ছোটবেলায় আমাদের সবুজবাগ এলাকায় খুব একটা টেলিভিশন ছিল না। দুই-একটা বাসায় যাও ছিল, তাও ছাড়া হতো রাত ৯টায়। আমাদের তখন লেখাপড়াও শেষ হতো সেই একই সময়ে। আমাদের ছোটদের অনুষ্ঠানগুলো হতো সাধারণত বন্ধের দিনগুলোতে সকালে আর অন্যান্য দিনে শুধু সন্ধ্যায়। রাত ৯টায় হতো সব বড়দের অনুষ্ঠান। নিজেদের টেলিভিশন ছিল না তাই ছোটদের বড়দের বলে কোনো অনুষ্ঠানের আলাদা কোনো মাহাত্ম্য আমার মনে খুব বেশি ছিল না। টেলিভিশন দেখতে পারছি, একটা চারকোনা বাক্সের ভেতর কত মানুষ কত বিচিত্র কিছু করে বেড়াচ্ছে, এটা দেখতেই বিস্ময়, বিস্ময়ে আনন্দ। সেই সময়ে বড়দের একটা অনুষ্ঠান ছিল ‘যদি কিছু মনে না করেন’। ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানটি অনেকেরই খুব প্রিয় ছিল। আমার প্রিয় ছিল অনুষ্ঠানটির উপস্থাপকের মাথার চুল। একপাশে সিঁথিকাটা লম্বা চুলগুলো যেভাবে পাটের আঁশ পানিতে শুয়ে থাকে সেভাবে মাথার ওপর শুয়ে থাকতো, মসৃণ, ম্লান। একটুও নড়তো চড়তো না। উপস্থাপকের নাম ফজলে লোহানী। জীবনে সেই প্রথম উপস্থাপক কথাটার সাথে আমার পরিচয় হয়। উপস্থাপক মানেই যেন কথার মায়ায় মানুষকে হাসাবে কাঁদাবে ভাবাবে। ফজলে লোহানী তার কথার দ্বারা তার উপস্থাপনার দ্বারা একরাতে আমার কিশোর মনকে নাড়িয়ে দিয়ে ভাবিয়ে দিয়ে বিপ্লবী করে তুলেছিল। স্পষ্ট মনে আছে, তিনি তার কথার মায়ায় আমাদেরকে এমনভাবে ফেলেছিলেন যেন মনে হচ্ছিল তিনি টেলিভিশনের পর্দায় না, একেবারে চাক্ষুষ আমাদের সামনে অবস্থান করে বলছেন, যেখানে আফ্রিকা আর এশিয়া একসাথে মিশেছে, সেখানে সিনাই মরুভূমির পূর্বদিকে, ভূমধ্য সাগরের দক্ষিণ-পূর্ব কিনারায় একটি প্রাচীন দেশ ছিল আজ আর সেই দেশটি নেই, সেই দেশের নাম ছিল প্যালেস্টাইন। তারপর আমরা দেখলাম অসংখ্য সাদাকালো ফটোগ্রাফির মাধ্যমে প্যালেস্টাইন ভূমি ও তার অসহায় মানুষদের প্রতিচ্ছবি। সেই প্রথম জানলাম ফিলিস্তিন ছিল তুর্কিয়ে সাম্রাজ্যের অংশ।

১৯১৭ সালে ব্রিটিশরা প্যালেস্টাইনের কর্তৃত্বভার গ্রহণ করে ম্যান্ডেটরি পাওয়ার হিসেবে। এর পর থেকেই বহিরাগত ইহুদিরা প্যালেস্টাইনে আসা শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৪৮ সালে ইহুদিরা প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের নাম বদলে ইসরাইল নাম ঘোষণা করে এবং আরবদেরকে তাদের বাসভূমি থেকে বিতাড়িত করা শুরু করে। এর পরের কথাগুলো কচি মন ভিজিয়ে দিয়েছিল- একটি পাখির বাসা আছে, একটি খরগোশের গর্ত রয়েছে, একটি গরুর গোয়াল আছে, একটি ঘোড়ার আস্তাবল আছে কিন্তু ফিলিস্তিনিদের কোনো দেশ নেই। এই ফিলিস্তিনের পরিচিতির মধ্য দিয়ে তৎকালীন প্রেক্ষাপট তিনি এমনভাবে তুলে ধরেছিলেন যে, যারা অনুষ্ঠানটি দেখছিল তাদের সবার চোখ ছলছল করে উঠছিল। এর পরই শুরু হলো গান ‘ফিলিস্তিন আহা ফিলিস্তিন, দুঃখিনী মায়ের মতো, সাগরের ঢেউয়ের মতো। ‘হানিফ সংকেতের গাওয়া সেই ছোটবেলায় শোনা গানের লাইনগুলো আজো ফিলিস্তিনের প্রসঙ্গ উঠলেই মনের অজান্তে তার হাল্কা পাতলা গড়নের অবয়বসহ গায়কি মুহূর্তটি চোখের সামনে ভেসে আসে ফিলিস্তিন আহা ফিলিস্তিন, দুঃখিনী মায়ের মতো, সাগরের ঢেউয়ের মতো। আর সাথে সাথেই ফিরে যাই সেই ছোটবেলার সময়টায়, যখন গানটা শেষ হলো তখন বড়রা কেউ কারো দিকে তাকাতে পারছিল না, কেননা সবার চোখেই পানি গড়িয়ে পড়েছিল। আর আমাদের চোখে ছিল বিস্ময়! আর কচি মনে ফিলিস্তিনিদের জন্য মায়া। তাহলে কি সবারই যেখানে ঘরে ফেরার তাগাদা থাকে, ঘরের কথা মনে পড়ে, সেই ঘরেই আজ তাদের পরবাসী জীবন? প্রতি মুহূর্তেই যেখানে আতঙ্ক আর আশঙ্কা। এই বুঝি কারো মৃত্যুসংবাদ, এই বুঝি কাউকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সংবাদ, এই বুঝি হাসপাতালে আহতদের আর্ত আহাজারিতে সাড়া দিতে ছুটতে হবে। এই বুঝি বোমা মেরে বাড়িঘরগুলো গুঁড়িয়ে দেয়া হবে? এই বুঝি আচমকা কেউ বুলেটবিদ্ধ হয়ে কাতরাতে থাকবে। এমনি এক ভয়াবহ আতঙ্কগ্রস্ত রাষ্ট্রটির নাম ফিলিস্তিন!!

আমার এক চাচা একেবারে টাটকা যুবক বয়সে কী এক কাজে সেই সময়ে লেবানন গিয়েছিলেন। যাওয়ার পর থেকেই মাসে কমপক্ষে দু’টি চিঠি আসত। মনে আছে পোস্টম্যান কাকা গেট থেকে ডাক ছাড়তেন। এই লেবানিজ চিঠি। সেই থেকে চাচার চিঠির নাম হয়ে গেল লেবানিজ চিঠি, চিঠি লিখতেন দারুণ। মজার মজার সব ঘটনার সাথে লেবাননের সুস্বাদু খাবারের কথা। কিভাবে চিজ পনির আর রকমারি কাবাব সুগন্ধ ছড়িয়ে তাদেরকে দোকানগুলোতে ডাকত, অলিভ তেলের রান্নার স্বাদের কথা, মসজিদের কথা, সুপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নগরের কথা, অসাধারণ সুন্দর ছেলেমেয়েদের কথা, তাদের জীবনযাত্রার কথা। মজার ব্যাপার হলো সেখানে যে-ই লেবানিজদের সাথেই তার পরিচয় হতো, সে-ই তাকে বাসায় নিয়ে যেত। খাওয়াতো গল্প করতো, গল্পে গল্পে আমার চাচার কাছে তার দেশের কথা জানতে চাইতো। লেবাননের পাশের দেশই ছিল ফিলিস্তিন। অসংখ্য ফিলিস্তিনিরা তখন নিজ দেশ ফিলিস্তিন ছেড়ে লেবাননে কেউ শরণার্থী হয়ে, কেউ লেখাপড়া করতে, কেউ পালিয়ে যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে। তাদের সাথেও চাচার দোস্তি জমে যায়। অতিথিপরায়ণ, বন্ধুবৎসল এদের সাথেই আমার চাচা লেবাননের ট্রেনিং ক্যাম্পগুলোতে ঘুরেছে, সেখানকার ছবি তুলে পাঠিয়েছে। তাদের সাথে আঙ্গুরের বাগান আপেলের বাগানে ঘুরে বেড়িয়েছে। জলপাই বনে তাঁবু গেড়ে রাতের পর রাত থেকেছে। প্রিয় ফিলিস্তিনিদের আর লেবানিজদের হৃদ্যতার কথা থাকতো সমস্ত চিঠিজুড়ে। দুঃখের বিষয় শুধু একটাই সে কাউকেই তার দেশ যে বাংলাদেশ এটা সরাসরি চিনাতে পারতো না। বাংলাদেশ চিনাতে হলে তাকে ম্যাপ ধরে বুঝিয়ে দিতে হতো, কিংবা ভারতের মাধ্যমে বাংলাদেশের পরিচয় ধরাতে হতো। চাচার সেই চিঠি পড়ে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে আমাদের ফ্যামিলির অনেকেই তখন ভেতরে ভেতরে লেবাননে পড়তে যাওয়ার কথা ভাবতে শুরু করে। এই সময়েই হঠাৎ করে চাচার চিঠি আসা বন্ধ হয়ে যায়। এক দুই চার আট মাস শেষে বছর পার। এ দিকে পত্রিকা এবং টিভি মারফত জানা যায় যুদ্ধ লেগে গেছে ওই অঞ্চলে। যদিও এখন জানি, ওরা আসলে যুদ্ধের ভেতরেই আছে বহু দশক ধরে। এ দিকে চাচার কোনো খোঁজ নেই। মধ্যপ্রাচ্যে তখন আমাদের পরিচিত অনেকেই থাকেন, তাদের মাধ্যমেও চেষ্টা চলল কিন্তু কোনো খোঁজ মিলল না। সবাই তখন চাচার পাঠানো আগেকার চিঠি, জলপাই বনের ভেতর তাঁবুতে বন্ধুদের সাথে ছবি, সমুদ্রপাড়ে চাচার ছবি, ট্রেনিং ক্যাম্পের ছবি দেখে কাতর হয়, সময়ে অসময়ে চোখ ভেজায় চোখের পানি মোছে, আফসোস করে। মুখফুটে কেউ কিছু না বললেও সবাই মনে মনে ধরে নেয় চাচা মরে গ্যাছে। হয়তো কোনো এক কামানের গোলার আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন দেহ উড়ে গেছে কেউ খোঁজই পায়নি। অথবা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে অসংখ্য গণকবরের একটি লাশ হয়ে পড়ে গ্যাছে এই পৃথিবীর কোনো এক কোণের মাটির নিচের ঘরে।

এসব ভাবনা ভাবতে ভাবতে সবার ভেতর যখন চাচার স্মৃতি অস্পষ্ট হয়ে আসছে তখনই হঠাৎ একদিন চাচা এসে হাজির আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের দোতলায়। কালো, হ্যাংলা রোগা কুঁজা দেয়া একটা দেহ যেন একটা শার্ট আর প্যান্টের ভেতর শরীরটা ঝুলাতে ঝুলাতে ঢুকছেন নিজ বাড়িতে। সাথে কিছুই নেই। ঝাড়া হাত-পা দেখে মনে হলো, কিছুক্ষণ আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে দীর্ঘ ঘোরাঘুরি শেষে বোধ হয় চাচা বাড়ি ফিরছেন। মাঝের দিন মাস বছরগুলো যেন মিথ্যা। চোখ বসে কোটরে ঢুকে গ্যাছে, চাপার হাড়ের সাথে সেঁটে চাপা ভেঙে গ্যাছে, পিঠের দিক বেঁকে গ্যাছে। সবাই বিস্ময়ে চুপ। কারো মুখে কোনো কথা নেই, চোখে অজানা আশঙ্কার ছাপ। চাচা কাউকে কিছু না বলে, দাদাকে জড়িয়ে ধরলেন আর সবার দিকে কিছুক্ষণ বিস্ময় নিয়ে চেয়ে থেকে বললেন, গোসল করব গরম পানি দাও। গোসল সেরে সামান্য খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। তার জন্য ডাক্তার ডাকা হলো। অনবরত নির্ঘুম আর নিরলস অকথ্য পরিশ্রমের ফলে তার শারীরিক এবং মানসিক বোধশক্তিই প্রায় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ভাগ্য ভালো তখনো টনটনে যৌবন, তাই ব্যাধি তাকে গিলতে পারেনি। কয়েক মাসের খাওয়া রেস্ট আর দোয়ার বরকতে আবার দেহ মনে তার প্রাণ ফিরে এসেছিল। আর তখনই এই চাচা হয়ে গেল আমাদের অ্যাডভেঞ্চার গল্পের নায়ক। কিভাবে তাদেরকে একদিন জলপাই বন থেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল ইসরাইলি বাহিনী। তারপর উল্টো করে পিঠমোড়া বেঁধে ট্যাংকের পাদানিতে রেখেছিল তা মনে করতে পারেননি। ইহুদিদের ট্যাংকের পাদানিতে পাপোশ হয়ে কত দিন থাকতে হয়েছিল সেই দিনক্ষণের হিসাব আজো অজানা। পিঠ ছুলে গিয়েছিল, চামড়া ঝলসে গিয়েছিল। তারপর একদিন টেনে হিঁচড়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এক দেশ থেকে আরেক দেশে। পানির জন্য চিৎকার করতে করতে কি হয়েছিল তারপর আর মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরে এলো তখন সে নিজেকে দেখতে পেল একজন চিকিৎসকের সামনে শোয়া। নড়াচড়া করার মতো অবস্থা তার নেই, কেবল মাথার ওপর খোলা আকাশ দেখা আর আল্লাহকে ডাকা ছাড়া। কিছু দিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে জেল। যেন সুস্থই করা হয়েছে অকথ্য পরিশ্রম করানোর জন্য, করতে না পারলেই নিপীড়ন আর নির্যাতন। জেলজীবনে অকথ্য ভয়াবহ নির্যাতন নিপীড়নের কথা থাক। চাচা এসব বলতে বলতে কেঁপে উঠত, কখনো চোখের মনি ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইতো প্রচণ্ড আক্রোশে। সেখান থেকে রেডক্রসের মাধ্যমে একসময় বন্দিবিনিময়ের মধ্য দিয়ে দেশে ফেরা। এভাবেই ৮০ থেকে ৯০ এর দশকে আমি জানতে পারি ফিলিস্তিনের কথা, ফিলিস্তিন গণ-আন্দোলন গণবিস্ফোরণের আরেক নাম ইন্তিফাদার কথা। বিশ্ব গণমানুষের বিপ্লবী এক নায়ক ইয়াসির আরাফাতের কথা, জানতে পারি মুসলমানদের প্রথম কিবলা মসজিদুল আকসা বায়তুল মুকাদ্দাসের কথা।

নাজিম হিকমত, পাবলো নেরুদা, রবার্ট ফ্রষ্টের কবিতার অনুবাদ পড়তে পড়তেই একদিন হাতে এলো মাহমুদ দারবিশ নামে এক কবির কবিতা, পড়ে বিস্ময়ে হতবাক। এভাবেও বলা যায়! জীবনের কথা, দ্রোহের কথা, কান্নার কথা, না পাওয়ার গ্লানির কথা? অবশ্যই বলা যায়, যখন জানি, জন্মের সাত বছরের মাথায় উচ্ছেদ হতে হয়েছিল নিজ জন্মস্থান থেকে। তারপর আর ফিরে পাওয়া যায়নি জন্মভূমিকে। কেননা সেই জন্মভূমির কোনো চিহ্নই ইহুদিরা ইসরাইলিরা রাখেনি। এমনভাবে ধ্বংস করা হয়েছিল যেন কোনো স্মৃতি চিহ্নও অবশিষ্ট না থাকে। চির যাযাবর দ্রোহী জন্মভূমি হারা কবিই তো লিখবেন :
গাজা শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর নয়
এর উপকূল অন্য শহরগুলোর তুলনায় নীল নয়
এবং এর কমলাগুলো ভূমধ্যসাগরের সবচেয়ে সুন্দর নয়
এবং গাজা শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ধনী নয়,
কিন্তু এটি একটি জাতির ইতিহাসের সমান
কারণ এটি শত্রুর দৃষ্টিতে সবচেয়ে কুৎসিত
দরিদ্র আরো কৃপণ এবং হিংস্র
কারণ এটি শত্রুদের জন্য বর্বর শিক্ষা
কারণ এটি শত্রুদের বিরক্ত করতে সবচেয়ে বেশি সক্ষম
এবং ভালোবাসার সবচেয়ে যোগ্য অবিচার আমরা তার সাথে করি যখন আমরা তার কবিতা খুঁজি
কারণ তার কবিতা নেই
তাকে সুন্দরীদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর করে তোলে
এমন সময়ে যখন আমরা কবিকে দিয়ে শত্রুকে পরাস্ত করার
চেষ্টা করছি।
- মাহমুদ দারবিশের ‘গাজার জন্য নিরবতা’ কবিতার অংশবিশেষ