রাশিয়ায় বাদামি ভালুকের সংখ্যা গত তিন দশকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। সম্প্রতি মানুষের ওপর এসব বন্য প্রাণীর আক্রমণের ঘটনা বাড়ায় নাগরিকদের সুরক্ষায় নানা পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা আরটি সোমবার (৫ অক্টোবর) জানায়, এ বছর রাশিয়ার ২২টি অঞ্চলে এখন পর্যন্ত ৫৯টি আক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এতে ২১ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৩৮ জন। ২০২৫ সালে আক্রমণের সংখ্যা ছিল ৩৪ এবং ২০২৪ সালে ছিল ১৯। বনাঞ্চলে প্রাকৃতিক খাবারের অভাব আর বাসাবাড়ির চারপাশে ফেলা আবর্জনা থেকে সহজে খাবার পাওয়ায় লোকালয়ে চলে আসছে ভালুক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় অর্থ বরাদ্দের পরিকল্পনা করছে মস্কো। একই সঙ্গে প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতে ভালুক শিকারের বিদ্যমান বাধ্যবাধকতা ও বার্ষিক সীমা শিথিল করার কথাও ভাবছে রুশ সরকার।
ভালুক ট্র্যাকিং ম্যাপ
কোথায় ভালুক দেখা যাচ্ছে, কোথায় আক্রমণ ঘটেছে বা পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে—সেই তথ্য এক জায়গায় প্রকাশ করতে চালু হয়েছে 'হোয়ারবেয়ার' (WhereBear) নামের একটি স্বাধীন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। এটি ইন্টারেক্টিভ মানচিত্রের মাধ্যমে পুরো দেশের তথ্য তুলে ধরে। তবে এটি কোনো তাৎক্ষণিক বা 'রিয়েল-টাইম' ট্র্যাকিং নয়; বরং কখন ও কোথায় ভালুকের দেখা মিলেছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে দেখানো হয়।
সমস্যার পরিধি ও লোকালয়ে আসার কারণ
রাশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে ৩ লাখ ৭ হাজার ৯০০টি বাদামি ভালুক রয়েছে। সাইবেরিয়া ও দূরপ্রাচ্য অঞ্চলেই এদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে ক্রাসনোয়ার্স্কে ২৬,৬০০, খাবারোভস্কে ২৬,২০০ এবং কামচাটকায়২৪,২০০টি ভালুক রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগাম বসন্ত ও চরম শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে এ বছর বনে বাদাম ও ফলমূলের ফলন বেশ খারাপ। ফলে দীর্ঘকালীন শীত নিদ্রা বা হাইবারনেশে যাওয়ার আগে বেশি বেশি করে খাবারদাবার গ্রহণ করে ভালুক। এবার ফলন কম হওয়ায় স্বাভাবিক খাদ্যের সংকট পড়েছে বাদামি ভালুককুল। অন্যদিকে পর্যটন কেন্দ্র ও লোকালয়ের খোলা ডাস্টবিনে ফেলা খাবার সহজেই পাওয়া যায় ফলে সে সব খাবারের লোভেই ভালুক মানুষ ও শহরের কাছাকাছি চলে আসছে।
সরকারি উদ্যোগ ও লোকালয়ের চিত্র
পরিস্থিতি সামাল দিতে রাশিয়ার উপপ্রশাসনিক প্রধান ও উপ-প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি পাত্রুশেভ জানিয়েছেন, বন্য প্রাণীর উপদ্রব সামলাতে আঞ্চলিক প্রশাসনকে বাড়তি তহবিল দেয়া হবে। পাশাপাশি দ্রত সিদ্ধান্ত নেয়ার সুবিধার্থে বাদামি ভালুককে নির্ধারিত শিকারের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে, যাতে স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত ভালুকের সংখ্যা নিধন বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
ইতোমধ্যে সাইবেরিয়ার কয়েকটি এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি হয়েছে। বুরিয়াতিয়ার জাকামেনস্ক শহরের ভেতরে ভালুক ঢুকে পড়ায় দুটি স্কুল ও একটি টেকনিক্যাল কলেজে অনলাইন ক্লাস চালু করতে হয়েছে।
রাশিয়ার ইয়ারোস্লাভল শহরের প্রতীক চিহ্ন
রুশ সংস্কৃতিতে ভালুকের শিকড়
রাশিয়ার জাতীয় পরিচয় ও সংস্কৃতিতে ভালুকের উপস্থিতি শত শত বছরের পুরোনো। রূপকথা, ক্লাসিক সাহিত্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন শহরের প্রতীক বা রাজকীয় চিহ্নে ভালুকের রূপ পাওয়া যায়। কবি পুশকিনের সৃষ্টি থেকে শুরু করে ১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিকের জনপ্রিয় মাসকট 'মিশা' কিংবা বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় শিশুদের কার্টুন 'মাশা অ্যান্ড দ্য বেয়ার'—সবখানেই মিশে আছে এই প্রাণীর ভাবমূর্তি।
শুধু রাশিয়া নয়; জাপান, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের কিছু দেশেও বনাঞ্চল ও মানুষের বাসভূমির সীমানা পেরিয়ে লোকালয়ে ভালুকের উপদ্রব বাড়ার একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।



