আলজাজিরা
পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ চুক্তি বা এনপিটি থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে ইরানের পার্লামেন্টের প্রেসিডিয়াম বোর্ডে একটি বিল জমা দিয়েছেন দেশটির কয়েকজন আইনপ্রণেতা। ইরানি পার্লামেন্টের সদস্য হোসেইন-আলি হাজি দেলিগানি গত রোববার জানিয়েছেন, বিলটি পার্লামেন্টে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তবে এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিতর্ক শুরু করতে পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের অনুমোদন প্রয়োজন। হাজি দেলিগানি বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ‘শত্রুর’ দুই দফা আগ্রাসনের পরিপ্রেক্ষিতে এনপিটিতে থাকা থেকে ইরানের লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হচ্ছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিচালনা পরিষদ ইরানের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে বিষয়টি জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তের কথাও উল্লেখ করেন হাজি দেলিগানি। তিনি বলেন, ইরানের নিজেদের বিষয় নিজেদের মতো করে পরিচালনা করার জন্য এনপিটি থেকে সরে আসার প্রয়োজন হতে পারে।
তাছাড়া দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি জানিয়েছেন, পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি থেকে ইরানের প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তিনি বলেছেন, এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে পার্লামেন্টে একাধিক প্রস্তাবও জমা পড়েছে। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে সরকারের সব স্তরের মধ্যে সমন্বয় এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কাঠামোর মধ্যে অভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
মেহর নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আজিজি বলেন, এনপিটি থেকে ইরানের প্রত্যাহার এখন আলোচনার টেবিলে থাকা একটি বিকল্প। তার ভাষ্য, এনপিটি থেকে প্রত্যাহারের বিষয়ে ‘প্রত্যাহার পরিকল্পনা’ নামে কয়েকটি আইন প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। এসব প্রস্তাবে বহু এমপির স্বাক্ষর রয়েছে এবং তা জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশন এবং পার্লামেন্টের আইন প্রণয়নবিষয়ক উপদফতরে জমা দেয়া হয়েছে।
তবে আজিজি বলেন, শুধু আইন প্রস্তাব উত্থাপন করলেই এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি সরকারের সব স্তরের সাথে সমন্বয় করতে হবে। একই সাথে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন কাঠামোর মধ্যে একটি অভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার ভূমিকা নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন আজিজি। তার অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সংস্থাটিকে রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত করা হয়েছে এবং এর কারিগরি ও বিশেষায়িত দায়িত্ব থেকে তা সরে গেছে। তার ভাষ্য, প্রতিষ্ঠার সময় যে কারিগরি ও পেশাদার ভূমিকার ওপর সংস্থাটির দায়িত্ব নির্ধারিত হয়েছিল, বর্তমানে তা আর যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে না। আজিজি আরো বলেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর হাতে কোনো হাতিয়ারে পরিণত হতে দেয়া উচিত নয়। তার দাবি, সংস্থাটির বিধিবদ্ধ দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও গত কয়েক বছরে তা যথাযথভাবে পালন করা হয়নি।
ইরানের এনপিটি থেকে প্রত্যাহারের সম্ভাবনা নিয়ে আজিজির এই বক্তব্যের আগে ১৫ সেপ্টেম্বর দেশটির একদল এমপিও চুক্তিটির সদস্যপদ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, এনপিটি ইরানের পরমাণু স্থাপনার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কিংবা চুক্তির মাধ্যমে প্রতিশ্রুত সুবিধা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
ওই সদস্যদের বিবৃতিতে আরো বলা হয়, এনপিটি পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধের অঙ্গীকারের পাশাপাশি সদস্য দেশগুলোর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পারস্পরিক ভারসাম্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর ঘটনাপ্রবাহে আন্তর্জাতিক কাঠামোগুলো ইরানের ন্যূনতম আইনগত অধিকারও নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন আজিজি। তিনি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রতিবেশী দেশগুলোকে শক্তিশালী ইরানের সাথে নিজেদের সমন্বয় ও সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করার আহ্বান জানান। তার মতে, আঞ্চলিক পরিস্থিতি, প্রতিরোধ ফ্রন্টের ভবিষ্যৎ, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সমীকরণ, ইরানের পরমাণু ইস্যু এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক, এসব বিষয় আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
এনপিটির স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারে না। তেহরান বরাবরই বলে আসছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই শনিবার বার্তাসংস্থা আল জাজিরাকে বলেছেন, দেশটির পরমাণু নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে এনপিটি থেকে সরে আসার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। রেজাই বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণের ওপর। আইএইএর পরিদর্শন ব্যবস্থার সাথে ইরানের কথিত অসহযোগিতার অভিযোগে দেশটির বিষয়টি জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র ইউরোপীয় দেশগুলো ৩৫ সদস্যের বোর্ড অব গভর্নরসে একটি প্রস্তাব পাস করানোর পর রেজাই এ মন্তব্য করেন।
এদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে আইএইএর দাবির ভিত্তিতে যেকোনো পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে রাশিয়া ও চীন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসনের কারণে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আইএইএর নিয়মিত পরিদর্শন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ইরান বহু বছর ধরেই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির উদ্দেশ্য অস্ত্র তৈরি নয়। দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তার সাম্প্রতিক বক্তব্যেও সেই অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে তেহরানের এমন অবস্থানের পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। ইরান এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে পার্লামেন্টে বিল উত্থাপন করলেও তা এখনো আইনে পরিণত হয়নি। বিলটি নিয়ে সংসদে বিতর্ক ও পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য স্পিকারের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।





