সৌদি ভিন্ন মতাবলম্বী সাংবাদিক, ওয়াশিংটপোস্টের কলামিস্ট জামাল খাশোগি। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে নিখোঁজ, পরে বিশ্ববাসীর চাপে সৌদি আরব কর্তৃক তাকে হত্যার খবর স্বীকার করে নেয়া -এ নাটকীয়তায় তার সম্পর্কে জানার আগ্রহের শেষ নেই।
মার্কিন লেখক লরেন্স রাইটের লেখা ‘দ্য লুমিং টাওয়ার : আল কায়দা অ্যান্ড দ্য রোড টু ৯/১১’ নামের বই থেকে জানা গেছে, সাংবাদিকতা জীবনের বাইরে খাশোগির ভিন্ন রূপ।
বইটিতে বলা হয়েছে, তিনি আল কায়দা নেতা ওসামা বিন লাদেনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। বইয়ের প্রথম দিকে বলা হয়, লাদেন ও খাসোগি উভয়ে মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য ছিলেন। ব্রাদারহুড মতাদর্শ থেকে হঠাৎই তিনি সরে যান। গঠন করেন জঙ্গিগোষ্ঠী আল কায়দা। বইটির ৭৮ পৃষ্ঠায় বলা হয়, কর্মজীবনে সৌদি আরবের বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমের হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগান আক্রমণ ও ওসামা বিন লাদেনের উত্থানসহ অনেক গুরুত্বপর্ণ ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রতিবেদন করেন সাংবাদিক খাশোগি।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে আফগানিস্তানের বিখ্যাত তোরাবোরা পাহাড়ে বেশ কয়েকবার ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন খাসোগি। ১৯৮৮ সালের ৪ মে আফগানিস্তানে আল কায়দার অপারেশনের অভিজ্ঞতা নিয়ে আরব নিউজে ছবিসহ একটি প্রতিবেদন লিখেছিলেন তিনি। ছবিতে তাকে (খাশোগিকে) আফগানি পোশাক পরা ও তার ঘাড়ে আরবিজি রকেটলঞ্চার দেখা গেছে।
১৯৫৮ সালে জন্মগ্রহণ করা খাসোগির তার দাদা ছিলেন সৌদি রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল আজিজ আল সৌদের ব্যক্তিগত চিকিৎসক।
দাদার সুবাদেই রাজপরিবারে খাশোগির বিচরণ। সৌদি রাজপরিবারের বহু গোপন বিষয়ও তিনি জানতেন। বলা হয়ে থাকে, খাসোগি রাজপরিবারের বাইরে থাকা একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন, যিনি আল কায়দার টুইন টাওয়ার হামলা নিয়ে সৌদি রাজপরিবারের সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারগুলো জানতেন।
সৌদি অস্ত্র ব্যবসায়ী আদনান খাশোগির ভাতিজা ছিলেন তিনি। অন্যদিকে তার আরেক চাচাতো ভাই দোদি আল ফায়েদ যিনি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রিন্সেস ডায়ানার সঙ্গে নিহত হন। মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সখ্য থাকায় তুরস্কে বেশ গ্রহণযোগ্যতা ছিল খাশোগির।
২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার পর বিন লাদেনের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেন বলে জানিয়েছিলেন সাংবাদিক খাসোগি।
আরো পড়ুন : রয়টার্সসঙ্কট মোকাবেলায় যা করছেন বাদশাহ সালমান
নয়া দিগন্ত অনলাইন, ২১ অক্টোবর ২০১৮, ১১:৩৯
সাংবাদিক জামাল খাশোগির অন্তর্ধানের পর থেকে বিশ্বব্যাপী সঙ্কট এতটাই ঘোরতর হয়ে উঠছে যে, শেষ পর্যন্ত তা সামাল দিতে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে স্বয়ং সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সউদকে। ছেলে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যোগ্য হাতে শাসন করতে পারছেন কি না তাও এখন খতিয়ে দেখতে হচ্ছে তাকে। সঙ্কট সামলাতে এরই মধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন বাদশাহ। গত ১১ অক্টোবর তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ব্যক্তিগত উপদেষ্টা প্রিন্স খালেদ আল-ফয়সালকে ইস্তাম্বুলে পাঠান তিনি।
খালেদের সফরকালে খাশোগির বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করতে তুরস্কের সাথে একটি যৌথ টিম গঠনে একমত হয় সৌদি আরব। এর পর থেকেই বাদশাহ সালমান নিজ হাতেই বিষয়টি সামলাচ্ছেন। এমনটিই বলছেন সৌদি রাজপরিবার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে সৌদি আরবের কর্মকর্তারা অবশ্য এ ব্যাপারে সরাসরি বাদশাহের জড়িত থাকার বিষয়টি এখনো বলছেন না। আর বাদশাহেরও এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর কথা ছিল না। কারণ তিনি তো তার ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানকেই সব কিছু দেখাশোনার ভার দিয়েছিলেন। খাশোগিকে নিয়ে সঙ্কটের বিষয়টিও তার জানা ছিল না বললেই চলে। কারণ যুবরাজের সহযোগীরা বাদশাহকে কেবল দেশের গৌরবোজ্জ্বল সংবাদগুলোই সবসময় দেখিয়ে এসেছেন। কিন্তু খাশোগির ঘটনাটি বহুদূর গড়ানোয় তা আর লুকিয়ে রাখতে পারেননি তারা।
গত ২ অক্টোবর সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি তুরস্কে ইস্তাম্বুলের সৌদি কন্স্যুলেটে ঢোকার পর থেকে আর তাকে দেখা যায়নি। বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে সব আরব এবং সৌদি টিভি চ্যানেলেই সেই খবর আসে। আর তখনই বাদশাহ সব জানতে পারেন। ক্রাউন প্রিন্স তখন এ বিশ্ব সঙ্কট সামাল দিতে বাদশাহকে অনুরোধ জানান। যুবরাজ তখতে বসার পর থেকেই তার হাতে অনেক ক্ষমতা দিয়েছিলেন বদশাহ। কিন্তু এখন বাদশাহর হস্তক্ষেপে প্রিন্স সালমানের শাসন করার যোগ্যতা নিয়ে দেশ-বিদেশে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে। প্রিন্সের সুনামও এতে ক্ষুণœ হচ্ছে।
সৌদি রাজদরবার সংশ্লিষ্টরা অনেকেই এখন বলছেন, ‘বাদশাহর কাছে তার ছেলে প্রিয় হলেও তাকে এখন শুধু ছেলেকে বাঁচানো নয় বরং সামগ্রিকভাবে নিজের এবং রাজপরিবারের অস্তিত্ব রক্ষার কথা ভেবে কাজ করতে হবে।’ হিসাব-নিকাশে ভুল করে ফেলেছিলেন যুবরাজ খাশোগি নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তুরস্ক তিনি খুন হয়েছেন বলে অভিযোগ করলেও সৌদি আরব বরাবরই কোনো কিছু জানা থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে। কিন্তু সৌদি আরবের বহু দিনের মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখানোর পর ঘটনাটি দেখভালের জন্য মাঠে নামেন বাদশাহ সালমান। ঘটনাটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সুর চড়াল, আর তারপরই যুবরাজ বাদশাহকে জানালেন, একটি সমস্যা হয়েছে এবং তা মোকাবেলা করতে হবে। এর আগে যুবরাজ ও তার সহযোগীরা প্রাথমিকভাবে ধরে নিয়েছিলেন সমস্যা কেটে যাবে। কিন্তু ঘটনাটির পরিণতি যে কী হতে পারে সেই হিসাবে ভুল করে ফেলেছিলেন তারা।
বাদশাহ সালমান হস্তক্ষেপের আগে আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বলে যাচ্ছিল সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ। হুমকির সুরে তারা বলছিল, খাশোগি নিখোঁজের জেরে কেউ সৌদি আরবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে এর আরো বড় পাল্টা জবাব দেয়া হবে। এতে করে বিশ্বে তেল সরবরাহে বিঘœ ঘটাসহ তেলের দামও একলাফে বেড়ে যেতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেয়া হচ্ছিল সৌদি আরবের সরকারি মালিকানাধীন পত্রিকায়।
গত ২৪ ঘণ্টায়ও সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে হুমকির প্রতিক্রিয়াই এসেছে যুবরাজের কাছ থেকে। কিন্তু বাদশাহ সালমান এখন ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব নেয়ার পর পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। অনেকটাই ভিন্ন সুরে কথা বলছেন তিনি, জানান রাজপরিবার সংশ্লিষ্ট এক ব্যবসায়ী। বাদশাহ সম্প্রতি কয়েকদিনে সরাসরি কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সাথেও।
৮২ বছর বয়সের বাদশাহ সালমান দীর্ঘ দিন ঐকমত্যের ভিত্তিতে শাসন পরিচালনা করেছেন। চার দশক ধরে রিয়াদের গভর্নর হিসেবে তিনি তার রাজ ক্ষমতাবলে বিপথে চলে যাওয়া প্রিন্সদের সাজা দিয়ে সুনামও কুড়িয়েছেন।






