দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ও রয়টার্স
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রাণ হারান। সেই একই হামলায় নিহত হওয়ার ঝুঁকিতে ছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচিও। সূচনালগ্নের সেই ধাক্কা কাটিয়ে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এখনো চলমান থাকলেও এ সপ্তাহে এক ভিন্ন রূপচিত্র দেখা গেল ম্যানহাটনের রাজপথে। দেশে অবস্থানকালে যাদের প্রতিনিয়ত বোমার ভয়ে ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে আত্মগোপন করে থাকতে হতো, সেই শীর্ষ ইরানি নেতারাই মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসের নিরাপত্তা বলয়ে মুক্তভাবে চলাফেরা করেছেন।
জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ করে ইরানি প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বৈশ্বিক কূটনৈতিক সুযোগের শতভাগ ফায়দা তুলে নিয়েছেন। বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে অত্যন্ত চতুর কৌশল প্রয়োগ করেছেন তারা। নিজেদের একচ্ছত্রভাবে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা দায়িত্বশীল রাষ্ট্র এবং প্রতিপক্ষকে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো লঙ্ঘনকারী ‘দস্যু’ হিসেবে চিত্রায়িত করতে সক্ষম হয়েছেন দুই নেতা। নিউ ইয়র্কে অবস্থানকালে আব্বাস আরাকচি অন্তত দুই ডজনেরও বেশি দেশের আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা সারেন, যার মধ্যে ১০টিরও বেশি ইউরোপীয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এমনকি ইতঃপূর্বে ইরানি হামলার শিকার হওয়া জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথেও বৈঠকে বসেন তিনি। কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বাধিক তাৎপর্যপূর্ণ ছিল মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সাথে আরাকচির বিরল প্রত্যক্ষ আলোচনা। এই বৈঠকের পর পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কট নিরসনে একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রস্তাব আলোচনার টেবিলে পেশ করেছে তেহরান। জাতিসঙ্ঘের মূল মঞ্চে দেয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান কোনো শক্তির সামনেই ‘মাথা নত করবে না’। তার এই আপসহীন অবস্থান ইরানের অভ্যন্তরীণ কট্টরপন্থী রাজনৈতিক মহলকে আশ্বস্ত করেছে। উল্লেখ্য, মার্কিন নৌ অবরোধ ও যুদ্ধকালীন কঠোর নিষেধাজ্ঞায় দেশের অর্থনীতি মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়ায় এই কট্টরপন্থীদের একটি অংশ গোড়ার দিকে পেজেশকিয়ানের মার্কিন সফর সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছিল।
পরবর্তী সময়ে গত বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্কের একটি অভিজাত হোটেলে পশ্চিমা সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক থিংক-ট্যাংক বিশ্লেষকদের সাথে এক বিশেষ গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন পেজেশকিয়ান, যেখানে তিনি তার প্রশাসনের নীতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিশদ ব্যাখ্যা করেন। এটি নিশ্চিতভাবেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই ভয়াল সকালের সম্পূর্ণ বিপরীত দৃশ্যপট, যখন যৌথ বিমান হামলার পরপরই কয়েক ঘণ্টার জন্য খবরের অন্তরালে চলে যাওয়া পেজেশকিয়ানের জীবিত থাকা নিয়ে চরম সংশয় তৈরি হয়েছিল। অতীতের দশকগুলোতেও জাতিসঙ্ঘের সাধারণ অধিবেশনে ইরানের উপস্থিতি বৈশ্বিক গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তবে চলতি বছরের যুদ্ধাবস্থার প্রেক্ষাপটে আয়োজিত এই সফরটিই ছিল অধিবেশনের প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও নিজ দেশের জনমত- উভয় দিক রক্ষা করতেই তেহরানের নীতিনির্ধারকরা সফরটি অত্যন্ত হিসাব-নিকাশ করে সাজিয়েছিলেন।
শুরুর দিকে তেহরানের কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো ওয়াশিংটনের সাথে পেজেশকিয়ান ও আরাকচির এই প্রত্যক্ষ কূটনৈতিক উদ্যোগের কঠোর সমালোচনা করেছিল। যুদ্ধরত শত্রুর দেশে গিয়ে সফর করাকে তারা একপ্রকার আত্মসমর্পণের শামিল বলে মনে করেছিল। বিশেষ করে মার্কিন প্রতিনিধি উইটকফের সাথে আরাকচি সরাসরি আলোচনায় বসায় কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতারা মারাত্মক ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
অফুরন্ত রাজনৈতিক ঝুঁকিগুলো জেনেও ইরানি প্রতিনিধিদল এমন একটি মিশন সাফল্যমণ্ডিত করেছে, যা একদিকে দেশের অভ্যন্তরে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ঘটিয়েছে এবং অন্য দিকে প্রতিপক্ষের সাথে থমকে যাওয়া কূটনৈতিক আলোচনার পথ পুনর্বার উন্মুক্ত করেছে। একই সাথে সমগ্র বিশ্বকে নিজেদের প্রশাসনিক টিকে থাকার স্পষ্ট বার্তা নিশ্চিত করেছে তারা। অধিবেশনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে পেজেশকিয়ান যখন ইরানের ন্যায়সঙ্গত দাবিগুলো পেশ করছিলেন এবং একের পর এক রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করছিলেন, ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা গেছে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রে। যৌথ যুদ্ধের অন্যতম উদ্যোক্তা ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দিতে মঞ্চে উঠলে জাতিসঙ্ঘের মিলনায়তন থেকে একের পর এক দেশের প্রতিনিধিদল একযোগে ওয়াকআউট করে বেরিয়ে যান এবং নিউ ইয়র্কের রাজপথে তার বিরুদ্ধে তীব্র জনবিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়।





