বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান কবি, গীতিকার, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও কবিসংঘ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তালাত মাহমুদ গত ৩ মার্চ সন্ধ্যায় শেরপুর জেলা হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন।
বিগত শতাব্দীর আশির দশকে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ‘নীলকণ্ঠ কবি’ খ্যাত তালাত মাহমুদ ১৯৫৭ সালের ২০ আগস্ট অবিভক্ত ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর মহকুমার নকলা থানার রানীশিমুল গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস একই থানার চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের বাছুর আলগা গ্রামের সরকার বাড়িতে। তার বাবার নাম মো: মনিরুজ্জামান সরকার ও মায়ের নাম হাসনা বানু। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার বাবা পেশায় ব্যবসায়ী মনিরুজ্জামান ওই অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণাদাতা ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজে ¯œাতকোত্তর শ্রেণীতে অধ্যয়ন করেন এবং পরবর্তীতে এলএলবি ডিগ্রিও অর্জন করেন। এক ছেলে ও এক মেয়ে সন্তানের জনক কবি তালাত মাহমুদের স্ত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। কবিপুত্র ইঞ্জিনিয়ার তানসেন মাহমুদ ইলহাম শৈশবে শিশু ছড়াকার হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় তার বেশ কয়েকটি ছড়া প্রকাশিত হয়। আর মেয়ে মনীষাও একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।
কবি তালাত মাহমুদের সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল প্রবল। ‘কবিসংঘ বাংলাদেশ/ শেরপুর থেকে সারাদেশ’- এই স্লেøাগানকে সামনে নিয়ে শেরপুরের কবি-সাহিত্যিকদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য তার ঐকান্তিক একক প্রচেষ্টায় তিনি গড়ে তোলেন কবিদের সংগঠন ‘কবিসংঘ বাংলাদেশ’ এবং আমৃত্যু তিনি এ সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তা ছাড়া ১৯৮১ সালে তিনি রাজধানী ঢাকায় জাতীয় সাহিত্য সংগঠন ‘লেকশি’ (জাতীয় লেখক কবি শিল্পী সংগঠন) প্রতিষ্ঠা করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ সালে তার প্রচেষ্টা ও ঐকান্তিক ইচ্ছায় শেরপুরে কবি সম্মেলনের সূত্রপাত ঘটে। ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিতব্য কবি সম্মেলনের জন্য তিনি প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছিলেন এবং এই সাহিত্য সম্মেলনকে কেন্দ্র করে তার সম্পাদিত সাহিত্য সাময়িকী ‘আমরা তোমারই সন্তান’ বর্ধিত কলেবরে প্রকাশের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
এ ছাড়াও তার দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক আজকের পত্রিকা, দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক ভোরের আকাশ, দৈনিক বাংলার কাগজ, দৈনিক ভোরের আলো, দৈনিক সচেতনকণ্ঠ, দৈনিক জাহান, দৈনিক পল্লীকণ্ঠ প্রতিদিন, সাপ্তাহিক দশকাহনিয়া, সাপ্তাহিক কালের ডাক, শ্যামলবাংলা২৪ডটকম, শেরপুরটাইমসডটকম ও আওয়ার শেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন জাতীয়, আঞ্চলিক, ত্রৈমাসিক, মাসিক, পাক্ষিক, সাপ্তাহিক পত্রিকা ও অনলাইন নিউজপোর্টালে অসংখ্য কবিতা, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ফিচার, প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তার সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা ‘সাহিত্য দর্পণ’ (১৯৭৩-৮৬) ও শেরপুর-জামালপুর জেলার সৃজনশীল সাহিত্য সাময়িকী ‘আমরা তোমারই সন্তান’ ১৯৯৯ সাল থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে।
সত্যিকারার্থেই ‘শাবমোচন’ খ্যাত কবি তালাত মাহমুদ শেরপুরের কবি-সাহিত্যিকদের একজন প্রকৃত অভিভাবক ছিলেন। তিনি শেরপুরের কবি-সাহিত্যিকদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য নিরলস কাজ করে গেছেন। তার একক প্রচেষ্টা-আগ্রহ ও অনুপ্রেরণায় শেরপুর আজ ‘কবিদের শহর’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। তিনি প্রত্যন্ত অঞ্চলে নীরবে-নিভৃতে আড়ালে পড়ে থাকা শেরপুরের কবি-সাহিত্যিকদের খুঁজে খুঁজে টেনে বের করে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এসেছেন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এমনকি তার হাত ধরেই আজকের পরিচিতি পাওয়া শেরপুরের কবি-সাহিত্যিকদের পথচলা শুরু হয়েছিল। তিনি তাদেরকে একেবারে অজোপাড়াগাঁ তথা মফস্বল এলাকায় ঘুরে ঘুরে খুঁজে বের করে নিয়ে আসেন। তার উদ্যোগেই শেরপুরে প্রায় প্রতি মাসেই কবিতা পাঠের আসর, কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে পূর্ণিমা রাতে কবিতা আবৃত্তির আসর, বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপন ও সাহিত্য রচনার কলা-কৌশলের ওপর সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মাত্র ১৭ বছর বয়সে কবি তালাত মাহমুদের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘স্বর্গের দ্বারে মর্তের চিঠি’ প্রকাশিত হয়। ১৯৭৯ সালে ‘গীতিলতিকা’ ও ২০০৪ সালে ‘লোকহীন লোকারণ্য’ নামে দু’টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ১৯৭৯ সালে ১৪ আগস্ট কবির ২২তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ডাকসুর তৎকালীন মিলনায়তন সম্পাদক খন্দকার আবদুর রহিমের ব্যবস্থাপনায় কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘গীতিলতিকা’ প্রকাশিত হয়।
তার রচিত অন্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ‘অপমৃত্যু অপলাপ’ (উপন্যাস), লাল সিঁড়িতে নীল পেয়ালা (কাব্যগ্রন্থ), নিষিদ্ধ কবিতা (কাব্যগ্রন্থ), টাউটমুক্ত সমাজ চাই (প্রবন্ধগ্রন্থ) প্রকাশিত হয়। তা ছাড়া উদাম গতরী ন্যাংটা বয়ান (প্রবন্ধ) এবং নিয়ম ভাঙার নিয়ম (গবেষণাপ্রবন্ধ) ইত্যাদি লেখা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তার অপ্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে অদৃশ্যে দৃশ্যমান (কাব্যগ্রন্থ), শতাব্দীর শুরুতে বিপন্ন বিশ্ব (প্রবন্ধ) উল্লেখযোগ্য। তিনি ২০০৬ সালে ‘শিক্ষাভাবনা তৃণমূল হতে’ নামক একটি গবেষণাগ্রন্থও সম্পাদনা করেন।
কবি তালাত মাহমুদ বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল ও রাজধানী ঢাকাসহ প্রায় সারা দেশেই সমানভাবে পরিচিতি লাভ করেন। বিগত আশির দশক থেকেই কবি তালাত মাহমুদকে নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য পত্রিকায় ব্যাপক লেখালেখি হয়। ১৯৮৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত কবিতাপত্রে কবির একগুচ্ছ কবিতা প্রকাশিত হলে সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং কবির পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনার ঝড় ওঠে।
কবি তালাত মাহমুদ ১৯৮০ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে সাহিত্য-সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদান রাখায় আশির দশকের সাড়া জাগানো ‘জিলবাংলা সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন। তা ছাড়া সাহিত্য সাধনা ও সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউল সমালোচক সংঘসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন থেকে কবিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সংবর্ধনা প্রদান করে। ১৯৮২ সালে সর্বদলীয় একুশে উদযাপন পরিষদ কর্তৃক ‘একুশে সাহিত্য পুরস্কার’ এ ভূষিত হন।
কবি তালাত মাহমুদ বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়াম, আলোচনা সভা, সাহিত্যের আসরের তার প্রদত্ত বক্তৃতায় সব সময় জন্মজেলা শেরপুরকে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পরিচিতি লাভ করাতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন। তার মতে, রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার মানুষের সাথে পরিচয়পর্বে নিজ বাড়ি শেরপুর বললে তার জবাবে তারা প্রশ্ন ছুড়ে বলেন- বগুড়ার শেরপুর (উপজেলা) নাকি সিলেটের শেরপুর (একটি ছোট্ট বাজার)? অথচ ময়মনসিংহ বিভাগের শেরপুর হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জেলা। তাই শেরপুর জেলাকে সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিক্ষা-দীক্ষায় আলোকিত ও আপন পরিচয়ে পরিচিত করতে তিনি যথাসাধ্য নিরলস কাজ করে গেছেন।
সদাহাস্যোজ্জ্বল ন¤্র-ভদ্র কবি তালাত মাহমুদ একজন মানবতাবাদী লোক ছিলেন। অন্যের দুঃখ-কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারতেন না; তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠত। তিনি প্রতি বছর তার প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের ‘কবিসংঘ’ উদ্যোগে শীতার্তদের মধ্যে কম্বল বিতরণসহ আর্তপীড়িতদের মধ্যে সাহায্যের হাত প্রসারিত করতেন। কবিসংঘের উদ্যোগে এই নিবন্ধকারকে সাথে নিয়ে তিনি গত ২০১৬ সাল থেকে শেরপুর, জামালপুর ও ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, মসজিদ প্রাঙ্গণ-কবরস্থান ও ঈদগাহতে এবং শহর-নগর-গ্রামের রাস্তাঘাটের দুইধারে লক্ষাধিক ফলদ, ঔষধি গাছের চারা ও তালবীজ রোপণ করেন।
কবি ও সাংবাদিক তালাত মাহমুদের মতো দেশপ্রেমিক, নির্ভীক, পরোপকারী, নিস্বার্থ ও পণ্ডিত ব্যক্তির অভাব আজ আমাদের সমাজে। বাংলা সাহিত্যে তার বিশেষ অবদান, সোনার বাংলায় সোনার মানুষ তৈরির মন্ত্রণাদায়িতা ও দূষণমুক্ত সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশ গড়ার সহযাত্রায় তার অবদান জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। কবি তালাত মাহমুদ বেঁচে থাকবেন বাংলার সাহিত্যমোদী প্রতিটি মানুষের হৃদয় মণিকোঠায়।
