ক্লাসে ফার্স্ট-সেকেন্ড হতাম বলে অন্যদের চেয়ে একখানা নতুন বই বেশি পেতাম। ’৯০-এর দশকে ছয়খানা বইয়ের মধ্যে তিনখানা পুরনো বই এবং তিনখানা নতুন বই দেয়া হতো। ক্লাসের শুরুর দিকের শিক্ষার্থীরা বড়জোর চারখানা নতুন বই পেত। শেষের দিকে যারা থাকত তাদের ভাগে পড়ত দুইখানা নতুন বই! বাবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন তবুও এ রীতির ব্যতিক্রম হয়নি। তখন রাষ্ট্রের এতটা সক্ষমতাও ছিল না। জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি বই দেয়া হতো। যে দিন বই দেয়ার তারিখ থাকত সে দিন সকাল সকাল স্কুলে উপস্থিত হতাম। কেমন একটা অন্য রকম দিন ছিল!
আমাদের উৎসব শুরু হতো বই নিয়ে বাসায় ফেরার পর। বিশেষ করে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নেয়ার মধ্যে কী যে আনন্দ ছিল তা বলে বোঝাতে পারব না। বাংলা বইখানা নতুন পেলে আর কোনো কথা ছিল না। সে দিনের রাতেই সব বাংলা কবিতা পড়ে ফেলতাম। গল্প পড়তাম। ক্ষুধা ভুলে যেতাম। হারিকেনের আলোয় বসে বাবা বইগুলোতে সুন্দরভাবে মলাট লাগিয়ে দিতেন। বিছানায় নতুন বই নিয়ে ঘুমাতাম! ছোটদের নতুন বই ধরতে দিতাম না কয়েক সপ্তাহ! একটা বেশি দাগ পরলে অন্তরে ব্যথা পেতাম। একটা উৎসব উৎসব আয়োজন। আমরাও সারা বছর বইগুলোকে যতেœ রাখতাম। বার্ষিক পরীক্ষার শেষের দিন অথবা ফলাফল প্রকাশের দিন বান্ডিল করে বই ফেরত দিতে হতো। বান্ডিলের উপরে টুকরো কাগজে লেখা থাকত। রাজু আহমেদ, চতুর্থ শ্রেণী, রোল নং-০১! ভালোবাসা জমা দিয়ে আসতাম। নতুন ভালোবাসার জন্য।
রাষ্ট্রের সক্ষমতা বেড়েছে। বিগত কয়েক বছর থেকে ১ জানুয়ারি দেশব্যাপী বই উৎসব পালন করা হয়। দেশের কয়েক লাখ শিক্ষার্থীকে সরকার কয়েক কোটি নতুন বই বিনামূল্যে উপহার দেয়। এ এক অন্য রকম আয়োজন। এই শতাব্দীর শিক্ষার্থীরা ভাগ্যবান। তারা প্রতিটি বিষয়ে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নিতে পারে। তারা বই উপহার পাওয়ার রাত্রিতে দীর্ঘক্ষণ জাগে কি না জানি না! অভিভাবকরা বোধহয় জাগতে দেয় না! কেননা বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই পরবর্তী ক্লাসের বই সংগ্রহ করে ধরিয়ে দেয়, টিউশন-কোচিংয়ে লাগিয়ে দেয়! সরকার শিক্ষাকে আনন্দঘন করতে চাইলেও প্রতিযোগিতা সে অবস্থা রাখছে না!
নতুন বইয়ের প্রাণ আছে। একেক বিষয়ের বইয়ের একেক রকম ঘ্রাণ। নতুন নতুন ছবি। শিক্ষার্থীরা নিশ্চয়ই উপভোগ করে! তাদের বাবাদের এখন আর মলাট লাগিয়ে দিতে হয় না কেননা বই ফেরত দেয়ার সিস্টেম নাই! তবুও আগের সময়ের চেয়ে বইগুলো বছর শেষেও নতুন থাকে! কোচিং-প্রাইভেটে তো গাইড পড়ায়! নতুন কারিকুলামের সম্পূর্ণ বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আবার সেই হারানো আনন্দ ফিরে আসবে বলে বিশ্বাস। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা আবার নতুন বইয়ের ঘ্রাণে মাতোয়ারা হোক। প্রাণে প্রাণ ফিরে পাবে।
বই উৎসব যেন আর কোনোদিন বন্ধ না হয়। সারা দেশে বই উৎসব- এক অভূতপূর্ব ঘটনা। রাষ্ট্র্রের সক্ষমতা, সরকারের শিক্ষা নিয়ে আন্তরিকতায় এটি সম্ভব হয়েছে। আমরা যারা বিগত শতাব্দীর মানুষ তারা এই আনন্দ মিস করি। আমাদের সন্তানদের নতুন বই পাওয়ার আনন্দটাই আমাদের আনন্দ মনে হয়। দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে যাক নতুন বই। ঘর ভর্তি হোক আলোয়। বাঁধভাঙা খুশির ঢেউয়ে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার আসুক- সেই কামনায়। বই উৎসব সফল ও সার্থক হোক।
