পৃথিবীতে কত ভাষা আছে? তিন হাজার না তার চেয়ে বেশি? পৃথিবীর এই হাজার হাজার ভাষা আর তাদের অসংখ্য উপভাষাগুলোর উদ্ভব কি একটি আদিম ভাষা থেকে? ওই সব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। পৃথিবীর প্রাচীনতম ভাষা কোনগুলো, তাদের বয়স কত, কোন আদিম ভাষা কখন কোন অঞ্চলে কোন মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল? এসব প্রশ্নেরও সঠিক উত্তর আমরা দিতে পারব না, কারণ অনেক অনুসন্ধান করেও সব কথা জানা যায়নি। কত ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে কে জানে? আর তার সাথে সাথে কত মানুষের কত চিন্তা, কত ভাবনা, কত অভিজ্ঞতা? সভ্যতার যেমন উত্থান আছে পতন আছে ভাষারও হয়তো তেমনি কিন্তু অনেক সভ্যতা, অনেক জাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে অথচ তাদের ভাষা ধ্বংস হয়ে যায়নি, আশ্চর্যজনকভাবে অনেক ধ্বংসপ্রাপ্ত সভ্যতার স্মৃতিকে বহন করে টিকে আছে কোনো কোনো ভাষা, তবে একটি ভাষাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারলে একটি জাতিও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
একটি ভাষা বলতে আমরা কী বুঝি? ভাষা বলতে আমরা বুঝি ছোট বা বড় একটি জনসমষ্টির ভাবের আদান-প্রদানের মাধ্যম বা মৌখিক যোগাযোগের বাহনকে। পুঁথির ভাষা তো মুখের ভাষাকে ধরে রাখারই প্রয়াস মাত্র। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় এমন অনেক ছোট ছোট ভাষাগোষ্ঠী আছে যাদের সদস্যসংখ্যা কয়েকশতের বেশি নয় এবং দ্রুত ওইসব ভাষা অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বা মৃত ভাষায় পরিণত হতে চলেছে। আবার এমনও দেখা যায় যে ক্ষুদ্র একটি অঞ্চলের ভাষা পৃথিবীর বিরাট অংশজুড়ে আধিপত্য করছে। যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ইংল্যান্ডের ভাষার একক আধিপত্য। ভাষার পৃথিবী এক আশ্চর্য পৃথিবী কারণ ভাষার কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক, ধর্মীয়, জাতীয় সীমারেখা নেই, একই ভাষা বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন ধর্মের, বিভিন্ন জাতির মাতৃভাষা হতে পারে আবার একটি ভাষা কেবল একটি দেশের একটি জাতির, একটি ধর্মের মানুষের ভাষাও হতে পারে।
ভিন্ন ভিন্ন ভাষার মধ্যে সীমারেখা কিন্তু সর্বদা স্পষ্ট নয়, ঊনবিংশ শতাব্দীতে নরওয়ে ডেনমার্কের অধীনে ছিল বলে ডেনো-নরওয়েজিয়ান নামে যে সাহিত্যিক ভাষাটি গড়ে উঠেছিল, তা ওই দুই দেশের সাহিত্যকর্মেই ব্যবহৃত হতো, বিশ্ববিখ্যাত নাট্যকার হেনরিক ইবসেন যে ভাষায় তার বিখ্যাত নাটকগুলো রচনা করেছিলেন। আজো একজন সুদক্ষ ডেনমার্কবাসী একজন নরওয়েজিয়ানের সাথে কথাবার্তা চালাতে পারেন। নরওয়ে ডেনমার্ক থেকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করলে দুই দেশের ভাষার বিকাশ ঘটে স্বাধীনভাবে ফলে আধুনিক নরওয়ে ও ডেনমার্কের ভাষা আলাদা কিন্তু ভাষা দু’টি বিবর্তনের ইতিহাসে যথার্থই স্বতন্ত্র কি না সে প্রশ্ন উঠতে পারে। বেলজিয়ামের জার্মানভাষীদের ফ্লেমিশ ও হল্যান্ডের ডাচ ভাষা নিয়েও একই প্রশ্ন তোলা চলে। একজন ফ্লেমিশভাষীর পক্ষে হল্যান্ড গিয়ে কথাবার্তা চালাতে কোনো অসুবিধে নেই। স্পষ্ট রাজনৈতিক সীমারেখা থাকা সত্ত্বেও ওইসব ক্ষেত্রে ভাষাতাত্ত্বিক সীমারেখা অস্পষ্ট।
একই অঞ্চলে একই ভাষার মধ্যে ভৌগোলিক বৈচিত্র্য উপেক্ষণীয় নয়, ভাষার এই বৈশিষ্ট্যকেই আমরা উপভাষা বলে থাকি। বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে সম্প্রসারিত একটি ভাষার বিভিন্ন আঞ্চলিক পার্থক্য কখনো কখনো ব্যাপক। স্কটল্যান্ড ও গ্রেট ব্রিটেনের ভাষার কথা ধরা যাক। স্কটল্যান্ডের একটি স্থানীয় ও নিজস্ব সাহিত্যিক ভাষা আছে, এ ভাষা ইংল্যান্ডের শিষ্ট ইংরেজি ভাষা থেকে পৃথক। চতুর্দশ শতক থেকে বর্তমান কাল অবধি বহু বিশিষ্ট সাহিত্যিক ওই ভাষা ব্যবহার করে আসছেন; ওই ভাষার নিজস্ব অভিধানও রয়েছে। স্কটিশ উচ্চভূমিতে প্রাচীন কেল্টিক ভাষার অস্তিত্বের কারণেই স্কটল্যান্ডের ভাষায় ওই পার্থক্যের সৃষ্টি হয়েছে। ইংল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলে স্ক্যান্ডেনেভিয়ান প্রভাবের ফলে অ্যাংলো-স্যাকসন উপভাষাগুলো তাদের আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য লাভ করেছিল। এখন প্রশ্ন হলো স্কটিশ ভাষা কি একটি স্বতন্ত্র ভাষা না ইংরেজি ভাষার অন্তর্গত একটি উপভাষা? উত্তরাঞ্চলের ভাষার সাথে ইংল্যান্ডের অন্যান্য অঞ্চলের ভাষার গভীর যোগসূত্র থাকা সত্ত্বেও তাদের পার্থক্য উপেক্ষণীয় নয়। রবার্ট বার্নস বা আলেকজান্ডার গ্রে-র কবিতায় ওই বিশেষ ভাষার ব্যবহার লক্ষ করা যায়। বস্তুত, ভাষা ও উপভাষার মধ্যে সীমারেখা টানা সর্বদা সম্ভবপর নয়। যখন একই ভাষা কিছু পার্থক্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন মানুষের মুখের ভাষারূপে গৃহীত হয় তখন ভাষাগত ঐক্যের কথা বলা চলে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ভাষার সাথে দেশ, কাল, জাতি, ধর্ম, রাষ্ট্র বা অঞ্চলের সঙ্গতি থাকতেও পারে আবার নাও থাকতে পারে। উপরিউক্ত পটভূমিকায় আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করব।
ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা : ইউরোপের প্রায় সমগ্র এবং এশিয়ার অনেকটা জুড়ে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী প্রচলিত। খ্রিষ্টের জন্মেরও কয়েক হাজার বছর আগে মধ্য এশিয়া থেকে উদ্ভূত হয়ে যে ভাষা একদিকে ইউরোপে এবং অন্যদিকে পারস্য ও ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিক অবস্থায় পারস্য ও ভারতবর্ষে আগত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার দু’টি শাখার মধ্যে এতই সাদৃশ্য ছিল যে, তাদের ইন্দো-ইরানীয় বলা হতো। পরে ঐতিহাসিক কারণে কালের বিবর্তনে পারস্য ও ভারতবর্ষে আগত ভাষার স্বাধীন ও স্বতন্ত্র বিকাশ ঘটে। ইরানির শাখার আধুনিক বিবর্তন ফারসি, ভারতবর্ষে আগত ইন্দো-ইউরোপীয় বা ইন্দো-ইরানীয় ভাষার নাম ইন্দো-আর্যভাষা। আর্য-ভাষার প্রাচীন রূপ বৈদিক ও সংস্কৃত ভাষায়, মধ্যরূপ পালি, প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষায় আর আধুনিক রূপ পাঞ্জাবি, সিন্ধি, রাজস্থানি, মারাঠি, গুজরাটি, সিংহলি, হিন্দি-উর্দু বা হিন্দুস্তানি, উড়িয়া, বাংলা, আসামি ইত্যাদি ভাষা।
প্রাচীন ভারতবর্ষের ভাষার সাথে আশ্চর্য সাদৃশ্য লক্ষ করা যায় লিথু ও লেটিশ নামক একজোড়া উত্তর-মধ্য ইউরোপীয় ভাষার, এই দু’টি ভাষা নিয়ে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর বাল্টিক শাখা গঠিত। বাল্টিকের প্রতিবেশী শাখা স্লাভিক, এই স্লাভিক শাখার ভাষাগুলো পূর্ব ইউরোপ ও এশিয়ার বিস্তৃৃত অঞ্চলে ছড়ানো। পোলিশ, চেক, স্লোভাক ভাষা নিয়ে পশ্চিম স্লাভিক, বুলগেরীয়, সার্বো-ক্রোশীয় নিয়ে দক্ষিণ স্লাভিক বা বলকান রুশ ভাষা নিয়ে পূর্ব স্লাভিক উপশাখা গঠিত। রুশ ভাষা স্লাভিক ভাষাগুলোর মধ্যে সর্বাধিকতম প্রচলিত। ইন্দো-ইরানীয় ও আর্য, বাল্টিক এবং স্লাভিক শাখা নিয়ে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর শতম শাখা। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হেলেনিক, পুরাতন এথেন্স নগরীর সভ্যতার ভাষা এটিক এ ভাষারই অন্তর্গত। হেলেনিক শাখার গ্রিক ভাষা দীর্ঘদিন পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের যোগাযোগের বাহন ছিল। সাহিত্য ও সভ্যতার বাহন হিসেবে গ্রিক ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। ইতালিক ইন্দো-ইউরোপীয় গোষ্ঠীর আরেকটি উল্লেখযোগ্য ভাষা, গ্রিসের মতো প্রাচীন ইতালির ভাষাও বিভিন্ন উপভাষার সমন্বয়, যার একটি ওসকান আর একটি উমব্রিয়ান; কিন্তু ইতালীয় উপভাষাগুলোর মধ্যে লাতিন আর সব উপভাষাকে ছাড়িয়ে কেবল ইতালিতেই নয়; সমগ্র বিশ্বে সঙ্গত করণেই খ্যাতি অর্জন করেছে। লাতিন কেবল অমর সাহিত্য সৃষ্টির ভাষা হিসেবেই নয়; সাথে সাথে বিশাল রোমক সাম্রাজ্যের সরকারি ও সামরিক ভাষা হিসেবেও অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। প্রাচীন বা ক্লাসিক্যাল লাতিন জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষারূপে আর চলিত লাতিন সাধারণ সৈনিক, ব্যবসায়ী ও উপনিবেশ স্থাপনকারীদের ভাষা হিসেবে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই ভাষাই কালের বিবর্তনে বর্তমানকালে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের জাতীয় ভাষায় পরিণত হয়। রুমানীয়, ইতালীয়, ইতালি, পর্তুগিজ, স্পেন, ফ্রান্সের ভাষা রোমান্স শাখাভুক্ত; আধুনিক রুমানীয়, ইতালীয়, পর্তুগিজ, স্প্যানিশ ও ফরাসি ভাষা যার নিদর্শন। স্প্যানিশ ভাষা আবার দক্ষিণ বা লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে আর পর্তুগিজ ভাষা ব্রাজিলে বিস্তারিত।
ইন্দো-ইউরোপীয় গোষ্ঠীর জার্মানিক শাখাও বহুল বিস্তৃত। আইল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি ও অস্ট্রিয়াতে এই শাখার ভাষাগুলো জাতীয় ভাষা। ইন্দো-ইউরোপীয় গোষ্ঠীর কেল্টিক শাখা এক সময়ে চেকোস্লোভাকিয়া, অস্ট্রিয়া, দক্ষিণ জার্মানি, উত্তর ইতালি, ফ্রান্স ও ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে চালু ছিল। আজো এ ভাষার স্বাক্ষর পাওয়া যায় আয়ারল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে, স্কটল্যান্ডের উত্তর উচ্চ ভূমিতে, ওয়েলসে আর ফ্রান্সের ব্রিটানিতে। ইন্দো-ইউরোপীয় গোষ্ঠীর দু’টি শাখা আলবেনীয় এবং আর্মেনীয় আজো জীবিত ভাষা কিন্তু হিট্টি আজ একটি মৃত ভাষা।
ফিনো-উগ্রিক ও বাস্ক : ইউরোপের ইন্দো-ইউরোপীয় গোষ্ঠী বহির্র্ভূত ফিনিশ, ইস্টোনীয় ও হাঙ্গেরীয় ভাষা ফিনো শাখাভুক্ত আর ল্যাপিস, পারসিয়ান ও উত্তর সাইবেরিয়ার স্যামোয়েড ভাষা উগ্রিক শাখাভুক্ত। বাস্ক ভাষা স্পেন ও ফ্রান্সে প্রচলিত।
সেমেটিক-হামিটিক : সেমেটিক ভাষা পুরাতন বিশ্বের আশিরীয় এবং ব্যাবিলনীয় সভ্যতার বাহন ছিল। বাইবেলের পুরাতন টেস্টামেন্টের ভাষা হিব্রু সেমেটিক শাখার। আরবি ভাষাও সেমেজিক শাখাভুক্ত, পবিত্র কুরআন শরিফের, ইসলাম ধর্মের ও বিভিন্ন আরব রাষ্ট্রের ভাষা হিসেবে আরবি ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। হামিটিক ভাষা প্রাচীন মিসরের আর আধুনিক হামিটিক ভাষা উত্তর ও মধ্য আফ্রিকায় প্রচলিত। ইথিওপিয়ার আবিসিনিয়ার ভাষা এ শাখাভুক্ত।
আল্টাইক ও পোলিও-সাইবেরীয় : মধ্য এশিয়ার আল্টাই পার্বত্য অঞ্চল থেকে উদ্ভূত এ গোষ্ঠীর শাখা তুরস্কের তুর্কি ভাষা ও মঙ্গোল তুঙ্গুজ ভাষা। সাইবেরিয়ার উত্তর-পূর্বের ইয়াকুত ভাষা, সাইবেরিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমের কাজাক, উজবেক ও তুর্কমেন ভাষাও এ শাখার সাথে সম্পর্কিত।
সিনো-টিবেটান : চীনা ভাষা এ গোষ্ঠীর প্রধান শাখা, পৃথিবীর বৃহত্তম জনগোষ্ঠী চীনা ভাষাভাষী। চীনা ভাষাকে অবশ্য অনেকে একটি মাত্র ভাষা না বলে কয়েকটি ভাষা বলেছেন কারণ চীনের এক অঞ্চলের মানুষ আরেক অঞ্চলের ভাষা বুঝতে পারেন না। তবে চৈনিক লিখন প্রণালী চীনা ভাষার ঐক্য ও যোগসূত্রের বাহন। তিব্বতি ও বার্মি ভাষা চীনা ভাষার সাথে বংশগতভাবে সম্পর্কিত, এসব ভাষার শাখা-প্রশাখা ভারতীয় উপমহাদেশ ও চীনের মধ্যবর্তী ভূখণ্ডে বা ইন্দো-চীনে প্রচলিত। কোরীয় ভাষার সাদৃশ্য রয়েছে তিব্বতি ও বার্মি ভাষার সাথে জাপানি ভাষার লিখন প্রণালী চীনা লিখন প্রণালীর মতোই যদিও জাপানি ভাষার ইতিহাস পৃথক। মালয়-পলিনেশীয় ভাষা মাদাগাস্কার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নিউজিল্যান্ড ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিস্তৃৃত। অস্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীদের ভাষা আবার ভিন্ন বংশজাত। ভারতে আর্য ভাষা বহির্র্ভূত ভাষাগোষ্ঠী হলো দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠী, তামিল, তেলেগু, কানাডা, মালায়ালাম এ শাখার ভাষা। ককেশাস ভাষা ককেশাসের পার্বত্য অঞ্চলে প্রচলিত, জর্জিয়ান ভাষা এ শাখাভুক্ত।
আফ্রিকার ভাষা : উত্তর আফ্রিকা থেকে শুরু করে পূর্ব আফ্রিকার গিনি উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃৃত অঞ্চলের বহু ভাষা সুডানিজ-গিনি শাখাভুক্ত। আরো দক্ষিণ ভাগে প্রচলিত বান্টু শাখা, যে শাখার ভাষাগুলো মধ্য আফ্রিকার বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়ানো। দক্ষিণ আফ্রিকার আঞ্চলিক ভাষাগুলো খোইন নামে পরিচিত, এর দু’টি শাখা- একটি বুশম্যান অপরটি হটেনটট।
আমে রেড ইন্ডিয়ান ভাষা : পশ্চিম গোলার্ধের প্রাচীন ভাষাসসমূহকে ইদানীং আমে রেড ইন্ডিয়ান ভাষা বলা হচ্ছে। উত্তর আমেরিকার কানাডার উত্তর থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত বিস্তৃৃত অঞ্চলে পশ্চিমি উপনিবেশ স্থাপনের আগে আদিবাসীদের বা রেড ইন্ডিয়ানদের মধ্যে প্রচলিত অসংখ্য ভাষা মোটামুটিভাবে ছয়টি শ্রেণীতে বিন্যস্ত। এক্সিমো-এলিউশিয়ান শাখা এলিউশিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, উত্তর কানাডা ও গ্রিনল্যান্ডে প্রচলিত। এলগোনকুইন-ওয়াকাশ শাখা- দক্ষিণ কানাডা ও উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ ভূভাগে ছড়ানো ছিল। হোকা-সিউ শাখা-উত্তর আমেরিকা থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত বিস্তৃৃত। না-দেনে শাখা-পশ্চিম কানাডা ও আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের ভাষা। পেনুশিয়া শাখা-ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, ওরিগন এবং ক্যালিফোর্নিয়া অঞ্চলের ভাষা। উটো-আজটেক শাখা-পশ্চিম আমেরিকা, মধ্য মেক্সিকো ও পানামা পর্যন্ত সম্প্রসারিত।
এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশে বর্তমানে জাতীয় ভাষাগুলো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতীক হিসেবে আদৃত হয়েছে। এসব দেশে বোধগম্য কারণেই ভাষা জাতীয় স্বাধীনতা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদাবোধের প্রতীক। বাংলাদেশেও বাংলা ভাষা স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন বাঙালি জাতির আত্মমর্যাদাবোধের প্রতীক।
ঘটনা তেমন কিছুই না
মনির বেলাল
কালীতলার সাঁকো পার হয়ে হঠাৎ থেমে গেল অটোটি। এটা কোনো মোড় নয়- কাছাকাছি কোথাও কোনো বাড়িঘরও নেই। এখানকার রাস্তার দু’পাশ জিন কলার গাছের দখলে। এক একটা কলাগাছ দেড় মানুষ- দুই মানুষ সমান লম্বা। একপলক দেখে- যে কেউ বুঝে যাবে- এ কলাগাছগুলো কতটা অবাধ্য আর বেপরোয়া। যেন আসমান ছোঁয়ার স্বাদ নিয়ে জমিনে জন্মেছে ওরা। এই জিন কলাগাছগুলোকেও ডোরায় বেঁধে রাখে- অদূরের ভূপতিরা।
ওদিকের জিন-ভূত, জিন কলা, ভূপতির হিসাব বাদ- অটোটি এখানে কেন দাঁড়াল? সেই সওয়ালের- জবাব পেতে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই! কারণ অটো চালক, তার ডোনচোখে কোথায়- কতদূরে কোনো যাত্রীকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে, তা প্রকাশ পেতে আরো কিছুটা সময় লাগবে। মহানন্দা লোকাল তবু স্টেশনে স্টেশনে থামে। তবে অটোগাড়িগুলোর কোনো স্টেশন নেই, যে কারো আঙুলের ইশারায় থেমে যায়। মোড়-অমোড়, বন-বাদাড়... সবখানে।
আমার তাড়া আছে। তা থাকলেও- জায়গা-অজায়গার অজুহাত তুলে আমি তো আর অটোওয়ালাকে বলতে পারি না
- এই ভাই এখানেও থামছ কেন?
কারণ আমি নিজেও এই অটোতে উঠেছি, আমার বাসার সামনে থেকে- ওই জায়গাটাও কোনো মোড় বা অটোস্ট্যান্ড ছিল না। তাই যে দোষ আমি করেছি, মুহূর্তের ব্যবধানে সেই দোষে- কিভাবে আমি আরেকজনকে দোষী সাব্যস্ত করি? আমি তা পারি না। তবে আমাদের পাড়ার মোমিন চৌকিদার হলে- পারত! নিজের দোষ ঢাকতে সে অনায়াসে অন্যের পরনের কাপড় খুলে নেয়- আবার অন্যের খুলতে খুলতে অসাবধানতাবশত মাঝেমধ্যে খুলে ফেলে নিজের পরনের কাপড়ও। তবে মাঝেমধ্যে সে অবশ্য খুব ওজনের কথা বলে... তখন মানুষ বিশ^াস করতে চায় না যে, মোমিন এই কথাটি বলছে। আবার কেউ কেউ বিশ^াস করে- এই ভেবে যে, এ কথাগুলো তার নয়। হয়তো সে এগুলো কুড়িয়ে পেয়েছে- কোনো সালিশ-দরবারে!
তার প্রতিদিনের কথামালার কমন অংশটুকু এই রকম- এই কথাগুলো সে গৌরবের সাথে- বুক চিতিয়েই বলে
- আরে আপনারা আমাকে খালি ধরেন। আমাকে ধরেন ক্যা? আপনেরে দুঃখে- এই চায়ের দোকানেও বসা যায় না। অসাক্ষাতে অনেকে নাকি আমার মা-মাসি, চৌদ্দগুষ্টিকেও ধুয়ে নামায়। আমি তাদের নামও শুনিছি, তবে তাদের নাম আমি বুলছি না।
- কিন্তু কই!
-চেয়ারম্যান সাবকে তো আপনেরা কিছু বুলতে পারেন না। তিনি তো ধোয়া তুলসিরপাতা, না? তিনি কি শুদ্ধ ভোটে পাশ করিছেন...?
- চশমা মার্কার ও প্রার্থীকে তিনি দাবায়ে দেন নাই? চাশমা গায়েব! কোথায় আছেন তিনি এখন?
- আর কালাম মাস্টারের নামে তো ‘পাঙ্গাস মাছ’ চুরির মামলাও দিছিল। ৮০ ট্যাকা কেজির পাঙ্গাস। পাট জাগের মতোন মামলার সাথে বান্ধি- মাস্টারকে জাগ দিছে চেয়ারম্যান। মাস্টারের শালা-সমুদ্দির নামেও মামলা দিছে। কাউকে বাদ দেয়নি। মামলা হয়নি খালি মাস্টারের বাড়ির কালো কুকুরডার নামে... অবশ্য ওই কুকুরডারও জবান আছে, ঘেউ ঘেউ করে!
- আর আপনেরা ভোট দিয়েই তো- সাহা ডাকাতকে মিম্বার বানাইছেন? কেশবপুরের সাথে গোণ্ডগোলের সুমায়, সাহা ডাকাত- আপনেরে কাছে হয়ে গেল লায়ক ওয়াসিম-জসিম। ফাসাদ বাধালোও সাহা ডাকাত- ফাসাদের পর লাভও হলো তারই... সাহা মিম্বারের বাপ-দাদার খবর কী আপনেরা জানতেন না? আরে কাসা-পিতল থাক- মানুষের ঘরের সিলভারের বাসন-কোসনও চুরি করত।
মোমিন চৌকিদারের এ কথাগুলো কে শুনছে, আর কে শুনছে না। বা এই কথাগুলোতে কেউ তার ওপর রাগ করতে পারে- বা তার কোনো ক্ষতি হতে পারে- সেইসব কোনো কিছুর তোয়াক্কা-ই মোমিন করে না। সে বলে চলে, আপন মনে... তার দোষটুকু- অন্যের তুলনাতে কত নগণ্য, এইটুকু শুধু সে প্রমাণ এবং প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
-খালি, আমাকে নরম পাইছেন, তাই আমাকে ধরি টানেন। আমার মরা বাপ-মা ধরি টানেন। আমি আর কয়ডা কাডের চাল সামলাইছি... আমি কি দলের লাগি কাম করিনি? তারপরও লগদ ট্যাকা ৩০ হাজার দিয়ে এই চৌকিদারের পদে আসিছি- ফ্রি পাইনি। ফ্রি দেয়নি কেউ... এই কথা কে জানে না। উপজেলা চেয়ারম্যান হিরু সাবও জানে। যাক, আমার ব্যাপারে আপনরা কী জানেন, না জানেন, জানিনি। তবে ভেতরের কথা বাইরে বুলার মতোন লোক কিন্তু আমি না... কিন্তুক কী আর বুলব এহুন? মানুষের সুখ- মানুষের পছন্দ হয় না! একজনের সুখ দেখলে- আরেক অমনি পেছনে আলগি দেয়।
এ মুহূর্তে অটোতে আর কোনো যাত্রী নেই। কলাপাতা রঙ বোরখায় মোড়ানো একজন নারী আমার সামনের সিটে বসলেন- এটুকু অনুভব করছি। ওদিকে আমার ওতটা ভ্রুক্ষেপ নেই। মোবাইল স্কিন যেন এখন লখিন্দরের ভেলা। আর বেহুলার সহযাত্রী হয়ে আমিও যেন ভেসে যাচ্ছি। চারদিকে কত সত্য-অসত্য, পচা-দুর্গন্ধ, সাথেই ভেসে চলা কচুরিপানা ফুলের সৌন্দর্য, রাতে আকাশে তারার মেলা- আকাশে চাঁদের একক কর্তৃত্ব। রাতের আকাশে আর কেউ নেই- তার সমতুল্য। উতালপাতাল ঢেউয়ের মধ্যে জেলে নৌকার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি- তাদের হাঁকডাক। হারিকেন জ¦ালানো এই নৌকাগুলোও যেন নদীর বুকে প্রতিষ্ঠা করেছে একখণ্ড আকাশ।
বেহুলার ভেলা নিমিষে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কোথায় থেকে কোথায়। আমি দেখছি, ভেসে যাচ্ছে- কতগুলো খবরের কাগজ। বাংলা। ইংরেজি। ফেসবুক। প্রতিষ্ঠিত পেপার হাউজের ইউটিউব কন্টেন্ট। চটকদার শিরোনামের ফেক কন্টেন্ট। নগ্নতা। অশ্লীলতা। কয়েক দানা চাল-ডাল আর কয়েক ফোঁটা তেলের জন্য মানুষের হাহাকার... টিসিবির ট্রাকের পেছনে নারী-পুরুষের দীর্ঘ লাইন। ওই লাইনের মধ্যে গামছায় মুখ লুকানো তথাকথিত মধ্যবিত্ত। নিখোঁজ সন্তানের জন্য মায়ের কান্নাভেজা দু’খানি চোখ... নিখোঁজ বাবার ছবি বুকে জড়ানো এক শিশু কন্যার মুখ। কতই বয়স মেয়েটির- আট বা নয় বছর। তিন বছর পেরিয়ে গেছে- তার বাবার কোনো খোঁজ নেই! মিছিলকে এখন সে ভয় পায়। ঘৃণা করে। ভার্সিটি পাশ টগবগে তরুণের শুষ্ক মুখখানি। সাপ্তাহিক চাকরির খবর। বিডি জবস। মশক নিয়ন্ত্রণের জন্য ১০৫ কোটি টাকার বরাদ্দ পেয়েছিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। তবু গত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ১৯ জনের মৃত্যু। চন্দ্রযান-২ সফল। হামাসের রকেট বৃষ্টি, আয়রন ডোমও ব্যর্থ। ৭৫ বছরে এমন সঙ্কটে পড়েনি ইসরাইল। সঙ্ঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছিল দেশের শেয়ার বাজার : তারপর থেকে আর কিছুতেই ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। বিমানবন্দরে কাস্টমসের ভোল্ট থেকে ১৫ কোটি টাকার সোনা গায়েব। বাংলাদেশ ব্যাংকে তীব্র ডলার সঙ্কট। আমাদের সংবাদ মাধ্যম সম্পূর্ণ স্বাধীন- তথ্যমন্ত্রী। সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমার সময় পেছাল ১০০ বার...। স্কিনে আঙুুল নাড়াতেই দেখা গেল পদ্মা সেতুর ঝকঝকে-তকতকে একখানা ফটো... বিশ^ব্যাংকে। অতঃপর মেট্রোরেল... কর্ণফুলি ট্যানেল... ১২ ঘণ্টায় ভোট পড়েছে মাত্র ৬টি... উগান্ডা, নাইজেরিয়া ও সোমালিয়া আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞা পেল... এইসব মিলিয়ে যেন তৈরি হয়েছে চাঁদ সওদাগরের পুত্র লখিন্দরের লাশ। এসব নিয়ে আমি ভেসে চলেছি কতদূর... আরো কতদূর...! আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের অলিগলিতে।
হঠাৎ কিছু একটা অনুভব করেই আমি বেহুলার ভেলা থেকে অটোতে ফিরে এলাম। সর্বাঙ্গ ধৌত করে যেমন নিজেকে সামলে নেন একজন পূর্ণ নারী- এই মেয়েটিও যেন তেমনি নিজেকে সামলে নিচ্ছে এখন। কিন্তু সে মুখে কোনো কথা বলল না। মাথার ওপর খাটো একটা ঘোমটা টানা। সেই কলাপাতা রঙ ওড়না। বোরখা-ওড়না ম্যাচিং করানো। এ রঙের বোরখা-ওড়না পরা কাউকে আগে আমি দেখিনি। আর মুখে বিশেষ ডিজাইনের মাস্ক। করোনাকালে এ ধরনের মাস্কগুলো কিন্তু ছিল না। মহামারীর পর পৃথিবী স্বাভাবিক হলে- এক সময়ের রক্ষাকবচ এ মাস্কগুলো এখন মানুষের ফ্যাশানের তালিকাতে যুক্ত হয়েছে। কলাপাতা রঙ ওড়নার চাইতেও উজ্জ্বল তার সরু কপালটুকু। এইটুকু যেন কচি কলাপাতা। সুতীক্ষè খোলা দু’টি চোখ। আর কপালের বাম উপকূলে দু’টি পাকা চুল। আঙ্গুলগুলোতে মাখানো স্বর্ণলতার রঙ। নখে অগাঢ় মেহদীর রঙ মাখিয়ে দিলে- আরো মানাতো। একনজরে, আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি দেখে- সে কিছুটা বিরক্ত হলো। লজ্জায় আমিও চোখ নামিয়ে নিলাম। স্কিন লক করে মোবাইলখানা রেখে দিলাম প্যান্টের পকেটে। তারপর দেখতে থাকলাম এদিক ওদিক- দু’পাশের বিস্তীর্ণ মাঠ। এখন পাটের মওসুম। উদ্দাম বাতাসের সাথে খেলায় মেতেছে পাটের গাছগুলো। ভুট্টার গাছগুলোও উদ্দাম এ বাতাসের সাথে মিলিত হচ্ছে, তবে আপন ঢঙে। রাস্তার পাশের পাকা দালানগুলো- মাঝে মাঝে পাটক্ষেতকে আড়াল করে দাঁড়াচ্ছে। ওই বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠে, মোড়ের টঙদোকোনে বা ইট-পাথরের এই দালানকোঠার মাঝে... কোথাও আমি এ মেয়ের নাম-পরিচয় খুঁজে পেলাম না। এরপর অটো ড্রাইভারের লুকিং গ্লাসের দিকে তাকালাম একবার। আসলে আমি পরখ করতে চাচ্ছি- সে আমাদের দু’জনকে কতটা দেখতে পাচ্ছে। না, তার ধ্যানজ্ঞান সামনের দিকে। তার মানে- আমাকে সালাম করার বিষয়টি ড্রাইভার হয়তো দেখেইনি। কিন্তু মেয়েটি কে? এইখান থেকে অটোতে কে উঠতে পারে? হেনা হতে পারে...! সে এখান থেকে কলেজের বাসে উঠত এবং সে একদিন কলেজ ক্যান্টিনে আমাকে পা-ছুঁয়ে সালামও করেছিল। এক সাথে ঘুরতে ঘুরতে একটা গভীর সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল তখন আমাদের ভেতর। কলেজ ক্যান্টিন, পদ¥া গার্ডেন, বিডিআর ক্যাম্পের বাবলা বাগান, পদ্মার চর... উৎসব সিনেমা হল... কোথায় যাইনি আমরা একসাথে- প্রচুর ঘুরেছি তখন আমরা। শুধু আমরা দু’জন, না। তখন আমাদের একটা টিম ছিল। জোড়া জোড়া। হেনা ছিল ইতিহাস বিভাগের... ইতিহাস আমারও ভালো লাগত।
কিন্তু এটা হেনা হতে পারে না। কারণ ওর গায়ে সুগন্ধি ধানের মতো একটা সুবাস ছিল। ওই সুবাস আমি চিনি। সেই সুবাস কই...?
এরই মধ্যে বৌকে কয়েক শতবার গালি দিয়েছে মনে মনে। অভিশাপও দিয়েছি কয়েকবার। ছি ছি! কী ভাগ্য আমার...! এখন সে আমার সন্তানের জননী। তবে বন্ধ দরজার আড়ালেও সে কোনোদিন আমাকে এমন সম্মান দেয়নি। সে যেন ওই সংসারের একজন ঠিকাদার। এটা নেই-ওটা নেই, বাচ্চাকে পড়ানো, বাচ্চাকে স্কুলে পাঠানো, স্কুলের খোঁজখবর রাখা, বাচ্চার মার্কসিটের মনিটরিং, সেই মোতাবেক অ্যাকশন নেয়া আর আলু-পটল, মাছ-মুরগি কুচিকুটি করে রান্নাবান্না করা... এই তাহার কাজ। আরেকটা কাজ সে করে- তা হচ্ছে আমার সামাজিক ও আর্থিক অবস্থান তাদের কোন আত্মীয়ের থেকে কতখানি কম- এই খোঁজখবরটা সে নিয়মিত রাখে এবং আমাকে তা পাঠ করে শোনায়। আমিও শুনি- ছোট্ট থেকে আমি বিবিসি শুনে অভ্যস্ত। সাধারণত ওইসব কথা আমি গায়ে মাখি না। আবার মাঝে মাঝে শুনিয়েও দিই দুই-চার কথা।
শহীদ কামারুজ্জামান পার্কের একটি কথা এখন খুব করে মনে পড়ছে। তখন অবশ্য এ পার্কের নাম ‘রাজশাহী’র নিজের নামেই ছিল। পার্কে তখন পাঠ্যবইয়ের পশু-পাখি, বাঘ-সিংহ, সাপ-বানর-হুনুমান-হরিণ... সব জীবন্তরূপে ছিল। এখন কিছুই নেই। এখন এ শহর শ^াসশূন্য আলোকে রঙিন। এ শহরের রাত-দিন সব সমান এখন। সড়ক বাতিগুলো আকাশমুখো করে জ¦ালানো, কেন? আকাশের কী আলোর অভাব- না, আঁধারের... জানি না! শুধু জানি, সেই আলোর অত্যাচারে রাতের পাখিরা ছেড়ে গেছে এই শহর। বৃষ্টিস্নাত সেই দুপুরে হেনা আমার নাকটা চেপে ধরে বলেছিল, ‘নাকটা হবে বাবার মতোন।’ মার্কিন ফরেন পলিসির মতো গভীর সেই কথাটি আমি তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারিনি। এতে সে ভীষণ রাগ করেছিল।
- আপনি সাহিত্যের ছাত্র- না, ইকোনমিক্সের...? সহজ একটা কথা বুঝতেও, আপনার দুই দিন লাগে।
সত্যিই সবকিছু বুঝতে আমার সময় লাগে। তবে এটা হেনা হলে- এতক্ষণ সে চুপ করে বসে থাকতে পারত না। খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠত। কিন্তু আমি এখন কী করব- তাও বুঝতে পারছি না। আর শুনেছিলাম- হেনার স্বামীর বাড়ি চট্টগ্রামে। খুব ধনী ব্যবসায়ী তার স্বামী। বিয়ের পর গ্রামের দিকে তাকে আসতে দিত না। বিয়ের পর কোনো দিন আমি তাকে দেখিনি। দুইবার নাকি গ্রামে এসেছিল- প্রাইভেট গাড়িতে করে। আবার চলে গেছে। তখন আমি শহরের মেসে থাকাতে দেখা হয়নি। অর্থবিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তি... হেনা, এসব খুব অপছন্দ করত। নিরহঙ্কার কথাবার্তা-ই ছিল তার অলঙ্কার। যাই হোক- এটা হেনা না, নিশ্চিত। কারণ তার তো প্রাইভেট গাড়ি আছে! তাহলে, কী এটা জাহানারা? সেও হতে পারে- জাহানারাও সত্যিই আমাকে ভালোবাসত। কিন্তু তখন আমি তাকে বুঝিনি। আমার ভুলের কারণেই শেষ অবধি সম্পর্কটা ভেঙে গিয়েছিল। হাজার বার ভেবেছি- তার কাছে আমার ‘সরি’ বলা উচিত। কিন্তু পরক্ষণে আর বলা হয়নি। আজ অটো থেকে নেমেই- তার কাছে অন্তত ক্ষমা চেয়ে নেব। নিজেকে প্রস্তুত করে নিচ্ছি। পারব তো...?
আমার ভাবনার মতো অটোটি আঁকাবাঁকা হয়ে চলেনি। সহজ-সরল পথে চলে সে কখন পেরিয়ে এসেছে কাপাশিয়া, কাটাখালি, দেওয়ানপাড়া মোড় সব, বুঝতে পারিনি। আমার গন্তব্য- রাজশাহী চিনিকল- তাহলে আমার কাটাখালিতে নেমে যাওয়া উচিত ছিল। এরই মধ্যে দু’জন যাত্রী অটোতে উঠেছিল- তারা নেমে গেছে কাটাখালিতে। আর ওখান থকে উঠেছে অন্য একজন। তবু আমার হুশ ফেরেনি। এখন কী করা? তবে জাহানারার গন্তব্যই- আজ আমার গন্তব্য। আমি তাকিয়ে আছি বাইরের দিকে। কোনো কূল-কিনারা করতে পারছি না। অহঙ্কারকে পরাস্ত করে- ক্ষমা প্রার্থনা করা সত্যিই কঠিন। আমি প্রস্তুতি নিচ্ছি। এখান থেকে শুরু হয়েছে দুর্ভোগের রাস্তা- তালাইমারী পর্যন্ত। সিক্স লেন রাস্তা হচ্ছে। ভবিষ্যতের ভালোর জন্য এ দুর্ভোগ সয়ে চলেছে মানুষ। আগামীকালের স্বপ্নেই তো মানুষ সয়ে যায়- সব কিছু, এইসব আমি ভাবছি। সিটিগেটের কাছে এসে মেয়েটি আবারো আমাকে সালাম করল। আমি তো তখন ভবিষ্যতের সাথে দৌঁড়াচ্ছিলাম। এ সিক্স লেন সড়ক, চলে গেছে বানেশ^র অবধি। হিজিবিজি বানেশ^র বাজারকে ভেঙেচুরে- আবারো সাজিয়েছে কেউ একজন... এ রকম কত কী? তার হাতের ছোয়ায় আমি বর্তমানে ফিরে দেখলাম, রাস্তার কিনারে নেমে দাঁড়িয়েছে মেয়েটি। আমি আগে নামব? না, কিছু বলব... ভাবছি। এমন সময় মেয়েটিই খুবই বিনীতস্বরে বলল
- দুঃখিত, ভাইয়া আবারো লাথি লেগে গেল?
