মহল্লার জমজমাট বড় মুদির দোকানটার সামনে এসে দাঁড়াতেই আসাদ সাহেবের খেয়াল হয়, বাসা থেকে বেরোনোর আগে মুনিরা কয়েকটি জিনিস কিনে আনতে বলেছিল। এর মধ্যে সাবান ও টুথপেস্টের কথা মনে পড়লেও বাকি দু’টি জিনিসের কথা ঠিক মনে পড়ছে না। আঁতিপাঁতি করে অনেক চেষ্টার পরও ঠিক মনে করতে পারেন না তিনি। সেই ছেলেবেলায় পড়া যোগীন্দ্রনাথ সরকারের লেখা কাজের ছেলে কবিতায় কিশোর ছেলেটির মতো অবস্থা হয়েছে তার।
দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল, চিনি পাতা দৈ
দু’টা পাকা বেল, সরিষার তেল, ডিমভরা কৈ।
পথে হেঁটে চলি, মনে মনে বলি, পাছে হয় ভুল,
ভুল যদি হয়, মা তবে নিশ্চয়, ছিঁড়ে দেবে চুল।
বাড়ি থেকে মায়ের ফরমায়েশ অনুযায়ী বাজারে জিনিসপত্র কিনতে এসে সবকিছু ভুলে এলোমেলো হয়ে যায় তার কাছে। কিছুতেই ঠিকভাবে মনে করতে পারে না মায়ের বলে দেওয়া জিনিসগুলোর কথা। এই মুহূর্তে আসাদ সাহেবের অবস্থাও হয়েছে তেমনি।
খুবই অসহায় বোধ করছেন তিনি এখন। আজকাল প্রায়ই এমন হচ্ছে। চট করেই ভুলে যাচ্ছেন অনেক কিছুই। কিছুক্ষণ আগে যে কাজটি করবেন বলে মনে করেছিলেন, পরক্ষণেই তা ভুলে যাচ্ছেন বেমালুম। এটা ডিমনেশিয়ার লক্ষণ, মানে স্মৃতিভ্রম। বার্ধক্যে পা রাখলে অনেক লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটাও তেমনি একটি লক্ষণ। বয়স ষাট পেরোলেই তো বার্ধক্যের সীমানায় এসে যায় মানুষ। তিনি আরো আগেই সেই সীমা অতিক্রম করে ঢুকে পড়েছেন বার্ধক্যে।

বাসায় না গিয়ে মোবাইলে ফোন করে সেই জিনিসগুলোর কথা জেনে নিতে পারলেই ল্যাঠা চুকে যেত। কিন্তু আজ কপালটা সত্যি খারাপ। বাসা থেকে বেরোনোর সময় তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে মোবাইলফোনটা সাথে নেয়া হয়নি। হঠাৎ মাঝে মাঝে এটা হয়ে যায়। আজও হয়েছে।
ব্যাংকের চাকরিতে অবসর নেয়ার পর চার বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে।
দীর্ঘ একটানা তেত্রিশ-চৌত্রিশ বছর চাকরি করেছেন। তখন কত ব্যস্ততায় সপ্তাহের দিনগুলো কিভাবে যে কাটত, টেরই পাওয়া যেত না। ব্যাংকের চাকরিতে সব সময় বাড়তি কাজের চাপ থাকত। আর টেনশন তো নিত্যদিনের সঙ্গী ছিল। আজকাল আধুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তির কারণে ব্যাংকের কাজকর্ম অনেকটাই সহজ-সাবলীল হয়ে গেছে। আগের ম্যানুয়েল সিস্টেমে অনেক কষ্ট আর পরিশ্রম করতে হতো। সেইসব দিন পার করে এসেছেন আসাদ সাহেব। সেইসব দিনগুলোর কথা মনে হলেই বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। আহা, এখন ব্যাংকের চাকরিতে সেই কষ্ট আর পরিশ্রম করতে হয় না। কত সহজেই সব কাজ হয়ে যায়।

আজকাল একাকী থাকলে কেবলই নিজেকে নিয়ে কত কথা মনে পড়ে তার।
দেখতে দেখতে বয়সটা বেড়ে গেল কিভাবে? সেই কলেজ-ভার্সিটি পড়াকালীন সময়গুলোর কথা ভাবতেই সারা শরীরে কেমন একটা শিহরণ লাগে। টগবগে তরুণবেলার সময়গুলো কত যে ঝলমলে, উজ্জ্বল-উচ্ছল ছিল। কত উত্তেজনা, আনন্দ, নিত্যনতুন অ্যাডভেঞ্চার অভিজ্ঞতায় কাটত তখনকার সময়গুলো। এখন সময়গুলো ক্রমেই ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। দিনে দিনে উদ্বেগ, বিষণœতা, একাকিত্ব, হতাশা চেপে বসছে মনের মধ্যে। পাশাপাশি একটার পর একটা রোগ এসে বাসা বাঁধতে শুরু করেছে। এতদিন ডায়াবেটিস, হাইপ্রেশার তেমনভাবে আক্রমণ না করলেও এখন তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়ম করে ওষুধপত্র খেতে হচ্ছে। কত কী খেতে মন চাইলেও ডাক্তারের নিষেধাজ্ঞা জারির কারণে সেই সব লোভনীয় খাবার দূরে ঠেলে সরিয়ে দিতে হচ্ছে। নিজেকে সুস্থ এবং ফিট রাখতে হলে নাকি দৈনিক কমপক্ষে এক ঘণ্টা হাঁটার বিকল্প নেই। বাইরে হাঁটতে বেরোলে চেনাজানা কত জনের সঙ্গে দেখা হয়। সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার গল্প হয় হাঁটতে হাঁটতে।
মুদির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে অনেক চেষ্টার পরও মুনিরার ফরমায়েশের বাকি কয়েকটি জিনিসের কথা মনে করতে না পেরে এক ধরনের বিষণœতা আর হতাশা চেপে বসে। এ রকম তো ছিলেন না তিনি! তার স্মৃতিশক্তি অনেকের তুলনায় বেশ প্রখর বলে বাড়িতে এবং বাইরে বন্ধুমহলে বিশেষ সুনাম ছিল। কেউ কেউ ঠাট্টা করে জীবন্ত ডিকশনারি-এনসাইক্লোপিডিয়া বলে ডাকত তাকে। তখন মাথায় কত কী বিষয় নিয়ে চলতেন। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে চট করে বলে দিতেন। এ জন্য ভেতরে ভেতরে এক ধরনের আনন্দ ও পুলক অনুভব করতেন। অথচ এখন সেসব অতীত স্মৃতি হয়ে গেছে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে একে একে মানুষ তার অনেক কিছু হারাতে শুরু করে। চুলে পাক ধরে। দাঁতে সমস্যা দেখা দেয়, নড়বড়ে হতে থাকে সেগুলো। শরীরের চামড়া শিথিল হয়ে যায়। হাড়ে ক্ষয় হতে থাকে। চলতে-ফিরতে কষ্ট হয়। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে গেলে টের পাওয়া যায় হাঁটুর জোর কমে আসার ব্যাপারটা। হজমশক্তিও কমে আসে ধীরে ধীরে। খাওয়াদাওয়ায় সাবধান-সতর্ক হতে হয়। তা না হলে নানা বিপত্তি ঘটে।

এখন ব্যস্ততা বলতে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নেই। কাজ ছাড়া একটানা বাসায় বসে থাকতে থাকতে একঘেয়েমি পেয়ে বসে। হাঁসফাঁস লাগে এই অখণ্ড অবসর। অথচ এক সময় তুমুল ব্যস্ততায় হাঁপিয়ে যেতে যেতে কেবলই মনে হতো-আহা, একটুখানি অবসর যদি পাওয়া যেত! এখন একটানা অবসরে তলিয়ে যেতে যেতে কেবলই মনে হয়, ব্যস্ততার সেই সময়গুলোই যেন ভালো ছিল। তখন কিছু একটা নিয়ে দিব্যি সময় কেটে যেত। অবশ্য এখন ধর্মকর্মে বেশি সময় দেয়ার সুযোগ হয়েছে। আগে হয়তো এতটা নিবিড় সময় দেয়া সম্ভব হয়নি বৈষয়িক নানা কাজের ব্যস্ততায়। এজন্য ভেতরে ভেতরে অনুশোচনাবোধ জাগলেও কিছু করতে না পারার ব্যর্থতা কুরে কুরে খায় তাকে। তবে এখন ধর্মকর্মে যথেষ্ট সময় দিতে পারছেন বলে প্রশান্তি অনুভব করেন।
এখন সময় কাটানোর উপায় বলতে পত্রিকা পড়া, বই পড়া, টিভি দেখার পাশাপাশি ফেসবুকে চোখ বোলানোই ভরসা। এই বয়সে ফেসবুকে চোখ বোলাতে বোলাতে কেবলই মনে হয়, দুনিয়াটা কত দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সমাজের নানা পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে বেশ কষ্ট হয়। নতুন জেনারেশনের সঙ্গে বড় ধরনের একটা ব্যবধান উপলব্ধি হয়। প্রগতিশীল ভাবনাচিন্তা নিয়ে সারা জীবন কাটালেও এখন এই বার্ধক্যে পৌঁছে আসাদ সাহেবের মনে হয়, আজকাল প্রগতির নামে অনেকে যাচ্ছেতাই কাণ্ডকীর্তি করে বেড়ায়। যা আবার ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে কেউ কেউ ফলাও করে জানান দেয় অন্য সবাইকে। তাদের কাণ্ডকীর্তিগুলো নিতান্তই অরুচিকর, অশালীন, অভদ্রোচিত মনে হয় অনেক সময়। এসব কারণে ফেসবুকে এক ধরনের অরুচি এসে গেছে। আসলে এসবই বয়সের কারণে ঘটছে- এটাও মানেন তিনি। তারপরও প্রশ্ন জাগে মনে, সমাজ ও সভ্যতা কি এগিয়ে যাচ্ছে, নাকি পেছাচ্ছে?

একটা সময়ে অফিসে অনেক প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হিসেবে তার আলাদা কদর ও খ্যাতি ছিল। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে সহকর্মী সিনিয়র-জুনিয়র সবাই বেশ কিছু বিষয়ে তার ওপর নির্ভর করতেন। কাজের চাপ থাকলে শুক্র-শনিবারেও তার তলব পড়ত। পারিবারিক অনেক জরুরি কাজকর্ম, দাওয়াত-নিমন্ত্রণ বাদ দিয়ে সেই তলবে সাড়া দিয়ে ছুটতে হতো। এ কারণে ছুটিছাঁটার প্রয়োজন হলে কর্তৃপক্ষ নানাভাবে বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ছুটি মঞ্জুর করতে চাইতেন না। এমনও হয়েছে, ভালো ভালো ট্রেনিংয়ের তালিকায় তার নাম এলেও শেষ পর্যন্ত অফিসের কাজের অজুহাতে সেই ট্রেনিংয়ে আর যাওয়া হয়নি। রিটায়ারমেন্টের পরও প্রায় এক বছর তাকে প্রায়ই যেতে হয়েছে অফিসে। বিভিন্ন কাজে মাঝপথে আটকে যাওয়ায় তেমন অবস্থায় উদ্ধার পেতে একমাত্র উপায় হিসেবে আসাদ সাহেবের ডাক পড়েছে। অবসর নেয়ার পর অফিস ছেড়ে আসার পরও এভাবে ডাক পড়ায় মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগলেও একসময় ব্যাপারটা তার জন্য অন্য এক ধরনের অনুভূতি বয়ে আনত। একপর্যায়ে অফিস থেকে তেমনি ডাকের জন্য মনটা ভেতরে ভেতরে উদগ্রীব হতো। অপেক্ষা করে থাকতেন, কখন ডাক আসবে? অফিসে এই ছুতোয় যাওয়ার পর পুরনো সহকর্মীদের সাথে দেখাসাক্ষাৎ, কথাবার্তা, আলাপ-আড্ডার সুযোগটা বেশ উপভোগ করেছেন বেশ কিছুদিন। কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই একসময় সেই ডাকের পরিমাণটা কমতে শুরু করে। তারপর তা একেবারে শূন্যে নেমে এসেছে। এখন আর বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে পুরনো অভিজ্ঞ কর্মকর্তা হিসেবে তার আর ডাক পড়ে না। অফিসের লোকজন নিজেরাই সেই সমস্যা সমাধানে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পৃথিবীর কেউই সব সময় অতি আবশ্যকীয় বা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারো জন্য পৃথিবীর কোনো কিছুই আটকে থাকে না। প্রকৃতিই সেই শূন্যস্থান পরিপূর্ণ করে দেয়। এরকম অনেক কথাই সবার মুখে ফেরে সব সময়। তাহলে বয়স বাড়ার সাথে সাথে অন্যদের কাছে তারও প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে!
নিজেকে একজন অপ্রয়োজনীয় মানুষ ভাবতে গিয়ে এক ধরনের হীনম্মন্যতা চেপে বসতে চায় তার মধ্যে। কিন্তু সেটাকে জোর করে দূরে ঠেলে সরিয়ে দিতে গিয়েও পারেন না। বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে স্বাভাবিকভাবে, তাহলে আর কষ্ট থাকবে না- এরকম একটা কথা কোথায় কোন বইয়ে যেন পড়েছিলেন। সেটা মনে পড়তেই মনটা শান্ত হয় কিছুটা। বাস্তবতাকে মেনে না নিলে অযথাই কষ্ট বাড়ে যেন।
এখন বাসায় ফরমায়েশের সবগুলো জিনিস না নিয়ে ফিরলে মুনিরা বেশ রাগ করবে। হয়তো ওই জিনিসগুলোর জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে সে। আজকাল সেও অল্পতেই রেগে যায়। যা মুখে আসে তাই বলে ফেলে। নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। এটাও তার বয়স বাড়ার কারণে হচ্ছে।
তার মতো জীবনসঙ্গিনীরও তো বয়স বেড়েছে। একসময়ের শান্ত, নরম স্বভাবের মুনিরা। বাসায় বড় বড় অনেক ঝামেলার মুখোমুখি হয়েও ধৈর্য ধরে সবকিছু সহজভাবে সামলে নিয়েছে। মেজাজ খারাপ করেনি। ছেলেমেয়ে দু’টিকে বড় করে তুলতে গিয়ে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে তাকে। তখন মা হিসেবে তাদের ওপর রাগ করার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে অনেকবার। অদ্ভুত এক ক্ষমতায় নিজেকে শান্ত রেখে সন্তানদের বুঝিয়ে শুনিয়ে সঠিক পথ ধরে চলতে শিখিয়েছে মুনিরা। তারা বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করেছে। বড় সন্তান আফসানা এখন আমেরিকার বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছে। স্বামী ও কন্যাকে নিয়ে বেশ ভালোই আছে। পুত্র আবরার বিসিএস করে এখন ইউএনও হিসেবে দিনাজপুরে পোস্টিং। সেও বউ নিয়ে আছে সেখানে।

বাসায় ফেরার পর মুনিরা মেজাজ খারাপ করে ঝাঁজালো কথাবার্তা বললেও তা মুখ বুজে শুনতে হবে তাকে। কিছুই করার নেই তার। এটাই যেন নিয়তি। ভুলে যাওয়া জিনিসগুলো হয়তো জরুরি কাজে লাগবে। এগুলো না হলে চলবে না। বাসায় ফিরে মুনিরার টকঝাল কথা শোনার পর ভুলে যাওয়া সেই জিনিসগুলো আনতে আবার মুদির দোকানে ছুটতে হবে।
সিঁড়ি বেয়ে তিনতলার ফ্ল্যাটে উঠতে উঠতে স্ত্রীর রাগী মুখের কথা মনে পড়ে যায় আসাদ সাহেবের। মনের মধ্যে ভয়ভাব না জাগলেও মুনিরার সেই রাগী মুখের কথা ভাবতে ভাবতে অদ্ভুত এক ভালোলাগা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। এই বুড়ো বয়সে নিস্তরঙ্গ জীবনে মাঝে মধ্যে এরকম রাগ, উত্তেজনাকর পরিস্থিতি কিছুটা বৈচিত্র্য বয়ে আনে বৈকি! এটাও তো এক ধরনের ভিন্ন অনুভূতির ছোঁয়া। একঘেয়ে জীবনের স্বাদে নতুনত্ব, আনন্দময় অভিজ্ঞতা। হয়তো আবার দোকানে যেতে কষ্ট হবে। এ নিয়ে আক্ষেপ, দুঃখ কিংবা হতাশা অনুভব না করে ব্যাপারটাকে স্বাভাবিক মামুলি বিষয় হিসেবে মেনে নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে তিনতলার দিকে এগিয়ে যান তিনি।