আলজাজিরা
গাজায় ইসরাইলের ‘গণহত্যামূলক যুদ্ধের’ তীব্র নিন্দা জানিয়ে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জাসিম আলে সানি বলেছেন, অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে এই ধ্বংসলীলার জন্য যারাই দায়ী, তারাই ‘যুদ্ধাপরাধী’। একই সাথে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বেও থাকা শেখ মোহাম্মদ মঙ্গলবার ‘পিয়ার্স মরগান আনসেন্সরড’ শোতে গাজায় ইসরাইলি কার্যক্রমের প্রকৃতি সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামাসের হামলার জবাবে ইসরাইলের প্রতিক্রিয়া কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত ছিল না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, হাসপাতালগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, স্কুলগুলোতে হামলা চালানো হয়েছে। যতই যুক্তি ও অজুহাত দেখানো হোক না কেন, এর পক্ষে কোনো কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়।
২০২৫ সালের অক্টোবরে কার্যকর হওয়া ‘যুদ্ধবিরতি’ ইসরাইল প্রায় প্রতিদিন লঙ্ঘন করছে বলেও জানান শেখ মোহাম্মদ। তিনি বলেন, এরপর থেকে গাজা উপত্যকায় এক হাজার ৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, আরো ভূখণ্ড দখল করা হয়েছে- উপত্যকার প্রায় ৭০ শতাংশ এখন দখল করা এবং ইসরাইলি বাহিনী সেখানে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। তারা এই চুক্তির প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করছে না। এটি দেখাচ্ছে যে তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে। গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় কাতারের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই ইসরাইল বারবার ‘ব্যাহত’ করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
২০২৫ সালে কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরাইলের হামলারও নিন্দা জানিয়েছেন শেখ মোহাম্মদ। ওই হামলায় আলোচনার জন্য জড়ো হওয়া হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। হামলায় প্রাণঘাতী বিস্ফোরণ ঘটে, যা কাতারের সার্বভৌমত্বের নজিরবিহীন লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দোহায় আমরা যখন মধ্যস্থতা করছিলাম এবং সেই সময় ট্রাম্পের প্রস্তাব বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছিলাম, ঠিক তখনই ইসরাইল আমাদের ওপর হামলা চালায়। এটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং নিন্দনীয়। এটি মধ্যস্থতাকারীদের ওপর হামলার এমন এক নজির সৃষ্টি করেছে, যা ইতিহাসের কোনো যুদ্ধেই কখনও ঘটেনি। তিনি যোগ করেন, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘সব সীমা অতিক্রম করে ফেলেছেন, যেভাবে তিনি অতীতেও অন্যান্য সীমা অতিক্রম করেছিলেন।’
গাজায় ফের ইসরাইলি হামলায় নিহত ৬
এদিকে আনাদোলু ও আলজাজিরা জানায়, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার মধ্যেই গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় ইসরাইলি হামলায় অন্তত ছয় ফিলিস্তিনি নিহত ও ১৮ জন আহত হয়েছেন। বুধবার গাজার বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসা সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। গাজা সিটির আল-ওয়াহদা সড়কে একটি বাড়িতে ইসরাইলি বিমান হামলায় এক নারী নিহত ও তার স্বামী গুরুতর আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ইসরাইলি একটি হেলিকপ্টার থেকে বাড়িটিতে অন্তত একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
এ ছাড়া দক্ষিণ গাজা সিটির তাল আল-হাওয়া এলাকায় যাত্রীবাহী ট্রেলার টানা একটি ট্যাক্সিতে হামলায় পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত ও অন্তত ১৩ জন আহত হয়েছেন। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। এদিকে গাজা সিটির শুজাইয়া এলাকায় দু’টি পরিত্যক্ত বাড়িতে ইসরাইলি বিমান হামলায় তিনজন আহত হন। শহরের শুজাইয়া ও জেইতুন এলাকায় গোলাবর্ষণ এবং ড্রোন হামলাও চালানো হয়। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইসরাইলি হামলায় এক হাজার ৪৩১ ফিলিস্তিনি নিহত ও পাঁচ হাজার ২৬ জন আহত হয়েছেন।
আল আকসায় ইহুদিদের প্রবেশ
আল আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে পুলিশি সুরক্ষার মধ্যে অন্তত ৫০০ ইহুদি প্রবেশ করেছে। দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক চুক্তি বা ‘স্ট্যাটাস কো’ অনুযায়ী, অমুসলিমরা পর্যটক হিসেবে আল-আকসায় প্রবেশ করতে পারলেও সেখানে কোনো ধর্মীয় আচার বা প্রার্থনা করতে পারেন না। কিন্তু গতকাল বুধবার, ইহুদিদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব সুক্কোতের পঞ্চম দিনে তারা জোর করে আল আকসা প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়ে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, তারা সেখানে তালমুডিক প্রার্থনা ও অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠান পালন করে। ইসরাইলি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে আল আকসা প্রাঙ্গণে ইসরাইলি পার্লামেন্টের সাবেক সদস্য ও জেহুত পার্টির নেতা মোশে ফেইগলিনকে আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে দেখা গেছে। সম্প্রতি ইসরাইলের বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতা ও মন্ত্রী এই প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হচ্ছেন ইসরাইলের নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গ্যভির। তিনি বলেছেন, ‘আমরা এই প্রাঙ্গণের মালিক, আমরা তাদের পরাজিত করেছি।’ ফিলিস্তিনিদের প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে ও তাদের বাধা দিয়ে এবং আল আকসার ঐতিহাসিক ও আইনগত স্থিতাবস্থা লঙ্ঘন করে প্রায়ই এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে ইসরাইলি ইহুদিরা।
গাজায় যা ঘটছে তার কোনো সাফাই চলে না : কাতার





