জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সদস্য না হয়েও সামরিক অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে সংকট উত্তরণে বৈশ্বিক এই বিচারিক প্রতিষ্ঠানকেই কাজে লাগাতে চাইছেন মিয়ানমারের ক্ষমতাচ্যুত পার্লামেন্ট সদস্যরা। শুক্রবার জাতিসঙ্ঘে সামরিক সরকারের বিরোধিতাকারী মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াো মোয়ে তুন নিউ ইয়র্কে এই কথা জানান।
তিনি বলেন, মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে বিচারের আওতায় আনার জন্য ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক নেতাদের কমিটি সম্ভাব্য সব উপায় খতিয়ে দেখছে।
কিয়ো মোয়ে তুন বলেন, 'এর মধ্যে আইসিসি অন্যতম একটি উপায়। আমরা আইসিসির সদস্য রাষ্ট্র নই কিন্তু আমাদের প্রয়োজনে আইসিসির কাছে এই মামলা উপস্থাপনের উপায় ও পন্থার সন্ধান করছি।'
এর আগে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর মিয়ানমার সেনাদের বর্বর নির্যাতন, লুটপাট, ধর্ষণ ও গণহত্যার অভিযোগে ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলা করে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) সহকারে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর সমর্থন থাকা এই মামলায় অভিযোগের বিষয়ে কখনোই খুব গুরুত্ব দিতে দেখা যায়নি মিয়ানমারের তৎকালীন 'গণতান্ত্রিক' সরকারকে। বরং রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করতে আইসিজেতে মিয়ানমারের হয়ে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন দেশটির শান্তিতে নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সু চি।
এ দিকে শুক্রবারের বিক্ষোভে দেশটির দেশটির কেন্দ্রীয় অংবান শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আট বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন।
মিয়ানমারের মানবাধিকার সংস্থা অ্যাসিসটেন্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনারস জানিয়েছে, মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৩২ জন নিহত হয়েছেন।
১ ফেব্রুয়ারি তাতমাদাও নামে পরিচিত মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী দেশটিতে সেনা অভ্যুত্থান ঘটায় এবং প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট ও স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চিসহ রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতার করে। সাথে সাথে দেশটিতে এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। গত বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিতর্কের জেরে এই অভ্যুত্থান ঘটায় সামরিক বাহিনী।
সেনা অভ্যুত্থানের প্রতিবাদে ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে মিয়ানমারের বিভিন্ন শহরেই বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা অং সান সু চিসহ বন্দী রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তির পাশাপাশি সামরিক শাসন প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছেন।
এ দিকে সেনা অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের বিভিন্ন শহর এবং উপশহর থেকে শত শত নাগরিক পালিয়ে প্রতিবেশি দেশ থাইল্যান্ড সীমান্তের দিকে ছুটছেন। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় জাতিগত সশস্ত্র গ্রুপগুলোর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় আশ্রয় নিচ্ছেন তারা।
এ ধরনের একটি গ্রুপের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, শরণার্থী ঢলের আশঙ্কায় প্রস্তুতি শুরু করেছে থাইল্যান্ড।
থাই সীমান্ত এলাকা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন (কেএনইউ)। জাতিগত এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটির এক কর্মকর্তা জানান তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রায় এক হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।
কেএনইউ-এর পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রধান পাদোহ সাও টাও নি বলেন, ‘আমাদের এলাকায় শত শত মানুষ রয়েছে। কেউ ধর্মঘটের নেতা, কেউ অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী, সরকারী কর্মী...চাকরি ছেড়ে দেওয়া পুলিশ ও সেনা সদস্য, এছাড়াও বেশ কয়েক জন পার্লামেন্ট সদস্য এবং চিকিৎসকও রয়েছেন।’
এছাড়া শান রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও বেশ কিছু সংখ্যক মিয়ানমারের নাগরিক আশ্রয় নিয়েছে বলেও জানান তিনি।
মিয়ানমারের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় বেশ কিছু জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয়। এই গোষ্ঠীগুলোর অনেকেই সামরিক অভ্যুত্থানের নিন্দা জানিয়ে প্রতিরোধ আন্দোলনে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে কেএনইউ। পাদোহ সাও টাও নি বলেন, অভ্যুত্থানের আগে সরকারের সঙ্গে অস্ত্রবিরতির চুক্তি হলেও তা অচল হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা জোরালোভাবে অসহযোগ আন্দোলন এবং মানুষের বিক্ষোভকে সমর্থন করছি।’
তবে মিয়ানমারের পালিয়ে যাওয়া নাগরিকদের আশ্রয় দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে থাইল্যান্ড। মায়ে সোত জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রায় ৪৩ হাজার মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনীর কর্নেল প্রসান হেনপ্রাসার্ট জানান সীমান্তে টহল বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সংঘর্ষ হলে আমাদের আমাদের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে হবে এবং এলাকা প্রস্তুত করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি পরিস্থিতি নিরাপদ হলে বহু মানুষ সীমান্ত পার হয়ে চলে যাবে কারণ সীমান্তের ওপারে তাদের বাড়ি রয়েছে।’
সূত্র : আলজাজিরা ও রয়টার্স








