বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, আমাদের প্রাণের ভাষা। মাতৃভাষার সুরে আমাদের হৃদয় আন্দোলিত হয়। আমরা যেমন আমাদের নিজেদের ভালোবাসি তেমনি ভাষার প্রতি আমাদের ভালোবাসা বিরাজমান। কিন্তু বাস্তব জীবনে আমরা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কতটুকু বজায় রাখতে পারি? যে ভাষাকে আমরা সর্বক্ষণ আমাদের বুকে ধারণ করি, তার প্রতি আমাদের যে দায়িত্ব ও কর্তব্য তা কতটুকু আমরা পালন করতে পারি?
আমাদের সমাজব্যবস্থা এবং জীবনাচরণ পাশ্চাত্য অভিমুখী হয়ে পড়েছে। তাদের মতো করে পোশাক পরা, তাদের মতো সাহিত্য রচনা করা, তাদের সংস্কৃতিকে নিজেদের সংস্কৃতির সাথে একাত্ম করে ফেলতে দেখা যাচ্ছে। এর সাথে বর্তমান সময়ে যোগ হয়েছে আরেক উপদ্রব। অনেকেই পশ্চিমাদের অনুকরণে কথা বলতে চেষ্টা করছেন। এই প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে আমাদের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। বোধকরি, ইংরেজ আমলেও ইংরেজির প্রতি আমাদের এতটা সহানুভূতি লক্ষ করা যায়নি। এর অবশ্য কারণও আছে। চাকরির বাজারে ইংরেজি ভাষার কদরই মানুষকে আজ ইংরেজিমুখী করে তুলছে।
কোনো ভাষা শিক্ষা করা দোষের কিছু নয়, বরং এটা একজন মানুষের দক্ষতাকেই ফুটিয়ে তোলে। কেউ যদি কয়েকটি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে পারেন, তাহলে আমরা তাকে অভিনন্দন জানাই। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বহু ভাষাবিদ ছিলেন। আমাদের সমস্যা হয়েছে অন্য জায়গায়। বিদেশী ভাষা শিখতে গিয়ে আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে জলাঞ্জলি দিচ্ছি। কথায় কথায় বাংলার মধ্যে ইংরেজি বলা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বাংলার সাথে ইংরেজি মিশিয়ে একটা জগাখিচুড়ি ভাষা আমরা প্রতিনিয়ত ব্যবহার করছি।
বর্তমান সময়ে যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষেত্রে রেডিও এবং টেলিভিশন যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে আসছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের আনন্দ-উৎসব থেকে শুরু করে কোনো বিষয়ের সংবাদ জানার জন্য আমরা অনেকাংশে এসব গণমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল। ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার জন্য এসব গণমাধ্যমের উচিত ছিল শুদ্ধ বাংলা ভাষায় তাদের অনুষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে বাংলাকে মানুষের হৃদয়ের আরো গভীরে পৌঁছে দেয়া। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে আমরা এর উল্টোটাই বরং বেশি দেখছি।
সরকারি প্রচারমাধ্যমগুলো বাদ দিয়ে দেশের বেশির ভাগ বেসরকারি প্রচারমাধ্যমগুলো যে ভাষায় তাদের অনুষ্ঠান প্রচার করে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এফএম রেডিওর জকিরা তাদের ইচ্ছামতো ভাষার ব্যবহার করেন। বাংলা এবং ইংরেজির মিশেলে এক জগাখিচুড়ি ভাষা তারা প্রতিনিয়ত তাদের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের অগণিত মানুষের মধ্যে পৌঁছে দিচ্ছেন। শুধু এফএম রেডিও চ্যানেলই নয়, আমাদের দেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও ভাষা বিকৃতির ক্ষেত্রে কোনো অংশে কম নয়। তাদের উপস্থাপকগণ মনোমুগ্ধকর বাচনভঙ্গির মাধ্যমে বিকৃত বাংলা ভাষা আমাদের কাছে উপস্থাপন করছেন।
ভাষা বিকৃতির প্রভাব গিয়ে পড়ছে আমাদের দেশের কোমলমতি শিশুদের ওপর গিয়ে। শিশুরা অতি সহজেই সবকিছু শিখে নেয়। ফলে এই বিকৃত উচ্চারণ শিশুরা গ্রহণ করছে এবং এটাকে শুদ্ধ মনে করে তার প্রয়োগও করছে। আমাদের জন্য এটা একটা অশনিসঙ্কেত। ভাষার জন্য যে জাতির বুকের রক্ত ঝরেছে সেই জাতির ক্ষেত্রে এমনটা কোনোমতেই কাম্য হতে পারে না। আমাদের ভাষার বিকৃতি অবশ্যই রোধ করতে হবে। আমাদের ভাষা পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষার চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। সরকারকে অবশ্যই এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।হ

লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়