ধীর গতিতে বয়ে চলা সঙ্কীর্ণ নদী মায়উ। বর্ষাকালে প্রসারিত হয় কিছুটা, তখন নদীর স্রোত বেগবান হয়। নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা পল্লী মংনুর মানুষগুলোর স্বভাব চরিত্র মায়উ নদীর মতো। তারা এমনিতে খুব সহজ সরল, ভদ্র নম্র। তবে হঠাৎ হঠাৎ তাদের মধ্যে কেউ কেউ ক্ষেপে উঠলে অন্যরকম হয়ে যায়। তখন আর চেনা যায় না তাদের। মংনু গ্রামে রোহিঙ্গারা বসবাস করছে অনেক দিন ধরে। তাদের মধ্যে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতির কমতি নেই। গ্রামের চায়ের দোকানে মুসলমানরা তাদের বৌদ্ধ প্রতিবেশীদের সাথে এক বেঞ্চে বসে চা খেতে খেতে গল্প-গুজবে মেতে উঠে। তেমন কোনো বিরোধ নেই তাদের মধ্যে।
মংনু গ্রামের দৃশ্যপট হঠাৎ করেই বদলে যায়। এক সকালে মায়উ নদীর পাড়ে শান্তি বাজারে অশান্তির ঝড় ওঠে।
বাজারে স্বাভাবিক কেনাবেচা চলছিল। হঠাৎ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে বর্মি সৈন্যরা বাজারে অতর্কিতে হামলা চালায়। অস্ত্র তাক করে গ্রামবাসীদের গুলি ছুড়তে থাকে। দিগি¦দিগশূন্য হয়ে ছুটতে থাকে বাজারের সব মানুষজন। নাসির আলি বাজার করতে এসেছিল অন্যান্য দিনের মতো। কিন্তু বাজারে পা রাখা মাত্রই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যায়, যার জন্য কোনোভাবেই প্রস্তুত ছিল না সে। বাজারের সবাই প্রাণ বাঁচাতে ছুটছে, যে যার মতো। নাসিরও ছুটতে থাকে। দৌড়ে পালাতে গিয়ে কেউ কেউ গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ছে আশপাশে, কেউ কেউ আহত হয়ে রক্তাক্ত শরীর নিয়ে পাশের সবুজ ধানক্ষেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আতঙ্কিত মানুষের আর্তনাদ, চিৎকারে সেখানকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে ক্রমশ। বর্মি সৈন্যরা সকাল বেলাতেই হামলা শুরু করেছে পৈশাচিকভাবে। এরকম ভয়াবহ পরিস্থিতি আগে কখনো সৃষ্টি হয়নি এখানে।

নাসির অনেক দূর দৌড়ে আসার পর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। গ্রামের একটি গাছের নিচে বসে হাঁপাতে থাকে। মংনু গ্রামেই নাসিরের বাড়ি। এখনই বাড়ি যাওয়া দরকার। কিন্তু কোন পথে গ্রামে যাবে ভেবে কুল পায় না সে। বাড়িতে বুড়ো বাবা, ভাই, বোন, বউ, ছেলেমেয়েরা আছে। তাদের কথা ভাবতেই অনেক আশঙ্কায় দুলে ওঠে মন। কয়েকজন গ্রাম থেকে পালিয়ে এসেছে এখানে। তাদের হাত থেকে রক্ষা পেতে যে যেভাবে পারছে গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছে। রক্তে রঞ্জিত রয়েছে গ্রামের রাস্তাঘাট, সবুজ মাঠ, ধানক্ষেত। পুরো জনপদই এখন রক্তাক্ত।
বর্মি সৈন্যদের হামলা এবং নৃশংসতার কথা শোনার পর নাসির নিজের প্রাণের মায়া ত্যাগ করে নিজের বাড়ির দিকে ছুটতে শুরু করে। নিজের বাড়ির কাছাকাছি এসে থমকে দাঁড়ায় একসময়। নাসির নিজের অসহায়ত্ব উপলব্ধি করে। ছটফট করতে থাকে সে। অক্ষমতা, ব্যর্থতার গ্লানি তাকে কুরে কুরে খেতে থাকে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না।

আঁয়ারা কনডে যাইয়ুম, আঁয়ারার যাইবার কোনো দ্যাশ নাই, এনডে আঁয়ারার বাড়িঘর, জায়গা-জমি। এগুন ছাড়ি কোন দ্যাশত যাইয়ুম,’ নাসির কথাগুলো বলতে চাইছিল। কিন্তু পাশ থেকে একজন প্রতিবেশী ইশারা করে থামিয়ে দেয়। বর্মি সৈন্যরা কারো কোনো কথা শুনতে প্রস্তুত নয়। তাদের নির্দেশের আপত্তি করলে, কিংবা তাদের কাজের প্রতিবাদ জানালে সাথে সাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা। গত কয়েক দিনে মংডু শহরে রোহিঙ্গা মুসলিম নিধনযজ্ঞে নেমে তারা নৃশংসতার চরম প্রকাশ ঘটিয়ে চলেছে।
নাসির তার বউ-বাচ্চা, ভাইবোনদের নিয়ে বাড়ির আঙ্গিনা ছেড়ে বেরিয়ে আসে। রাস্তায় গিয়ে দঁাঁড়ায়। একটু পরেই বাড়ির ভেতরে বর্মি সৈন্যরা এক ধরনের পাউডার ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহূর্তেই আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাড়িতে। নিজের চোখের সামনে অতি যতেœ তিল তিল করে গড়ে তোলা সুন্দর বাড়িটি বর্মি সৈন্যদের দেয়া আগুনে পুড়তে দেখে নাসিরের বউ রাহেলা আর্তনাদ করে ওঠে, ‘ও আল্লারে, আঁয়ারার কি অইবো, আঁয়ারা কনডে যাইয়ুম, কনডে থাইক্ক্যুম, আল্লারে আঁয়ারার উঅর এ কোন গজব নাজিল অইয়ে দে।’
ধমক দিয়ে বউকে থামাতে চায় নাসির, ‘চুপ কর, রাহেলা। তুই নো বুঝর, এয়েনে চিল্লøাইলে মিলিটারি আই সোজা গুলি করি দিবো, আঁয়ারা আর বাঁচিন্নো ফাইজ্জুম। আল্লার দোহাই লাগের এক্কানা চুপ কর। জান বাঁচাইতে চাইলে এনডত তুন যাওন ফরিব। আরা বাঁচিবার কোনো পথ খুঁজি ন’ফাইর। জলদি, জলদি এনডেতুন না গেলে ব্যাকগুনেরে মারি ফালাইবো দে। কোনো কথা ন’কই এনডেতুন চল পোয়া ছা ব্যাকগুনেরে লই।’
বাড়ি থেকে বেরিয়ে নাসির বউ ছেলেমেয়েদের নিয়ে মায়উ নদীর পাড় ঘেঁষে চলা পথ ধরে হাঁটতে থাকে। কোন পথ ধরে এগোলে বাংলাদেশে যেতে পারবে জানে না তারা। যেতে যেতে তারা একই গ্রামের লাতু মিয়া এবং তার বড় ভাই লেদু মিয়াকে দেখতে পায়। তখনই আকাশ ভেঙে মুষলধারে বৃষ্টি নামে।

দুই
লাতু মিয়া তার বড় ভাই লেদু মিয়াকে নিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটছে। বৃষ্টি হওয়ায় গ্রামের পথঘাট বেশ পিচ্ছিল এবং কর্দমাক্ত হয়ে আছে। পথ চলতে তাদের কষ্ট হচ্ছে অনেক। কিন্তু তাদের রুদ্ধশ^াসে ছুটতে হচ্ছে। কারণ স্থানীয় থানা থেকে খবর দেয়া হয়েছে জরুরি ভিত্তিতে দেখা করার জন্য। খুব বেশি সময় দেয়া হয়নি তাদের। এক ঘণ্টার মধ্যে থানায় গিয়ে কথা বলতে হবে।
লাতু আর লেদু দু’ভাই নদী পথে মালামাল পরিবহন ব্যবসার সাথে জড়িত। তাদের বেশ কয়েকটি নৌকা রয়েছে। এ ব্যবসায় মোটামুটি ভালো আয় হয় তাদের। মায়উ নদীতে নৌকাগুলো চলে। সব কিছুই ঠিকঠাক মতো চলছিল। কিন্তু দু’দিন আগে পুলিশ ক্যাম্পে হামলা এবং হতাহতের ঘটনার পর থেকে বর্মি সৈন্য, লুন্টিন পুলিশ ও স্থানীয় রাখাইন মগ সন্ত্রাসীরা যেভাবে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর অত্যাচার শুরু করেছে তাতে এখানে প্রাণ বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়-বাণিজ্য তো দূরের কথা। মাইক দিয়ে ঘোষণা করে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। পুড়ছে বাড়িঘর, দোকানপাট, ফসলের গোলা। কোথাও কোথাও ক্ষেতের পাকা ধানও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে বংশ পরম্পরায় এখানে বসবাসকারী মুসলিম জনগোষ্ঠীকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। এখান থেকে যেকোনোমূল্যে তাদের উচ্ছেদ করে রোহিঙ্গামুক্ত এলাকা ঘোষণা করাটাই তাদের পরিকল্পনা। এই এলাকা দিয়ে নাকি তেলের পাইপ লাইন যাবে চীন দেশে। এরকম কথা শুনেছে লাতু মিয়া। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে বিদায় করে দিয়ে তাদের বাড়িঘর ভেঙে জায়গাজমি দখল করে সেখানে সরকার শিল্পকারখানা স্থাপন করতে চায়।
স্থানীয় পুলিশদের সাথে লাতু এবং লেদুর ওঠাবসা সবসময়। যে কারণে তারা সরকারি নানা খবরাখবর জানতে পারে। থানা থেকে জরুরি ডাক পাবার পর তাদের মনে কিছুটা চিন্তার উদ্রেক হলেও তারা তেমন ভয় পাচ্ছে না। তাদের ধারণা, অন্য সবার সাথে যে ধরনের আচরণ করছে পুলিশ এবং মিলিটারিরা তাদের সাথে তেমন করবে না। কারণ স্থানীয় পুলিশদের সাথে তাদের সখ্য অনেক দিন ধরে।
থানায় ঢোকামাত্র লাতু মিয়া হাড্ডিসার দীর্ঘাঙ্গী এক মিলিটারি সার্জেন্টকে দেখতে পায়। লাতু মিয়াদের বাড়িতে কয়েকবার এসেছেও আগে এই মিলিটারি। অন্য সময় হাসিমুখে কথা বললেও আজ বেশ গম্ভীর হয়ে চেয়ারে বসে আছে। তার মুখে কোনো হাসি নেই। তার আগের রূপ, পাল্টে গেছে রাতারাতি। অন্য মানুষে পরিণত হয়েছে বাজো মিং।

‘স্যার, কিল্লাই ডাইক্কোন আঁয়ারারে, জরুরি কোনো কাজ আছে ফায়ান্নালার। কই ফেল্যুন, করি দিয়ুম,’ লেদু পরিবেশটাকে হালকা করতে বলে।
তারপরও সাজের্ন্টের মুখে ভাবান্তর ঘটে না। সে অনেকটা গম্ভীর মুখে নির্দেশের সুরে যা বলে তার মর্মার্থ হলো- ‘এখানকার সৈন্যরা তাদের একটি বড় নৌকা জরুরি কাজের জন্য নিয়ে যেতে চায়, তা আজই দিতে হবে বুঝিয়ে, সাথে নৌকার মাঝি বা চালকও দিতে হবে।
লাতু ও লেদু, দুই ভাই তেমন প্রস্তাব শোনার জন্য প্রস্তুত ছিল না। এর আগে স্থানীয় পুলিশ এবং মিলিটারিদের অনেক ব্যক্তিগত কাজের জন্য নৌকা দিলেও এভাবে কঠিন নির্দেশের সুরে নৌকা চাওয়া হয়নি। কী কাজের জন্য নৌকা দিতে হবে, এই মুহূর্তে জানতে চাওয়া মানে হাতে ধরে বিপদ ডেকে আনা। সার্জেন্টকে আজ সুবিধাজনক মনে হচ্ছে না। হঠাৎ কী করে বসে বলা যায় না। ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছে তাকে এখন। তার চোখে মুখে এক ধরনের নির্মমতা ফুটে উঠছে। নৌকা দিতে গড়িমসি করলে তাদের মেরে ফেলা হবে হয়তো, বুঝে নেয় দু’ভাই।
‘ঠিক আছে। নৌকা নদীর ঘাটত আছে, লই যাইবা দে আরি।’ লেদু বলে।
কিছু সময় পর কাছের নদীর ঘাটে নিজেদের একটি বড় নৌকা মিলিটারিদের কাছে বুঝিয়ে দেয় তারা। নৌকার সাথে দু’জন মাঝিকেও দেয়া হয় ওটা চালানোর জন্য। নৌকা নিতে আসা মিলিটারিদের মধ্যে চরম উত্তেজনা লক্ষ করে লাতু মিয়া। তার দিকে কটমট চোখে তাকায় কয়েকজন। মাঝিসহ নৌকা নিয়ে চলে যায় মিলিটারির দল।

নদীপথে কিছুদূর যাওয়ার পর নৌকাটি কাছের একটি গ্রামের পাশে ঘাটে গিয়ে ভিড়ে। পুরো গ্রামে লোকজন নেই। জনশূন্য অস্বাভাবিক পরিবেশ। বাতাসে পোড়া গন্ধ ভেসে আসছে ।
যে দু’জন মাঝি নৌকার সাথে গেছে তারা ঘাটে বসে অপেক্ষা করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর তারা ভয়ঙ্কর এক অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এরকম ভয়াবহ পরিস্থিতি আগে কখনো দেখেনি তারা।
সৈন্যরা গ্রাম থেকে আনা একটির পর একটি লাশ এনে নৌকায় তুলতে শুরু করে। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীর লাশে বোঝাই করা হয় নৌকা। এরপর মাঝিকে অস্ত্র উঁচিয়ে নির্দেশ দেয় একজন মেজর। সাগরে নিয়ে লাশগুলো ফেলে দিতে হবে। অন্যথা হলে গুলি করে মারা হবে। প্রাণের ভয়ে মাঝিরা কাঁপতে থাকে। এ ধরনের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হয়নি তাদের আগে কখনো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তারা লাশ বোঝাই নৌকা নিয়ে মায়উ নদী বেয়ে সাগরের দিকে যেতে থাকে।
চরম নির্মমতা আর ভয়ঙ্কর ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকে মায়উ। ক্ষোভে প্রতিবাদে ফুঁসে উঠছে নদী। উত্তাল ঢেউ বইছে। থেমে থেমে বাতাস বইছে। ক্রমেই ঝড় ঘণীভূত হচ্ছে। এ অবস্থায় লাশ বোঝাই নৌকা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। যেকোনো সময় ডুবে যেতে পারে। ভীষণভাবে দুলছে নৌকা। কিন্তু এরপরও থেমে থাকার সুযোগ নেই। নদীর পাড়ে অস্ত্র হাতে সৈন্যরা দল বেধে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের নির্দেশ নৌকা বোঝাই লাশগুলো যেকোনোভাবেই হোক সাগরে নিয়ে ফেলতে হবে। এর অন্যথা হলে তাদেরও লাশ হতে হবে। ঝড়-তুফান উপেক্ষা করে লাশ বোঝাই নৌকাটি মায়উ নদী অতিক্রম করে সাগরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।