আলজাজিরা
গাজার মতো করে ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরে পুরোদমে সামরিক অভিযান ও ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ করতে আহ্বান জানিয়েছেন ইসরাইলের চরম ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ। তিনি গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বাহিনী যেভাবে ধ্বংসযজ্ঞ ও অভিযান চালিয়েছে, পশ্চিম তীরেও ঠিক একই নীতি বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট-এর একটি পডকাস্ট অনুষ্ঠানে দেয়া সাক্ষাৎকারে ‘ধর্মীয় জায়োনিজম’ পার্টির প্রধান স্মোত্রিচ এই উসকানিমূলক মন্তব্য করেন। সাক্ষাৎকারে স্মোত্রিচ পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের সীমিত স্বায়ত্তশাসন প্রদানকারী প্রশাসন ‘ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ’-কে পুরোপুরি বিলুপ্ত বা ভেঙে দেয়ার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে একটি ‘সন্ত্রাসী সত্তা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, পশ্চিম তীরে কোনো সন্ত্রাসী বা অবৈধ অস্ত্র থাকতে দেয়া হবে না ও গাজার মতো এখানেও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিতে হবে। পশ্চিম তীরের পাশাপাশি লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল ও অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার যেসব এলাকা বর্তমানে ইসরাইলি বাহিনীর দখলে রয়েছে, সেসব অঞ্চলকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলের ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত করার আহ্বান জানান এই বিতর্কিত মন্ত্রী।
তিনি দাবি করেন, চলমান যুদ্ধের পরিণতি হিসেবে শত্রুপক্ষকে আঞ্চলিক বা ভূখণ্ডগত মূল্য চোকাতে হবে। তাই গাজার বড় অংশ ও লেবাননের লিটানি নদী পর্যন্ত অঞ্চল ইসরাইলের অংশ হিসেবে দখল করে নেয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরাইলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আগামী নির্বাচনের প্রচারণা সামনে রেখে ও নিজের চরমপন্থী সমর্থক গোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট করতেই উগ্র ডানপন্থী এই নেতা পশ্চিম তীরে নতুন করে চরম সামরিক আগ্রাসন ও অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের এমন হুমকি দিচ্ছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
নিহত ২৬২ ফিলিস্তিনি সাংবাদিক 
মিডল ইস্ট মনিটর জানায়, গাজায় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ২৬২ জন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস। এ সময় আহত হয়েছেন আরো ৪৩৩ সাংবাদিক। গত শনিবার ‘ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের সাথে সংহতি দিবস’ উপলক্ষে দেয়া এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানায় গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস। বিবৃতিতে বলা হয়, নিহত সাংবাদিকদের মধ্যে ২৬ জন নারী সাংবাদিক রয়েছেন। এ ছাড়া যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলি বাহিনী ৫০ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। বর্তমানে তাদের মধ্যে ২৩ জন বন্দী রয়েছেন বলে জানায় সংগঠনটি। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস আরো জানায়, ইসরাইলি হামলায় গণমাধ্যম খাতে ৮০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হামলায় ১২টি প্রিন্ট মিডিয়া অফিস, ২৩টি ডিজিটাল মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়, ১২টি স্থানীয় রেডিও স্টেশন, ১৬টি টেলিভিশন ও স্যাটেলাইট চ্যানেল, ২৭টি ছাপাখানা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে।
চাপা পড়ে আছে ১০ হাজার মানুষের দেহাবশেষ
এদিকে গতকাল রোববার  ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানায়, গাজায় প্রায় ছয় কোটি ১০ লাখ টন ধ্বংসস্তূপ জমেছে। জাতিসঙ্ঘের হিসাবে, এসব সরাতে অন্তত সাত থেকে ১০ বছর লাগতে পারে। ব্যয় হবে কয়েক শ’ কোটি ডলার। আধুনিক ইতিহাসে এটি হতে পারে ধ্বংসস্তূপ সরানোর অন্যতম বৃহৎ অভিযান। জাতিসঙ্ঘ উন্নয়ন কর্মসূচি বা ইউএনডিপির ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি জ্যাকো সিলিয়ার্স জানান, গত ১৮ বছরে বিশ্বের সব যুদ্ধ মিলিয়ে যত ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছে, গাজায় তার প্রায় ২০ গুণ জমেছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ ৭ হাজার টন ধ্বংসস্তূপ সরানো হয়েছে। এর মধ্যে তিন লাখ টনের বেশি পুনর্ব্যবহারের উপযোগী করা হয়েছে। কিন্তু এটি মোট ধ্বংসস্তূপের মাত্র দেড় শতাংশ। তবে ধ্বংসস্তূপ সরানোর সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক হলো এর নিচে চাপা পড়া মানুষের দেহাবশেষ ও স্মৃতি। জাতিসঙ্ঘের হিসাবে, এখনো আট হাজার থেকে ১০ হাজার মানুষের দেহাবশেষ ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকতে পারে।
নিহত বেড়ে ৭৪ হাজার ১৮
গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা বেড়ে ৭৪ হাজার ১৮ জনে দাঁড়িয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা ইসরাইলের হামলায় এ পর্যন্ত আহত হয়েছেন এক লাখ ৭৫ হাজার ৭৯ জন।