝিয়ে দিলে চলবে না। চাপার জোর সবখানে চলেও না। তাই বিজ্ঞের মতো জানতে চাইলাম পুরো লাইনটা বল। ফাতি শোনালো। ঝংকৃত সুর ঢেলে দিয়ে ঝর্নার মতোই তরতর করে ও আবৃত্তি করে গেল পুরো কবিতাটা:
‘চপল পায় কেবল ধায়
কেবল গাই পরীর গান,
পুলক মোর সকল গায়
বিভোল মোর সকল প্রাণ।

বনঝাউয়ের ঝোপ গুলায়
কালসারের দল চরে,
শিং শিলায় শিলার গায়
ডালচিনির রং ধরে।

অপূর্ব। কিন্তু ‘কালসার’? নাহ বোধগম্য নয়। সময় চেয়ে নিলাম। বিদ্যালয়ে সংরক্ষিত বাংলা অভিধানটি টেনে নিয়ে দেখলাম- নিবিষ্ট মনে খুঁজলাম। কোথাও পেলাম না অমন বিদঘুটে শব্দটি! কিন্তু কবিতার ভাবার্থ অনুযায়ী কেবলই মনে হচ্ছিল ‘কালসার’ শব্দটি কোনো একটি প্রাণী হবে। কিন্তু পানিতে কী প্রাণী হতে পারে? শিং মাছ? নাহ্ শিং মাছের তো শিং নেই। তবে কি ওর দাড়িগুলোকেই কবি রূপকার্থে শিং বলেছেন! কবিদের ‘কবিতাসত্য’ তো এমনি! অলীক অথচ সত্য। অর্থাৎ বাস্তব ধারণায় অলীক অথচ কবিতার ধারণায় সত্য একেই বলে কবিতাসত্য। কিন্তু পাথর ঘষে কি আর তা দারুচিনি রং হয়? সে আবার কী? দারুণ ধাঁধাঁ মনে মনে কবির কাব্যশক্তিকে সম্মান জানাচ্ছিলাম। ভাবছিলাম তার কবিতা সত্যের গূঢ়তা নিয়ে। হঠাৎ মনে হলো ইউটিউব সার্চ দেই। যেই ভাবা! পুরো কবিতাটা বেরিয়ে এলো। অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্যে পাহাড়ের গা বেয়ে ঝর্ণা বয়ে যাচ্ছে। আবৃত্তিকার আবৃত্তি করে যাচ্ছেন ছন্দে ছন্দে। কিন্তু আশেপাশে তো কোনো প্রাণীর চিত্র নেই! কোনো একটা প্রাণীনা জলজ না স্থলভাগের।


মাথায় একবার যেটা ঢোকে তার সমাধান না করে উঠা যে আমার ধাঁচে নেই। যাহ্ পাশেই হাইস্কুল। বিরতির সময় ছাত্র পাঠিয়ে প্রাক্তন এক ছাত্রের কাছ থেকে নবম শ্রেণীর পদ্যাংশটি আনালাম। মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। কবি পরিচিতি, কবিতার মূলভাব কিছুই বাদ রাখিনি। তন্ন তন্ন করে শব্দভাণ্ডারেও খুঁজলাম। নাহ্ কোথাও এই বিদঘুটে শব্দের কোনো অর্থ দেয়া নেই। যথারীতি ছুটির ঘণ্টা পড়ে গেল। আজ আর ফাতিকে জানাতে পারলাম না। ও দিকে ঈদ- ই- মিলাদুন্নবীর বন্ধসহ তিনদিন একাধারে বিদ্যালয় বন্ধ থাকবে। একটা ছুটি ভোগের সুযোগ পেয়ে গেলাম। বাসায় ফিরে গোছানো ব্যাগটা নিয়ে সব সময়ের মতো সেদিনই ছুটলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে পরিজনের কাছে। ঢাকায় ফিরে দ্বিতীয় সংসার নামে খ্যাত আমার নাতনীদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ফাতির ‘কালসার’ এর বিষয়টি ভুলেই গেলাম বেমালুম। পরদিন মেয়েদের পরিকল্পনা মতো নাতনীদের নিয়ে ‘মিরপুর চিড়িয়াখানায়’ ঘুরতে যাওয়ার প্রোগ্রাম ঠিক হলো। মূলত আমার ছুটির দিনগুলো এভাবেই কাটে। আমাকে নিয়ে মেয়েরা সবসময় একেকটা প্রোগ্রাম সাজিয়ে রাখাতে আমিও ওদের সময় দিতে পারি বেশ, এ আমার এক বড় প্রাপ্তি।
পরিকল্পনা মতো সকালের নাশতা সেরেই আমরা বেড়িয়ে পড়লাম চিড়িয়াখানার উদ্দেশে। প্রবেশমুখে টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকে গেলাম সবাই। প্রশস্ত অঙ্গন। ঘুরছি, দেখছি। আমার সাথে বড় নাতনী নূরীন। হাতধরা আমাকে নিয়েই হরিণছানার মতো লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছে। সে কী উচ্ছ্বাস! কোন প্রাণীর কি নাম? কি তার বৈশিষ্ট্য, কোথায় তার নিবাস ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশ্নোত্তরে এগিয়ে চলা। কৌতূহলী নূরীনের প্রশ্নোত্তর দেয়ার মতো ধৈর্য যেহেতু আমারই আছে তাই নো অবজেকশন। এভাবেই প্রশ্নোত্তরে প্রশ্নোত্তরে আমরা চলে এলাম হরিণের খাঁচার কাছে। দেখতে লাগলাম চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ। এর পরের খাঁচাটির দিকে যেতেই নূরীন চিৎকার করে বলে উঠল উঁহশু! হ্যাঁ তাই তো! তবে আমি ভালো করে তাকিয়ে বিস্মিত হলাম ভীষণ। উঁচু-লম্বা-প্রায় কালো রং কিন্তু এর মাথায় শিং কেন? গাধার আবার শিং হয় না কি? নূরীনেরও কৌতূহলী অথচ জিজ্ঞাসু দৃষ্টি ধরে আমি আবারো গভীরভাবে দেখতে লাগলাম। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড! উচ্ছ্বসিত হয়েই চিৎকার করে উঠলাম ‘ওয়াও!’ নূরীন তো হতবাক।

নানাপাখির এমন কাণ্ডে। কী! দেখ ওর শিং দুটো একেবারে দারুচিনি রং! নূরীন কি বুঝলে জানি না। এরই মধ্যে সালওয়া এসে দিলো এক ঝাড়ি। এক জায়গায় এতক্ষণ দেরি করলে হবে? অগত্যা দ্রুতগতিতে হাঁটা ধরলাম আমরা। যাচ্ছিলাম হাতির আস্তানার পাশ দিয়ে। হাতি দেখার বিস্ময়তায় নূরীন ভুলে গেল পেছনের সব উল্লসিত হয়ে পড়ল কিন্তু আমি? আমি তখন বাসায় ফেরার তাগিদ অনুভব করছি প্রচণ্ড কখন ডিকশনারিটা হাতে পাব! তবে আমার ভেতরের সে উত্তেজনা কেউ টের পেল না। বাসায় ঢুকে যথারীতি ধীরস্থিরে নামাজ শেষে সান্ধ্যকালীন নাশতা দিয়ে আমি বসলাম ডিকশনারি নিয়ে। ওই প্রাণীটার সাইনবোর্ডে লেখা ছিল ‘কৃষ্ণমৃগ’। আমি খুঁজলাম কৃষ্ণমৃগের প্রতিশব্দ কি কি ? এবং এর বৈশিষ্ট্যসমূহ কেমন ইত্যাদি। পেয়েও গেলাম আল্লাহ চাহেত- কৃষ্ণমৃগের প্রতিশব্দ ‘কালসার’। যার শিংগুলো দারুচিনি রং। অন্য প্রজাতির হরিণের তুলনায় কিছুটা উঁচু। সুবহান আল্লাহ! যেমনি আল্লাহর সৃষ্টি তেমনি কবির রচনাশৈলী! কোথা থেকে উদাহরণ নিয়েছেন কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত! মা শা আল্লাহ! কবিতার চরণটি আবারো স্মরণ করলাম বন ঝাউয়ের কোনগুলায় কালসারের দল চরে,
শিং শিলায় শিলার গায় ডালচিনির রং ধরে। অসাধারণ কাব্যগাঁথা। বস্তুত: কবি এখানে সুন্দরী ঝর্ণার রূপ-বৈশিষ্ট্য ঝর্ণার মুখ দিয়েই বিভিন্ন উপমা, উৎপ্রেক্ষা, অনুুপ্রাসের অলঙ্করণে ফুটিয়ে তুলেছেন ঝর্ণার চিরন্তন বয়ে চলা এক মূর্তমান দৃশ্য।
পরদিনই রিং দিলাম ফাতিকে। -কী খবর তোমার কালসারের? আর বলো না। আজও পাইনি। ওদিকে স্কুল খোলার সময় হয়ে এলো।
- তা! কীভাবে ক্লাস ম্যানেজ করেছ? ওই যে তোমার বর্ণনামতোই ঝর্ণার রূপ,বৈশিষ্ট্য বুঝিয়েছি বটে কিন্তু ‘কালসার’ দিয়ে ধাঁধাঁয় ফেলে দিয়েছি। বলেছি পাঁচটি প্রশ্ন তৈরির সৃজনশীল কাজ দিয়ে দিলাম বন্ধের কাজ হিসেবে। - বাহ্ এই তো প্রজ্ঞাময়ী শিক্ষিকা। - আরে না না! নিজেই জানি না আর ওরা কী লিখে আনবে! হ্যাঁ হ্যাঁ ওদের থেকেই জেনে যাবে। দৃঢ় কণ্ঠে সায় দিয়ে আমি বললাম, হোমটাস্ক দিয়ে তো উত্তম করেছ। এখনকার ছেলেমেয়েরা আমাদের চেয়েও ডাকসাইটে। ‘মানে’ এই যেমন আমার নূরীন ছ’বছর বয়সেই জেনে ফেলল ‘কালসার’ কি? দেখতে কেমন? আর আমি তা জানলাম এতদিনে! ‘বলো কি?’ হ্যাঁ গো হ্যাঁ। ‘কালসার’ হচ্ছে হরিণের একটা প্রজাতি। যেমন চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ তেমনি কৃষ্ণহরিণ। এর প্রতি শব্দই কালসার। এবার তুমি কবিতার সাথে মিলিয়ে দ্যাখ। - ও পাশ থেকে শোনা গেল উচ্ছ্বসিত কণ্ঠের আওয়াজ; ‘আল্লাহু আকবার’।