সিএনএন ও ওয়াশিংটন পোস্ট
জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে সংস্থাটির সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রথম দিনে প্রদত্ত বক্তব্যে বেশ কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্য উত্থাপন করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দীর্ঘ ৩৭ মিনিটের এই ভাষণে তিনি ইরান যুদ্ধ, গ্রিনল্যান্ড, জলবায়ু পরিবর্তন, ওয়াশিংটনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিশ্বশান্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গগুলো ছুঁয়ে গেলেও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা তার বিভিন্ন দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বক্তব্যের শুরুতেই দায়িত্ব গ্রহণের পর আটটি যুদ্ধ বন্ধ করার সাফল্য দাবি করেন তিনি। তার তালিকার মধ্যে কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড, কসোভো-সার্বিয়া, রুয়ান্ডা-কঙ্গো, ভারত-পাকিস্তান, আর্মেনিয়া-আজারবাইজান, গাজা, ইসরাইল-ইরান এবং মিসর-ইথিওপিয়ার নাম উল্লেখ করা হলেও মূল চিত্রটি বেশ ভিন্ন। প্রকৃতপক্ষে মিসর ও ইথিওপিয়ার মধ্যকার মতবিরোধটি একটি জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণসংক্রান্ত কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ ছিল, তা কোনো সশস্ত্র যুদ্ধ ছিল না। একইভাবে সার্বিয়া ও কসোভোর মধ্যকার অস্থিতিশীলতাও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপ নেয়নি। রুয়ান্ডা ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের মধ্যস্থতায় কেবল একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার পরও সঙ্ঘাত পুরোপুরি থামেনি। অন্যদিকে, গাজায় মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও ইসরাইল টানা সামরিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি, গত বছর ইসরাইল ও ইরানের সাময়িক উত্তেজনা প্রশমিত করার দাবি করা হলেও চলতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন বলয়কে সাথে নিয়ে ইসরাইল আবারো ইরানের সাথে সরাসরি ও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, যারা এআই মানবজাতি ধ্বংস করবে বলে ভয় দেখাচ্ছে, তারাই একসময় বলেছিল বৈশ্বিক উষ্ণায়নে ১২ বছরের মধ্যে সবাই মারা যাবে। তিনি আরো দাবি করেন, উষ্ণতার বদলে তাপমাত্রা শীতল হতে থাকায় ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ নাম বদলে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ রাখা হয় এবং এই পরিবর্তনের ফলে কোনো প্রাণহানিও ঘটেনি। তবে জলবায়ুবিজ্ঞানীদের পর্যালোচনায় এই বক্তব্যের একাধিক ভুল উন্মোচিত হয়েছে। প্রথমত, ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ ও ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ ভিন্ন দু’টি বৈজ্ঞানিক ধারণা, যা যথাক্রমে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত রূপান্তর বোঝাতে আজও ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন থামার দাবিটি ভিত্তিহীন; বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্যানুযায়ী বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত ১১টি বছরের তালিকায় শেষ তিন বছর ছিল শীর্ষস্থানে। তৃতীয়ত, জলবায়ুর চরম বিপর্যয়ের ফলে ইতোমধ্যে বিশ্বে মিলিয়ন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। চতুর্থত, ২০১৮ সালের বিখ্যাত বিজ্ঞাপনী রিপোর্টে কেবল তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রিতে ধরে রাখতে আগামী ১২ বছরের মধ্যে কার্বন নির্গমন কমানোর তাগিদ দেয়া হয়েছিল, সর্বাত্মক বিলুপ্তির কথা সেখানে ছিল না।
বিনিয়োগ প্রসঙ্গে ট্রাম্প সারা বিশ্ব থেকে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করার দাবি করলেও হোয়াইট হাউজ এর পক্ষে কোনো পোক্ত প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি সরকারের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যমতে তার দ্বিতীয় মেয়াদে বিনিয়োগের অঙ্কটি ১১.২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ট্রাম্পের বলা পরিমাণের প্রায় অর্ধেক। গত বছরের আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের পর্যালোচনায় হোয়াইট হাউজের এই তালিকায় অনেক অস্পষ্ট ও অনিশ্চিত বিনিয়োগ হিসাবভুক্ত করার বিষয়টি ফুটে ওঠে। ইরানের সাথে চলমান সঙ্ঘাতে আমেরিকার সমরাস্ত্র ঘাটতি দেখা দেয়ার খবরগুলোকে ট্রাম্প দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন। তিনি সমালোচকদের আখ্যা দিয়ে দাবি করেন, মার্কিন বাহিনীর অস্ত্রাগারে যে পরিমাণ বিপুল সমরাস্ত্র উদ্বৃত্ত আছে তা ধারণার অতীত। পেন্টাগন প্রকাশ্যে মার্কিন সামরিক ভাণ্ডার অক্ষত থাকার কথা বললেও পেন্টাগনের নিজস্ব তদারকি সংস্থা এবং নিরপেক্ষ কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। গত সপ্তাহে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে স্বীকার করা হয় যে, ইরান যুদ্ধের জেরে সুনির্দিষ্ট কিছু গোলাবারুদের সমাহার হ্রাস পেয়েছে এবং এই ঘাটতি মেটাতে প্রতিরক্ষা শিল্প খাতের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে দীর্ঘ সময় লাগবে। সর্বশেষে, নিজ দেশের রাজধানী ওয়াশিংটনে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে অপরাধের হার ৮৭ শতাংশ কমিয়ে আনার দাবি জানান ট্রাম্প। কিন্তু ওয়াশিংটন পুলিশের নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত বছরের একই সময়ের সাথে তুলনা করলে প্রকৃত অপরাধ কমেছে প্রায় ২৩ শতাংশ। প্রেসিডেন্টের এই বিপুল পরিমাণ অপরাধ হ্রাসের দাবির সপক্ষে স্থানীয় প্রশাসন বা সংবাদমাধ্যমগুলো কোনো সমর্থনযোগ্য তথ্য খুঁজে পায়নি।